ঢাকা, রোববার 1 July 2018, ১৭ আষাঢ় ১৪২৫, ১৬ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কোটা সংস্কার আন্দোলনদের ওপর ছাত্রলীগের নৃশংস হামলা

গতকাল শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নেয়ার সময় কোটা সংস্কার আন্দোলনের সাথে যুক্ত নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দফায় দফায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল শনিবার সকাল পৌনে ১১টা থেকে হামলা শুরু হয়। থেমে থেমে দেড়টা পর্যন্ত কোটা আন্দোলনের সামনের দিকের নেতাদের ধরে ধরে মারধরের খবর পাওয়া যায়। ঢাবি সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে এবং শাহবাগে পাবলিক লাইব্রেরির সামনে কোটা আন্দোলনের নেতাদের ওপর এসব হামলার ঘটনা ঘটে। দুপুর পর্যন্ত দুই যুগ্ম-আহ্বায়কসহ আহত সাত জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, ছাত্রলীগ এ হামলা চালিয়েছে। তাঁদের এক নেতাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে তুলে নিয়ে ছাত্রলীগ অজ্ঞাত স্থানে রেখেছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা। হামলার প্রতিবাদে আজ রোববার থেকে দেশের সব কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সারা দেশে অবরোধ কর্মসূচিও পালন করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান।
কোটা বাতিল বলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রায় তিন মাস পার হলেও প্রজ্ঞাপন জারির কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় নতুন করে আন্দোলনের প্রস্তুতির জন্য গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সাংবাদিক সম্মেলন ডাকে আন্দোলনকারীরা। তবে সাংবাদিক সম্মেলন শুরুর আগেই তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
এ হামলার জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করেছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা। আন্দোলনকারীদের যুগ্ম-আহ্বায়ক রাশেদ খান বলেন, আন্দোলনকারী অনেকের ওপর হামলা করেছে ছাত্রলীগ। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। নুরের অবস্থা আশংকাজনক। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে ছাত্রলীগ। তাদের দাবি, কোটা নিয়ে আন্দোলনকারীদের অন্তর্কলহের জের ধরে এই হামলার ঘটনা ঘটেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সাংবাদিক সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। তবে তার আগেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সেখানে অবস্থান নেয়। সাংবাদিক সম্মেলনের জন্য কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের একটি দল কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে আসার পর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। নুরকে ঘিরে ধরে মারধর করা হয়। এ সময় ‘ওরে মেরে ফেল’, ‘কলিজা কাট’ ইত্যাদি উক্তি করে তাকে লাথি, ঘুষি, চড়-থাপ্পড় দিতে থাকে হামলা কারীরা। এক পর্যায় নুর মাটিতে পড়ে গেলে শোয়া অবস্থায় তাকে লাথি মারতে থাকে তারা। এরপর লাইব্রেরির বাহিরে টেনে নিয়ে এসে আবারও তাকে মারধর করা হয়। এ সময় তার নাক-মুখ ফেটে রক্ত বের হতে দেখা যায়। পরে শিক্ষকরা তাকে উদ্ধার করে লাইব্রেরির ভেতরে নিয়ে যান। এ সময় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক এস এম জাবেদ আহমেদও হামলাকারীদের হাতে লাঞ্ছিত হন।
আন্দোলনরত মাসুদুল হোসেন বলেন, পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী বেলা ১১টার দিকে কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপনের দাবিতে ঢাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সাংবাদিক সম্মেলন করার কথা ছিল। কিন্তু, সকাল নয়টা থেকেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আশপাশে অবস্থান নিয়ে ছিল। তিনি বলেন, সাড়ে ১০টার দিকে যখন কোটা আন্দোলনে সম্পৃক্ত নেতাকর্মীরা গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হন, তখন ওরাও আস্তে আস্তে আমাদের ঘিরে ফেলতে শুরু করে। আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতারা আসার পরই তারা অস্ত্র নিয়ে হামলা করে।
এ সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নুরুল হক নুর, রাশেদ খান, মো. আতাউল্লাহ, ফারুক খানসহ কোটা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতাদের বেধড়ক মারধর করে। এ সময় তারা বলতে থাকে, ‘আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়া, নয়তো দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেব, কোনো বাপ তোদের বাঁচাতে পারবে না।’
এক পর্যায়ে নুরুল হকের মাথায় রড দিয়ে আঘাত করলে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। মুখ দিয়ে ফেনা বের হয়ে আসে। ওই ঘটনায় ৩০/৩৫ জন আহত হলেও গুরুতর আহত ৭ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বলে জানান মাসুদুল। ঢামেকে ভর্তি আহতরা হলেন নুরুল হক, সাদ্দাম হোসেন, মো. আতাউল্লাহ, মাসুম, আব্দুল্লাহ, হায়দার ও সাহেদ।
মাসুদুল বলেন, নুরের মাথার সিটিস্ক্যান করতে পাঠানো হয়েছে। আমার আপন ছোট ভাই আতাউল্লাহর ঠোট ফেটে গেছে, মাথায় বুকে আঘাত লেগেছে। তাকে ঢামেকে ১০১ নং কেবিনের ১১ নম্বর বেডে ভর্তি করা হয়েছে।
সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক রাশেদ খান বলেন, গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হল থেকে পরিষদের আরেক যুগ্ম-আহ্বায়ক মশিউর রহমানকে ছাত্রলীগের কয়েকজন তুলে নিয়ে গেছেন। তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে রাখা হয়েছে।
রাশেদ খান বলেন, বেলা ১১টার দিকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আমাদের ওপর পিস্তল ও রামদা নিয়ে হামলা চালায়। আমরা তাদের কাছে এটা প্রত্যাশা করিনি।
ঢাবির অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র আমির আব্দুল্লাহ বলেন, আমি লাইব্রেরিতে পড়তে আসছিলাম। বাইরে বের হতেই আমাকে নৃশংসভাবে পেটানো হয়েছে।
বেলা ১২টার দিকে আবার ছাত্রদের ওপর হামলা চালানো হয়। ঢাবি’র বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মো. আরশকে মাটিতে ফেলা লাথি ও মারধর করতে দেখা যায়। দুপুর পৌনে ১টার দিকে লাইব্রেরির সামনে একটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়।
বেলা দেড়টার দিকে পাবলিক লাইব্রেরির ভেতর থেকে ধরে এনে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক জসিমকে মারধর করা হয়েছে। জসিমকে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করার পর পুলিশের গাড়িতে করে ঢামেকে নেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানান, পাবলিক লাইব্রেরির ভেতর থেকে পাঁচ জন ছাত্রকে ডেকে বাইরে নিয়ে মারধর করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, সাংবাদিক সম্মেলনের উদ্দেশ্যে সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে আমরা গ্রন্থাগারের সামনে আসি। আমরা দাঁড়ানোর কিছুক্ষণের মধ্যে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। এতে আমাদের অন্তত পাঁচ জন আহত হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। আহতদের মধ্যে যুগ্ম আহ্বায়ক নূরের অবস্থা গুরুতর।
আন্দোলনকারীদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুনকে আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের একটি কক্ষে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। বেলা ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল মোবাইল টিম গিয়ে গ্রন্থাগারের পেছনের ফটক দিয়ে বের করে গাড়িতে করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।
তবে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রলীগ নেতারা বলেছেন, ছাত্রলীগ কোনও হামলা চালায়নি। ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। আমরা শুনেছি আন্দোলনকারীদের দুই গ্রুপের মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে হামলার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় এখন বন্ধ। ঈদের পর আগামীকাল রবিবার থেকেই খুলবে। ছুটির সময় হলেও লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করতে গিয়েছিল ছাত্ররা। কিন্তু লাইব্রেরির সামনে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনায় লাইব্রেরিতে লেখাপড়ার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। এরা কারা এবং এ ধরনের ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়েছে, আমরা এখনও তাদেরকে চিহ্নিত করতে পারিনি।
এ বিষয়ে পুলিশে রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মারুফ হোসেন সরদার বলেন, বিষয়টি আমরা শুনেছি। কিন্তু আমরা চাইলেই ক্যাম্পাসের ভেতরে যেতে পারি না। এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতারও করা হয়নি।
এদিকে হামলার প্রতিবাদে আজ রোববার থেকে দেশের সব কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। একই সঙ্গে সারা দেশে অবরোধ কর্মসূচিও পালন করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীদের যুগ্ম-আহ্বায়ক রাশেদ খান। গতকাল শনিবার বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানায় আন্দোলনরতরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কারণে আজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন হবে না।
কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোটা নিয়ে যখন এতকিছু, তখন কোটাই থাকবে না। কোনও কোটারই দরকার নেই। যারা প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তাদের আমরা অন্যভাবে চাকরির ব্যবস্থা করে দেব।’ কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য অনুযায়ী কোটা নিয়ে কোনো আদেশ জারি করা না হলে ফের স্বোচ্চার হন শিক্ষার্থীরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ