ঢাকা, শুক্রবার 29 June 2018, ১৫ আষাঢ় ১৪২৫, ১৪ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নীতি ঘাটতি শিক্ষা নীতিমালা ২০১৮

প্রভাষক মো. মনিরুজ্জামান মোড়ল : গত ১২/৬/২০১৮ ইং তারিখে শিক্ষামন্ত্রণালয় (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ) একটি শিক্ষা নীতিমালা প্রকাশ করেছে যা মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ হতে ২৬/০৫/২০১৮ তারিখে শর্তযুক্ত অনুমোদিত হয়েছে। প্রসঙ্গত একটি দেশের সরকারি,  বেসরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্বশাসন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় একটি মানসম্মত দিক নির্দেশনা যার অপর নাম নীতিমালা। আর সেই নীতিমালাটি হতে হবে পূর্ণাঙ্গ ও সর্বজন স্বিকৃত। সেই লক্ষ্যে সাম্প্রতিক প্রণয়নকৃত শিক্ষা নীতিমালায় কিছু বৈষম্য ও ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে যেটি সঠিক সুন্দর শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তরায় বলে মনে করি 

 যেমন :(১) বেসরকারি কলেজে অনার্স, মাস্টার্স কোর্সটি কিভাবে চলবে,এমপিও,  বেতন ভাতা, নিয়োগ, পদোন্নতি,  জ্যৈষ্ঠতা, অবসর কোন বিষয়েই দৃষ্টিপাত করা হয়নি। তবে কি এ কোর্সটির পরিচালনায় অনিয়ম দূর্নীতিকে আশ্রয় প্রশ্রয়ের অলিখিত নীতিমালা অনুমোদন দেয়া হচ্ছেনা? যেখানে বলা হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা অধিকতর যুগোপযোগি করার সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। তাছাড়া কলেজগুলিতে অনার্সের শিক্ষক কর্মচারি নিয়োগ ব্যবস্থা যেখানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতে সমার্পণ করা হয়েছে। 

(২) পদোন্নতির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে শুধুমাত্র এমপিও ভুক্ত শিক্ষকরাই ৫:২ অনুপাতে অর্থাৎ প্রতি ৫ জনে দুইজন ৮ বছর চাকরি মেয়াদ পূর্ণ হলে সহকারি অধ্যাপক পদে উন্নিত হবেন এবং এর পর আর কোন পদে পদোন্নতি হবেনা যেমন সহযোগি অধ্যাপক, অধ্যাপক হতে পারবেনা। বাকি  শিক্ষকরাই পদোন্নতি না পেলেও ১০ বছর পুর্তিতে ৮ গ্রেড এর ৬ বছর পর ৭ গ্রেড বেতনভুক্ত হবেন। সারা জীবনে উল্লেখিত একটির বেশি পদোন্নতি ও দুটির বেশি বেতন গ্রেড পাবেন না। এখানে আমার কথা হল সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী শিক্ষকরাই পদোন্নতি পাবেনা অথচ অন্য সেক্টরে এস এস সি এইচ এস সি ডিগ্রী পাস করা কর্মচারীুগণ পদোন্নতি নিয়ে মাস্টার্স পাশের কর্মকর্তা/শিক্ষকদের অফিসিয়ালি বস হয়ে যাচ্ছেন বা নিয়ন্ত্রণ করছেন। সেটি কতটুকু নীতিবহুল? আর একই চাকুরি করে কিছু পদোন্নতি পাবেন কিছু পাবেনা এটিও কেমন নীতি,  কোন যুক্তির রেশিও প্রথা? আর এমপিও হলে পাবে না হলে পাবেনা সেটিও বা কোন যুক্তিতে এমপিও না হওয়া বা না করার দায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের নয় এটি শিক্ষা কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা বা দায়, ঐ শিক্ষকতো তার ক্লাস, ও দায়িত্ব সকলের সহিত সমানভাবে পালন করে যাচ্ছে। তবে নিজের ব্যর্থতা অন্যের উপর চাপানো নয় কি? অন্যান্য সেক্টরে প্রতি ৩ বছর অন্তর অন্তর ও একাধিক পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে সেখানে বেসরকারি কলেজের দোষ কোথায়? 

(৩) ২নং এর (ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে জনবল কাঠামো অনুযায়ী শিক্ষক কর্মচারী প্রাপ্যতা নির্ধারণের পর কোন প্রতিষ্ঠানে বেতন ভাতাদির সরকারি অংশের প্রাপ্ত  শিক্ষক কর্মচারীর সংখ্যা যদি প্রাপ্যতার অতিরিক্ত হয় তবে অতিরিক্ত পদ সমুহ উদ্বৃত্ত পদ বলে বিবেচিত হবে এবং এ পদে শিক্ষক পদ শূন্য হলে ননএমপিও শিক্ষকদের উক্ত প্যাটার্নভুক্ত  শুন্য পদে    জ্যৈষ্ঠতার ভিত্তিতে আভ্যন্তরীণ নিয়োগ/ সমন্বয় করতে হবে। এক্ষেত্রে আমার কথা এখানে ননএমপিও অনার্সের শিক্ষকও রয়েছেন তারা এর অন্তর্ভূক্ত কি না সেটি অস্পষ্ট। আর যদি তারা পদায়ন হন তাহলে তাদের  জ্যৈষ্ঠতা, পদায়ন,  পদোন্নতি চাকুরিতে যোগদানের তারিখ থেকে গণনা করা হবে কিনা সেটিও অস্পষ্ট? 

(৪) নীতিমালার ১৩ নং অনুঃ এ বলা হয়েছে জ্েযষ্ঠতা নির্ধারণ হবে এমপিওভুক্তি সাপেক্ষে তাই যদি হয় যে সমস্ত শিক্ষকদের এমপিও করা হয়না তাদের ছাত্ররা এসে শিক্ষক হয়ে তার স্যারের সিনিয়র হয়ে যাচ্ছেন বিভাগের প্রধান হচ্ছেন এমন অসস্থিকর পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষক ছাত্রের অধস্তন হয়ে কাজ করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত। এটি অপমানজনক ও নীতি গর্হিত ব্যবস্থা নয় কি? 

(৫)বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী বদলি ব্যপারে প্রয়োজনে না করে আবশ্যিক করলে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাসের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ, নাম্বারিং  অনিয়ম, প্রাইভেট পড়ায় বাধ্য করা ইত্যাদি বিষয়গুলি দূর হবে। 

(৬) নীতিমালার ১৮. ঘ  তে বলা হয়েছে প্যাটার্ন অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হলে শতভাগ বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি কলেজ/প্রতিষ্ঠান কেই দিতে হবে এর ব্যতয় হলে প্রতিষ্ঠান প্রধান এর বেতন ভাতাতি বন্ধ ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই নির্দেশনাটি পূর্ববর্তী  নীতিমালায় অন্তর্ভূক্ত ছিল অথচ আজ ২৪ বছর হল কোন এমপিও হয়না বা তাদের ভাতা ও অন্যান্য সুযোগের কথা বাদই দিলাম,  শতভাগ বেতন ত দূরের কথা দুই হাজার, পাচ হাজার এমনকি অনেক কলেজে বলে এমপিও না হওয়া পর্যন্ত এক টাকাও পাবেন না বা দেয়া হয়না, অনেক কলেজে সামান্য  দিলেও কয়েক মাস পর পর দেয়। যেখানে একজন প্রভাষকের মূল বেতন ২২০০০/= বাইশ হাজার টাকা। এই অসহায় শিক্ষকদের বছরের পর বছর বঞ্চিত করে যাচ্ছে জুজুর ভয় দেখিয়ে, সন্তান মা বাবাদের নিয়ে ঈদ আনন্দ ত দুরের কথা সংসার চালাইতে নাভিশ্বাস প্রায়। সে সকল প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আজ ২৪ বছরে কোন আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তাহলে কর্তৃপক্ষের নজরে কি আসেনি? কলেজগুলিতে কি কোন অডিট হয়নি ২৪ বছরে? আর যদি অডিট হয়ে থাকেই এই অনিয়মগুলি অনুমোদিত? নাকি চোখে ধরা পড়েনি? আর যদি চোখে ধরা না পড়েই থাকে বর্তমান নীতিমালায় দৃষ্টি শক্তি বৃদ্ধির কোন উপায় সংযোজিত সম্ভব হবে কি? উন্নত জাতি গঠনে শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন ছাড়া সম্ভব নয়।

একটি মালার মাঝের কিছু ফুল ছিড়ে ফেললে যেমন তার পূর্ণাঙ্গ রুপ ও সৌন্দর্য হারায় তেমনি

 প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সকল খুটিনাটি বিষয়ের সংক্ষিপ্ত রুপের একটি মালা প্রস্তুতই নীতিমালা যেখানে সৌন্দর্যের ঘাটতি থাকলেই অনিয়ম বিশৃংখলা দেখা দিবেই। সেই রকম একটি মহৎ লক্ষকে সামনে রেখে  শিক্ষা নীতিমালাটি উল্লেখিত  বৈষম্য, ত্রুটি বিচ্যুতিমুক্ত,  যুগোপযোগি করে তোলার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ বেসরকারি কলেজ (অনার্স, মাস্টার্স) শিক্ষক পরিষদ, খুলনা জেলা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ