ঢাকা, শনিবার 30 June 2018, ১৬ আষাঢ় ১৪২৫, ১৫ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চালের বাজারে অস্থিরতা

মাহমুদুল হক আনসারী : বাজেটে চাল আমদানীতে ২ ভাগ শুল্কের স্থলে নতুন করে ২৮ ভাগ শুল্ক আরোপের ফলে চাউলের মূল্য নাগালের বাইরে চলে যাবে। বাংলাদেশের জনগণ মাছে ভাতে বাঙ্গালি। দুই বেলা ভাত না হলে বাঙ্গালির ঘরে ঘরে আহাজারি দেখা যায়। প্রায় ১৮ কোটি জনগণের এদেশে মানুষের প্রধান খাদ্য হচ্ছে ভাত। সকাল বিকেল ভাত খেতেই দেশের মানুষ অভ্যস্ত। দুবেলা ভাত খাওয়ার জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিন মজুর থেকে কোটিপতি পয্র্ন্ত পরিশ্রম করে থাকে। পরিবারের সদস্যদের অন্নের সন্ধানে পরিশ্রম করে থাকে পরিবারের প্রধান। খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ দুবেলা ভাত খেতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ভাত ছাড়া অন্য যত প্রকারের নাস্তাই আপ্যায়ন করা হোক না কেন ভাত খেতেই হবে। অতিথি মেহমানদেরকেও হাজার প্রকারের নাস্তার আপ্যায়ন হলেও ভাত খ্ওায়া আমাদের অন্যতম সংস্কৃতি ও অভ্যাস। পূর্বপুরুষদের থেকে পাওয়া এ অভ্যাস বাঙ্গালি ছাড়তে পারে নি।
কমবেশী দুবেলা কোনো কোনো পরিবারে তিনবেলাও ভাত খাওয়া হয়। ভাত বাঙ্গালিকে খেতেই হবে। অতিথি মেহমানদেরকেও ভাত দিয়ে আপ্যায়িত করতে হবে। এ প্রজন্ম এ ভাবেই বেড়ে উঠছে। কেউ কম খায়, আবার কোনো কোনো পরিবারে ভাত বেশী খাওয়া হয়। খেটে খাওয়া পরিশ্রমী দিনমজুর কৃষক মানুষরা ভাত খেয়েই ক্ষুধা নিবারণ করে থাকে। কথা হচ্ছে ভাত খাওয়া না খাওয়া নিয়ে কারো কোনো দ্বিধা দন্দ্ব নেই। কিন্তু আমাদের দেশে অন্যান্য ভোগ্য পণ্যের দাম বাড়লে তেমন বেশী আলোচনা সমালোচনা হয় না। যখন চাউলের মূল্য বৃদ্ধি পায় তখন সব শ্রেনীর মানুষের মধ্যে আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠে। কারণ এ চাউল বা ভাতের সাথে দেশের কৃষক থেকে কোটিপতি পয্র্ন্ত সবার সম্পর্ক থাকে। কেউ বেশী খায়, কেউ কম খায়। সবাই ভাতের উপর ক্ষুধা নিবারণে নির্ভরশীল।
বর্তমান সরকার কৃষিবান্ধব জনবান্ধব উন্নয়নমুখী সরকার বলে জনগণ মনে করে। অতীতের সব সরকারের তুলনায় বর্তমান সরকার উন্নয়ন গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের সাথে দুর্নীতিও কিন্তু কম হচ্ছে না। তারপরও উন্নয়ন অগ্রগতি জন কল্যাণমূলক উন্নয়নে জনগণ এক ধরনের খুশী। জনগণের ব্যয়ের সাথে আয়ও বেড়েছে। না হলে মানুষ না খেয়ে ক্ষুধার যন্ত্রনায় ছটফট করতো। কিন্তু বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একসময় ক্ষুধার যন্ত্রণা দেখা যেতো। মাত্র কয়েক বছর আগেও এমন ধরনের সংবাদ প্রচার মাধ্যমে পাওয়া যেতো। এখন কিন্তু সে ধরনের সংবাদ দেখা যায় না। মানুষ দৈনন্দিন কাজ করে তাদের অন্নের যোগাড় করতে পারে। শহর ও গ্রামে খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের যথেষ্ট চাহিদা ও কদর আছে। ফলে কোনো পরিবার ও মানুষকে ভাতের জন্য ভূভুক্ত থাকতে হচ্ছে না। আয়ের সাথে ব্যয় মিল করে সব শ্রেনীর মানুষ ভাত কাপড়ে ভালো আছে। ২০১৭/১৮ বছরের চাউলের কয়েক দফা মূল্য বৃদ্ধি দেখা যায়।অনেক আলোচনা সমালোচনার পর সরকারের পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচী হাতে নিয়ে মূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু যেখানে আওয়ামীলীগ সরকার গ্রামের খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের কথা বেশী চিন্তা করে থাকে, সেখানে এ সরকারের বাজেটে কেন চাউলের উপর বেশী শুল্ক আরোপ করা হলো সে বিষয়টা বোধগম্য হচ্ছে না। বেশী শুল্কের চাপটা অবশ্যই যে সাধারণ গরিব শ্রেণীর উপরে বর্তাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাহলে কেন চাউলের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ? কাদের স্বার্থে এটা খতিয়ে দেখতে হবে। বাজেট এখনো পাশ হয়নি। এর মধ্যেও নতুন ভাবে ঘোষিত শুল্ক আদায় করার প্রক্রিয়া চলছে বলে সংবাদ মাধ্যমে জানা যায়। ব্যবসায়ীরা যারা আগের শুল্কে চাউল আমদানী করেছিল তাদেরকে নতুন করে আরোপিত ২৮ ভাগ শুল্কের ফলে প্রতি কেজি চাউলে ৯ টাকা ৬১ পয়সা করে শুল্ক পরিশোধ করতে হবে।
তাহলে ১ কেজি চাউলের মূল্য নির্ধারণ করে বস্তা প্রতি কী পরিমাণ টাকা মূল্য নির্ধারণ হবে সেটা ব্যবসায়ীরা ঠিক করেবে। কথা হলো চাউলের মূল্যের চেয়ে শুল্ক মূল্যের পরিমাণ যদি বেশী হয়, সেক্ষেত্রে চাউলের মূল্য বর্তমান বাজারের চেয়ে দ্বিগুণ হওয়ার আশংকা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ শ্রমজীবী দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ। সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি করা হলেও এ ক্ষেত্রে বেসরকারী কর্মচারীদের বেতন ভাতা বাড়েনা। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ সে সুবিদা পায়না। যারা শ্রম দিয়ে দৈনন্দিন কজ করে চলে তাদেরও সাপ্তাহে সপ্তাহে বেতন বাড়ে না। কিন্তু খরচের পরিধি বেড়েই চলছে। অন্যান্য খরচের সাথে চাউলের এ মূল্য বৃদ্ধি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দূর্ভোগ বাড়াবে। কথা হচ্ছে সরকার কি মুষ্টিময় মানুষের সুবিধার চেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ খেটে খাওয়া মানুষের কথা বেশী অনুধাবন করবে। সরকারের বাজেট চিন্তায় মনে হচ্ছে যেনো এ বাজেটে গরীব দুখী খেটে খাওয়া মানুষের সুখ-দুঃখের চিন্তা গুরুত্ব পাচ্ছে না। আওয়ামীলীগের রাজনীতির উদ্দেশ্য ছিলো সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষে, তাদের সুবিধায় অসুবিধায় আওয়ামীলীগের রাজনীতি ও পরিকল্পনা ছিলো।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খেটে খাওয়া মানুষের সুখ দুখের সাথেই ছিলেন। তার গঠিত দল ক্ষমতাসিন সরকারের চিন্তাও সেটা হওয়া উচিৎ। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা আর রাজনীতির জন্য সাধারণ মানুষের সুখ অসুখের কথা ভুলেই যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ ক্ষমতা চায়না। তারা বাজেট বুঝে না। তারা চিনে বাজারে পণ্যমূল্যের কি অবস্থা। এ অবস্থা দেখেই তারা বুঝে নেই বাজেটের কি প্রতিক্রিয়া। কথা হলো বাংলাদেশে অনেক ধরনের পণ্য আমদানী হয়, কিছু পণ্য শিল্পপতি পুজিপতিদের জন্য হয়ে থাকে। আর কিছু সাধারণ সব মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক প্রয়োজনে আমদানী করা হয়ে থাকে। সেধরনের একটি পণ্য হচ্ছে চাউল। চাউলটার শুল্ক না বাড়ালেইতো হয়। এ পণ্যের সাথে কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের বেশী সম্পর্ক। চাউল ছাড়া  তাদের জীবন বাচেঁ না। ক্ষুধার জ্বালা নিবারণে তারা ভাত চায়। এ ভাতের উপর যখন নানা ভাবে শুল্কের নামে মূল্য বৃদ্ধি হয় তখন তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। সরকারের সমালোচনায় পড়া মহল্লা সরগরম হয়ে উঠে। তখন সে সুযোগে একটি শ্রেনী তাদের পক্ষ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের ষড়যন্ত্র করে। তাহলে কি সরকার ইচ্ছে করেই চাউলের মূল্য বৃদ্ধি করে সাধারণ মানুষদের ক্ষেপিয়ে তুলতে চায়? সরকারের  বাজেটে এমন ধরনের ইঙ্গিত বহন করছে। নির্বাচনের বছরে এধরনের সাধারণ মানুষের পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কি দরকার ছিলো। এসব বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল মহলে আলোচনা ও পূনরবিবেচনা হওয়া দরকার। কোনো অবস্থায় চাউলের মূল্য বৃদ্ধি জনসমর্থন বাড়বে না। যেকোনো সময় এসমস্ত কাজে সরকারে বারটা বাজাবে সাধারণ মানুষ। তাই চাউলের মূল্য বৃদ্ধি না করে শুল্ক না বাড়িয়ে চাউলের বাজার সব মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে সচেতন মানুষ মনে করে।
-গবেষক, কলামিষ্ট

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ