ঢাকা, রোববার 1 July 2018, ১৭ আষাঢ় ১৪২৫, ১৬ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শেয়ারবাজারের উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে পারছে না

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : বর্তমান সরকারের সময়ে শেয়ারবাজারের মহাধ্বসের পর বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা এমন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে যে তা কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। শেয়ারবাজারের উন্নয়নে ইতোমধ্যে সরকারের ভাষায় পলিসি সাপোর্ট, আইনগত সংস্কার ও অবকাঠামো নির্মাণসহ নানাবিধ সহযোগিতা দেয়া হয়েছে। তারপরও কোনোভাবেই বাজারের উন্নতি হচ্ছে না। একদিন দাম বাড়ছে তো আবার টানা পতনের কবলে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা জরুরী। অন্যথায় কোনো পদক্ষেপই কাজে আসবে না।    
জানা গেছে, বর্তমান সরকারের সময়ে ২০১০ সালের সর্বশেষ শেয়ারবাজারের ধ্বসের পর বাজারের উন্নয়নে ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশনের কাজ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণীত প্রণোদনার কার্যক্রম চলছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কৌশলগত বিনিয়োগকারীর অন্তর্ভুক্তিও নিশ্চিত করা হয়েছে। সর্বশেষ বিনিয়োগকারী আস্থা ফেরাতে ও কর্ম পরিবেশ উন্নত করার পাশাপাশি কর্মকর্তাদের মনোবল ও কর্মদক্ষতা বাড়াতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নিজস্ব ভবন নির্মাণ সম্পন্ন কার হয়েছে। সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীও শেয়ারবাজার ভালো করার আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রীও শেয়ারবাজার নিয়ে পজেটিভ মন্তব্য করেন। কিন্তু সরকারের আশ্বাস, কর্মকান্ড ও পদক্ষেপে আস্থা রাখতে পারছে না বিনিয়োগকারীরা। পুঁজি হারানোর ভয় এখনো তাদের পিছু ছাড়ছে না। ফলে শেয়ারবাজারের উন্নতি তিমিরেই থেকে যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে কয়েকজন বিনিয়োগকারী জানান, যারা শেয়ার কেলেঙ্কারীর সাথে জড়িত, যারা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পুঁজি লুট করে পথে বসিয়েছে তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারীর হোতারাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা কিভাবে বিশ্বাস করবো যে আমাদের কষ্টার্জিত টাকা আবার লুট হয়ে যাবে না। এ নিশ্চয়তা দেয়ার মতো কেউ নেই। কেননা একবার নয়, দুইবার আমাদের টাকা লুট করা হয়েছে। আর দুইবারই হয়েছে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। এ কারণে অনেক বিনিয়োগকারী বাজারে সক্রিয় হচ্ছে না।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, বাংলাদেশের শেয়ারবাজার বিশ্ব বিনিয়োগের অন্যতম আকর্ষণ এবং গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পুঁজিবাজার সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকার একটি শক্তিশালী শেয়ারবাজার গড়ে তোলার জন্য ধারাবাহিকভাবে পলিসি সাপোর্ট, আইনগত সংস্কার ও অবকাঠামো নির্মাণসহ নানাবিধ সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। শিল্প, অবকাঠামো ও সেবাখাতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারের অবদান দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুঁজিবাজারের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম দূর করে জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নিজস্ব ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে, যা আর্থিক খাত বিকাশের অগ্রগতির নির্দেশক। ফলে কর্ম পরিবেশ উন্নত হবার পাশাপাশি কর্মকর্তাদের মনোবল ও কর্মদক্ষতা বেড়েছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণীত প্রণোদনা প্যাকেজের সফল বাস্তবায়ন অব্যাহত রয়েছে। একটি জ্ঞান-নির্ভর বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ‘বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কেট’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কৌশলগত বিনিয়োগকারীর অন্তর্ভুক্তির নিশ্চিত করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রণীত বিধিমালার আলোকে ইতোমধ্যে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও ইম্প্যাক্ট ফান্ড গঠনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে এবং তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। ফলে পুঁজিবাজার এখন পরিবেশ বান্ধব, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকারের আশব্যঞ্জক বক্তব্য ও পদক্ষেপের পরও শেয়ারবাজারে কোনো উন্নতি হচ্ছে না। একদিন বাড়ছে তো আবার টানা পতনের কবলে পড়ছে। সর্বশেষ বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) পাঁচ কার্যদিবসের তিন দিনই শেয়ারবাজারে বড় দরপতন হয়েছে। এতে ডিএসই বাজার মূলধন হারিয়েছে তিন হাজার কোটি টাকা ওপরে। বাজার মূলধনের পাশাপাশি গত সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স এবং বাছাই করা সূচক ডিএসই-৩০ কমেছে।
গত বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয় তিন লাখ ৮৪ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। যা তার আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ছিল তিন লাখ ৮৭ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক সপ্তাহেই তিন হাজার ৪১ কোটি টাকা বাজার মূলধন হারিয়েছে ডিএসই।
এদিকে গত সপ্তাহজুড়ে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স কমেছে ৩৬ দশমিক ৩০ পয়েন্ট বা দশমিক ৪৩ শতাংশ। অপর দুটি সূচকের মধ্যে গত সপ্তাহে ডিএসই-৩০ কমেছে ২১ দশমিক ৮৬ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে প্রধান সূচক ও বাছাইকৃত সূচক কমলেও ডিএসই শরিয়াহ সূচক গত সপ্তাহে কিছুটা বেড়েছে। গত সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৪২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের মধ্যে আগের সপ্তাহের তুলনায় দাম কমেছে ১৯৬টির, বেড়েছে ১২৬টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২০টির দাম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সরকারের সময়ে দুই দুই বার শেয়ারবাজারে মহাধ্বস নামে। শেয়ার কেলেঙ্কারির ১৯৯৬ সালের ঘটনায় যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল বিনিয়োগকারীদের মনে তা বহুগুণে বৃদ্ধি পায় ২০১০ কেলেঙ্কারির পর। এ দুটি ঘটনায় বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটা অজানা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তারা ধরেই নিয়েছে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে শেয়ারবাজার লুটপাট হয়। এতেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আর বিনিয়োগকারীদের এমন আস্থাহীনতার কারণেই বাজারের এমন নাজুক অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা জরুরী। অন্যথায় কোনো পদক্ষেপই কাজে আসবে না। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ