ঢাকা, বৃহস্পতিবার 28 June 2018, ১৪ আষাঢ় ১৪২৫, ১৩ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

তারপরও ব্রাজিলকেই ফেভারিট ভাবা হচ্ছে

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : এবারের বিশ্বকাপে অন্যতম ফেভারিট দল ব্রাজিল। তবে শুরুটা তাদের মোটেও আশানুরূপ হয়নি। প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের সাথে ড্র করার পর অনেকেই ব্রাজিলের দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠা নিয়ে শংকায় পড়ে গিয়েছিল। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে কোস্টারিকার বিরুদ্ধে ২-০ গোলে কষ্টার্জিত জয় পায় দেশটি। যদিও গোল দুটিই হয়েছিল অতিরিক্ত সময়ে। এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত ব্রাজিলের দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠার বিষয়টি ফাইনাল হয়ে গেছে। মস্কোয় বুধবার বাংলাদেশ সময় রাত ১২টায় ‘ই’ গ্রুপের শীর্ষে থাকা ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়েছে তৃতীয় স্থানে থাকা সার্বিয়া। একই সময়ে গ্রুপের অপর ম্যাচে দ্বিতীয় স্থানে থাকা সুইজারল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ছিল তলানিতে থাকা কোস্টারিকা। ফলাফল কি হয়েছে পাঠকরা তা জেনেই ফেলেছে। তবে এবারের বিশ্বকাপে অন্যতম ফেভারিট দল ব্রাজিল এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।  গ্রুপ পর্ব থেকে ব্রাজিল ছিটকে যাবে-এমনটা অনেকেরই ভাবনার বাইরে। তবে সেলেসাওদের বিপক্ষে সার্বিয়া জিতলে এবং অপর ম্যাচে কোস্টা রিকার সঙ্গে সুইজারল্যান্ড ড্র করলে সেটা সম্ভব।   আর তা যদি হয়ে যায় তাহলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হবে পাঁচ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে। তিতের দলের এই স্নায়ুচাপকেই কাজে লাগানোর পরিকল্পনা মিত্রোভিচের। আমার মনে হয়, ব্রাজিলের উপর অনেক চাপ থাকবে। কারণ এই ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে তারা অভ্যস্ত নয়। প্রথম রাউন্ডে তারা বাদ পড়ে যেতে পারে; অন্যদিকে, আমাদের হারানোর কিছু নেই। আমি মনে করি, যতক্ষণ আমরা ম্যাচে থাকব ততক্ষণই এটা আমাদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেবে। আমাদের স্মার্ট হতে হবে, নিজেদের সেরাটা দিতে হবে। সঙ্গে কিছুটা ভাগ্য ও সৃষ্টিকর্তার সাহায্য থাকলে আমরা জিততে পারব। ব্যর্থ হওয়ার ভয় ব্রাজিলের উপর চাপ ফেলবে বলে বিশ্বাস আলেক্সান্দার মিত্রোভিচের। আর তা সার্বিয়ার বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে ওঠার পথ তৈরিতে কাজে দেবে বলে মনে করেন দলটির এই ফরোয়ার্ড।
কোস্টারিকার বিপক্ষে জয়ে বিশ্বকাপ শুরু করা সার্বিয়া গত শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের কাছে ২-১ গোলে হেরে যায়। তবে দলের পারফরম্যান্স ও চেষ্টায় খুশি মিত্রোভিচ। এখানে ফেভারিটদের পথ চলাটা সহজ হচ্ছে না। উদাহরণ-ক্রোয়েশিয়ার কাছে আর্জেন্টিনার হার। কোস্টারিকা ও সুইজারল্যান্ড দেখিয়েছে যে, তারা ব্রাজিলের সঙ্গে খেলতে পারে। আমি আত্মবিশ্বাসী, আমরা তাদের বিদায় করে দিব। তবে এটি মনে হয় খুবই কঠিন কাজ। জিতেই দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে যাবে ব্রাজিল এটি সবার বিশ্বাস। ড্র করলেই শেষ ষোলোতে সাম্বার দেশ। হারলে আছে নানা সমীকরণ। শেষ ষোলোতে যাওয়ার লড়াইয়ে আছে সুইজারল্যান্ড ও সার্বিয়া। গ্রুপ চ্যাম্পিয়নও হতে পারে যে কোনো দল। রাশিয়া বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডের খেলা প্রায় শেষ। এরই মধ্যে দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করাও হয়ে গেছে। এবার শুরু হবে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠার লড়াই। বিশ্বকাপের ২১তম আসারে এবারও ফেবারিটের তকমাটা গায়ে মাখানো ব্রাজিলের! এর পেছনে বড় কারণ, অতীত সাফল্য আর নিজেদের খেলার ধরণ। এবার রাশিয়া বিশ্বকাপেও তার ব্যতিক্রম নয়। যার নেপথ্যে রয়েছেন তিতে। তার অধীনে বর্তমান ব্রাজিল দলটা অনেক বেশি শক্তিশালী, যথেষ্ট ধারাবাহিকও। যার প্রমাণ গত এক বছরেই দেখেছে গোটা ফুটবল দুনিয়া। লাতিন আমেরিকা অঞ্চল থেকে সবার আগেই বাছাই পর্বের বাঁধা পেরিয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বের টিকেট নিশ্চিত করে সেলেসাওরা। পাঁচটি কারণে এবার রাশিয়া বিশ্বকাপে ব্রাজিলকেই ফেবারিট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।তাদের মধ্যে শক্তিশালী রক্ষণভাগ অন্যতম। একদম রক্ষণভাগ থেকেই ব্রাজিলকে গড়ে তুলেছেন তিতে। ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে ব্যর্থ হওয়ায় অধিনায়কত্ব হারাতে হয়েছিল থিয়াগো সিলভার। সেবার বরখাস্ত হওয়া কার্লোস দুঙ্গার উত্তরসূরি হিসেবে নিয়োগ পেয়ে সেই সিলভাকে দিয়েই আত্মবিশ্বাস ফেরানোর কাজটা করেন তিতে। তার সৌজন্যেই সেন্টার হাফে মিরান্ডা কিংবা মারকুইনহোসের সঙ্গে থিয়াগো সিলভাকেই বর্তমান বিশ্বের সেরা জুটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্রাজিলের গোলরক্ষককে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য তাদের ঠিক সামনেই রয়েছেন ক্যাসেমিরো এবং পাউলিনহো। একটু পরিসংখ্যান ঘাঁটলেই দেখা যাবে তাদের সাফল্য। সেরা মানের গোলরক্ষকও রয়েছে দলে। এই মুহূর্তে বিশ্বমানের গোলরক্ষক রয়েছে ব্রাজিলের। ২৫ বছর বয়সী এ্যালিসন বেকার ইতোমধ্যেই নিজের জাত ছিনিয়েছেন। ব্রাজিলের এই গোলরক্ষক ইতালিয়ান সিরিএ লিগের দল রোমার হয়ে অসাধারণ খেলছেন। তার পারফরমেন্সে মুগ্ধ হয়ে দলে ভেড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছে লিভারপুল এবং রিয়াল মাদ্রিদের মতো জায়ান্ট ক্লাবগুলো। এ ছাড়া নেইমারের ওপর নির্ভরশীল নয় এবার ব্রাজিল। যদিওবা বর্তমান ব্রাজিলের সেরা তারকা নেইমার। তার পরও ব্রাজিল দলে নেইমারই কেবল বিশ্ব মাপের খেলোয়াড় নন। পিএসজির এই তারকা ফুটবলার ছাড়াও ব্রাজিলের রয়েছে ফিলিপে কোটিনহো, উইলিয়ান কিংবা ডগলাস কোস্তার মতো সব তারকা ফুটবলার। আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে। এই মুহূর্তে ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে। আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ কিংবা বাছাই পর্বের ফলাফলের দিকে তাকালেও খুব সুস্পষ্ট তা। চার বছর আগে ব্রাজিল বিশ্বকাপে যে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল সম্প্রতি সেই জার্মানিকেও ১-০ ব্যবধানে হারিয়েছে ব্রাজিল। বিশ্বকাপের আগে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের জন্য এটা মোটেও বড় কোন জয় নয়, তবে এই জয়টা যে ৭-১ গোলের হারের ‘ভূত’ থেকে ব্রাজিলকে বের করে নিয়ে এসেছে তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
দলের সেরা তারকা নেইমারকে ফিরে পেয়েছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। প্রীতি ম্যাচে নেইমারকে শুরুর একাদশে রেখে ঝুঁকি নেননি কোচ তিতে। যদিওবা নেইমারবিহীন ব্রাজিল প্রথমার্ধে কিছুটা এলোমেলো খেলাই উপহার দিচ্ছিল। নিজেদের পায়ে বল রাখতেই হিমশিম খেতে হয় সেলেসাওদের। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ফার্নান্দিনহোর বদলি হিসেবে নেইমার নামতেই ব্রাজিলের খেলার ধরন পাল্টে যায়। চার মাস পর চোট কাটিয়ে ফেরা নেইমার শুরুতে কিছুটা অস্বস্তিতেই ছিলেন। তবে সময় গড়াতেই সেই অস্বস্তি কাটিয়ে স্বরূপে ধরা দেন প্যারিস সেন্ট জার্মেইর এই তারকা ফুটবলার। ম্যাচের ৬৯ মিনিটে দেখা যায় নেইমারের পায়ের জাদু। উইলিয়ানের পাস থেকে বল পেয়ে ক্রোয়েশিয়ার তিন ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে দর্শনীয় এক শটে জাল খুঁজে নেন নেইমার। সেই সঙ্গে তাকে ঘিরে সেলেসাওদের বিশ্বকাপ স্বপ্নের পালে দিলেন জোর হাওয়া। ম্যাচের শেষ মিনিটে ক্যাসিমারোর পাসে ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে বল জালে জড়িয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন গ্যাব্রিয়েল জেসুসের বদলি হিসেবে নামা রবার্তো ফিরমিনো। শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলের জয় নিয়ে প্রস্তুতি পর্বটা বেশ ভালভাবেই সারল পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।
মূল পর্বেও নেইমারকে দারুণ ফর্মে দেখা গেছে। প্রথম ম্যাচে গোল না পেলেও দারুণ খেলেছে এই ফরোয়ার্ড। তাকে আটকানোতেই ব্যস্ত ছিল প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড। একাধিকবার তাকে আহতও করা হয়েছে। তবে দ্বিতীয় ম্যাচের নিজের জাত চেনালেন নেইমার। একটি গোল করার পাশাপাশি দলের জয়ের বিষয়ে দারুণ ভূমিকা পালন করেছে।
অনেকেই বলছে, বিতর্কহীন কোচ তিতে, যা রাশিয়া বিশ্বকাপে ব্রাজিল হট ফেবারিট হওয়ার অন্যতম কারণ। ব্রাজিলের আগের দুই কোচের চেয়ে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিচারে তিতে অনন্য। খেলোয়াড়দের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক তার। গণমাধ্যমের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেন তিনি। তার অধীনে সকলেই নিজের সেরাটা ঢেলে দিতে মরিয়া। দুঙ্গার উত্তরসূরি হিসেবে ব্রাজিলের ভার কাঁধে নেয়ার পর থেকে কোন ধরনের বিতর্ক ছুঁতে পারেনি তাকে! ব্রাজিলের খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফদের প্রত্যেকেই ভালবাসেন এবং সম্মান করেন তিতেকে। তবে তিতে নেইমারের ওপর কোন ধরনের প্রত্যাশার চাপ সৃষ্টি না করার জন্য অনুরোধ করেছেন। এ প্রসঙ্গে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের শেষে তিনি বলেন, ‘প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ভাল করে ফিরেছে সে আজ। আমি যেমনটা আশা করেছিলাম তার চেয়েও অনেক ভাল করেছে সে। যদিওবা সে এখনও ফিট হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে। তবে সেরা ফর্মে ফেরার আগে উত্থান-পতন দেখা যাবে তার। সেরা ফর্মে ফিরতে তার আরও তিন-চার ম্যাচ লাগতে পারে। কিন্তু অনুগ্রহপূর্বক সে আজ যা করেছে তার চেয়ে বেশি প্রত্যাশার চাপ তৈরি করবেন না।’ এদিকে, অস্ট্রিয়ার একদল সংখ্যাতত্ত্ববিদরাও বলছেন, রাশিয়া থেকে বিশ্বকাপ নিয়ে ঘরে ফিরবেন কোটিনহো-নেইমাররা। তারা বলছেন, সব হিসাব মিলে গেলে রাশিয়া বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নশিপের মুকুট পেতে চলেছে ব্রাজিল। আর এই হিসেবে রানার্সআপ হবে জার্মানি।
যদিও জার্মানী মাত্র একটিতে জয় পেয়েছে। সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে দুই দেশ যদি ফাইনালে মুখোমুখি হয় তাহলে ব্রাজিলের জয়ের সম্ভাবনা প্রায় ৫০.৬ শতাংশ। আর তুলনায় জার্মানির প্রায় ৪৯.৪ শতাংশ। এ ছাড়া লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার একটি ভাল সুযোগ রয়েছে।  রাশিয়ায় ব্রাজিল ভরসা করার মতো একজন খেলোয়াড় পেয়েছে। তিনি ফিলিপে কুতিনহো। দুই ম্যাচে তার গোলেই ব্রাজিল তুলে নিয়েছে ৪ পয়েন্ট। দলে নেইমারকে ছাড়িয়ে নিজের গুরুত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে। অনেকের মতো এমনটাই ভাবছেন ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী সাবেক খেলোয়াড় কাকা। মেসি-রোনালদো যুগ শুরু হওয়ার আগে শেষ ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড় হওয়া কাকা বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলের প্রধান চরিত্র হিসেবে দেখছেন কুতিনহোকে। নেইমার তিতের দলের মূল তারকা হলেও বার্সার প্লেমেকারই সেলেসাওদের খেলায় মূল ভূমিকা রাখছেন। কাকা জানিয়েছেন, ‘নেইমার আমাদের সেরা খেলোয়াড়। আমি মনে করি, নেইমারকে কীভাবে কাজে লাগাতে হবে তিতে সেটা জানে এবং দলকে আরও শক্তিশালী করার জন্য নেইমারকে প্রস্তুত করে ফেলবে। আমাদের গ্রুপ খুব কঠিন। আর কুতিনহোই আমাদের দলকে টানছে। সে-ই ব্রাজিলের হয়ে পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ