ঢাকা, শুক্রবার 29 June 2018, ১৫ আষাঢ় ১৪২৫, ১৪ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আল হাফিজের সচিত্র কবিতার আলোড়ন

তাজ ইসলাম : একদা এই উপমহাদেশে ফতোয়া জারি করা হয়েছিল বাংলা ভাষা চর্চাকারীগণ রৌরব নরকবাসী হবে।স্বভাবতই উপলব্ধি করা যায় এই ভাষা এবং ভাষাচর্চাকারীগণ বহু নির্যাতন নিপীড়নের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে আসছেন যুগের দীর্ঘ পথ। আজকের উৎকর্ষ বাংলা ভাষার ইতিহাসে জড়িত  নানা প্রতিবন্ধক  কাল। সব বাধা অতিক্রম করে বাংলা ভাষা বিশ্বের অগ্রগণ্য ভাষার অন্যতম একটি। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতে প্রতিনিধিত্ব করে এগিয়ে চলেছে ভাষা তার আপন মহিমায়। পিছনে রেখে এসেছে দশক খচিত কত কত শতাব্দী। গত শতাব্দীর শেষ ভাগ,নববই দশক তারই একটি। নববই দশকের কবিতার আকাশ উজ্জল আলোয় উদ্ভাসিত হলো। বিপুলসংখক কবি তাদের মনের মাধুরি মিশিয়ে  মাতৃভাষায় চর্চায় নিমগ্ন হলেন। তাদের মাঝে অনন্য হয়ে ওঠলেন কেউ কেউ। নিজের দিকে পাঠকের দৃষ্টিকে নিবদ্ধ রাখতে সক্ষম হলেন তাদের অনেকেই।নববইয়ের দশকের সেই সব প্রতিভাবান অনন্য কবিদের একজন আল হাফিজ।

আল হাফিজ তার কবিতায় নৃত্য পটিয়সী ছন্দের তালে, উপমা উৎপ্রেক্ষার জৌলুসে, অনুপ্রাসের জেলাসে,চিন্তার স্বাতন্ত্রে,শব্দের কারুকার্যময় বুননে সহসায় কবিতা প্রেমিকদের নজর কাঁড়তে সক্ষম হলেন।প্রকাশ হতে থাকলো তার কবিতা এবং কবিতার বই। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ বই মেলায় মহাকাল প্রকাশন প্রকাশ করল আল হাফিজের কবিতার বই "বিবস্ত্র সম্ভ্রম "।

সম্ভ্রম আজ সর্বত্রই বিবস্ত্র।হানাদার দখলদার কর্তৃক বিবস্ত্র হয় একটি স্বাধীন ভূখন্ডের সম্ভ্রম, বিবস্ত্র হয় রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকের সম্ভ্রম, সবলের হাতে দুর্বল নিগৃহিত, দিকে দিকে মানবতার সম্ভ্রমহানী, পুঁজিবাদী চতুরতার নিকট বিবস্ত্র হয় অসহায় বিশ্ব। এসবের ফিরিস্তি "যে দেখার দেখে না সে, দেখে আর কেউ "! (বিবস্ত্র নদী)। এই আর কেউটাই কবি। কবির তৃতীয় চোখ অবলোকন করে  বিশ্বের বিবস্ত্র সম্ভ্রম।

"বিবস্ত্র সম্ভ্রম " নামে কোন কবিতা নাই, " বিবস্ত্র  নদী " নামে একটি কবিতা এ বইয়ে গ্রন্থিত আছে। আর " বিবস্ত্র সম্ভ্রম " নামেই আত্মপ্রকাশিত আল হাফিজের কবিতার বই।তথ্যবিবরণীতে জানা যায়  তার সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ ২০১৩।  ২০১৩ এ প্রকাশিত কবিতাসমুহ ছাড়াও নানা সময়ে রচিত অথচ অপ্রকাশিত কবির সময়কালে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার উপলব্ধির নির্যাস নিয়ে কবি কল্পনার রঙে রঞ্জিত পঙক্তিমালার মলাটবদ্ধ রূপই " বিবস্ত্র সম্ভ্রম"। বিবস্ত্র সম্ভ্রমে 'র পঙক্তিতে পঙক্তিতে আছে বহুমাত্রিক কাব্যরস। প্রেম, দ্রোহ, শ্লেষ, প্রতিবাদ, প্রকৃতি, রাজনীতির সদর অন্দরের  অভিজ্ঞ দ্রষ্টার নিখুঁত বয়ান। কবি আল হাফিজ বয়ান করে চলেছেন তার নিজস্ব বয়ানভঙ্গীতে তার চেতনালব্ধ বয়ানগীতি। এই বয়ানগীতির "বিবস্ত্র সম্ভ্রম " নামকরণও কবি চিন্তার প্রখরতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

কোন কোন কবি তার কবিতায় ছন্দের তাল ঠিক রাখতে জোর জবরদস্তি করে। আল হাফিজের কাছে ছন্দ বশিভূত নাগিণীর মত। তার হাতে আছে ছন্দের বীন। আল হাফিজ ছন্দকে নাচান বশীভূত নাগিণীর মত। কবি দক্ষ সাপুড়ে, যেমনে নাচান ছন্দ ঠিক তেমনি নাচে। কবিতার বাঁকে বাঁকে ছন্দ নাচতে থাকে দক্ষ সাপুড়ের মোহময় বীনের তালে। এই নৃত্যের কোথাও কোন ক্লান্তি নেই, কোথাও নেই কোন পতন।পাঠক তখন পাঠ করে চলে বিরামহীন। পাঠ করতে করতেই " সাহসের সীমা ভাঙে অসীম অপার প্রেমে/ ডিজিটাল রোদমাখা সোনার শরীর/ শরীরের ভাঁজে ভাঁজে মৌটুসি হাওয়া এসে/ দোলা দেয় প্রহরী যেনো চাঁদ হয়ে সারারাত/ জেগে থাকো একা/.... (পতাকা টাওয়ার)।

"আমের সুবাস বন উঠে যাস প্রতিবেশী ছাদে/ সাধের নোবেলবই, কবিতার ভাব হোস/ পাড়ার কলেজ হোস ইচ্ছে মতন/ ইশারার ঘুড়ি হোস,পরি হোস/ কতোকিছু হোস তুই যখন তখন।/ (মিসফায়ার চাঁদ)"। কবি তার কল্প মানসের উদ্দিষ্টজনকে লক্ষ্য করে বললেও আমরা দেখি তার কবিতাও কতকিছু হয়ে যায় যখন তখন।

১.অনলাইন ঢেউ ভাঙা মিসফায়ার চাঁদ

২.কাঁঠালের কোয়া কোয়া রোদ

৩.জ্বলে ওঠে এনার্জি দাঁত

৪. নাশপাতি পোজ

৫. জোসনা পায়েশ

৬. ফি বছর গড়ে নিস  ফুটবল টিম

৭. হয়ে যাবি বিধবা সানাই

৮. আমি তোর মৌমাছি বিনীত সরল।

উপরোক্ত শব্দাবলি কবি আল হাফিজ রচিত একটি কবিতা লেহেঙায় খচিত আল হাফিজীয়  শব্দ জরি। যা কবিতাকে করে কাব্য ঈদ মার্কেটে পাঠকের চোখে অনন্য বৈশিষ্ট্য মন্ডিত। তখন তা শতশোভিত কবিতার ভীড়ভেদ করে আপন মহিমায় উজ্জল হয়ে চলে আসে পাঠকের হাতে।নেড়েচেড়ে দেখতে বাধ্য যেন সচেতন কাব্য সুধীজন। আর উপমা উৎপ্রেক্ষা,অলংকার,চিত্রকল্প নামক নানা রঙের চকমকি পাথরে পরিপূর্ণ আল হাফিজের কবিতার আঁচল।যে আঁচলে আবৃত কবিতাকে মনে হয় রুপেগুনে সাজসজ্জায় অনন্য অতুলনীয় এক  ষোড়শী বঙ্গকন্যা।অলংকারের কারুকার্যময় শব্দের দ্যোতনা কবি আল হাফিজের প্রায় প্রতিটি কবিতাতেই হাজির রেখেছেন একজন মেধাবী কবিতা কারিগরের মত।যা তাকে তার সময়ের সহযোদ্ধা কবিদের থেকে করেছে স্বতন্ত্র কবিকণ্ঠস্বরে পরিণত, পরিচিত।

সাধারণের সহজ সমাধান অভিধান।শব্দের অর্থ যখন অজানা মনে হয় তখন সহজে অভিধানের পাতা মেলতেই মিলে যায় সঠিক অর্থের হদিস। কিন্তুু কবি যখন তার প্রখর মেধা আর শানিত চিন্তায় যোগ করেন শব্দের সাথে শব্দ,তখন এই যুগল শব্দ তৈরী করে অভিধানকে অতিক্রম করে নতুন অর্থময় দ্যোতনা। আমরা আল হাফিজের কবিতার জমিনে হেঁটে হেঁটে দেখা পাই নাশপতি পোজ, এনার্জি দাঁত, জোছনা পায়েশ, মসলিন- জামদানি বউ,তরুণ খাট, বরফ ঘুম, হতাশ জাজিম, পাড়াতো বিকেল, মৌটুসি হাওয়া, প্রণয়কিরিচ, ঝরনা ময়ুরসহ যুগল শব্দ রাজি। যার অর্থ আবিষ্কারের জন্য অভিধান নয় অপরিহার্য কবির রচিত কবিতা পাঠ। কেননা আমরা দৃঢ়তার সাথে বলে দিতে পারি আপনি অভিধান ঘেঁটে কোথাও পাবেন না "রাতবালিকা চাঁদবালিকা কলবালিকা মোম " জিনিসটা কি? একথার গূঢ় তত্ত্ব জানতে হলে আপনাকে পড়তে হবে "সোডিয়ামের রাজনীতি দেয়  বিবস্ত্র সম্ভ্রম " আর এভাবেই কবি  উপভোগের উদ্ধৃতি দিয়েছেন তার "জোসনা যাপনকাল 'র"। আর কবিতার ছত্রে ছত্রে ঢেলে দিয়েছেন ভাবনার সুগন্ধি শিশি।

কবিতা কি? কবিতা কেমন?  কবিতা কি লাস্যময়ী কল্পলোকের কোন ফুল? ছন্দ ধ্বনি  ভাবের ছবি?  না কোন তন্বীর আবেহ জড়ানো চুল? জামদানি শাড়ি, নাকি মিছিল করা শার্ট?  এসব কবি আল হাফিজের প্রশ্ন। কবিতা খবর কেউ জানে কিনা বা কোথায় সে স্মার্ট? "কবিতা তরুণী বিধবা কিনা,,,,,,,,,, কতোখানি আবডালে ছোঁয়ার মতোন " এসবের কিছুটা হলেও জবাব পাওয়া জরুরি।এবং পাঠক যখন কবি আল হাফিজের কবিতার বই বিবস্ত্র সম্ভ্রম 'র পাতা খুলে পাঠ করবে "কবিতা তুই জুঁই- চামেলী - হাসনাহেনার বোন/ কবিতা তুই গহীন গজল রাবেয়া রাত ফোন/ তোর শরীরে শরীর মেখে মহাকালের জিন/ বেঁচে থেকে  মুচকি হেসে ছড়ায় আলোড়ন। (সচিত্র কবিতার আলোড়ন)

মহাকাল নামক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রকাশ করেছে ২০১৮ বই মেলায় কবি আল হাফিজের কবিতার বই "বিবস্ত্র স¤্র¢ম"।প্রচ্ছদ শিল্পী মোস্তাফিজ কারিগর। পাঠক সমাবেশ, উত্তরণ এবং রকমারী ডটকম এই বইয়ের পরিবেশক। ৪৮ পৃষ্ঠা, উন্নতমানের কাগজ, সুন্দর রুচিশীল ছাপার কবিতার বইখানির মুল্য ১৫০ টাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ