ঢাকা, শুক্রবার 29 June 2018, ১৫ আষাঢ় ১৪২৫, ১৪ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা সমস্যা ও বাংলাদেশ সংগ্রহে রাখার মতো গবেষণাগ্রন্থ

ড. সাঈদ হোসেন : মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশের বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা নামে পরিচিত। বর্তমানে বসনিয়া, চেচনিয়া, ফিলিস্তিন, ফিলিপাইনের মোরো, কাশ্মীর প্রভৃতি সমস্যার চেয়েও রোহিঙ্গা সমস্যা মুসলিম বিশ্ব তথা আন্তর্জাতিক বিশ্বের অন্যতম প্রধান ট্রাজেডি। সমস্যাটি বাংলাদেশের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। এ গবেষণাগ্রন্থের প্রাথমিক আলোচনায় আরাকান ও রোহিঙ্গাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, রোহিঙ্গাদের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। অষ্টম শতাব্দী থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে সেখানে তাদের বসতি গড়ে উঠেছে। কৃষি, ব্যবসা, প্রশাসন, সেনাবাহিনী প্রভৃতি অঙ্গন ছাড়াও আরাকান অমাত্যসভায় তাদের ভূমিকা ছিল অনন্য। এমন কি মুসলিম অমাত্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় আরাকানে বাংলা সাহিত্যের প্রভুত বিকাশ সাধিত হয়। সুতরাং তারা ঐতিহ্যগতভাবে সেখানকার নাগরিক। 

রোহিঙ্গা সমস্যার সূচনা করে মূলত বৃটিশরা। তারা বার্মাকে স্বাধীনতা দানের পূর্বেই কৌশলে মগ-রোহিঙ্গা বিভেদ সৃষ্টি করে এবং সে সূত্র ধরেই মিয়ানমার শাসকগোষ্ঠী বিভিন্নভাবে তাদের উপর নির্যাতন চালায়। রোহিঙ্গা সমস্যা সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি, পত্র-পত্রিকায় প্রতিফলন ও সচেতন জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি অনুসন্ধানে প্রায় অভিন্ন মতামত পাওয়া যায় যে, রোহিঙ্গারা জন্মগত সূত্রে ঐতিহ্যগতভাবে আরাকানের নাগরিক। তাদের উপর মিয়ানমার সরকারের নির্যাতন ও নাগরিক অধিকারহরণ অমানবিক এবং মানবাধিকারের চরম লংঘন। বর্তমানে সেখানে নির্বিচারে গণহত্যা চলছে। সে প্রেক্ষাপটে ২০১৬-১৭ সালেও প্রায় আট লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বিভিন্ন সময় মিয়ানমার বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বদেশে ফেরত নিলেও মূলত তাদের নাগরিক অধিকার প্রদান করেনি। ফলে স্বদেশে ফিরে যাওয়া হাজার হাজার রোহিঙ্গা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে পুনরায় বাংলাদেশে আসছে এবং এদেশে স্থায়ী আবাসন গড়ে তুলছে। এতে দরিদ্র জনবহুল বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটা একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। আন্তর্জাতিক বিশ্বের সহায়তায় অতিসত্বর এর স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রফেসর। ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি রোহিঙ্গা ও আরাকান বিষয়ে গবেষণা করে চলেছেন। তিনিই প্রথম এ বিষয়ে এম.ফিল এবং পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। গবেষক হিসেবে তাঁর প্রকাশিত প্রায় সকল প্রবন্ধই আরাকান ও রোহিঙ্গা সমস্যাকে কেন্দ্র করে। সে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি রচনা করেছেন রোহিঙ্গা সমস্যা ও বাংলাদেশ শিরোনামের গবেষণাগ্রন্থটি। রোহিঙ্গাদের ইতিহাসকেন্দ্রিক বিভিন্ন গ্রন্থের মাঝে এ গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে একটি মাইলস্টোন। গ্রন্থটি একদিকে যেমন গবেষণার মৌলিক বিষয়গুলোকে ধারণ করেছে অন্যদিকে সাধারণ পাঠকের পাঠ উপযোগী ঝরঝরে ভাষার ব্যবহার সবাইকে আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। রোহিঙ্গাদের সামগ্রিক ইতিহাসের পাশাপাশি রোহিঙ্গা নির্যাতনের কারণ, নির্যাতনের মর্মান্তিক ইতিহাস, আন্তর্জাতিক পরিম-লে রোহিঙ্গাদের অবস্থান এবং রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পরামর্শসমূহ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

সামগ্রিক বিচারে বলা যায়, রোহিঙ্গা সমস্যা ও বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যাকেন্দ্রিক একটি মৌলিক গবেষণাগ্রন্থ হিসেবে সংগ্রহে রাখার মতো একটি বই। বইটি প্রকাশ করেছে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পরিলেখ। চাররঙা প্রচ্ছদে অফসেট কাগজে ছাপা তিনশো বারো পৃষ্ঠার চমৎকার বোর্ড বাধাইয়ের গ্রন্থটির দাম উল্লেখ করা হয়েছে ৪৫০ টাকা। 

বইটির সর্বাধিক প্রচার কামনা করি। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ