ঢাকা, শুক্রবার 29 June 2018, ১৫ আষাঢ় ১৪২৫, ১৪ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা

বুধবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল আলোচনায় দেশের বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, সংবিধানে জনগণকে সকল ক্ষমতার উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হলেও বর্তমান সরকারের কণ্ঠরুদ্ধ করার কর্মকা-ের পরিণতিতে জনগণই শুধু ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ছে না, দেশও গণহীন গণতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রসঙ্গক্রমে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রাধান্যে এসেছে ‘স্বাধীন’ নামের নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার কথা। বিশিষ্টজনেরা অভিযোগ করেছেন, নির্বাচন কমিশন স্বেচ্ছাচারী সরকারের ‘তোতা পাখির’ ভূমিকা পালন করছে। সে কারণে কমিশনের অভিসন্ধি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। কমিশন হয়তো দলহীন গণতন্ত্র চাচ্ছে।

বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করা। অন্যদিকে বাস্তব ক্ষেত্রে কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ সেবাদাসের ভূমিকা পালন করে চলেছে। যেমন গত ২৬ জুন অনুষ্ঠিত গাজীপুরের নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যায় জাল ভোট দেয়ার বিরুদ্ধে বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ জানানোর পরও কমিশন কোনো ভোটকেন্দ্রেই কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। একই কমিশন আবার নয়টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছে, নির্বাচনে আসলেও জালিয়াতি হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, কয়েকটি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হলেই জালিয়াতি বন্ধ হয়ে যায় না। গাজীপুরেও হয়নি। গাজীপুরে বরং নীরবে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার পেছনে ছিল নির্বাচন কমিশনের সরাসরি ভূমিকা।  

গাজীপুরের নির্বাচনের পাশাপাশি সামগ্রিক কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতেও বিশিষ্টজনেরা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব, ভূমিকা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। উদাহরণ হিসেবে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন সংক্রান্ত আইনের উল্লেখ করে বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, কিছুদিন পরপর নতুন নতুন শর্ত চাপিয়ে কঠিন আইন তৈরি করা কমিশনের কাজ হতে পারে না। যেমন প্রথম থেকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত নির্দিষ্টসংখ্যক সদস্য ও সমর্থকের নাম দেয়ার যে আইনটি ছিল সাম্প্রতিক সময়ে কমিশন সেখানে সমর্থক হিসেবে এক শতাংশ ভোটারের নাম দেয়ার বিধান করেছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি জেলায় দলের শাখা থাকতে হবে বলেও নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। অথচ গণতন্ত্রে এ ধরনের আইন কোনোক্রমেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। 

এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের আইন যে কারণে তৈরি করা হয়েছিল বর্তমানে তার সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে আইনটিকে নতুন রাজনৈতিক চিন্তা ও দল নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এবং কৌতূহলোদ্দীক মন্তব্য করেছেন প্রবীণ রাজনীতিক পংকজ ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, নিবন্ধন ছাড়াই তারা জেল খেটেছেন, মামলার শিকার হয়েছেন এবং করেছেন স্বাধীনতাযুদ্ধও। যুদ্ধের ফসল সে একই দেশে নিবন্ধনের নামে রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি রাজনীতিকদেরও ‘খেলো’  তথা অসম্মানিত করা হচ্ছে। 

এভাবে সব মিলিয়েই বুধবারের গোলটেবিল আলোচনায় নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন আইন ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা। সরকারের আজ্ঞাবহ সেবাদাসের ভূমিকা পালন বন্ধ করার পাশাপাশি অন্য কিছু বিষয়েও কমিশনকে তারা নীতি-কৌশল ও কার্যক্রমে পরিবর্তন আনার দাবি জানিয়েছেন। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন সংক্রান্ত আইন এরকম একটি প্রধান বিষয়। নির্বাচনের প্রাক্কালে কিংবা বছরের বিশেষ কোনো সময়ে নিবন্ধন করার নিয়ম পরিত্যাগ করে এমন ব্যবস্থা করার পরামর্শ তারা দিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলো যাতে সারা বছরই নিবন্ধন করার সুযোগ পায়।

এক শতাংশ ভোটার বা সমর্থকের নাম-ঠিকানাসহ তালিকা দেয়ার ব্যাপারেও আপত্তি তুলেছেন তারা। বলেছেন, কোনো দলের জনসমর্থন আছে কি না, থাকলেও কত শতাংশ রয়েছেÑ এ ধরনের বিষয় দেখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের নয়। কমিশনের দায়িত্ব অবাধ, সুষ্ঠু ও সরকারের প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা। সে নির্বাচনেই দেখা যাবে, কোন দলের কতটা জনসমর্থন রয়েছে। এটা আগে থেকে নির্ধারণ করার বিষয় হতে পারে না। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন তার আসল কাজে চরম অবহেলা দেখিয়ে সরকারের হুকুম তামিল করার, গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠানোর এবং দেশকে দলহীন করার কর্মকান্ডে ব্যস্ত রয়েছে।    

আমরাও বিশিষ্টজনদের মূলকথাগুলোর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে মনে করি, বিশেষ করে ২৬ জুন অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে আরো একবার গুরুতর প্রশ্ন ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। কমিশনের উচিত অনতিবিলম্বে নীতি-কৌশল ও কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটানো এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি গণতন্ত্রের অভিভাবকের দায়িত্ব পালনের প্রধান কাজের ব্যাপারে মনোযোগী হওয়া। আমরা আশা করতে চাই, ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছা পূরণ করার জন্য এতদিন যা কিছুই করে থাকুক না কেন, এখন থেকে কমিশন তার সব কাজে নিজের আইন মেনে চলবে এবং প্রতিটি নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে সততার সঙ্গে সচেষ্ট হবে।

এটা বিশেষ করে দরকার এজন্য যে, চলতি বছরের ডিসেম্বরেই জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সে নির্বাচনও যদি গাজীপুরের মতো নীরবে সরকার নিয়ন্ত্রিত হয় এবং নির্বাচন কমিশন যদি আরো একবার আজ্ঞাবহের ভূমিকাই পালন করে তাহলে গণতন্ত্র তো বাধাগ্রস্ত হবেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ