ঢাকা, শনিবার 30 June 2018, ১৬ আষাঢ় ১৪২৫, ১৫ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

৯ বছরে ২৬ বার আন্দোলনে কেবলই আশ্বাস মিলেছে শিক্ষকদের ভাগ্যে

প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক এমপিওভুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষকদের আমরণ অনশন চলছে। গতকাল শুক্রবার তোলা ছবি -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : গত ৯ বছরে ২৬ বার আন্দোলনে নেমেছেন নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা। তবে প্রতিবারই সরকারের পক্ষ থেকে কেবল আশ্বাসই জুটেছে। আমরা যেই রাস্তার শিক্ষক, সেই রাস্তাতেই রয়ে গেছি। তবে এবার আর খালি হাতে ফিরতে চাই না। দাবি আদায় করেই ঘরে ফিরতে চাই।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে আমরণ অনশনরত শিক্ষকরা এমন প্রত্যয়ের কথাই জানালেন।
শিক্ষকরা জানান, গেল ডিসেম্বরে দুর্বার আন্দোলন গড়ার পর সরকার এমপিওভুক্তির আশ্বাস দিয়ে আমাদের বাড়ি ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু সম্প্রতি নীতিমালার মাধ্যমে আমাদের বঞ্চিত করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। নতুন এ নীতিমালায় খুব বেশি হলে ২০০ প্রতিষ্ঠান এমপিওর সুযোগ পেতে পারে। বাদ পড়বে ৫ হাজারের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এমন নীতিমালা আমরা মানি না।
 কথা হয় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ ড. বিনয় ভুষণ রায়ের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিলেও জাতীয় সংসদে অর্থ বাজেটে তার প্রতিফলন নেই। আমরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজনে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে আন্দোলন করে যাব।
সংগঠনের সভাপতি গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার বলেন, গত ৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তার সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা হচ্ছে না। আমরা আবারো আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছি।
তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে আমরা কেবল দু’মুঠো ভাতের জন্য আন্দোলন করছি। বিগত ৯ বছরে আমরা ২৬ বার রাজপথে নেমেছি। প্রতিবারই আমাদের আশ্বাস দিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা আর প্রতারিত হতে চাই না।
এদিকে আমরণ অনশনের ষষ্ঠ দিনেও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শিক্ষকরা অনশনে যোগ দিয়েছেন। রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মাদরাসা শিক্ষক মোখলেসুর রহমান বলেন, ভোরে ঢাকা এসেছি। সারারাত ঘুমাতে পারিনি। বাড়িতেও ভালো ঘুম হয় না, নানা টেনশন আর আর্থিক টানাপড়েনে। জানি না এ অবস্থা থেকে কবে বের হতে পারব।
টানা অনশনে গতকাল শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ১০৫ জন শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানানো হয়েছে। শুক্রবার বিকালেও কয়েকজন অসুস্থ হন। এদের মধ্যে ৬২ জনকে অনশন স্থলে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। এছাড়া ১১ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
গতকাল বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে দেখা যায়  শিক্ষক কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ অসুস্থ শিক্ষকরা রাস্তায় শুয়ে আছেন। তারা এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন শোয়া অবস্থায়।
তারা জানিয়েছেন, শিক্ষকদের দাবি মেনে না নিলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।  তারা মনে করিয়ে দেন, আগেই বলেছিলাম, ২৪ জুনের মধ্যে দাবি মেনে নেওয়া না হলে ২৫ জুন থেকে আমরা আমরণ অনশনে যাবো। পূর্বঘোষিত সেই ঘোষণা অনুযায়ী সোমবার সকাল ১০টা থেকে অনশনে বসেছি। যত ঝড়-তুফান আসুক না কেন, দাবি না মানা পর্যন্ত আমরা অনশন চালিয়ে যাবো।
প্রসঙ্গত, গত ১২ জুন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল-কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮ জারি করা হয়েছে। এই নীতিমালাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়ায় বাধা হিসেবে দেখছে নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশন।
সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান অনুমতি ও স্বীকৃতির সময় আরোপিত শর্তের সঙ্গে এই নীতিমালা সাংঘর্ষিক। ২০১৮-১৯ বাজেটে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য বরাদ্দের কোনও সুস্পষ্ট ঘোষণা নেই। এ কারণে নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা অত্যন্ত হতাশ ও আশাহত হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপে সারাদেশের নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একযোগে এমপিওভুক্তি হলে সবাই সন্তুষ্টি নিয়ে বাড়ি ফিরে যাবে।
অনশনকারীরা জানান, বর্তমানে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে পাঁচ হাজার ২৪২টি। এছাড়া সরকার নতুনভাবে ১৩১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের দাবি, সারা দেশে পাঁচ হাজারের বেশি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর বিনা বেতনে পাঠদান করে অত্যন্ত কষ্টকর ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকের চাকরির মেয়াদ আছে ৫ থেকে ১০ বছর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা উন্নয়নবঞ্চিত অবস্থায় রয়েছেন।
এদিকে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত (মান্থলি পে-অর্ডার) করার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে দুটি কমিটি গঠন করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। এগুলো হলো শর্ত পূরণ করা প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুতের জন্য অনলাইন অ্যাপলিকেশন গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং এমপিওভুক্তির জন্য বাছাই কমিটি। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে এক হাজার বা তার কিছু বেশি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করবে সরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ