ঢাকা, শুক্রবার 29 June 2018, ১৫ আষাঢ় ১৪২৫, ১৪ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা রম্যনাটকের প্রথম স্রষ্টা

 

রবিউল ইসলাম : মুসলমানদের হাতে ভাত খেলে জাত যায়। জমিদার ভক্তপ্রসাদ রাধাকৃষ্ণ বলে ফাতেমার হাত ধরে টানাটানি করছিল। তখন ভন্ড ভক্তপ্রসাদের জাত যায় না? অত্র সংলাপ মাইকেল মধুসুদন দত্ত অমর সৃষ্টি বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো থেকে উদ্ধৃত হয়েছে। অন্যদিকে ভারতবর্ষের ব্রিটিশ কর্তৃক মুসলিম নির্যাতনের চিত্র দেখে মধুসুদনের হৃদয় কেপে ওঠে। মাদ্রাস পত্রিকা মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের নির্যাতনের বৈরী প্রতিবাদে উপ-সম্পাদীকিয় মুসলিম ইন্ডিয়া শিরোনাম লিখে মুসলমান সম্প্রদায়ের পাশে অবস্থান নেন।

নাট্যকার ও মহাকবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারী যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলা সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা রাজ নারায়ন দত্ত ছিলেন প্রতিষ্ঠিত উকিল। মাতা জাহ্নবী দেবী। প্রথম তিনি সাগরদাড়ি পাঠশালাল লেখাপড়া করেন। সাত বছর বয়সে তিনি কলকাতায় যান। খিদিরপুর স্কুলে ২ বছর পড়াশুনার পর ১৮৮৩ সালে কলেজে ভর্তি হন। কলেজে অধ্যয়নকালেই প্রতিভার বিকাশ ঘটে। ১৮৩৪ সালে তিনি কলেজে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে নাট্য বিষয়ক ইংরেজি প্রস্তাব আবৃতি করেন। উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এখানে তার সহপাঠি ছিলেন ভুদেব মুখোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রনাথ মিত্র, রাজ নারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক প্রমুখ যারা পরবর্তী জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

উল্লেখ্য কলকাতার বেলগাছিয়া নাট্যশালায় নাটক দেখার জন্য একদল ইংরেজ আসেন। বাংলা নাটকের সংলাপগুলো তৎক্ষণিক দ্রুত ইংরেজিতে অনুবাদ করে যাওয়ার কেউ আছে কি ইংরেজরা প্রশ্ন করেন। উপস্থিত লোকজন বলল কলকাতার মধ্যে মাইকেল মধুসুদন ছাড়া আর কেউ তা পারবে না। ১৮৫৯ সালে মধুসুদন দুটি প্রহসন রম্য নাটক রচনা করেন। এটাই বাংলা ভাষার প্রথম রম্য নাটক, একেই বলে সভ্যতা ও বুড়ো শালিকের ঘাঁড়ে রো। রচনার মাধ্যমে সীমাহীন কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। 

তৎকালীন সমাজ সম্পর্কে মধুসুদনের ব্যাপক অভিজ্ঞতা, পরিচয়, বাস্তবতার যথার্থ চিত্র, বিচিত্র চরিত্রের সার্থক রুপায়ন ব্যঙ্গ বিদ্রƒপের তীব্রতায় সংলাপের সাবলীলতায় তিনি যে বিপুল প্রতিভার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন। তাতে প্রহসন বাংলা নাটকের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাভ করেছেন। 

বুড়ো শালিকের ঘাঁড়ে রোঁ

নাটকের ঘটনাস্থল সাগড়দাড়ী গ্রামের তৎকালীন সমাজ ও পরিবেশ। রম্য নাটকের তিনি শুরু করেছেন এই ভাবে। অত্র গ্রামের বক ধার্মিক জমিদার ভক্তপ্রসাদ মুখে তার ধর্মের কথা অন্তরে লাম্পট্য বয়সেও বৃদ্ধ। গরীব প্রজাদের প্রতি অত্যাচারে সে নির্দয়। ভক্ত প্রসাদের গরীব প্রজা হানিফের জমিতে উৎপাদিত ধানের পরিমাণ একেবারে নগন্য। খাজনা দিতে না পারায় প্রজা হানিফকে শাস্তি প্রদানের হুকুম জারী। হানিফকে রক্ষা করার জন্য গধাদর তার লম্পটকে লোভ দেখায় ওবেটা যে ছুরিকে বিয়ে করেছে তার নাম ফাতেমা তাকে কি আপনি দেখেছেন? মুখের কথা আর কি বলবো। বয়স বছর ১৯। এখনো ছেলে পিলে হয়নি। 

গায়ের রং যেন কাঁচা সোনা। মালা জপ করতে করতে একথা শুনে ভক্ত প্রসাদ নারী লিপ্সায় লালায়িত হয়ে ওঠে। হানিফ যেহেতু অন্য ধর্মের লোক। সেহেতু নারীদের সাথে ব্যভিচারের ব্যাপারে দ্বিধান্বিত হয়। তখন গধাদর যুক্তি তুলে ধরে বলেন, আপনি না আমাকে কতবার বলেছেন যে, শ্রীকৃষ্ণ ব্রাজ গোয়ালের মেয়েদের নিয়ে কেলি করতেন। ভক্তপ্রসাদ দীনবন্ধো তুমি যা কর। স্ত্রী লোকের আবার জাত কি। হানিফের সুন্দরী স্ত্রী ফাতেমাকে হাত করার জন্য পরিকল্পনা। সে দায়িত্ব নেয় গধাদর খর্চা ২০ টাকা। একটু পরেই আসে বাচস্পতি। তার মা ঠাকুর পরলোক হয়েছে। বাচস্পতি মাতৃশ্রদ্ধায় দায়গ্রস্থ। এই গরীবের যে যা সামান্য সম্পত্তি ছিল, তা ভক্ত প্রসাদ গ্রাস্য করেছে। বাস্পতি তার মাতৃ শ্রদ্ধা মোচনের জন্য ভক্ত প্রসাদের কাছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে ভক্ত প্রসাদ নানা অজুহাত দেখিয়ে সাহায্য করতে অস্বীকার করলো। ভক্ত প্রসাদের লাম্পট্য প্রসঙ্গে গধাদরের উক্তিতে এ কথা প্রকাশ পরে যে, ভক্ত প্রসাদ এ পর্যন্ত বহু সনাতন ধর্মের বহু রমনীর সর্বনাশ করে তাদের জীবন বিনষ্ট করেছেন। কুল ছাড়া করেছেন। ব্যভিচারের জন্য টাকা খরচ করতে ভক্ত প্রসাদের আপত্তি নেই। ইতিমধ্যে পীতম্বর তেলির বিবাহিত কন্যা ভগী যে তার কন্যা সমতুল্য তাকে দেখে ভক্ত প্রসাদের কামনা লালসা অতি উদগ্রীব হয়ে ওঠে। হানিফ এবং তার স্ত্রী ফাতেমা ভক্ত প্রসাদের লাম্পট্যের প্রতিবাদে জলন্ত আগ্নেয়গিরি বুড়ো শালিকের ঘাঁড়ে রোঁ নাটকে। 

ফাতেমার কাছে ভক্ত প্রসাদের লাম্পট্যের প্রস্তাব নিয়ে আসে। ফাতেমাকে সে লোভ দেখায় এই ক্ষেত্রে ফাতেমা চতুরালির আশ্রয় নেয়। তবে অন্তরে তার অন্যরকম অভিসন্ধি পুটি ফাতেমা ভক্ত প্রসাদের মিলিত হওয়ার জন্য বলে, তুই সাজের বেলা ঐ আম বাগানে যাস তার পরে আমি এসে তোকে নিয়ে যাবো। ফাতেমা এই শর্তে সম্মত। এ সব শুনে হানিফ রাগে ফুসতে থাকে। বাচস্পতির সাথে হানিফের যোগাযোগ হয়। তারা উভয়ে লম্পট ভক্ত প্রসাদের উপর্যুক্ত শিক্ষা দেওয়ার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা করে। পুটিয়ে এসে ফাতেমাকে বলেন, ঐ যে পুকুরের ধারে ভাঙ্গা শিব মন্দির আছে ঐখানে তোকে যেতে হবে। রাত ৪ টার সময় গাছতলায় দাঁড়াস পরে আমি এসে নিয়ে যাবো। ভক্তপ্রসাদের কলেজ পড়–য়া ছেলে অম্বিকার বন্ধু আনন্দের আলাপ প্রসঙ্গে ভক্তপ্রসাদের প্রশ্ন আমি শুনেছি কলকাতা নাকি সব একাকার। কায়েস্ত ব্রাহ্মণ, সোনার বেনে, কপালি, তাতী জোলা তেলি সকলেই নাকি একত্রে ওঠে আর বসে। বাপু এসকল কি সত্য। এর উত্তরে আনন্দ আজ্ঞে বড় মিথ্যা তাও নয়। একথা অন্য ধর্মের অবৈধ নারী সম্পদ লোভী ভক্ত প্রসাদের মাথায় বাজ পড়ে কি সর্বনাশ। রাধাকৃষ্ণ বলে ভন্ডামি করে চরম লাম্পট্যের লোভে ফাতেমার জন্য লালাইত হয়ে উঠেছে। যে লোকটি সেই ভক্ত প্রসাদ সনাতন সমাজের বর্ণভেদ প্রথার শিকড় আগলে রাখতে চাইছেন। 

মাইকেল মধুসুদন এই স্ববিরোধী বিষয়টি স্পষ্ট তুলে ধরেছেন। হানিফের স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার জন্য রাধাকৃষ্ণের নাম জপ করা লম্পট ভক্তপ্রসাদ। তাজ মাথায় দিয়ে নিজের টিকি ধরে গায়ে আতর মেখে সুসজ্জিত হয়ে রওনা হয়। বাস্পতি ও হানিফের গোপন পরামর্শ হানিফ বলে আমার সামনে ভক্ত প্রসাদ আমার স্ত্রীর গায়ে হাত দেয় বেইজ্জতি করে। ভক্ত প্রসাদের মাথাটা টেনে ছিড়ে ফেলব। ভক্তপ্রসাদ দফাদারকে সরিয়ে পাহারায় রাখে। ফাতেমার প্রতি প্রথম সম্ভাষণ সুন্দরী একবার বদন তুলে দুটি কথা কও। আমার জীবন স্বার্থক হোক। প্রহসন আর কাকে বলে ফাতেমা ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নেয়। ভক্ত প্রসাদ কামনার উদ্দীপ্ত লালসায় রসসিক্ত প্রেয়সি তুমি যদি যাবে তবে আর বাঁচবো কিসে? তুমি আমার প্রাণ, তুমি আমার কলজে, বুড়ো বলে অবহেলা করো না। এরপর গদাধরের উক্তি সে প্রশ্ন করে মুসলমানদের ভাত খেলে জাত যায়। মুসলিম মেয়েদের সাথে ব্যভিচার করলে চরিত্রহীন ভক্ত প্রসাদের জাত যায় না। মধুসূদন এভাবে ভক্ত বর ধার্মিকের চরিত্র নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। হানিফের হুংকারে প্রকম্পিত হয়ে বিচলিত পুটি তুতলে পতন। ভক্তপ্রসাদের পৃষ্টদেশে হানিফের কিল ঘুষি। 

গভীর নিশীতে গভীর উদ্যানে ভগ্ন মন্দিরের আঙ্গিনায় ভক্তপ্রসাদের সাথে পুটি এবং ফাতেমাকে দেখে বাস্পতির প্রশ্ন ভক্তপ্রসাদ এ সময় এখানে কেন? আর এরাই বা কেন এখানে এসেছে। এতো দেখছি হানিফ গাজীর মার্ক। এ পর্যায়ে ভক্তপ্রসাদ লজ্জিত হয়ে নিজের দোষ স্বীকার করে তোমার হাত ধরে বলছি এই ভিক্ষাটা আমাকে দাও। বুড়ো বয়সে এ ঘটনা প্রকাশ করে আমার কুলমানে একেবারে ছাই পড়বে। পূর্ব পরিকল্পিত অনুসারে বাস্পতির অভিযান স্বার্থক। সে তার জমি ফেরত পায় এবং হানিফ ভক্ত প্রসাদকে বলে আপনার মুসলমান হতে সাধ জেগেছে এই জানতে পারলে ভাবনা কি ছিল। 

ফাতেমার চেয়েও সোনার চাঁদ আপনাকে দিতে পারতাম। এজন্য আপনি এত শ্রম নিলেন কেন। এখন ভক্ত প্রসাদ নিজেই মুসলমান হতে বসেছে। এর চেয়ে খুশির খবর আর কি হতে পারে। ভক্ত প্রসাদ নিজের সর্বনাশ বুঝতে পারে এই জঘন্য কর্মটা আজ দেখে দুর করলাম। বকধার্মিক লম্পট ভক্তপ্রসাদের উপর্যুক্ত শিক্ষা হয়েছে। হানিফকে ২০০ টাকা দিতে সম্মত হয়। বিষয়টি যেন বাইরে জানাজানি না হয়। যেমন কর্ম ফল্য ধর্ম। তৎকালীন সমাজে বাস্তবতা অবলম্বনে অত্র প্রহসন নাটকের একজন নিপুন শিল্পীর মত তার নাটকে ক্যানভাসের সেই চিত্র অত্যন্ত স্বার্থকতার সাথে তুলে ধরেছেন। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ