ঢাকা, রোববার 1 July 2018, ১৭ আষাঢ় ১৪২৫, ১৬ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মিয়ানমার-জাতিসংঘ ‘গোপন চুক্তিতে’ নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা নেই রোহিঙ্গাদের

৩০ জুন, রয়টার্স: বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে পারলেও সেখানকার নাগরিকত্ব কিংবা দেশজুড়ে অবাধ চলাচলের সুযোগ পাবেন কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা ছাড়াই দেশটির সরকারের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ‘গোপন চুক্তি’ করেছে জাতিসংঘ।

 মে’র শেষ দিকে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তির রূপরেখায় দুই পক্ষই বাংলাদেশের আশ্রয়ে থাকা লাখ লাখ রোহিঙ্গার নিরাপদে ও নিজেদের পছন্দ অনুসারে ফেরত যাওয়ার ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছে বলে জানিয়েছে 

জাতিসংঘ কিংবা মিয়ানমার সরকারের কেউই চুক্তির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।

যদিও দুই পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) একটি অনুলিপি হাতে পেয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ফাঁস হওয়া অনুলিপিটি অনলাইনেও ছড়িয়ে পড়েছে।

গোলযোগপূর্ণ রাখাইন অঞ্চলে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রবেশাধিকারে গত বছরের অগাস্ট থেকেই বাধা দিচ্ছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। এ বাধা সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মিয়ানমারে ফেরত যাওয়া শরণার্থীদের অধিকার বিষয়েই দুই পক্ষের মধ্যে মূল আলোচনা হয়েছে বলে সমঝোতা স্মারকটি পর্যালোচনা শেষে শুক্রবার ধারণার কথা জানিয়েছে।

“বিদ্যমান আইন ও বিধান অনুযায়ী মিয়ানমারের অন্য নাগরিকরা রাখাইন রাজ্যে চলাচলের যে ধরনের স্বাধীনতা পায়, প্রত্যাগমনকারীরাও সে ধরনের সুযোগ উপভোগ করতে পারবেন,” সমঝোতা স্মারকে এমনটা বলা হলেও রাখাইন রাজ্যের বাইরে চলাচলের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা অবাধ সুযোগ পাবেন কিনা তার কোনো উল্লেখ নেই, জানিয়েছে বার্তা সংস্থাটি।

পর্যবেক্ষরা বলছেন, সমঝোতা স্মারকে যে ‘বিদ্যমান আইন ও বিধানের’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাতে রাখাইন রাজ্যেই অবাধ চলাচলের সুযোগ পান না রোহিঙ্গারা। যে কারণে নিজভূমে ফিরতে পারলেও তাদের দুন্দশা লাঘব হবে না বলেও শঙ্কা তাদের।

 বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমার রাখাইনের রোহিঙ্গাদের আদি বাসিন্দা হিসেবে স্বীকার না করায় সংখ্যালঘু এ মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই নাগরিকত্ব ও নাগরিক বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী দাবি করে কয়েক দশক ধরে তাদেরকে ‘বাঙালি’ হিসেবেও ডেকে আসছে দেশটির সরকার।

রোহিঙ্গারা শুরু থেকেই তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এ পরিচিতি প্রত্যাখ্যান করে পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্বের দাবি জানিয়ে আসছেন।

গত বছরের অগাস্টে রাখাইনে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযান শুরুর পর থেকে সীমান্ত টপকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারাও প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নাগরিকত্বের বিষয়টি মীমাংসার ওপরই জোর দিচ্ছিলেন।

নাগরিকত্ব না দিয়ে মিয়ানমার সরকার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ নামে এক ধরনের পরিচয় পত্র দিতে চায় বলেও জানিয়েছেন তারা। এ পরিচয় পত্রের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারে অভিবাসী হিসেবে গণ্য করা হবে; তাদেরকে দেশটিতে আজীবন থাকার অনুমতি দেওয়া হলেও মিয়ানমারের অন্যান্য অঞ্চলে অবাধে চলাচলের সুযোগ মিলবে না।

জাতিসংঘের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকেও বাংলাদেশে আশ্রিতদের ‘রোহিঙ্গা’ নামে অভিহিত না করেই ‘প্রত্যাবাসনকারী প্রত্যেককে যথোপযুক্ত পরিচিতি পত্র’ দেবার অঙ্গীকার করেছে মিয়ানমার সরকার। ‘যোগ্য’ ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য একটি স্পষ্ট ও স্বেচ্ছাসেবী পথ নিশ্চিত করারও আশ্বাস দিয়েছে তারা।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, জাতিসংঘ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

“এখনকার পরিস্থিতিতে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর অর্থ হচ্ছে তাদেরকে জাতিবিদ্বেষের মুখেই ঠেলে দেওয়া; এমন একটা জায়গা, যেখানে তারা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। স্কুল, হাসপাতাল ও কাজের জন্য নির্ভরশীল জায়গাগুলোতে প্রবেশাধিকার পেতে কষ্ট করতে হয়। পরিস্থিতির যে বদল ঘটবে এই নথিতে তারও কোনো ধরনের নিশ্চয়তাই নেই,” বলেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মিয়ানমার বিষয়ক বিশ্লেষক লরা হাই।

সমঝোতা স্মারকে গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গগুলোর উল্লেখ না থাকায় ক্ষুব্ধ রোহিঙ্গারাও।

“এই সমঝোতা স্মারকে আমরা ক্ষুব্ধ। এখানে রোহিঙ্গা পরিচয়ও ব্যবহার করা হয়নি। বলা হয়েছে রাখাইন রাজ্যে অবাধ চলাচলের কথা, যদিও আমাদের জন্য তা খুবই কঠিন। আমরা এই সমঝোতা স্মারক মেনে নিতে পারছি না,” বলেন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মহিবুল্লাহ।

প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বেরও নিশ্চয়তা চেয়েছেন তিনি।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এর আগে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটিকে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে ‘সহযোগিতার কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রথম ও জরুরি পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছিল।

এ বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জ হাতোই এবং দেশটির সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী উইন মিয়াত আইকে বারকয়েক ফোন দিয়েও জবাব পায়নি রয়টার্স।

শ্রম, অভিবাসন ও জনসংখ্যা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক পরিচালক বলেছেন, কথা বলার জন্য তিনি উপযুক্ত লোক নন। মন্তব্যের জন্য মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন ওই পরিচালক। স্থায়ী সম্পাদককে ফোন করা হলেও তিনি জবাব দেননি।

আন্তর্জাতিক দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সূত্রে রয়টর্স সমঝোতা স্মারকটির বিষয়বস্তু নিশ্চিত করেছে।

স্বাক্ষরের আগেরদিন লেখা ৩০ মে-র ওই খসড়াটি দেখতে পাওয়ার কথাও জানিয়েছে তারা। খসড়া স্মারকের মূল অংশগুলোই সমঝোতা চুক্তিতে অটুট আছে বলে কূটনীতিক ও বিভিন্ন এনজিওকে পাঠানো ইউএনএইচসিআরের ব্রিফিং ও এ সংক্রান্ত এক চিঠি থেকে নিশ্চিত হয়েছে রয়টার্স।

জাতিসংঘের এ বিষয়ক এক মুখপাত্র বলেছেন, তাদের নীতিতে ফাঁস হওয়া কোনো নথি নিয়ে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। ইউএনডিপি, ইউএনএইচসিআর ও মিয়ানমারের সরকার সমঝোতা স্মারকটি জনসম্মুখে প্রকাশের বিষয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও ইমেইলে দেওয়া জবাবে জানিয়েছেন তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ