ঢাকা, শনিবার 30 June 2018, ১৬ আষাঢ় ১৪২৫, ১৫ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাজেট জনবান্ধব নয়

আবু মুনীর : জনগণের বাজেট ইংরেজি Budget of the people. এ দেশটির সাংবিধানিক নাম people’s Republic of Bangladesh যাকে বাংলাতে বলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সংবিধানে বাজেট শব্দটি নেই। এ সংবিধানের পঞ্চম ভাগের ৮৭ নং অনুচ্ছেদে বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি অর্থাৎ Annual financial statement কথাটি উল্লেখ রয়েছে। Bud অর্থ কুঁড়ি বা মুকুল এবং Get অর্থ প্রাপ্ত হওয়া বা লাভ করা। কিন্তু শব্দ দুটোকে একত্র করা হলে Budget অর্থ দাড়াঁয়  আয়ব্যয়ক। সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের বার্ষিক আগাম হিসাবই হলো Budget. অর্থাৎ পরিকল্পনার সংখ্যাত্মক প্রকাশকে বলে বাজেট। পরিকল্পনা হলো চিন্তন, মনন প্রক্রিয়া, আর ব্যবস্থাপনার দর্পন হলো পরিকল্পনা। ফরাসি শব্দ Bougette (বগেটি) থেকে বাজেট শব্দটির উৎপত্তি যার অর্থ ব্যাগ বা থলে। ১৭৩৩ সালে ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী চামড়ার একটি ব্যাগে ভরে অর্থ সংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে তা অনুমোদনের জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই বাজেট পদ্ধতির গোড়াপত্তন হয়। সেই অবধি বাজেট (Budget) শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক কালে বাজেট যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক নীতির একটা হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে বাজেট প্রসঙ্গে ডব্লিও কলিন্স বলেন, “So the budget may be spoken of as being prepared as being voted on ratified as being executed as being audited and controlled it goes through all these states”. সহীহ আল্ বুখারী হাদিসগ্রন্থের প্রথম হাদিসটি উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “নিশ্চয়ই কর্মফল নিয়্যাতানুযায়ী নির্ধারিত হয়ে থাকে.........।” এখানে নিয়তের অর্থ সংকল্প হলেও ব্যাপক অর্থে এটিকে পরিকল্পনা (Planning) বলা যায়। যার সমার্থক হিসেবে being after শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ An act of formulating a programme for a definite course of action. ১৪/০৪/২০১৮ খ্রিঃ তারিখের আমাদের সময় পত্রিকার ৪নং পৃষ্ঠায় সম্পাদকীয়তে কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক আবুল মোমেন ‘নববর্ষঃ আনুষ্ঠানিকতা থেকে জীবন ঘনিষ্ঠতা’ শিরোনামে লিখেছেন, “................ আমরা স্বেচ্ছায় হার মেনে নিয়েছি ইংরেজি ক্যালেন্ডারের কাছে বিনা চ্যালেঞ্জে, বিনা প্রয়াসে, ঠিক তেমনটাই ঘটেছে মাতৃভাষার ক্ষেত্রেও........।” ১৪/০৫/২০১৮ খ্রিঃ তারিখের দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার ৫নং পৃষ্ঠার বাতায়ন- এ অর্থ বছর পরিবর্তনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন সরকারের সাবেক সচিব এবং এন.বি.আরের সাবেক চেয়ারম্যান ডঃ মোঃ আব্দুল মজিদ। আমিও মনে করি বাংলা সনকে হুবহু সাযুজ্যকরণে বাংলাদেশের অর্থ বছর ১৪ এপ্রিল (১ বৈশাখ) -১৩ এপ্রিল (৩০ চৈত্র) সাব্যস্ত হতে পারে। কারণ আমাদের প্রতিবেশী বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের অর্থবছর মোগল যুগ ও ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই এপ্রিল- মার্চ হলেও পাকিস্তান আমলে প্রবর্তিত জুলাই-জুন অর্থ বছর বিগত চার দশকের বেশি সময় ধরে স্বাধীন বাংলাদেশে বিদ্যমান। বাংলাদেশে জমি ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি রেজিস্ট্রি করণের সময় হাল সনের খাজনা পরিশোধের রশিদ (দাখিলা) প্রয়োজন হয়। এতে প্রচলিত অর্থ বছরের সহিত বাংলা সনের আড়াই মাসের (১৪ এপ্রিল-৩০ জুন) ব্যবধান হয়ে যায়। ফলে ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) আদায় ও সরকারি কোষাগারে  জমা করণের মধ্যে আড়াই মাসের তারতম্য এ যাবৎকাল চলেই আসছে। এটি নিরসন হওয়া একান্ত আবশ্যক বলে আমি মনে করি। কারণ বাংলা নববর্ষ উৎসব রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে পালন করার পর ১ বৈশাখ থেকে তার ব্যবহার রাষ্ট্রীয় ভাবে সুনিশ্চিত করা এটা বাংলাদেশের জনগণের প্রাণের দাবী এবং এটাই হওয়া উচিত এবং হচ্ছেও তাই, তবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। চিরাচরিত প্রথায় বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরের ৪৮তম বাজেট ৭ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে পেশ করেছেন। ৮ জুন শুক্রবারের সমকাল পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় হেড লাইন করা হয়েছে ‘বড় বাজেট, ভাবনায় ভোট’। এবারের বাজেটে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা, রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা, ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। ১৪/০৬/২০১৮ খ্রিঃ তারিখের আমাদের সময় পত্রিকার ৪নং সম্পাদকীয় পাতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ডঃ জোবাইদা নাসরীন ‘নারীর আশা-হতাশার বাজেট’ শিরোনামে লিখেছেন, “............ এই বাজেটেও লিঙ্গীয় সমতার ওপর জোর দেওয়া হলেও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য কোনো বাজেট আসে নি................”। প্রস্তাবিত বাজেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে যার পরিমান ৬৭ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা, অথচ এমপিও ভুক্তিতে বাজেট বরাদ্দের ঘোষনা নেই। এফবিসিসিআইর সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেছেন, “প্রস্তাবিত এ বাজেটকে পুরোপুরি শিল্প ও ব্যবসা বান্ধব বলা যাবে না। উৎপাদন মুখী শিল্প ও ব্যবসাকে এ বাজেট চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।” বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “ পোশাক খাতের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিকুল বাস্তবতার মধ্যে বর্ধিত উৎসে কর কোনো ভাবেই ব্যবসা সহায়ক নয়। বাজেটে এ পদক্ষেপের কারণে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় এই খাত।” ঋণের ভারে জর্জরিত চলতি জাতীয় এ বাজেট। অর্থনৈতিক শোষণের হাতিয়ার যেন বর্তমান বাজেট। বাজেট জনবান্ধব নয় বড় অংশ চলে যাবে লুটপাটে। এ বাজেটে জাতির ঘাড়ে অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো হয়েছে। সুশাসন ছাড়া এ বাজেটে জনগণের কল্যাণ হবে না। সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতি আস্টেপৃষ্টে বাঁধা পড়া। অসাধু পন্থায় উপার্জন বন্ধ হওয়া। সাধারণ গণমানুষের জীবন যাত্রায় সমতা আসা। অন্যায় পথে নিজের অবস্থা ভালো রাজনীতি পরিত্যক্ত হওয়া। জাতীয় উন্নয়নমূলক সকল গৃহীত প্রকল্প ও কর্মসূচির জন্যে বরাদ্দকৃত অর্থ অপচয়হীন ভাবে কড়ায়-গন্ডায় কাজে লাগায়। অনুৎপাদন খাত বা স্বল্প উৎপাদন খাতে অর্থ ব্যয় বন্ধ করা। জাতীয় জীবনে সকল কর্ম কান্ড পরিচালনার জন্যে এমন নিয়ম বিধি থাকা যেগুলো প্রয়োগ হবে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ নেতৃত্ব ও যোগ্য পরিচালন ব্যবস্থার মাধ্যমে। মিল্লাতে ইসলামিয়ার জন্য ওলামা- এ কেরামকে অনেকে ট্রাফিক পুলিশের সাথে তুলনা করেছেন। চৌরাস্তায় সে কর্তব্যে অবহেলা করলে মুহূর্তের মধ্যে দূর্ঘটনা ঘটার আশংকা থাকে। তেমনি ইসলামি উম্মাহ্র ওলামা যদি নিজেদের দায়িত্ব যেভাবে এবং যেখানে যেখানে পালন করার কথা সেভাবে ও সে স্থানে পালনে ব্যর্থ হন, জাতির জীবনেও দুর্ঘটনা দেখা দেয়াটা অবধারিত। অর্থনীতির অঙ্গন থেকে আল্লাহ্ ভীরু লোকগুলো যখন বিদায় গ্রহণ করেছে, তখন চরম মুনাফাখোর সুদখোর ও দস্যু-তস্করের দল অর্থ জগতের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে মানবতার উপরে শোষণমূলক পুঁজিবাদ চাপিয়ে দিয়ে মানবতাকে নির্মমভাবে শোষণ করছে। অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্র থেকে ঈমানদার মুসলমানদের দুর্ভাগ্যজনক পশ্চাদাপসারণের ফলে মানবতার কল্যাণে অর্থ ব্যয় না হয়ে অকল্যাণে অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
পৃথিবীর অসংখ্য আদম সন্তানকে দারিদ্র সীমার নিচে জীবন যাপন করতে বাধ্য করা হচ্ছে। অগণিত অর্থ সম্পদ নিছক আমোদ ফুর্তি ও চিত্তবিনোদনের নামে ব্যয় করা হচ্ছে। নিছক শখের বশে অনুৎপাদনশীল খাতে অর্থ ব্যয়ের প্রতিযোগিতা চলছে।  ঈমানদার লোকদের পরিবর্তে ঈমানহীন লোকগুলো যখন মানব জীবনের যাবতীয় ক্ষেত্রে নেতৃত্ব গ্রহণ করেছে, তখনই সমগ্র পৃথিবী ব্যাপী মহা ভাঙ্গন ও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। যার প্রভাব বর্তমান এই নির্বাচনী বাজেটেও পড়েছে।
মহাকবি ইকবালের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা শেষ করছি, “হাস্ত দীনে মোস্তাফা দীনে হায়াত/ শরয়ে’উ তাফসীরে আইনে হায়াত/ খাস্তা বাশী উস্তওয়ারাত মী-কুনাদ/পোখতা মিস্লে কুহসারাত মী-কুনাদ।” অর্থাৎ দীনে মোস্তফা হচ্ছে জীবনবিধান। এর বিধি বিধান সমূহ হলো বাস্তব জীবনের ভাষ্য। তুমি হীন ও দূর্বল হলে এটিই তোমাকে পাহাড়সম উচ্চতা ও সবলতা প্রদান করবে।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ