ঢাকা, শনিবার 30 June 2018, ১৬ আষাঢ় ১৪২৫, ১৫ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আ’লীগ ইচ্ছামত জাতীয় নির্বাচন করতে পারবে না

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের চলার পথ, কথা বলার ক্ষেত্র ক্রমশঃই সংকুচিত হচ্ছে। মুখে তারা যতই নিজেদের অধীনে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের কথা বলুক না কেন বাস্তবে তারা ইচ্ছামত দেশে নির্বাচন করতে পারবে না। সবার অংশগ্রহণে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনেরই আয়োজন তাদের করতে হবে। সেটি অবশ্যই হতে হবে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। এমন বক্তব্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। তারা বলছেন, সর্বশেষ অনুষ্ঠিত খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীনদের অধীনে যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয় সেটি আবারো প্রমাণিত হলো। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই সিটিসহ অতীতের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে বিরোধীদলীয় প্রার্থীরা দৃশ্যত পরাজিত হয়েছেন। তবে যেভাবে নির্বাচন হয়েছে তা দেশে বিদেশে কোথায়ও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। গাজীপুরে ৪৬ শতাংশ কেন্দ্রে ভয়াবহ কারচুপির প্রমাণ মিলেছে। বিদেশীরাও বলছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। নির্বাচন পর্যবেক্ষকরাও বলছেন নির্বাচন নিরপেক্ষ হয়নি।
খুলনা ও গাজীপুর নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্বেগ কেবলই যাক্তরাষ্ট্রের একার নয়। এটি পুরো পশ্চিমাদেরই মনোভাব। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেছেন, খুলনা ও অতি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ছিনতাই এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও পোলিং এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের খবরে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। এ ছাড়া বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও পোলিং এজেন্টদের গ্রেফতার ও পুলিশী হয়রানির বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। বৃহস্পতিবার ডিপ্লোমেটিক করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিকাব) আয়োজিত অনুষ্ঠানে মার্শা বার্নিকাট এ উদ্বেগের কথা জানান।  মার্শা বার্নিকাট বলেন, বাংলাদেশ সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যে নির্বাচনে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে। আমরা দেখতে চাই, সরকার তার অঙ্গীকার পূরণ করবে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে বার্নিকাট বলেন, ওই স্থিতিশীলতা কেবল অবাধ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে করা সম্ভব। বাংলাদেশ সরকার অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ, যেখানে বাংলাদেশের মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে। বাংলাদেশ সরকার সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে- আমরা সেটাই দেখতে চাই। বার্নিকাট বলেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে হলে গণতান্ত্রিক বাতাবরণ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে সহিষ্ণুতার চর্চা হবে, মানবাধিকার গুরুত্ব পাবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সমর্থন পাবে, যা সব নাগরিকের নিজের মতো শান্তিপূর্ণ ও দৃঢ়ভাবে প্রকাশের সুযোগ দেবে।
এদিকে গাজীপুর নির্বাচনে ৪৭ শতাংশ কেন্দ্রে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, ২৬ জুন অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ৪৬.৫ শতাংশ কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে। এসব অনিয়মের মধ্যে আছে- জোর করে ব্যালটে সিল মারা, ভোটের সংখ্যা বাড়িয়ে লেখা, কেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে প্রচার চালানো ও ভোটকেন্দ্রের ভেতর অননুমোদিত ব্যক্তিদের অবস্থান। আর এসব অনিয়মের বেশিরভাগই দুপুরের পর সংঘটিত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইডব্লিউজি)। বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসকাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ বিষয়ে প্রাথমিক বিবৃতি জানাতে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় সংস্থাটি। এতে বলা হয়, সংস্থাটির পর্যবেক্ষক দেখতে পান ব্যালট পেপারে অবৈধভাবে সিল মারা হচ্ছে এবং দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা একজন মেয়র প্রার্থীর সরবরাহ করা খাবার গ্রহণ করেছে। ভোটগ্রহণকারী কর্মকতারা ব্যালট পেপার নিয়ে তাতে সিল মেরে ব্যালট বাক্সে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। অননুমোদিত ব্যক্তি সারাদিন ধরে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ঘোরাঘুরি করেছে। অধিকাংশ কেন্দ্রেই বিএনপির এজেন্ট উপস্থিত ছিলেন না বললেই চলে। সংস্থাটি জানায়, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সর্বমোট ৪২৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ইডব্লিউজি ৫৭টি ওয়ার্ডেরই ১২৯টি (৩০ শতাংশ) ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছে। তারা সর্বমোট ১৫৯টি নির্বাচনী অনিয়মের ঘটনা লিপিবদ্ধ করেন। এগুলোর মধ্যে আছেÑ ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেয়া, পোলিং এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেয়া,  পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া, ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে নির্বাচনী প্রচারণা,  প্রার্থী কর্তৃক যানবাহন সরবরাহ করা, কেন্দ্রে অননুমোদিত ব্যক্তির উপস্থিতি ইত্যাদি।
নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দেশের নির্বাচনের প্রচলিত সংস্কৃতিকে কলুষিত করে শেখ হাসিনার গণতন্ত্রবিনাশী ভোট ডাকাতির সর্বশেষ লেটেস্ট মডেলের নির্বাচন গাজীপুরে অনুষ্ঠিত হলো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সরাসরি সহায়তায় আওয়ামী লীগ গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আরেকটি প্রতারণার নির্বাচন উপহার দিলো। এই নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও আওয়ামী লীগ তৃপ্তির ঢেকুর তুললেও দেশে-বিদেশে এটি কলঙ্কিত নির্বাচনের আরেকটি ইতিহাস হয়ে রয়ে গেল। ভোট কেন্দ্র দখল করে সিল মারার দৃশ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসিসহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শত শত কেন্দ্রের ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেছে। অথচ নির্বাচন কমিশন  নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হওয়ার ‘সার্টিফিকেট’ দিয়ে ভোট ডাকাতিকেই প্রশ্রয় দিলো। তিনি বলেন, এসব করেও এই সরকারের শেষ রক্ষা হবে না।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে দেশের সব কটি সংবাদ মাধ্যমই ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছে। সরকার সমর্থক বলে পরিচিত সংবাদ মাধ্যমগুলাতেও ভয়াবহ কারচুপি, ভোট ডাকাতির চিত্র স্থান পেয়েছে। দেশের শীর্ষ স্থানীয় সংবাদপত্র দৈনিক প্রথম আলো লিখেছে, ‘ভোটের দিন কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে খুলনার চেয়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এক ধাপ এগিয়ে রয়েছে আওয়ামী লীগ। এজেন্টদের কেন্দ্রছাড়া করার ক্ষেত্রে নেওয়া হয়েছে অভিনব কৌশল। আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের একটি অংশকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, মূলত বিএনপির মেয়র প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্রছাড়া করার পরই বিভিন্ন কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করার ঘটনাগুলো ঘটেছে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটা অংশের বড় ভূমিকা ছিল। খুলনার নির্বাচনে বিএনপিকে মাঠছাড়া করার জন্য পুলিশ যেভাবে বাসা-বাড়িতে অভিযান চালিয়েছিল, গাজীপুরের ক্ষেত্রেও তা হয়েছিল’ । পত্রিকাটি লিখেছে, ‘ভোটের পরদিন বিভিন্ন পর্যায়ে খোঁজখবর করে এবং বিএনপির নেতা ও উধাও হয়ে যাওয়া এজেন্টদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাউকে ভোটের আগের রাতে, ভোটের দিন ভোরে বাড়ি থেকে, সকালে কেন্দ্রের ভেতর ও বাইর থেকে তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এমন অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে। তবে বেশির ভাগই এখনো আতঙ্কে আছেন, নাম প্রকাশ করে গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতে ভয় পাচ্ছেন। বিএনপির প্রার্থীর মিডিয়া সেলের প্রধান মাজহারুল আলম বলেন, গ্রেফতার এড়াতে এজেন্টদের বাড়িতে না থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তাতেও লাভ হয়নি। অনেককে কেন্দ্রের ভেতর বুথ থেকেও সাদাপোশাকের পুলিশ বা ডিবি তুলে নিয়ে গেছে।তুলে নিয়ে গোপন স্থানে রেখে ভোট শেষ হওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, এমন ৪২ জন সম্পর্কে জানা গেছে, যাঁরা বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্ট বা কেন্দ্র কমিটির সদস্য ছিলেন’।
তাদের মধ্যে রয়েছেন আঞ্জুমান হেদায়েতুল উম্মত কেন্দ্রের এজেন্ট হাবীবুর রহমান, টিডিএইচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের এজেন্ট ফারুক হোসেন, ধীরাশ্রম জি কে আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের এজেন্ট সেলিম রেজা, সাহারা খাতুন কিন্ডারগার্টেন কেন্দ্রের এজেন্ট মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর আলম, ধূমকেতু স্কুল কেন্দ্রের এজেন্ট আবদুল হামিদ, শ্রমকল্যাণ কেন্দ্র থেকে সাবেক পৌর কমিশনার শরিফ মিয়া, শরিফপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে মনির হোসেন, টঙ্গী থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি শাহাব উদ্দিন, আমবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে শ্রমিক দলের নেতা বজলুর রহমান, পুবাইল রোমানিয়া মাদরাসা কেন্দ্র থেকে খোরশেদ মিয়া, সাবেক কাশিমপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল আজিজ মাস্টার; ধূমকেতু কেন্দ্র থেকে শাহাব উদ্দিন, ক্যারিয়ার লাইফ স্কুল কেন্দ্রের আবদুল কাদির, ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের আহম্মদ, ১৫ নম্বর ওয়ার্ড ভোগড়া মধ্যপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে গিয়াস উদ্দিন, টঙ্গী কিন্ডারগার্টেন কেন্দ্র থেকে সোহাগ প্রমুখ। ৩১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আইনজীবী হাসানুজ্জামান, ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের আমির হোসেন, তৈজউদ্দিন উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রর এজেন্ট আবু বকর সিদ্দিককে ভোট শুরুর পর কেন্দ্র থেকে ডেকে নিয়ে আটক করা হয়। পরে অনেক রাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। ভোটের দিন সকাল সাতটার দিকে উত্তর ধীরাশ্রমের বাসা থেকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায় তরুণ আইনজীবী সেলিম রেজাকে। তিনি ধানের শীষের একজন এজেন্ট। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, এমন সময় পুলিশ এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়। ভোটের আগের দিন সন্ধ্যায় শহরের ধীরাশ্রম এলাকা থেকে ছয়জনকে তুলে নিয়ে যায় সাদাপোশাকের পুলিশ। তাাদর সন্ধান পাওয়া গেছে যে তারা ঢাকার কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।
দেশের প্রথম সারির জনপ্রিয় একটি দৈনিক তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে, ‘খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নানা রকম অভিযোগ উত্থাপনের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল গাজীপুরে মোটামুটি একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলো নির্বাচন কমিশন সেটি পারেনি। এই ব্যর্থতার দায় তাদের নিতেই হবে। কয়েকটি কেন্দ্রের কথা বাদ দিলে গাজীপুর সিটি নির্বাচন দৃশ্যত শান্তিপূর্ণ হয়েছে। এই শান্তিপূর্ণ অবস্থার পেছনে যে বড় ধরনের অশান্তির আলামত ছিল, সেসব তথ্যও ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে। নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশ হয়তো উত্তপ্ত ছিল না। একটি নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ বলতে যা বোঝায়, গাজীপুরে তার অনেক কিছুরই ঘাটতি ছিল। কোনো নির্বাচনে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ভয়ে পালিয়ে থাকা কিংবা কেন্দ্রে প্রার্থীর এজেন্টকে অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে না দেওয়া শুধু সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায় নয়, নির্বাচনী পদ্ধতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। গাজীপুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ কেন্দ্রে মেয়র পদে নৌকা ছাড়া কোনো প্রার্থীর এজেন্ট ছিলেন না। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের ভাষ্যমতে, বেশির ভাগ কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টই ছিলেন না। অনেক কেন্দ্রের এজেন্টদের আগের রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে গিয়ে সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাইরে ছেড়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছেন। আবার অনেক কেন্দ্রে এজেন্ট গেলেও তাঁদের বের করে দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় যদি কেউ দাবি করেন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও সুন্দর হয়েছে, সেটি হাস্যকর বলেই মনে হয়। সত্যিকারভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে একটি নির্বাচন করতে যেসব পূর্বশর্ত পূরণ করা প্রয়োজন, তার অনেক কিছুরই ঘাটতি ছিল গাজীপুরে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো কারও পক্ষে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে গিয়ে যাতে অন্যদের জন্য প্রতিকূলতা সৃষ্টি না হয় তা নিশ্চিত করা। খুলনা ও গাজীপুরে সেই নিশ্চয়তা দিতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। গাজীপুর সিটি নির্বাচনের আগে যেমন বিতর্ক ছিল, নির্বাচনের পরও তার অবসান হয়নি। আওয়ামী লীগ নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে দাবি করলেও বিএনপি অনিয়ম-কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন বাতিলের দাবি জানিয়েছে। সামনে আরও তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এরপর বছরের শেষে জাতীয় সংসদের নির্বাচন হওয়ার কথা। এ অবস্থায় কে এম নুরুল হুদার কমিশন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, কোনো সমস্যা নেই বলে আত্মপ্রসাদ লাভের চেষ্টা করলে তার পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে। আশা করি, দেরিতে হলেও কমিশনের বোধোদয় হবে’।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এমন বেপরোয়া আচরণের পরও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। আগামী তিন সিটি নির্বাচনেও তারা অংশ নেবে বলে জানিয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন ‘সম্ভব না’ -এটা প্রমাণ করতেই রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। তিনি বলেন, গাজীপুরে কোনো নির্বাচন হয় নাই। এখন প্রশ্ন: তারপরও কেনো তিনটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহন করছেন? এর জাবাবে তিনি বলেন, আমরা দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন নিরপেক্ষ অবাধ ও সুষ্ঠু হয় না- সেটা আমরা জাতির কাছে প্রমাণিত করতে পারবো এবং এটা প্রমাণিত করার জন্যই এই তিনটি সিটি নির্বাচনে আমরা অংশ গ্রহণ করছি। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মওদুদ আহমদ বলেন, এই নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা আগেও বলেছি এটা একটা তল্পিবাহক, একটা আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিবিসি বাংলাও। তারা বলেছে, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বাইর থেকে শান্তিপূর্ণ মনে হলেও মূলত নির্বাচন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। অধিকাংশ কেন্দ্রেই বিএনপির কোনো এজেন্ট ছিলনা। সরকার দলীয়রা হয় তাদের আসতে দেয়নি অথবা ভোরেই কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছে। ভোটাররা ছিলেন আতংকের মধ্যে। নৌকার পক্ষে সিল মারার কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা হয় বিবিসি বাংলার রিপোর্টে। জনপ্রিয় এই সংবাদ বলেছে, তাদেও রিপোর্টার যে কয়টি কেন্দ্রে গিয়েছে সেখানে বিরোধী নেতাকর্মীদেও চোখে পড়েনি। বেশীরভাগ কেন্দ্রই ছিল সরকারদলীয়দের দখলে।
পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে যে ফলাফল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে গেছে, সেটা নিয়ে অনেকে হয়তো আশ্বস্ত বোধ করতে পারেন। কিন্তু আত্মপ্রসাদের কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। এটাকে যেভাবেই দেখা হোক না কেন, আগামীতে একটা প্রচ- সংকট সৃষ্টির সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। তারা বলছেন, নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিয়ে কেবল দেশের ভেতরেই শঙ্কা বাড়ছে না। বিদেশীরা এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন। সবাই বলছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সব নির্বাচনেই জিততে চান। যে কোন মূল্যে বিরোধীদের হারাতে হবে। এটাকে নির্বাচন বলা যাবেনা। নির্বাচন হতে হবে সবাইকে সমান সুযোগ দিয়ে। সবার আগে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরী করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ