ঢাকা, বৃহস্পতিবার 28 June 2018, ১৪ আষাঢ় ১৪২৫, ১৩ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গাজীপুরে ‘নীরবে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন’

সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২৬ জুন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও এ নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সংশয় ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। এর কারণ, দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, প্রিসাইডিং অফিসার ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি পুলিশ ও র‌্যাব তথা আইন-শৃংখলা বাহিনীর সামনেই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা ব্যাপক সংখ্যায় জাল ভোট দিয়েছে। তারও আগে বিএনপির পোলিং এজেন্ট ও নেতা-কর্মীদের বের করে দিয়ে অঘোষিতভাবে ভোটকেন্দ্র দখল করে নিয়েছিল তারা। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, প্রায় কোনো ভোটকেন্দ্রেই বিএনপির কোনো পোলিং এজেন্টকে থাকতে দেয়া হয়নি। কোনো কোনো জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ৫০টি কেন্দ্র ঘুরে ৩৩ টিতেই বিএনপির কোনো পোলিং এজেন্টকে দেখতে পাননি সাংবাদিকরা। একই চিত্র দেখা গেছে ৪২৫টি ভোটকেন্দ্রেও।
এমন অবস্থার সুযোগ নিয়ে গণহারে জাল ভোট দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়েছে এমনকি ১২/১৩ বছরের কিশোররাও। কিন্তু এসব অনিয়ম ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্যও বিএনপির কোনো নেতা-কর্মীকে পাওয়া যায়নি। বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার জেলা রিটার্নিং অফিসারের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। তিনি ভোটগ্রহণ স্থগিত করার জন্যও অনুরোধ করেছেন। অন্যদিকে জেলা রিটার্নিং অফিসার সাংবাদিকদের শুনিয়েছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেছেন, সব ভোটকেন্দ্রেই ভোটাররা নাকি শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে পেরেছেন! কোথাও কোনো সংঘাত বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি! সাংবাদিকদের উপর্যুপুরি জিজ্ঞাসার মুখে জেলা রিটার্নিং অফিসার অবশ্য স্বীকার করেছেন, ৪২৫টির মধ্যে মাত্র সাতটি কেন্দ্রে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া গিয়েছিল। তিনি ওই কেন্দ্রগুলোর ভোটগ্রহণ স্থগিত করেছেন। অন্য আরো কয়েকটি কেন্দ্রে বিচ্ছিন্ন কিছু সংঘাতের ঘটনা ঘটলেও আইন-শৃংখলা বাহিনীকে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং ভোটাররা তাদের ইচ্ছামতো প্রার্থীদের ভোটও দিতে পেরেছেন।
জেলা রিটার্নিং অফিসারসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা তো বটেই, তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে একই শান্তিপূর্ণ পরিবেশের কথা শুনিয়েছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীসহ দলের নেতা-কর্মীরাও। তারা সেই সাথে বিএনপির নালিশ জানানোর পুরনো অভ্যাসের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। হেরে গেছে বলেই নাকি বিএনপি জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছে!
অন্যদিকে দেশের কোনো গণমাধ্যমের রিপোর্টেই কিন্তু প্রশাসন এবং আওয়ামী লীগের বক্তব্য সমর্থন পায়নি। প্রায় সব গণমাধ্যমের রিপোর্টে বরং গাজীপুরের নির্বাচনকে ‘নীরবে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কোনো দৈনিক শিরোনাম করেছে, ‘প্রতিরোধ প্রতিপক্ষহীন সুষ্ঠু ভোট’। আবার প্রধান একটি জাতীয় দৈনিকের শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘নিয়ম-অনিয়মের নির্বাচন’। ‘বাইরে সুনসান, ভেতরে গড়বড়’ শিরোনামে প্রকাশিত বিশেষ রিপোর্টেও জালভোট ও নীরব সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অনিয়মের খবর জানানো হয়েছে।
এসব খবরেই জানা গেছে, নির্বাচনের অনেকদিন আগে থেকেই বিএনপির নেতা-কর্মীদের ধাওয়ার মুখে রেখেছিল পুলিশ। পুলিশের মামলা দায়ের ও গ্রেফতার করার অভিযানে শত নয়, হাজারের অংকে বিএনপির নেতা-কর্মীকে কারাগারে ঢোকানো হয়েছে। যারা কোনোভাবে গ্রেফতার এড়াতে পেরেছেন তাদের পক্ষেও প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো সম্ভব হয়নি।  তারা এমনকি নিজেদের বাড়িতেও থাকতে পারেননি। পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হয়েছেন। একই কারণে নির্বাচনের দিনও তারা কোনো ভোটকেন্দ্রের ধারেকাছে যেতে পারেননি। প্রতিটি কেন্দ্রেই আওয়ামী লীগের গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পাহারা দিয়েছে আইন-শৃংখলা বাহিনীর লোকজন। এজন্যই কোথাও প্রকাশ্যে কোনো সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। আর কথিত শান্তিপূর্ণ সে অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে নৌকা প্রতীকে সিল মারার মহোৎসব করেছে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন।
এভাবেই তিনগুণেরও বেশি ভোট পেয়ে ‘বিজয়ী’ হয়েছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী। বিষয়টিকে অবিশ্বাস্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। কারণ, দেশের অধিকাংশ এলাকার মতো গাজীপুরেও সব সময় বিএনপি বিরাট ব্যবধানে জয়ী হয়ে এসেছে। ক্ষমতাসীনরা অবশ্য নিজেদের রাগের ঝাল মিটিয়েছেন যথেচ্ছভাবে। গাজীপুরের সর্বশেষ মেয়র অধ্যাপক এম এ মাননানকে একের পর এক মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে শেষ পর্যন্তও মেয়রের আসনে বসতে দেয়া হয়নি। মেয়াদের বেশির ভাগ সময় তাকে বরং কারাগারে কাটাতে হয়েছে। এই অভিজ্ঞতার কারণেই বিএনপি গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটি ঘোষিত ফলাফল বাতিল করে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানেরও দাবি জানিয়েছে।
শুধু বিএনপি নয়, সকল বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও গাজীপুরের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের অঘোষিত সন্ত্রাস ও ভোট জালিয়াতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী অনেক আগে থেকেই বলে এসেছে যে, বর্তমান সরকার এবং তার আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। গাজীপুরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আরো একবার জামায়াতের বক্তব্যই সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। ভোট কেন্দ্র থেকে বিএনপির পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া, গ্রেফতারসহ দলটির নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালানো এবং নির্বাচনী এলাকার আশপাশে তাদের থাকতে না দেয়ার বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান আরো বলেছেন, বিএনপির মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করে নির্বাচন স্থগিত করার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে নীরবতা পালনের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে, এই কমিশন আসলেও সরকারের আজ্ঞাবহ। সে কারণেই এ কমিশনের অধীনে কোনো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করা যায় না।
বলার অপেক্ষা রাখে না, সরকার এবং নির্বাচন কমিশন যে ফলাফলের কথাই বলুক না কেন, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ যেমন হয়নি, তেমনি এর ফলাফল জনগণের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে না। বাস্তবে জনগণ বরং ফলাফল প্রত্যাখ্যানই করেছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী এবং ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত রাজনৈতিক দলগুলোও একই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। আমরা উদ্বিগ্ন আসলে বিশেষ একটি কারণে। পুলিশ ও আইন-শৃংখলা বাহিনীকে ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও তার নেতা-কর্মীদের ধাওয়ার মুখে রেখে গাজীপুরে ‘নীরবে নিয়ন্ত্রিত’ যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মহড়া করা হয়েছে সে নীতি-কৌশলকেই যদি জাতীয় নির্বাচনেও ভিত্তি করার পরিকল্পনা ক্ষমতাসীনদের থেকে থাকে তাহলে নির্বাচন শুধু নয়, দেশ থেকে গণতন্ত্রও চিরদিনের জন্য বিতাড়িত হবে। আমরা আশা করতে চাই, ক্ষমতাসীনরা অমন ভয়ংকর কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগোনোর চিন্তা এখনই পরিত্যাগ করবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ