ঢাকা, শুক্রবার 29 June 2018, ১৫ আষাঢ় ১৪২৫, ১৪ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিশাল ঘাটতি রেখেই নির্বাচনী বছরের বিগ বাজেট পাস

 

মিয়া হোসেন : বড় ধরনের কোন পরিবর্তন না এনেই বিশাল ঘাটতি রেখেই নির্বাচনী বছরের ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের বাজেট পাস হয়েছে। নতুন অর্থ বছরের ব্যয়ের জন্য বরাদ্দকৃত ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার এক চতুর্থাংশের বেশি রয়েছে ঘাটতি। যার পরিমাণ ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। এ ঘাটতি মেটাতে ঋণ ও অনুদানের উপর নির্ভর করতে হবে। 

গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৭১ হাজার ৮৩৩ কোটি ৮২ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ের অনুমোদন নিতে নির্দিষ্টকরণ বিল-২০১৮ পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরে কন্ঠভোটে সর্বসম্মতিতে তা পাস হয়। এর আগে মঞ্জুরি দাবির উপর আলোচনার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা শিক্ষাখাতে অনিয়ম-দূর্নীতি, অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যর্থতা, জনগণের স্বাস্থ্য সেবা সংকট, দূর্যোগ মোকাবেলা প্রস্তুতির অভাব ও রেলখাতের অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ডের কঠোর সমালোচনা করেন।

আগামী ১ জুলাই থেকে এই বাজেট কার্যকর হবে। গত ৭ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সংসদে এই বাজেট উপস্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ বাজেটের ওপর ২২৩ জন সংসদ সদস্য মোট ৫৫ ঘণ্টা ৫৫ মিনিট আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে ইন্টারনেট ব্যবহার, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, দেশীয় মোবাইল ফোনসহ কয়েকটি পণ্যের শুল্ক কমানো হয়। অপরদিকে সিগারেট ও জর্দ্দায় শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়। এ ছাড়া বড় ধরনের কোন পরিবর্তন করা হয়নি।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। সংসদ নেতা ও প্রুধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ সরকারি বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্যের উপস্থিতিতে অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেটের উপর ৫৯টি মঞ্জুরি দাবি বিপরীতে ৪৪৮টি ছাঁটাই প্রস্তাব আনা হয়। সরকার ও বিরোধী দলের হুইপের মধ্যে সমঝোতা অনুযায়ী ৫টি মঞ্জুরি দাবি আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়। এই আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় পার্টির মো. ফখরুল ইমাম, কাজী ফিরোজ রশীদ, নূরুল ইসলাম ওমর, মোহাম্মদ আব্দুল মুনিম চৌধুরী, নূরুল ইসলাম মিলন, সেলিম উদ্দিন ও বেগম রওশন আরা মান্নান এবং ডা. রুস্তম আলী ফরাজী। 

দীর্ঘ প্রায় চার ঘন্টা আলোচনা শেষে দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট পাস হয়। এর আগে আলোচনা শেষে মঞ্জুরী দাবিগুলো কন্ঠভোটে সংসদে গৃহীত হয়। এরপর অর্থমন্ত্রী ‘নির্দিষ্টকরণ বিল-২০১৮’ পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে সর্বসম্মতিতে তা পাস হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারি দল ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্য টেবিল চাপড়িয়ে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বাজেট বাস্তবায়নের যাত্রাকে স্বাগত জানান। বাজেট পাসের পর অর্থমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সন্ধ্যায় আয়োজিত ডিনারে যোগদানের জন্য সকল সংসদ সদস্যকে আমন্ত্রণ জানান। এরপর স্পিকার সংসদ অধিবেশন আগামী দুই জুলাই বিকাল ৫টা পর্যন্ত মূলতবি করেন।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ৭ জুন জাতীয় সংসদে ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপন করেন। প্রস্তাবিত বাজেটের উপর সাধারণ আলোচনা গত ১০ জুন থেকে শুরু হয়। গত ২৭ জুন বুধবার সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে সাধারণ আলোচনা শেষ হয়। এরপর বুধবার রাতে সংসদে অর্থবিল-২০১৮ পাস হয়। যে বিলে কর-সংক্রান্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আর নির্দ্দিষ্টকরণ বিল পাসের মাধ্যমে সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত ৫ লাখ ৭১ হাজার ৮৩৩ কোটি ৮২ লাখ ৯২ হাজার টাকার মধ্যে সংসদের ওপর দায় এক লাখ ৪৬ হাজার ১৪৭ কোটি ৬২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এই টাকা অনুমোদনের জন্য কোন ভোটের প্রয়োজন হয় না। সরাসরি সংসদ এই টাকা অনুমোদন করে। অবশিষ্ট ৪ লাখ ২৫ হাজার ৬৮৬ কোটি ১৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ভোটের মাধ্যমে সংসদে গৃহীত হয়।

জাতীয় সংসদে পাসকৃত এই বাজেটটি মুলত গ্রস বাজেট। বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও অন্যান্য খাতে বাজেটে সরকারের অর্থ বরাদ্দের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এই অর্থ কখনো ব্যয় হয় না। যা বাজেটের আয় ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে হিসাবে মেলানো হয়। এই বাধ্যবাধকতার কারণে এবারের বাজেটেও এক লাখ ৪৬ হাজার ১৪৭ কোটি ৬২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা বাজেটে অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যা ব্যয় হবে না। পহেলা জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী যে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট উত্থাপন করেছেন, সেটাই ব্যয় হবে। সেটাই আগামী অর্থবছরের নীট বাজেট। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ॥ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দের বিরোধীতা করে বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা বলেছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যাপক অনিয়ম-দূর্নীতি চলছে। আড়াই লাখ থেকে ৫ লাখ টাকায় জিপিএ-৫ বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস হতে দেখা গেছে। কোচিং ব্যবসা এখনো চলছে। আর এমপিওভূক্ত না করায় সংসদ সদস্যরা প্রায়শই নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন। এই কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দের দাবি কমিয়ে এক টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। 

জবাবে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগুচ্ছি। শিক্ষার মান অবশ্যই বৃদ্ধি পেয়েছে। জিপিএ-৫ বিক্রির কথা সঠিক নয়। একটি অভিযোগের ভিত্তিতে এটা বলা হয়েছে। এই অভিযোগ আসার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আর প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে তিনি বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান।

স্বাস্থ্যখাত ॥ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের বিরুদ্ধে ছাঁটাই প্রস্তাব দিয়ে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্য সেবা মৌলিক অধিকার হলেও সেই অধিকার সকলে পাচ্ছে না। প্রত্যন্ত এলাকার সুচিকিৎসা নেই। সরকার চিকিৎসক দিলেও তারা এলাকায় থাকেন না। অনেক স্থানেই আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। আবার বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো রমরমা ব্যবসা করছে। অযোগ্য লোকদের দ্বারা অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ক্লিনিক ও ডায়াগোনিষ্টিক সেন্টার বাণিজ্য করছে। অথচ এই খাতে বরাদ্দ খুবই কম। তারা বলেন, সকলের জন্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হলে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করতে হবে। যার ভিত্তিতে স্বাস্থ্য সেবা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। গরীব ও নি¤œবিত্তদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালুর দাবি জানান তারা। 

জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে দাবি করে বলেন, লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের মাধ্যমে আমাদের এই খাতে সক্ষমতার বিষয়টি বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছি। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে জনগনের দৌড় গোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা পৌছে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঠিক দিক নির্দেশনার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বেসরকারি মেডিকেল কলেজের বিরুদ্ধে অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। অনেক কলেজের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছিলাম। লাইব্রেরি নাই, ল্যাবরেটরি নাই, শিক্ষকও নাই-এমন কলেজগুলো বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু আদালতের নির্দেশনা নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। এখানে আমাদের কিছু করণীয় নেই। 

গ্রামে ডাক্তার নিয়োগে দীর্ঘসূচিতা কারণে সংসদ সদস্যদের ক্ষোভের প্রেক্ষিতে মন্ত্রী বলেন, এ সরকার যদি আবার ক্ষমতায় আসে তাহলে ডাক্তারের অভাব হবে না। গ্রামে পোস্টিং থাকা সত্ত্বেও যারা সেখানে ডিউটি না করে ঢাকায় বসে বেতন নিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, কিন্তু আপনারা যদি সোচ্চার থাকেন, আমি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন করতে যাচ্ছি। এটা বাস্তবায়ন হলে কোনো মানহীন বেসরকারি মেডিকেল থাকবে না। গত তিনবছর মেডিকেল ভর্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। আমি অভিজ্ঞ ডাক্তারদের নিয়ে এ ভর্তি ব্যবস্থা করেছি। সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকার পরও বিশ্বের অনেক দেশ থেকে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সেবায় এগিয়ে আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

স্থানীয় সরকার বিভাগ ॥ স্থানীয় সরকার বিভাগ খাতে বরাদ্দের বিরুদ্ধে ছাঁটাই প্রস্তাব এনে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়। যে মন্ত্রণালয়ের সফলতার উপর জরগণের ভোট নির্ভর করে। কিন্তু মন্ত্রণালয়টি কাঙ্খিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না। তারা অভিযোগ করেন, স্থানীয় উন্নয়নে সুষম বন্টন নেই। দেশের অনেকস্থানেই রাস্তা-ঘাট ধ্বংসের পথে। হাওড় ও পাহাড় অঞ্চলের সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ। দক্ষতার অভাবে অনেক রাস্তা নির্মাণের পরেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আবার দীর্ঘদিনেও ঠিকাদাররা কাজ শেষ করছে না। জেলা পরিষদে এডিবি’র বরাদ্দ খরচ করতে পারে না। ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় সরকারের কোন কর্মকান্ড পরিচালিত হয় না। অর্থ বরাদ্দের আগে সারাদেশেই সুষম উন্নয়নের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, স্থানীয় সরকার উন্নয়নমুখী বিভাগ। নগর ও গ্রামীণ এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয় এই বিভাগের মাধ্যমে। জনগণের চাহিদার প্রেক্ষিতে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রত্যেকটা গ্রামকে যোগাযোগের আওতা আনতে প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। তিনি বলেন, সুষম বন্টন নিয়ে অনেকেই অভিযোগ করেছেন। কিন্তু প্রকল্প প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমরা বিষয়টি বিবেচনা করে থাকি। যে এমপিদের এলাকা বেশী তাদের বেশী বরাদ্দ দেওয়া হয়। সারাদেশে সড়কের পাশাপাশি পৌর শহরে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নগরে জলাবদ্ধতা কমে এসেছে। তিনি আরো বলেন, ৩ লাখ ২১ হাজার ৪৬২ কিলোমিটারের উপরে আমাদের রাস্তা রয়েছে। ধারণ ক্ষমতার বাইরে লোড পড়লেই এসকল রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিভাবে লোড নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে বিষয়ে সতর্ক রয়েছি। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমেই সারাদেশকে উন্নয়ন-সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। তাই সংসদ সদস্যদের দাবি অনুযায়ী বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ ॥ ছাটাই প্রস্তাব নিয়ে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কঠোর সমালোচনা করেন বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা। তারা বলেন, দেশ দূর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। এ বিষয়ে প্রস্তাবিত নেওয়ার দায়িত্ব এই মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু কি প্রস্তুতি রয়েছে? বরং বরাদ্দ ব্যয়ে নানা অনিয়ম রয়েছে। বৈষম্যও করা হয়। মন্ত্রণালয় থেকে সোলার দেওয়া হচ্ছে, যা কোন কাজে আসে না। এই মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলো যথাযথ ভাবে বাস্তবায়ন হয় না। বিভিন্ন প্রকল্পের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাই সরকারের শেষ সময়ে এসে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

জবাবে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জেল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, দূর্যোগ প্রবণ এই দেশে প্রকৃতির আচরণ স্বাভাবিক নয়। যে কারণে সঠিক কর্মপরিকল্পনা কঠিন। তারপরও আগের মতো হাওড়ে দূর্যোগ হয়নি। সরকার জানমাল রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে এ সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার কিছু এলাকায় বন্যা হয়েছে। আমরা খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেছি। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় যেখানেই হোক না কেন আমরা ছুটে যাই। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়। আর এখন দূর্যোগের পর বরাদ্দের জন্য ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়না। জেলা প্রশাসকদের কাছে এসংক্রান্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাজেটের আকার বাড়লেও এই মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি উল্লেখ করে তিনি বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

রেলপথ ॥ বাজেটে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরী দাবির উপর ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করেন বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা। প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাকালে তারা বলেন, গণপরিবহনে সব থেকে সাশ্রয়ী রেল। আগে মন্ত্রী-এমপিরাও ট্রেনে যাতায়াত করতেন। কিন্তু ১০টার ট্রেন কয়টায় আসে, এটা এখনো পরিবর্তন হয়নি। ষ্টেশনগুলোতে আধুনিককায়ন হয়নি। যাত্রী সেবার কোন ব্যবস্থা নেই। যে কারণে মানুষ আস্থা হারাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিলেও রেলের উন্নয়ন হয়নি। অথচ যানজট ও দূর্ঘটনার ঝূঁকি এড়াতে রেলের উন্নয়ন জরুুির। জনস্বার্থে রেলের প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।

জবাবে রেলপথ মন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, রেল কোন মন্ত্রণালয় ছিলো না। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিভাগ ছিলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই নতুন মন্ত্রণালয় করেছেন। এরপর থেকে রেলের উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এখন শুধু উত্তরবঙ্গে ২৬টি ট্রেন যাতায়াত করে। বিভিন্ন প্রকল্পের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কর্ণফূলি নদীর উপর রোড কাম রেল ব্রীজ করার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পর্যটন নগরী কক্সবাজারে অত্যাধুনিক রেল ষ্টেশন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বরিশাল হয়ে পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেল লাইন যাবে। গোপালগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন দ্রুতই উদ্বোধন হবে। অন্যান্য জেলাতেও রেলের কাজ চলছে। দেশের একটি জেলাও রেল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নতুন অর্থ বছরের বাজেট ॥ ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের বাজেটে ব্যয়ের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। অনুদান ছাড়া আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। ফলে বাজেটে ঘাটতি থাকছে এক লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা, অন্যদিকে অনুদানসহ মোট আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। এতে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে এক লাখ ২১ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর খাতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা, এনবিআর-বহির্ভূত কর খাতের আয় ৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা এবং কর ব্যতীত রাজস্ব আয় ৩৩ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে এক লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। 

খাতওয়ারি বরাদ্দ : বাজেটে খাতওয়ারি বরাদ্দের মধ্যে অর্থ বিভাগের ব্যয় ২ লাখ ২ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। ব্যয়ের দিক থেকে সবচেয়ে কম রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে। এ খাতে ব্যয় ২২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। অনুমোদিত ব্যয় পর্যায়ক্রমে হচ্ছে প্রতিরক্ষায় ২৯ হাজার ৬৬ কোটি টাকা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগে ২৯ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। অন্য খাতের ব্যয়ের মধ্যে জাতীয় সংসদ খাতে ৩৩২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় খাতে ২ হাজার ৮০১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ১৫৭ কোটি টাকা, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে এক হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ২ হাজার ৬৬২ কোটি, সরকারি কর্মকমিশন খাতে ৭৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা। 

অর্থ বিভাগ মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয় খাতে ২১৫ কোটি, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে ২ হাজার ৪২৬ কোটি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে ২ হাজার ৬৬২ কোটি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ খাতে ১৩ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। পাশাপাশি পরিকল্পনা বিভাগে এক হাজার ৩৮০ কোটি ১৭ লাখ, বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে ১৩৫ কোটি ৫৮ লাখ, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে ৫৯৯ কোটি ৬২ লাখ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ৫৫৫ কোটি ৫৩ লাখ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক হাজার ২৫০ কোটি ৭৫ লাখ, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে ৩৪ কোটি ৫৪ লাখ, আইন ও বিচার বিভাগে এক হাজার ৫২৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ধরা হয়। 

জননিরাপত্তা বিভাগে বরাদ্দ ২১ হাজার ৪২৬ কোটি ৩৫ লাখ, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগে ৩৪ কোটি ৭৭ লাখ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ২২ হাজার ৪৬৬ কোটি ২০ লাখ ৫৬ হাজার, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ২৪ হাজার ৮৯৬ কোটি ১৭ লাখ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় খাতে ১২ হাজার ২০০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা খাতে ১৮ হাজার ১৬৬ কোটি ৩১ লাখ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে ২ হাজার ৬৮১ কোটি ১০ লাখ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ৫ হাজার ৫৯৩ কোটি ৭ লাখ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ৩ হাজার ৪৯০ কোটি ১৬ লাখ, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় খাতে ২২৭ কোটি এক লাখ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় খাতে ৪ হাজার ৯৬৪ কোটি ৫৫ লাখ, তথ্য মন্ত্রণালয় খাতে এক হাজার ১৬৫ কোটি ৬০ লাখ এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫১০ কোটি টাকা।

ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এক হাজার ১৬৮ কোটি ২২ লাখ টাকা, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় খাতে এক হাজার ৪৯৮ কোটি ১৪, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগে ২ হাজার ২০৯ কোটি ৯০ লাখ, শিল্প মন্ত্রণালয়ে এক হাজার ৩৫১ কোটি ৫৭ লাখ, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে ৭৩৮ কোটি, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে এক হাজার ৯৮৪ কোটি ৬২ লাখ, কৃষি মন্ত্রণালয়ে ১৩ হাজার ৯১৪ কোটি ৬৬ লাখ এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় খাতে এক হাজার ৮৬৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। 

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় খাতে এক হাজার ২৭১ কোটি ৫ লাখ, ভূমি মন্ত্রণালয় খাতে ২ হাজার ১২০ কোটি ৫৫ লাখ ১২ হাজার, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ৭ হাজার ৯২ কোটি ৮০ লাখ, খাদ্য মন্ত্রণালয়ে ১৬ হাজার ২৫ কোটি ৩৪ লাখ ৭৭ হাজার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে ৯ হাজার ৬৫৮ কোটি ৫১ লাখ ২৩ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে ২৪ হাজার ৩৮০ কোটি ২৪ লাখ, রেলপথ মন্ত্রণালয়ে ১৪ হাজার ৬৩৮ কোটি ২৬ লাখ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে ৩ হাজার ৫৩৬ কোটি ৭৪ লাখ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে এক হাজার ৫০৭ কোটি ৯১ লাখ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে ৩ হাজার ৩৮৩ কোটি ৬৭ লাখ, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এক হাজার ৩০৯ কোটি ১৩ লাখ ৪৪ হাজার, বিদ্যুৎ বিভাগ ২২ হাজার ৯৩৫ কোটি ৮৬ লাখ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ৪ হাজার ২৬০ কোটি ৭০ লাখ, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে ৫৯৫ কোটি ২৫ লাখ, দুর্নীতি দমন কমিশন খাতে ১১৭ কোটি ৪৭ লাখ এবং সেতু বিভাগে ৯ হাজার ১১৪ কোটি ২ হাজার টাকা, কারিগরী ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে ৫ হাজার ৭০২ কোটি ৩৭ লাখ, সুরক্ষা সেবা খাতে ৩ হাজার ৩৫০ কোটি ৬৫ লাখ ৬৬ হাজার এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ খাতে বরাদ্দ ৫ হাজার ২২৮ কোটি ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ