ঢাকা, রোববার 1 July 2018, ১৭ আষাঢ় ১৪২৫, ১৬ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চলতি সপ্তাহেই চার্জর্শিট ॥ অভিযুক্ত ৮ জনের মধ্যে দু‘জন অধরা

হলি আর্টিজান হামলার দুই বছর

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে রাজধানীর কূটনীতিক পাড়া গুলশানের হলি আর্টিজান  বেকারিতে হামলা চালিয়ে ১৭ বিদেশীসহ ২০ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। তাদের ঠেকাতে গিয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তাও নিহত হন। রাতভর উৎকণ্ঠার পর ২ জুলাই সকালে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে সঙ্কটের অবসান ঘটে। হামলায় অংশ নেওয়া নব্য জেএমবির পাঁচ জঙ্গি ওই অভিযানে নিহত হয়। সে সাথে নিবরাজ ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জল নিহত হয়েছিলেন হামলার দ্বিতীয় দিন সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে।
আর পরে জঙ্গিবিরোধী বিভিন্ন অভিযানে হামলার ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ তামিম চৌধুরী, জাহিদুল ইসলাম, তানভীর কাদেরী, নুরুল ইসলাম মারজান, আবু রায়হান তারেক, সারোয়ার জাহান, বাসারুজ্জামান চকলেট ও ছোট মিজান নিহত হন। গ্রেপ্তার আছেন রাজীব গান্ধী, বড় মিজান, রফিকুল ইসলাম রিগ্যান, সোহেল মাহফুজ, রাশেদুল ইসলাম ওরফে র‌্যাশ ও হাদিসুর রহমান সাগর।
 দেশবিদেশের বহুল আলোচিত দুর্ধর্ষ জঙ্গী হামলার অন্যতম সেই হৃদয়বিদারক ঘটনার দিনটি আজ। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় আজো কাঁদে তাদের স্বজনরা।দিনটি স্মরণে দেশবিদেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধর্মানুসারে আয়োজন করা হয়েছে স্মরণ সভাসহ নানা আনুষ্ঠানিকতার।
দুই বছর আগে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলায় জড়িত ২১ জনকে চিহ্নিত করার পর চলতি সপ্তাহেই আটজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট(অভিযোগপত্র) দিতে যাচ্ছে পুলিশ। ‘চিহ্নিত’ বাকি ১৩ জন নজিরবিহীন ওই হামলার পর বিভিন্ন অভিযানে নিহত হন বলে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন।
ওই হামলার দুই বছর পূর্তির আগের দিন গতকাল শনিবার জানতে চাইলে তদন্ত সংস্থার প্রধান মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকের বলেন, “বাস্তবায়ন, প্রস্তুতি এবং সর্বশেষ হামলা পর্যন্ত আমরা মোট ২১ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছি। এই ২১ জনের ভেতরে বিভিন্ন অভিযানে ১৩ জন নিহত হয়েছে। “বাকি আটজনের বিরুদ্ধে আমরা পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছি। যার মধ্যে দুজন পলাতক রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আমরা চার্জশিট দিতে যাচ্ছি।”
কবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে মনিরুল সঠিকভাবে কিছু না বললেও গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান মিয়া আগামী এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়ার কথা বলেছিলেন। সেমতে চলতি সপ্তাহেই চার্জশিট প্রদান করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী শহীদুল ইসলাম খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন নামে দুজন এখনও পলাতক রয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘটনার সময় গ্রেপ্তার নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমের ওই ঘটনায় সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।
এবিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে মনিরুল বলেন, “আমরা এখনও চার্জশিট আদালতে জমা দেইনি। জমা দেওয়ার পর বিস্তারিত জানতে পারবেন।”
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, চিহ্নিত ২১ জনের মধ্যে পাঁচজন গুলশান হামলায় সরাসরি অংশ নেন। বাকিরা হামলার পরিকল্পনা, সমন্বয়, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র-বোমা সংগ্রহসহ বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত ছিলেন।
গত বছর মনিরুল বলেছিলেন, হামলার মূল পরিকল্পনাকারী (মাস্টারমাইন্ড) তামিম চৌধুরী, মূল প্রশিক্ষক (মাস্টার ট্রেইনার) মেজর জাহিদ কিংবা তানভির কাদেরি, নুরুল ইসলাম মারজান ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসামী।
পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গুলশান হামলার জন্য বগুড়ার দুই জঙ্গিকে নিয়োগ করেন রাজীব আর বসুন্ধরায় বাসা ভাড়া ও জঙ্গিদের উদ্ধুদ্ধও করেন তিনি। সাগর সীমান্তের ওপার থকে আসা অস্ত্র ঢাকায় মারজানের কাছে পৌঁছান। বাশারুজ্জামান মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ থেকে দুই দফা হুন্ডির মাধ্যমে আসা ২০ লাখ টাকা গ্রহণ করেন এবং সেই টাকা গুলশান হামলায় ব্যবহৃত হয়।

সেই বাড়িটি এখনও সুনসান
ভয়াবহ জঙ্গি হামলার সাক্ষী গুলশানের যে বাড়িতে হলি আর্টিজান বেকারি ছিল, সেখানে এখনও সুনসান নীরবতা। গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়িটিতে বাইরে থেকে তালা ঝোলে অধিকাংশ সময়। ভবন মালিক নিজে থাকতে বাড়িটি বসবাস উপযোগী করলেও নিয়মিত থাকেন না। লেকের ধারের এই বাড়িতে ছিল হলি আর্টিজান বেকারি; যেখানে ২০১৬ সালের ১ জুলাই জঙ্গি হামলার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শোর ফেলেছিল। কমান্ডো হামলায় জঙ্গিরা মারা যাওয়ার পর কয়েক মাস আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল বাড়িটি। গত বছর তা বুঝিয়ে দেওয়া হয় মালিককে। তবে ওই বাড়িতে বেকারিটি আর চালু হয়নি।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির প্রবেশ মুখে প্রধান ফটকে নিরাপত্তাকর্মীরা পাহারা দিচ্ছেন। বাড়ির সব দরজা-জানালা বন্ধ।
নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, জঙ্গি হামলার পর বাড়ির দেয়ালের বাইরের অংশে সাদা রঙ করা হলেও দরজা-জানালায় নতুন করে আর রঙ করা হয়নি। আগে বাড়িটির পূর্বপাশে লেকের পাড় দিয়ে হাঁটার পথ থাকলেও হামলার পর সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তা এখনও খোলা হয়নি।
নিরাপত্তাকর্মী মো. হোসেন বলেন, বাড়িটি বসবাসের উপযোগী করা হয়েছে। মালিক সামিরা আহমেদ, তার স্বামী সাদাত মেহেদী ও এক সন্তান মাঝে মধ্যে থাকেন, আবার চলে যান। বাইরের মানুষ সেখানে খুব একটা আসে না।
বাড়ির পুরনো আরেক নিরাপত্তাকর্মী আকতার হোসেন বলেন, “এ বাড়িতে বসবাসের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র উঠানো হয়েছে। মালিক নিজেই সেখানে বসবাস করেন। তবে তিনি (সাদাত মেহেদী) ব্যবসায়িক কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে এখানে বেশি আসেন না। বনানীতে আরেকটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি।”
বাড়িতে গণমাধ্যমকর্মীসহ যে কারও প্রবেশে ‘মালিকের কড়াকড়ি’ রয়েছে বলে জানান পাহারাদার হোসেন।
মেহেদী জানান, বাড়িটি এখন দুজন মালি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তকর্মীরা দেখাশুনা করে থাকে।
সামিরার স্বামী সাদাত ও তার এক বন্ধু মিলে ২০১৪ সালে এ বাড়িতে হলি আর্টিজান বেকারিটি গড়ে তুলেছিলেন।
১৯৭৯ সালে ‘আবাসিক ভবন কাম ক্লিনিক গড়ে তোলার জন্য’ ডা. সুরাইয়া জাবিনকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল বাড়িটি। ১৯৮২ সালে ওই প্লটের একপাশে গড়ে তোলা হয় লেকভিউ ক্লিনিক।
সুরাইয়ার মৃত্যুর পর প্লটের মালিক হন তার মেয়ে সামিরা ও সারা আহমেদ। তাদের দুটি প্লট এক করে উত্তর পাশের দোতলা ভবনটিতে গড়ে তোলা হয় হলি আর্টিজান বেকারি, আর দক্ষিণপাশে ‘ লেকভিউ ক্লিনিক’।
ক্লিনিকটি সচল রয়েছে, সেখানে রোগী ও তাদের স্বজনদের যাতায়াতও চোখে পড়ে।

৩ সন্তান নিয়ে সংগ্রামে সাইফুলের স্ত্রী
হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর কমান্ডো অভিযানে পাঁচ জঙ্গির সঙ্গে নিহত পাচক সাইফুল ইসলাম চৌকিদারের স্ত্রী সংসার চালান সেলাই কাজ করে। এছাড়া তাদের সন্তানের লেখাপড়ার জন্য হলি আর্টিজান কর্তৃপক্ষ প্রতিমাসে কিছু টাকা দেন বলে স্বজনরা জানিয়েছেন।
সাইফুল নিহত হওয়ার তিন মাস পর জন্ম হয় ছেলে হাসানের। তার বয়স এখন ২১ মাস। হাসান এখন বাবা বলতে শিখেছে। সাইফুলের তিন সন্তানের মধ্যে বড় দুজন মেয়ে। এদের মধ্যে সামিয়া (১১) ৫ম শ্রেণিতে এবং ইমলী (৯) তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে স্থানীয় একটি স্কুলে।
হামলাকারীদের সঙ্গে লাশ মেলায় সাইফুলের গায়েও লেগে গিয়েছিল ‘জঙ্গি তকমা’। পরে স্বজনরা তাকে বেকারির পাচক হিসেবে সনাক্ত করলেও লাশ আর ফেরত পায়নি। সরকারের পক্ষ থেকেও মেলেনি কোনো সহায়তা।
তিন শিশু সন্তানকে নিয়ে সাইফুলের স্ত্রী সোনিয়া আকতারের এখন দিন কাটে খেয়ে-না খেয়ে। সন্তানদের ভবিষ্যত চিন্তাতেই অস্থির থাকতে হয় তাকে।
সাইফুলে কথা জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তার স্ত্রী সোনিয়া আকতার। তিনি বলেন, “স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পৌর মেয়র সাটিফিকেট দিলেও সাইফুলের মরদেহটাও আমাদেরকে দেওয়া হয়নি। আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামে বেওয়ারিশ লাশ বলে নিহত জঙ্গিদের সঙ্গে দাফন করা হয়েছে। আমার অবুঝ শিশুটি বড় হয়ে তার বাবার কবরটাও দেখতে পাবে না। এর চাইতে আর দুঃখ কী হতে পারে।” সাইফুল নিহত হওয়ার পর থেকেই তার মা অসুস্থ বলে জানান সোনিয়া।
সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য করা হয়নি উল্লেখ করে সোনিয়া বলেন, “হলি আর্টিজান কর্তৃপক্ষ ছেলে- মেয়ের লেখাপড়ার জন্য মাসিক কিছু টাকা দেয়। বাকি খরচ চালাতে হয় সেলাই মেশিনে কাজ করে এবং পরের উপর নির্ভর করে। আমার দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে কোনোরকম বেঁচে আছি।”
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কলুকাঠি গ্রামের মৃত আবুল হাসেম চৌকিদারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সাইফুল। তার ছোট ভাই বিল্লাল মালয়েশিয়ায় থাকেন। তিন বোনের সবার বিয়ে হয়েছে, থাকেন স্বামীর বাড়িতে।
১০ বছর জার্মানিতে থাকার পরে দেশে ফিরে নিহত হওয়ার দেড় বছর আগে হলি আর্টিজানে পিৎজা তৈরির শেফ হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সাইফুল।
নিহত হওয়ার পর থেকে পুলিশ সাইফুলকে জঙ্গি হিসেবে প্রচার করে। হামলার খবর টেলিভিশনে প্রচার হতে দেখে পরিবারের লোকজন ওই রাতে সাইফুলকে ফোন করে না পেয়েই শুরু করে আহাজারি। পরে স্বজনরা ঢাকায় গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন।
তদন্তকালে সাইফুলের মা সমেরা বেগমকে ছেলের লাশ শনাক্তের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করতে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য ও নড়িয়া থানা থেকে সাইফুলের নামে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুতেই কাজ হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তিন মাস তদন্ত শেষে বেওয়ারিশ হিসেবে সাইফুলের লাশ দাফনের জন্য আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামে হস্তান্তর করে। নিহত জঙ্গিদের সঙ্গেই জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ