ঢাকা, রোববার 1 July 2018, ১৭ আষাঢ় ১৪২৫, ১৬ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

৭ দফা দাবিতে সড়ক অবরোধ বাস মালিক সমিতির অফিস ও বাস ভাঙচুর

চৌগাছা সংবাদদাতা : যশোরের চৌগাছায় গত ২৬ জুন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত গার্মেন্ট শ্রমিক অহেদুজ্জামান টনির (২৫) মৃত্যুর জেরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখিয়েছে তার সহকর্মীরা। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা তাদের সাত দফা দাবিতে চৌগাছা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির অফিস ভাঙচুর করে ও বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কয়েকটি বাসও ভাঙচুর করেছে। গতকাল শনিবার সকাল নয়টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিক্ষোভ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। পরে চৌগাছা থানা পুলিশের হস্তক্ষেপে ১২টায় শ্রমিকরা অবরোধ তুলে নেয়। পরে সাড়ে ১২টায় চৌগাছা থানায় বাস মালিক-শ্রমিক, গ্রার্মেন্ট শ্রমিক ও থানা পুলিশের মধ্যে চর্তুপক্ষিয় সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সমঝোতা বৈঠকে গার্মেন্ট শ্রমিকদের দাবি নিয়ে আলোচনা শেষে বাস মালিক সমিতির পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ফিরে যায়। বৈঠক ফলপ্রসু হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন চৌগাছা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান।
গার্মেন্টস শ্রমিকদের দাবিগুলি হলো (ক) রাজপথেই তাদের দাবির সমাধান করতে হবে। (খ) সড়কে ফিটনেস বিহিন গাড়ি চালানো যাবে না। (গ) মালিক-শ্রমিক পক্ষকে অবরোধের স্থানে এসে সমস্যার সমাধান করতে হবে। (ঘ) মালিক সামিতিকে চৌগাছা-যশোর রুটের গাড়ির টাইমিং স্থল কয়ারপাড়ায় করতে হবে। (ঙ) অদক্ষ চালক-সহকারীকে দিয়ে গাড়ি চালানো যাবে না। (চ) স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল ও গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির সামনে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে গাড়ি চালাতে হবে। (ছ) ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত ২৬ জুন (মঙ্গলবার) দুপুরের দিকে চৌগাছা-যশোর সড়কের চৌগাছা শহরের তানজিলা ব্রিকস্রে সামনে একটি যাত্রিবাহী বাস (যশোর-জ-০৪-০০৩৬) সড়কের পাশের একটি রেইনট্রি গাছে ধাক্কা মেরে দিলে ডিভাইন গার্মেন্টে ডিউটি করতে যাওয়ার পথে সাইকেল আরোহী অহেদুজ্জামান টনি মারাত্মক আহত হয়। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখান থেকে চিকিৎসকরা তাকে ঢাকায় রেফার করেন। সর্বশেষ রাজধানীর আনোয়ার খান মর্ডান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার বিকাল তিনটায় তার মৃত্যু হয়। টনির মৃত্যুর পরেই তার সহকর্মীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।
গতকাল শনিবার সকাল নয়টায় চৌগাছা কামিল মাদরাসা মাঠে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। নামাজে জানাজায় চৌগাছার রাজনৈতিক সামাজিক নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি চৌগাছার ডিভাইন গ্রুপের দুটি ফ্যাক্টরির কয়েক শত শ্রমিকও অংশ নেন। জানাজা শেষে চৌগাছা পৌর কবরস্থানে নিহত টনিকে দাফন শেষে তার সহকর্মীরা চৌগাছা শহরের দিকে বিক্ষোভ মিছিল সহকারে আসেন। শহরে আসার পথে চৌগাছা খাদ্য গুদামের সামনে অবস্থিত চৌগাছা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। এসময় কয়েকটি বাসও তারা ভাঙচুর করেন বলে মালিক সমিতির নেতারা দাবি করেছেন। এরপর তারা শহরের যশোর বাসস্ট্যান্ডে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এ সময় চৌগাছা-যশোর সড়কের সকল যানচলাচল বন্ধ করে দেয় শ্রমিকরা। সংবাদ পেয়ে চৌগাছা থানার ওসি খন্দকার শামীম উদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে বিক্ষুব্ধ গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিবৃত করার চেষ্টা করেন। সেখানে দীর্ঘক্ষণ চেষ্টার পর গার্মেন্টস কর্মকর্তা-শ্রমিকরা সমঝোতা বৈঠকে বসতে রাজী হয়। পরে তারা চৌগাছা থানায় যান। সেখানে চৌগাছা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংস্থার নেতৃবৃন্দ আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন।
এদিকে সড়ক দুর্ঘটনার দিনই বাসটিকে চৌগাছা থানা পুলিশ দুর্ঘনটাস্থল থেকে চৌগাছা থানায় নেয়। সেখান থেকে দ্রুতই বাসটিকে মালিকের নিকট হস্তান্তর করা হয়। এটিই শ্রমিকদের বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ বলে অবরোস্থলে কয়েকজন গার্মেন্ট শ্রমিক জানান। তারা বলেন বাসের নির্ধারিত সময়ের কথা বলে বাস মালিক শ্রমিকরা যশোর থেকে ছেড়ে আসার পর সারা রাস্তায় আস্তে আস্তে চললেও কয়ারপাড়া বাজার পার হয়েই বেপরোয়া গতিতে চালাতে থাকেন। এ সময়ই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। বিগত কয়েক বছরে চৌগাছা-যশোর সড়কে যে সকল দুর্ঘটনা ঘটেছে তার সিংহভাগই কয়ারপাড়া থেকে চৌগাছা হাসাপাতালের ২ কিলোমিটার সড়কে। যশোর থেকে চৌগাছাগামি বাসগুলোতেই এই দুর্ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। আর সড়কের এই অংশে রয়েছে চৌগাছা হাসপাতাল, চৌগাছা ডিগ্রি কলেজসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ডিভাইন গ্রুপের দুটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা। এই অংশের সড়কেই চৌগাছা শহরের সবথেকে বেশি মানুষের চলাচল। ফলে দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতিও হয়ে থাকে বেশি। শ্রমিকদের দাবি চৌগাছা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতি সিন্ডিকেট করে লক্কড়-ঝক্কড় বাস এই রুটে চালিয়ে থাকেন।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চৌগাছার একজন বাস মালিক জানিয়েছেন তানজিলা ব্রিকসটি শহরের মধ্যে চৌগাছা-যশোর সড়কে অবস্থিত। এই ভাটাটির মালিকপক্ষ দিনে-রাতে ভাটায় মাটি নেয়ার সময়ে চৌগাছা হাসপাতাল থেকে কয়ারপাড়া পর্যন্ত সড়কে মাটি জমে থাকে। সামান্য বৃষ্টি হলেই এই মাটি ও পানিতে সড়ক খুবই পিচ্ছিল হয়ে থাকে। এতে সড়কে ছোট খাট দুর্ঘটনা লেগেই থাকে। ঘটনার দিন অর্থাৎ ২৬ জুনও সড়কটি পিচ্ছিল ছিল। বাসের চালক পিচ্ছিল পাড় এড়াতেই বাম সাইডে সাইড নেয়ার চেষ্টা করলে দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি অবশ্য স্বীকার করেন সে সময় সড়েকের ডান পাশে অন্যকোন গাড়ি ছিল না এবং ডান সাইডে গাড়িটি নিলে হয়ত দুর্ঘটনা ঘটত না।
এদিকে দুপুর পৌঁনে দুইটার সময় চৌগাছা থানায় চতুর্পক্ষীয় সমঝোতা বৈঠক শেষ হয়। সেখানে সকল পক্ষের সম্মতিতে অবরোধ তুলে নেন গার্মেন্ট শ্রমিকরা। বেলা দুইটা থেকে চৌগাছা- যশোর রুটে যান চলাচল শুরু হয়। সমঝোতা বৈঠক সফল হওয়ার বিষয় নিশ্চিত করেছেন চৌগাছা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান।
হাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের কাছে তারা কিছু দাবি দাওয়া রেখেছেন। আমরা আজ রোববার সমিতির সাধারণ সভা ডেকে সেখানে এ বিষয়ে এবং সমিতির অফিস ও গাড়ি ভাঙচুরের বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বলেছি। তিনি বলেন, নাইট হলের গাড়ি (দুপুর থেকে যে সকল গাড়ি যশোর যায়) চালানো শুরু করা হবে। বিষয়টি যেন সুষ্ঠুভাবে নিস্পত্তি হয় রোববারের মালিক সমিতির মিটিংয়ে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে আশা করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ