ঢাকা, শুক্রবার 29 June 2018, ১৫ আষাঢ় ১৪২৫, ১৪ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নব-বিবাহিত কর্পোরেট

হাফিজ ইকবাল : অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পোহানোর পর ছয় বছরের কপট প্রেমের পরিণতি হলো। খুব ঘটা করে না হলেও ঘরোয়া পরিবেশে বিয়ে হলো রান্টু-জুঁই জুটির।

দেশের দুইবিভাগের দুই পাত্র-কন্যা একছাদের নিচে বসবাস করা শুরু করেছে। পাত্র হিসেবে রান্টু নাম্বার ওয়ান না হলেও বিয়ের বাজারে বেশ ডিমান্ড ছিল তার। পাত্রি হিসেবে জুঁইয়ের ছিল প্রথমশ্রেণির টিকিট। 

রান্টু একজন কর্পোরেট পার্সন। জুঁই বেসরকারী ব্যাংক কর্মকর্তা। আহ! কী চমৎকার মিল! যেন সোনায় সোহাগা! রান্টুর অফিস মিরপুর এক নম্বরে। তার অফিসের শাখাগুলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও আছে। তবে ঢাকায় তাদের একটাই অফিস।

জুঁই ভাগ্যবতী নারী। সে পোস্টিং পেয়েছে মতিঝিলে তার ব্যাংকের হেড অফিসে। মতিঝিলে হেড অফিস হওয়ায় জুঁই আগে থেকেই মতিঝিলে থাকত। সেখানে তার এক কলিগসহ একটি ফ্লাটে স্বাচ্ছন্দে থাকত। এখনতো সুখে টইটুম্বুর অবস্থা জুঁইয়ের। এতদিন যাকে শয়নে-স্বপনে চেয়েছিল সে এখন সেই ফ্লাটের একজন পার্মানেন্ট মেম্বার। যদিও কলিগকে হাসি-কান্না জড়িত আবেগময় বিদায় জানাতে হয়েছিল তাকে।

রান্টু মিরপুরে তার অফিসের পাশেই থাকত। সাড়ে নয়টায় ঘুমথেকে উঠলেও যথাসময়ে অফিস ধরতে সমস্যা হতোনা। পাঁচমিনিট লাগত অফিসে পৌঁছতে তার। কত সাধের ময়নার সাথে বিয়ে হয়েছে রান্টুর। তাই সে মিরপুর এক নম্বর ছেড়ে পাড়ি জমালো মতিঝিলের জুঁইয়ের ফ্লাটে।

বিয়ে উপলক্ষে টানা দশদিনের ছুটি কাটিয়ে তারা গ্রামের বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় আসল। শুক্রবার রাতে তারা ঢাকায় ফিরে। বাসায় পৌঁছতে পৌঁছতে রাত বারটা বেজে গেছে। জার্নি করে আসার ক্লান্তিতে বাইরের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে দু'জনে। রান্টুর জব প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে হওয়ার কারণে সপ্তাহে ছয়দিন অফিস। আর জুঁইয়ের পাঁচদিন ব্যাংক খোলা থাকে।

শনিবার সকাল ছয়টা। রান্টুর ঘুম ভেঙ্গেগেল। অফিস দশটায়। তাড়াহুড়ো করে অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছে। নববধূ জুঁই তখনো ঘুমোচ্ছে। স্বামী অফিসে যাচ্ছে একটু নাস্তা তৈরি করে দিবে। কিন্তু জার্নির ক্লান্তিতে ঘুম ভাঙ্গছেনা তার।

সেভ করে গোসল সেরে রেডি হতে সাতটা বেজে গেল। তখনো সাধের ময়নার ঘুম ভাঙ্গেনি। 'এই জুঁই, আমি অফিসে যাচ্ছি। দরজাটা লাগাও।' বলে রান্টু ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ে। রান্টুর ডাকে আধখোলা চোখ নিয়ে দরজাটা বন্ধকরে আবার ঘুমোতে যায় জুঁই।

মতিঝিল থেকে মিরপুর এ যেন ঢাকা টু রাজশাহীর দূরত্ব। সকাল সকাল বের হয়েও দশটার মধ্যে অফিসে পৌঁছতে পারল না রান্টু। পৌঁছল সাড়ে দশটায়। অফিসের ম্যানেজার রান্টুকে তার কক্ষে ডেকে নিলেন।

'রান্টু সাহেব, ক্যামন কাটলো বৈবাহিক জীবনের স্টার্টিং মুমেন্টগুলো?'

'জি স্যার, ভালোই কাটলো।'

'শুনলাম আপনি নাকি বাসা নিয়েছেন মতিঝিলে?'

'জি স্যার, ওয়াইফের ওখানে পোস্টিং তো তাই।'

'মিরপুর টু মতিঝিল বেশ কষ্টকর যাতায়াত হবে রান্টু সাহেব। ঢাকা শহরে যে পরিমাণে জ্যাম!'

 

ম্যানেজারের সঙ্গে কথাবলা শেষ করে রান্টু তার ডেস্ক এ বসে। পকেটে থাকা মোবাইলটা বেজে উঠে। রান্টু দেখল যে জানু ওরফে জুঁই ফোন করেছে। 

'হ্যালো।'

'হ্যাঁ, তুমি কি অফিসে পৌঁছেছ?'

'মাত্রই পৌঁছলাম। আচ্ছা শোনো, আমি রাখছি। অনেক কাজ পড়ে আছে। কাজ শেষকরে তোমাকে ফোন করব হ্যাঁ।'

'শোনো না? কিছু খেয়েছ কী?'

'না খাইনি। পিয়নকে দিয়ে ব্রেকফাস্ট আনিয়ে খাব। আচ্ছা রাখলাম।'

রান্টু পিয়নকে ব্রেকফাস্ট আনতে বলে কাজের মধ্যে ডুবে যায়। পিয়ন ব্রেকফাস্ট আনলে সেখানথেকে কিছু নাকে-মুখে গুজে নিয়ে আবার ডুবে যায় কাজে। কখনযে একটা বেজে গেছে টেরই পায়নি রান্টু। অন্য কলিগরা যখন লাঞ্চের জন্য উঠল তখন সে টের পেল যে একটা বেজে গেছে। রান্টুর মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। কিন্তু সে ফোনটা ধরল না। কলিগদের সাথে অফিসের সরবরাহকৃত লাঞ্চ শেষকরে আবারো ডুবে যায় কাজের সাগরে।

আবারো বেজে উঠে মোবাইল ফোনটা। জুঁইয়ের ফোন।

'হ্যালো। শোনো অনেক কাজ জমেছে। কাজ করছি। অফিস শেষকরে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসব।'

জুঁইয়ের কোনো কথা না শুনে কলটা কেটে দিয়ে রান্টু ব্যস্ত হয়ে পড়ে তার জমে থাকা কাজগুলো সামলাতে।

সন্ধ্যা সাতটা। অফিসের সবাই চলে যাচ্ছে। রান্টু কাজের ঘোরথেকে সম্ভিত ফিরে পায়। ফাইল পত্র সব গুছিয়ে রেখে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বের হয় অফিস থেকে। মতিঝিলগামী বাসে উঠে রান্টু। বাসে বসে জুঁইকে ফোন দিয়েছে। 

'হ্যালো।'

'হ্যাঁ! বলো?'

'আমি অফিস শেষকরে বাসে উঠেছি।'

'আচ্ছা, ভালোভাবে আসো।'

স্বামীর প্রিয় খাবার ছোটমাছ ভাজি ও মুগেরডাল রান্না করছে জুঁই। মনে মনে প্লানকরছে রান্টু আসলে মুভি দেখবে। গল্প করবে খুনসুটি করবে। রান্না শেষকরতে প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গেল। রান্টু কতদূর এসেছে জানার জন্য ফোন করে জুঁই।

'হ্যালো।'

'হ্যাঁ! বলো জুঁই?'

'কতদূরে তুমি?'

'আমি এখন ফার্মগেটে।'

'আচ্ছা আসো।'

রান্টুর আসার অপেক্ষায় জুঁই হারিয়ে যায় পুরনো স্মৃতি রোমন্থনে। মাত্র একবারের দেখায় ব্যক্তিত্ব দেখে প্রেমে পড়া। কত রাখ-ঢাক করে প্রেম। প্রথম ডেটিংয়ে চকোলেট খাওয়ানো। স্মৃতির ভেলায় ভাসতে ভাসতে হঠাতই চোখ পড়ে দেয়াল ঘড়িতে। দেখে সাড়ে নয়টা বাজে। রান্টুর ফোনে কলদেয় আবারো। 

'হ্যালো।'

'কি খবর তোমার?'

'এইতো শাহবাগে।'

'এতক্ষণেও শাহবাগে!'

'কী করব বলো? জ্যামের শহর ঢাকা।'

'আচ্ছা রাখলাম।'

টিভিতে দশটার সংবাদ দেখছে জুঁই। পেট বারবার জানান দিচ্ছে দুপুরের খাওয়া খাবারের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। কিছু খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এখন কিছু খেলে ক্ষিধেটা মরে যাবে। রান্টু আসুক একসঙ্গে খাব। গল্প করব। আর কতক্ষণই বা লাগবে? ভালোবাসার মানুষ আমার। তাকে ছাড়া খেতে পারব না। আবারো সে ফোন করে রান্টুর ফোনে। একবার, দু'বার করে বিশবার রিং হলো কিন্তু রান্টু ফোন ধরল না। জুঁই খুবই টেনশনে পড়ে গেল। কোনো বিপদ হলোনা তো। ঢাকা শহরের যে লক্কর ঝক্কর বাস। আবার ড্রাইভারগুলোও সেই এক্সপার্ট! প্রায় দিনই কোনো না কোনো ছোট-বড় এক্সিডেন্ট ঘটে। আবার মলম পার্টি ও অজ্ঞান পার্টিরও দৌড়াতœ বেড়েগেছে। রান্টুর থেকে জুঁইয়ের আবেগ ও ভালোবাসা বেশি। তাই নানা প্রকার দুশ্চিন্তা ভর করল জুঁইয়ের উপর। ঘেমে একাকার হয়ে গেছে সে। আল্লাহর নাম জপা শুরু করেছে সে। ভয়ার্তভাবে আবারো রিং দেয় জুঁই। এবার রান্টু ফোনটা পিক করে।

'হ্যালো।'

'তুমি কল ধরছো না কেন? কতগুলো কল দিলাম। আমি টেনশনে শেষ হয়ে যাচ্ছি(কান্নাজড়িত কণ্ঠে)।'

'শোনো, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আর অফিস থেকে বের হওয়ার পর মোবাইলের সাউন্ড অফকরে ভাইব্রেশন চালু করেছি। মানুষের সামনে রিংটোন বাজলে খারাপ লাগে। এখন শাহবাগের চৌরাস্তা মোড়ে আছি। চারদিকের বাসগুলো একবার একবার করে ছাড়ে তাই একঘন্টা ধরে দাঁড়ানো বাসে বসে আছি। বাসের গরমে ঘেমে ক্লান্তহয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।'

'এখন কই তুমি?'

'এইতো ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের সামনে। '

'ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি আসো।'

রান্টুর বাস এখন পল্টন মোড়ে। এখানেও চৌরাস্তার সিগন্যাল পার হতে টানা আধাঘন্টা লেগে যাবে। তাই বাস থেকে নেমে হেঁটে মোড়টা পারহয়ে কমিউনিস্ট পার্টির অফিসের সামনে থেকে রিক্সায় উঠে পড়ে রান্টু। তাদের বাসার সামনে নেমে পড়ে রিক্সার ভাড়া দিয়ে। দশতলা ভবনের পাঁচতলায় একটি বেডরুম, এটাচ বাথ, ডাইনিং স্পেস, কিচেন, বেলকুনিসহ একটি ফ্লাট জুঁইদের। এতরাতে লিফ্ট বন্ধ। তাই পাঁচতলা পর্যন্ত সিঁড়ি বেয়ে উঠে কলিং বেলে টিপ দেয় রান্টু। সাথে সাথেই দরজা খুলে দেয় জুঁই। 

'আরে বাপরে কী জ্যাম!'

'দাও, তোমার ব্যাগটা দাও। কাপড় ছেড়ে টেবিলে বসো খাবার দিচ্ছি।'

ঘর্মাক্ত শরীরের কাপড় খুলে লুঙ্গি পরে হাত-মুখ ধুয়ে একটু বিশ্রামের জন্য বিছানায় গড়ান দেয় রান্টু। কিচেনথেকে খাবার এনে ডাইনিং এ সাজানো শেষকরে জুঁই রান্টুকে ডাকছে। 

'কই তুমি? আসো খেয়ে নেই।'

কোনো উত্তর নেই জুঁইয়ের ডাকের। তাই বেডরুমে ঢুকে দেখে রান্টু নাক ডাকছে। কী শ্রান্তি নিয়ে ঘুমোচ্ছে! রান্টুর ক্লান্তি ও অবসাদের ঘুমদেখে মায়ায় ভরে যায় জুঁইয়ের মন। তাই ডাকতে যেয়েও ডাকতে পারলো না। তাই মনে মনে বলছে। সারাদিন অফিসকরে এসে একমুঠো খাবে। তারপর না হয় ঘুমাক। খেলোনা। আর আমিযে সারাদিন অপেক্ষা করে আছি। গল্প করব। হানিমুনে কোথায় যাব সে জন্য প্লানিং করব। কোন হোটেলে উঠব? কি কি কিনব? কতদিন থাকব? খুনসুটি করব। আর আমার দিকে তাকানোর পর্যন্ত সময় হলো না তার। কী হলো তার পছন্দকরা গহনা পরে? কী হলো তার প্রিয় শাড়ি পরে?

জুঁই ভাবল একটু ঘুমাক। হয়ত বা কিছুক্ষণ পরে উঠবে। ঘুম থেকে উঠলে খাওয়া শেষকরে প্লান করবো, গল্প করবো, খুনসুটি করবো। বেলকুনিতে যেয়ে গ্রিল ধরে দাঁড়ালো জুঁই। দেখে এই মধ্যরাতে চাঁদটা একাকী মিটিমিটি জোসনা ছড়াচ্ছে। কী নিঃসঙ্গ চাঁদটা! চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতেই নিজেকে এখন বড্ড একাকী মনে হচ্ছে তার। এদিকে পেট বলছে যদি কিছু তাতে না পড়ে তাহলে নাড়ি-ভূঁড়ি হজম হওয়া শুরু হবে।

পেটের ক্ষুধা ও মনের বাসনা নিয়ে ঘরে ফিরে জুঁই। দেখে রান্টুর নাক ডাকার আওয়াজটা আরো বেড়ে গেছে। ফ্যানের বাতাসের শীতের প্রভাবে কিছুটা আড়ষ্ট হয়েছে রান্টু। পরম মমতায় জুঁই নকশি কাঁথাটি রান্টুর গায়ের উপর দিয়ে দিলো। নকশি কাঁথাটি গায়ে পেয়ে রান্টু বেশ আরামবোধ করছে। তাই নাকডাকার আওয়াজটা বাড়িয়ে গভীর থেকে গভীরতর ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায় সে।

রান্টুর ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ক্ষুধার্ত মনে অনেক যতনেরাধা সেই মুখরোচক খাওয়ার রেখে ও সুচারুরূপে গোছানো নিজেকে নিয়ে ডিম আলো জালিয়ে রান্টুর পাশেই শুয়েপড়ে জুঁই। হাজারো কল্পনার ডালা সাজাতে সাজাতে ঘুমিয়ে পড়ে জুঁই। 

পরদিন সকালে রান্টুর ডাকে জুঁইয়ের ঘুম ভাঙ্গে। 

'জুঁই, জুঁই। দরজাটা একটু লাগাও। আমি অফিসে যাচ্ছি।'

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ