ঢাকা, শনিবার 30 June 2018, ১৬ আষাঢ় ১৪২৫, ১৫ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খুলনাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে লেখাপড়ার আগ্রহ সৃষ্টি করেছে

খুলনা অফিস : প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রামের সহায়তায় শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জেলায় ৪৬৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালু রয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের আনন্দঘন শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হয়েছে। একইসাথে শহর ও গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার প্রযুক্তিগত বৈষম্য দূর হয়েছে। এর মাধ্যমে আকর্ষণীয় উপস্থাপন, কঠিন বিষয় সহজভাবে তুলে ধরা, শিক্ষার্থীদের সহজে শিখন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা এবং সৃজনশীল অনুশীলন কার্যক্রম খুব সহজভাবেই পরিচালনা করা যায়।
খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের শিক্ষা ও আইসিটি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সরকারিভাবে খুলনা জেলায় ৪৪৬টি স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম চালু রয়েছে। এর মধ্যে কোতয়ালী থানা এলাকায় ৭৭টি, খানজাহান আলী থানা এলাকায় ৬১টি, রূপসায় ৩৪টি, তেরখাদায় ১৯টি, দিঘলিয়ায় ২২টি, ফুলতলায় ২৪টি, দাকোপে ২২টি, পাইকগাছায় ৩৬টি এবং কয়রায় ২৭টি স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস চালু রয়েছে। এছাড়াও বেসরকারি দুটি স্কুলেও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম চালু আছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম শিক্ষা ক্ষেত্রে গতি সঞ্চার করেছে বলে উল্লেখ করেছেন বলে স্থানীয় শিক্ষকরা জানিয়েছেন।
খুলনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রমেন্দ্রনাথ পোদ্দার বলেন, এ জেলায় ৬৩২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫১২টি নবজাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২৭৭টি কিন্ডার গার্টেন, ১৪০টি ইবতেদায়ী মাদরাসা, ২৩৯টি এনজিও শিক্ষাকেন্দ্র এবং ৮৫টি অন্যান্য প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ বছরের শুরুতেই এসব স্কুলের শতভাগ শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে বই দেয়া হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি স্কুলে শিখন শিখানো কার্যক্রম উন্নয়নে বার্ষিক ৪০ হাজার টাকা করে সিøপগ্রান্ড প্রদান করা হয়।
তিনি জানান, গত বছর পয়লা জুলাই থেকে জেলার সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক লাখ ৮৬ হাজার ৬৫জন শিক্ষার্থীকে শিওর ক্যাশ’র মাধ্যমে উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। জেলার প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই মিড ডে মিল চালু রয়েছে। অবশ্য মিড ডে মিল চালুর জন্য সরকারিভাবে শুধুমাত্র জনসচেতনতা সৃষ্টি করে অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। অনেকে তাদের সন্তানদের সকালে স্কুলে পাঠালেও দুপুরের খাবারের জন্য কোন ব্যবস্থা করতেন না। এতে শিশুরা যেমন পুষ্টিহীনতায় ভুগত তেমনি শেষ দিকে গিয়ে পড়াশুনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলত। অভিভাবকদের বিষয়টি বুঝিয়ে খুলনা বিভাগের ৮ হাজার ১৬০টি স্কুলের শতভাগ শিক্ষার্থীর জন্য টিফিন পাঠানো নিশ্চিত করা হয়েছে।
খুলনা নগরীর নজরুল নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা পারভীন আক্তার বলেন, যেহেতু শিশুরা পড়াশুনাকে কষ্ট মনে করে আর টিভি দেখতে পছন্দ করে তাই প্রজেক্টরের মাধ্যমে বড় পর্দায় পড়াটিকে টিভির মত করে দেখানোর ফলে তারা খেলতে খেলতেই শিখতে পারছে।
তিনি বলেন, কোন ব্যক্তিকে বইয়ের পড়ার মধ্য দিয়ে আবিষ্কার করা যতটা কঠিন, স্ক্রিনে দেখার ফলে তাকে চিনতে ততটাই সহজ। সেই সাথে শিশুরা শিক্ষার পাশাপাশি যখন গ্রুপওয়ার্ক করে তখনও তারা খেলার মাধ্যমে শেখার সুযোগ পায়। ফলে তারা আনন্দের সাথে পড়া তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ এ পদ্ধতির শিক্ষাব্যবস্থা অল্প সময়ে অনেক বেশি শিখনের সুযোগ করে দিচ্ছে।
খুলনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারহানা নাজ বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে এটি একটি দারুন পরিবর্তন। প্রতিটি ক্লাস মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে নেয়া সম্ভব হলেই ডিজিটাল বাংলাদেশের পূর্ণতা আসবে। এর ফলে শিক্ষার্থীরাও পড়ার প্রতি মনোযোগী হবে। পাশাপাশি কোচিংমুখী নয়, বরং তারা হবে স্কুলমুখী। শিক্ষকরাও নিত্য নতুন কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে নিজেদের আরও দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারবেন।
রূপসা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ শ্রেণির ছাত্র ইমাম হাসান সাজিদ, ছাত্রী মেহেরুন্নেছা আক্তার সাজনা এবং নবম শ্রেণির ছাত্রী মমতাজ ইসলাম মমো জানান, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের ফলে এখন আর পড়া মুখস্থ করার প্রয়োজন হয়না। পুথিগত শিক্ষা থেকে বের হয়ে এসে নতুন করে শেখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের এ অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তারা দেশ সেবায় নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করতে চান।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক প্রফেসর শেখ হারুনর রশীদ বলেন, শিক্ষা যে এখন আর বোঝা নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনেরই একটি অংশ শিক্ষা সহায়তা কর্মসূিচর মধ্য দিয়ে সেটি প্রমাণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে ।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর খুলনার সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক টিএম জাকির হোসেন বলেন, সমবায়ভিত্তিক ল্যাপটপ কিনে প্রতিটি শিক্ষককে দক্ষ করে তোলা সম্ভব। নিজস্ব ল্যাপটপ থাকলে শিক্ষকরা নতুন নতুন কনটেন্ট তৈরি করে শিক্ষার্থীদের শেখানোর সুযোগ পাবেন। মাল্টিমিডিয়া ও ডিজিটাল ক্লাসের প্রসার যত বাড়বে ততই শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানমুখী হবে। ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কোচিং সেন্টার বন্ধ হয়ে যাবে। অভিযান চালিয়ে আর কোচিং বন্ধের প্রয়োজন হবে না। তিনি কোচিং থেকে শিক্ষার্থীদের ফেরাতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস চালু রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
এ ব্যাপারে খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আবু সায়েদ মো. মনজুর আলম বলেন, বছরের শুরুতেই নতুন বই হাতে পাওয়া, মাল্টিমিডিয়া ও ডিজিটাল ল্যাব এর মাধ্যমে পড়াকে সহজভাবে গ্রহণ করার সুযোগ সৃষ্টি, মিড ডে মিল ও উপবৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। শতভাগ মানুষের শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষা সহায়তা কার্যক্রম চালু করেছেন।
এ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, বহির্বিশ্বের সাথে নিজের দেশের শিক্ষার গুনগত মানের পার্থক্য দেখতে শিক্ষকদের বিদেশে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ