ঢাকা, শনিবার 30 June 2018, ১৬ আষাঢ় ১৪২৫, ১৫ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কলেজ অনুমোদন নীতি বেকারত্বের জন্য দায়ী

খনরঞ্জন রায় : ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ক্ষুদ্র বাংলাদেশ। জনসংখ্যা ১৬ কোটি। হাজার সমস্যা জর্জরিত সোনার বাংলা, বন্যা, খরা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, ভূমিধসের মত যত না সমস্যা তার চেয়ে বেশি মানবসৃষ্ট। ব্যাংক জালিয়াতি, সড়ক দুর্ঘটনা, ভবনধস, বিদ্যুৎ, গ্যাস চুরি, ধর্ষণ, ঘুষ, মাদক, রোহিঙ্গা শরণার্থীর কারণে বাঙালি সংস্কৃতি প্রায় ধ্বংসের পথে। এরপর শিক্ষা, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যে ধস নেমেছে এবং এভাবে চলতে থাকলে কয়েক প্রজন্মকে এর এমন শিকার হতে হবে যে সেখান থেকে বের হওয়া দুরূহ হবে। ইতোমধ্যেই এর ছাপ ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে আমাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অঙ্গনে। বছরে ১ কোটি লোকের বিদেশে চিকিৎসা, ৩৫ লাখ বিচারাধীন জটে মামলা, ৩ কোটি কর্মক্ষম তরুণ বেকার। জীবনযাত্রার দৃষ্টিকোণ থেকে একেক তরুণের সমস্যা গুরুত্বে রয়েছে ভিন্নতা। থার্মোমিটারের পারদের মত উঠানামা করে। তবে সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সব সমস্যার মূলে বেকারত্ব। গত ২৯ ডিসেম্বর ২০১৭ শুক্রবার ৩৮ তম বিসিএসের যে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা হয়েছে, তাতে অংশ নিয়েছে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫৩২ জন। ৩৭ তম বিসিএসের প্রিলিমিনারিতে পরীক্ষা দিয়েছিল ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৬ জন। এ থেকে ধারণা করা কঠিন নয় যে চাকরিপ্রার্থীদের সংখ্যা উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। ৩৬ তম বিসিএসের পরীক্ষার্থীদের মধ্য থেকে চূড়ান্তভাবে ৫ হাজার ২৩১ জন উত্তীর্ণ হলেও বিভিন্ন ক্যাডারে ২ হাজার ৩২৩ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। অপেক্ষমাণ রয়েছে ৩ হাজার ৩০৮ জন।
একটি দেশে বেকারত্বের মাত্রা কেমন, তা নিরূপণ করা যায় চাকরির পরীক্ষা কিংবা শূন্যপদের বিপরীতে আবেদনের সংখ্যা দিয়ে। এক বছরের ব্যবধানে এক লাখ পরীক্ষার্থী বেড়ে যাওয়া থেকে অনুমান করা কঠিন নয় যে আমরা বেকারত্বের এক জ্বলন্ত চুল্লিতে বসে আছি। কযেক বছর ধরে নিয়মিত বিসিএস পরীক্ষা হচ্ছে। কিন্তু প্রতি বছর ২০ থকে ২২ লাখ তরুণ যে শ্রমবাজারে আসছেন, তাঁদের কজন চাকরি পাচ্ছেন? এক-তৃতীয়াংশেরও কম। বাকিরা হয় বেকার, না হয় ছদ্মবেকার। অনেকে এমন কাজও করেন, যা তাঁদের লেখাপড়া কিংবা যোগ্যতা ও মেধার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপমানকরও।
সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অনশন করেছিলেন তাঁদের পদোন্নতির জন্য। বিসিএস পরীক্ষা দিয়েই নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ পাওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকেরা ১১তম গ্রেডে বেতন পান। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চতর সব শিক্ষক নিয়োগ কর্মকমিশনের মাধ্যমে হওয়া উচিত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রাথমিক থেকে কলেজ পর্যায়ে একই পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। উত্তীর্ণ শিক্ষকদের বিকল্প বেছে নিতে বলা হয় তাঁরা কোন স্তরে যাবেন। বেতন-ভাতা সব স্তরেই সমান। আমাদের শিক্ষাব্রতী সরকার এ রকম একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারলে শিক্ষায় দুর্নীতি ও অধোগতি দুটোর হাত থেকে জাতি রেহাই পেত।
বিসিএস-এ একটি পদের বিপরীতে যখন প্রায় ৭০ জন পরীক্ষা দিয়ে থাকেন, তখন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে চাকরিপ্রার্থীদের ভিড়টা সহজেই অনুমান করা যায়। বিশ্বব্যাংক মনে করে, বাংলাদেশে বেকারত্বের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। তাদের মতে, বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের তালিকার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। আইএলওর দেয়া মানদন্ড- অনুযায়ী সপ্তাহে এক ঘন্টা কাজ না করলে ওই ব্যক্তিকে বেকার ধরা হয়। কিন্তু সপ্তাহে এক ঘন্টার কাজ করে বাংলাদেশে যে মজুরি পাওয়া যায়, তা দিয়ে অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটানো দূরে থাক, দুবেলা অন্নসংস্থানও হয় না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুারোর (বিবিএস) প্রতিবেদনে দেখা যায় যে বাংলাদেশে পড়াশোনা করলে কাজ পাওয়ার সুযোগ বেশি। কোনো ধরনের শিক্ষার সুযোগ পাননি, এমন মানুষের মধ্যে মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ বেকার। তুলনায় উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ৯ শতাংশ। কোনো কোনে ক্ষেত্রে আরও বেশি। বিবিএসের হিসাবে ১৫ বছরের উর্ধ্বে অর্থনৈতিকভাবে কর্মক্ষম শ্রমশক্তি ৬ কোটি ৭ লাখ। এ শ্রমশক্তির মধ্যে ৫ কোটি ৮০ লাখ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। পরিবারের মধ্যে কাজ করেন কিন্তু কোনো মজুরি পান না, এমন মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ১১ লাখ। এছাড়া আছেন আরও ১ কোটি ৬ লাখ দিনমজুর, যাদের কাজের নিশ্চয়তা নেই।
সরকারি হিসাবেই বাংলাদেশে তরুণ বেকারের হার সবচেয়ে বেশিথ ১০ দশমিক ৪ ভাগ। তাঁদের মধ্যে নারীদের হার বেশি ১৫ শতাংশ। মাধ্যমিক পাস করাদের বেকারত্বের হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিক পাস ৬ দশমিক ২ শতাংশ যুবক বেকার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষিত ১০০ জন মানুষের মধ্যে ৪৭ জন কাজের সুযোগ পান না। এটি হলো মুদ্রার এক পিঠ। অপর পিঠ হলো বাংলাদেশের শিল্পকারখানা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এমনকি হাসপাতাল পরিচালনার জন্যও বিদেশ থেকে বেশি মজুরি দিয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী আমদানি করতে হচ্ছে।
একজন ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন বর্তমান যেসব ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের চাহিদা সৃষ্টি হচ্ছে, সে অনুযায়ী ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীরা আসছেন না। পেশা ও পণ্যভিত্তিক ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী লোক বাজারে অনেক কম। শিক্ষাবিহীন যারা আছেন, তাঁদের চাকরি দিলে লেখাপড়ার মতো গোড়া থেকে শিখিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশে যে মানের শিক্ষিত লোকবল তৈরি করা হচ্ছে, তার উৎকৃষ্ট অংশ চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। আর যারা দেশে থাকছেন তাঁদের বেশির ভাগ গড়পড়তা মানের এবং বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের জ্ঞান তাঁদের কম। ফলে বেসরকারি খাতে মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতি বছর ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রচুর জনশক্তি আমদানি করতে হচ্ছে।
আমাদের শিক্ষা ও চাকরির বাজার চলছে বিপরীত ধারায়। প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় এসে একেকটি শিক্ষানীতি করে, কিন্তু দেশের ভেতরে বা বাইরে কী ধরনের শিক্ষার কী পরিমাণ চাহিদা আছে, তা নিরূপণ করে শিক্ষাব্যবস্থাটা ঢেলে সাজানোর কাজটি কেউ করলেন না। গরিব ও বেকারদের অনেকেই মনে করেন যে তাঁদের উদ্যোগ ও উদ্যমের ঘাটতির কারণেই তাঁদের এই পরিণতি। অর্থাৎ প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে যাঁরা পিছিয়ে পড়ছেন, তাঁরা পরাজিত হওয়ার তকমা পাচ্ছেন। এই পরাজিত মানুষদের জীবনে কী দুর্যোগ নেমে আসে, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের কোনো কোনো দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক মতপ্রকাশ করতে থাকেন যে, পাশ্চাত্য সভ্যতা গভীর সংকটে নিমজ্জিত। স্পেংলারের Decline of the West, সুইটজারের The Decay and Restoration of Civilization, ক্লাইভ বেলের Civilization প্রভৃতি আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থে শিক্ষা সভ্যতা সংস্কৃতি বিন্যাস পুনঃবিন্যাসের প্রয়োজন উপলব্ধি করেন।
বিশ্বযুদ্ধের পূর্বের চিন্তা চেতনা থেকে বিশ্বযুদ্ধ উত্তর চিন্তা চেতনা বহুলাংশে অগ্রগামী হয়। শিক্ষা ও শিক্ষা যুগ পরিবর্তন করে ‘পড় উপার্জন কর (Earning & Learning) নীতি গ্রহণ করে। এখানে ডিপ্লোমা শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরেই ডিপ্লোমাকে সংযোগ ঘটিয়েছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি কঠোর করে বিধি বিধান আইন প্রণয়ন করেছে। আমাদের ক্ষেত্রে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ব্রিটিশদের বিচ্ছিন্ন মতাদর্শকে গ্রহণ করে। ডিপ্লোমা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণের যে ইস্ট বেঙ্গলের স্থলে পূর্ব পাকিস্তান শব্দ সংযুক্ত করে কিছু কালাকানুন প্রবর্তন করে। শিক্ষাকে অর্জনমুখী করে ফেলে। কর্মসংস্থানমুখী নয় অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম এই কারণেও ১৯৭১ সালে এই ভূখন্ডে- জগৎ কাঁপানো যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। একটি লাল সবুজ পতাকা অর্জন করতে ৩০ লাখ লোক শহীদ হয়। ৩ লাখ মা-বোনের ইজ্জতহানি ঘটে। বাংলার খাল-বিল-নদী-নালা, সাগরের পানি রক্তে একাকার হয়ে যায়। এত ত্যাগের পরও স্বাধীন দেশের নীতি নির্ধারকদের ডিপ্লোমা শিক্ষার ক্ষেত্রে মন মানসিকতা পরিবর্তন ঘটেনি।
সাবেক নীতি অনুসরণ করে ডিপ্লোমা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ পূর্ব পাকিস্তানের স্থানে শুধুমাত্র বাংলাদেশ শব্দ সংযোজন ঘটায়। এতে শিক্ষা ক্ষেত্রে মৌলিক কোন পরিবর্তন হয়নি বরং গণহারে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়ে সার্টিফিকেট অর্জননির্ভর শিক্ষাকে প্রেরণা যুগাচ্ছে। এদিকে মাধ্যমিক ও শিক্ষা বোর্ড তাদের বংশবৃদ্ধি ব্যাপকহারে করতে থাকে। ইতিমধ্যে দশগুণ বৃদ্ধি করেছে। তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড প্রতিদিনই নতুন নতুন কলেজের অনুমোদন ও আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করে যাচ্ছে। বর্তমানে কলেজগুলোতে ১৫ লক্ষ আসন সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে ইস্ট-পাকিস্তানের গড়া কর্মসংস্থানমুখী ডিপ্লোমা শিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করছে। তা না হলে এতো বাজেট খরচের পরও সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে সারা দেশে মাত্র ১ লাখ শিক্ষার্থীকে ডিপ্লোমাতে ভর্তির সুযোগ দিচ্ছে। দেখা গেছে এসএসসি পাস ৩ জন তরুণ ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট ভর্তি হলে ৯৭ জন ভর্তি হয় উচ্চ মাধ্যমিকে। তারাই থাকে দিকনির্দেশনাহীন।
তর্জন গর্জন যতই করা হোক কর্মসংস্থানমুখী ডিপ্লোমা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণ পরিচালন ক্ষেত্রকে আলাদা করতেই হবে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে স্বাধীন, স্বতন্ত্র ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড। তা না হলে এই শিক্ষায় গতি আসবে না। ইঙ্গ পাকিদের প্রেতাত্মার জ্বালা বহন করতেই থাকবো। যেমনটা করে আমরা বড় সার্টিফিকেটধারীর অর্ধেকাংশ বেকারত্বকে নিয়তি হিসাবে গ্রহণ করেছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ