ঢাকা, শনিবার 30 June 2018, ১৬ আষাঢ় ১৪২৫, ১৫ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সার্কের সাফল্যে ডিপ্লোমা শিক্ষার গুরুত্ব

আবুল হাসান : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে অন্যতম ঐতিহাসিক ঘটনাটি হলো ১৯৮০’র দশকে সার্ক (SAARC) অর্থাৎ দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার প্রতিষ্ঠা। ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় দক্ষিণ এশিয়ার ৭টি দেশকে নিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক (South Asian Association for Regional Cooperation- SAARC) গঠিত হয়। সরকারি নাম হল: আঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্দেশ্যে দক্ষিণ এশিয়া সমিতি বা সার্ক। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনে ৭টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণ সার্কের সনদে স্বাক্ষর করেন। যে সমস্ত দেশকে নিয়ে সার্ক গঠিত হয়েছে তারা হলো ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও মালদ্বীপ। পরবর্তিতে অবশ্য আফগানিস্তানকে সার্কের পূর্ণ সদস্যপদ দেয়ায় বর্তমানে মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ এ। এ ৮টি দেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার একটি বিশেষ অঞ্চলে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে এদের মধ্যে বিস্তর সাদৃশ্য বিদ্যমান। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার হিসেবে এরা সবাই কম-বেশি অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ এবং আধুনিক ভাষায় যাকে বলা হয় উন্নয়নশীল দেশ। নিজেদের মধ্যে নানা বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই সার্ক গঠন করা হয়েছে।
প্রাচীনকালে থেকে সার্ক অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন কৃষি। অনেকের মতে, প্রাগৈতিহাসিককাল থেকেই দক্ষিণ এশিয়ায় কৃষির গোড়াপত্তন হয়েছে এবং তা ক্রমান্বয়ে বিকশিত হয়েছে। প্রাচীনকালে এ অঞ্চলে উৎপন্ন কৃষিপণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ধান, পাট, মরিচ, হলুদ, আদা, রসুন, তুলা, রেশম, আখ, পান, সুপারি ও বিভিন্ন ফলমূল। মধ্যযুগেও কৃষিপণ্য উৎপাদনের এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন লক্ষণীয় মাত্রায় বাড়ায় গত কয়েক বছরে বেসরকারি খাত বীজ, সেচসহ যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও বিপণনে নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। আবার প্রযুক্তি প্রয়োগযোগ্য পর্যাপ্ত জমি না থাকায় অনেক দেশ তা পারছে না। সার্কভুক্ত দেশগুলো এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ইফপি) এক গবেষণা বলছে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এই সমস্যা আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।
সার্কভুক্ত দেশের মধ্যে আবাদযোগ্য ৭৬ শতাংশ জমিতেই প্রযুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব। অথচ এখনো এসব জমিতে প্রযুক্তির যথাযোগ্য ব্যবহার করা যায়নি। এখানে একদিকে অনেক সময় প্রযুক্তির অপব্যবহার হচ্ছে, অন্যদিকে পুরনো প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। ফলে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত কৃষিপণ্য উৎপাদনে সম্ভাবনা থাকলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যে টেকসই নিরাপত্তা অর্জন করতে হলে এ খাতে প্রযুক্তির জুতসই ব্যবহার জরুরি। তারা বেসরকারি খাতের মাধ্যমে উদ্ভাবিত জাতগুলো সরকারিভাবে কৃষকের কাছে প্রদর্শনের ব্যবস্থার চিন্তা করছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মাধ্যমে উপযুক্ত প্রযুক্তিটি কৃষকের কাছে পৌঁেছ দিতে ও চেষ্টা করছে।
সার্ক অঞ্চলটি যুগ যুগ ধরে শিল্প খাতে রয়ে গেছে অনুন্নত। ইংরেজ আমলে শিল্প খাতে যেটুকু অগ্রগতি হয়েছিল, তা ছিল হালকা শিল্প খাত। বৃহৎ/বড় মাঝারি শিল্প স্থাপনে এগিয়ে আসে নাই। বিশেষ করে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় গ্যাসভিত্তিক ইউরিয়া সার কারখানা, সিরামিক শিল্প, ওষুধ শিল্প, তৈরি পোশাক শিল্প, অটো অ্যাসম্বলি শিল্প ইত্যাদি গড়ে উঠতে পারছিল না। সময় এসেছে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিগুলোর সমন্বয় করার। রফতানির কথা বিবেচনা করে বিনিময় হারে বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার। সার্ক দেশগুলোর উচিত আস্থার ঘাটতিকে ন্যূনতম স্তরে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার স্বার্থে রাজনৈতিক পার্থক্যকে দূরে সরিয়ে রাখা। সব সদস্য দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করতে হলে পল্লী অঞ্চলে শিল্প, কারখানা নির্মাণ প্রয়োজন।
এসমস্ত দেশে কর্মসংস্থান হতাশাজনক বেকারের হার বাড়ছেই। পল্লী উন্নয়নের একটি প্রধান শর্ত হচ্ছে কর্মসংস্থান। আর এই কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন দেশে শিল্পায়ন অর্থনৈতিক কর্মকা- বৃদ্ধি। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন কর্মমুখী শিক্ষাতেই এর সমাধান। উচ্চ শিক্ষিতরা বেশি বেকার-এমন তথ্য উৎসাহব্যঞ্জক নয়। কিন্তু বাস্তবে সেটিই আছে। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী বেকারত্বের হার ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় উত্তীর্ণ ১০ দশমিক ১ শতাংশ, উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ ৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং মাধ্যমিক উত্তীর্ণ ১০ দশমিক ৭ শতাংশ বেকার। পক্ষান্তরে ডিপ্লোমা পাস করা যুবকদের মধ্যে বেকারের হার ১ দশমিক ৫ শতাংশ।
বর্তমান সময়ের সার্কভুক্ত দেশগুলোতে বিশেষ করে পাকিস্তান, আফগানিস্তানে সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদ উন্নয়নের গতিপথকে বিঘিœত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। তবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অশুভ শক্তিকে মোকাবেলা করা অসম্ভব নয়। সার্কভুক্ত দেশের সব শ্রেণির মানুষের সার্বিক সহযোগিতায় এ ধরনের সহিংস কার্যকলাপ নির্মূল করতে বেশি সময় লাগার কথা নয়। বর্তমান পরিস্থিতি সেই সম্ভাবনারই দিক নির্দেশ করে। সমাজ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে এদের দায়িত্ব পালন করে যায় তাহলে সমস্যা খুব বেশি মাথা চাঁড়া দিতে পারে না। নতুন প্রজন্মের অসামাজিক কার্যকলাপে দেশ ও জাতির উদ্বেগ খাটো করে দেখার বিষয় নয়। সন্তানদের কর্মক্ষম করার জন্য ডিপ্লোমা শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে হবে।
বিশ্ব চিকিৎসাব্যবস্থার যখন জয়োৎসব চলছে তখনও সেকেলে ঝাড়ফুঁকে আর হাতুড়ে চিকিৎসার আবেদন এতটুকুও কমেনি। অদ্ভুত উটের পিঠেই দেদারসে চলছে সার্ক অঞ্চলে বিশেষ থেরাপি। সার্ক অঞ্চলে মৃত শিশু জন্মের হারও উদ্বেগজনক। প্রতি ১ হাজার শিশু জন্মের ঘটনায় মৃত শিশু জন্ম নিচ্ছে ২৫টি। এছাড়া অনেক মা প্রসূতিপূর্ব সেবা পাচ্ছেন না। কে ঝুঁকিপূর্ণ মা তা মাঠপর্যায়ে শনাক্ত হচ্ছে না। এসব কারণে মৃত শিশু জন্ম দেয়ার ঘটনা এড়ানো যাচ্ছে না। গ্রামে ডিপ্লোমা নার্স, মিডিওয়াইফ মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে এই সংখ্যা হ্রাস করা সম্ভব।
সার্কভুক্ত দেশগুলোতে গ্রামাঞ্চলে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। গ্রামীণ পরিবহণ ব্যবস্থা ও অনুন্নত। নৌ, সড়ক যানবাহন পরিচালনায় দক্ষ শ্রমশক্তি হিসাবে ডিপ্লোমা শিক্ষাতে জোর দিতে হবে। আমরা চাই, আমাদের এ অঞ্চলের দেশগুলো থেকে বিশ্বব্যাংক, আইএফএফর মতো প্রতিষ্ঠান দ্রুত বিদায় নিক; কিন্তু তার আগে প্রয়োজন সার্কভুক্ত গ্রামের মানুষের দিনমান উন্নয়নে ডিপ্লোমা শিক্ষার প্রসার। তাতে আমাদের এ অঞ্চলের মানুষকে চ্যালেঞ্জ করতে শেখাবে, যা ২০০ কোটি মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে বিনিয়োগ করবে; আমরা আমাদের মুনাফা এসব দেশের মধ্যেই মানবকল্যাণে ব্যয় করতে পারবো।
পৃথিবীর সব দেশের জন্য মানবসম্পদের মূল ভান্ডার দক্ষিণ এশিয়া সঠিক পরিকল্পনায় দক্ষ মানবসম্পদ গঠন করতে পারলে পুরো পৃথিবীর অর্থনীতির সিংহভাগ দক্ষিণ এশিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। এখন প্রয়োজন সব দ্বিধা ভুলে সার্ক দেশগুলোর মধ্যে নূন্যতম মতৈক্যের ভিত্তিতে দ্রুতই পল্লী অঞ্চলে ডিপ্লোমা শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো।
এ অঞ্চলে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মানুষের মধ্যে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, কারিগরি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আদানপ্রদান ও যোগাযোগ সহজ করাই কিন্তু সার্কের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। ঔপনিবেশিক শাসনের দায় থেকে মুক্তি পেতে হলে শুধু বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে প্রাপ্ত সাহায্যের ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না। কারণ সেই সমস্ত সাহায্যের পেছনে থাকে নানা ধরনের শর্ত। এ শর্তগুলো সাহায্যের কার্যকারিতাকে বহুলাংশে নষ্ট করে দিচ্ছে। তাই বহুদেশ সাহায্য গ্রহণে বিশেষভাবে আগ্রহী নয়। অথচ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রকে যদি বাড়িয়ে তোলা যায় তাহলে সেই সহযোগিতা অনেকটা বিদেশি সাহায্যের বিকল্প হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষাপটে সার্কের প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় অর্থনৈতিক উন্নতি, সামাজিক প্রগতি সাংস্কৃতিক বিকাশকে ত্বরান্বিত করা।
সার্ক দক্ষিণ এশিয়ায় তার লক্ষ্য অর্জনে এখনো আশানুরূপ ফল লাভ করতে পারেনি। এর সহযোগিতা কেবল আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ। মূল ক্ষেত্রে পল্লীতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র বিমোচন এখনও সার্ক তার সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে পারেনি। দারিদ্র বিমোচনের কথা সার্কের প্রথম দিনই বলা হয়েছিল। কিন্তু এখনও এই অঞ্চলের প্রায় ৪৬% মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। গবেষণা, প্রকাশনা, শিক্ষা প্রশিক্ষণ প্রযুক্তির যাবতীয় কাজকর্ম শহরের মধ্যে আবদ্ধ করে না রেখে পল্লী পর্যায়েও নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা যাতে বৃদ্ধি পায় সেদিকে নজর দিতে হবে।
গ্রামীণ বেকার সমস্যা সমাধান করতে কৃষি ও অকৃষিগত ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রয়োজন। কৃষিক্ষেত্রে সেচ ব্যবস্থার উন্নতি, বহু ফসলি চাষাবাদ এবং কৃষিভিত্তিক নানা কাজকর্ম যেমন- গবাদি পশু পালন, বনসৃজন, হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য চাষ প্রভৃতি গ্রামীণ ক্ষেত্রে নতুন নতুন কর্ম সৃষ্টিতে বিরাট ক্ষমতা আছে। অকৃষিক্ষেত্রে গ্রামীণ রাস্তাঘাট নির্মাণ, গ্রামীণ গৃহ নির্মাণ, পুকুর সংস্কার, খাল সংস্কার, কুটির শিল্পের বিকাশ, ছোট-খাটো ব্যবসায়-বাণিজ্য প্রভৃতি গ্রামীণ ক্ষেত্রে নতুন নতুন কাজের যথেষ্ট সুযোগ সার্কভুক্ত দেশের মাধ্যমেও সৃষ্টি করতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (ILO) তথ্য মতে মোট শিক্ষিত ৯ শতাংশ ডিপ্লোমা শিক্ষা হলে আড়াই কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়। সে হিসাবে ৭ শতাংশ বৃদ্ধি হলে বছরে ১৭ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়। দুই বছরে সৃষ্টি হবে সার্কদেশসমূহে কোটি মানুষের কর্মসংস্থান। এবারের ২য় বিশ্ব ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস ২০১৭ (2nd World Diploma Education Day 2017) এর স্লোগান ‘পল্লী উন্নয়নে বিভাগীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড’ (Rural Development for Divisional Diploma Education Board) নির্ধারণের সুফল সার্ক অঞ্চল পল্লীর ২০০ কোটি জনগণ ভোগ করবে। সার্ক অঞ্চলে উন্নয়ন সমৃদ্ধির গতিকে বেগবান করবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ