ঢাকা, রোববার 1 July 2018, ১৭ আষাঢ় ১৪২৫, ১৬ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হারিয়ে যাচ্ছে শ্রীনগর’র রাজা শ্রীনাথ রায়ের হাসপাতাল

শ্রীনগর (মুন্সীগঞ্জ): সংষ্কার ও সংরক্ষণ ও অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বিক্রপুরের (মুন্সীগঞ্জ) শ্রীনগর উপজেলার ভাগ্যকূলের রাজা শ্রীনাথ রায়ের ডিসপেনসারী ও হাসপাতাল। অনুসন্ধানে জানা-যায়, ভাগ্যকুলের জমিদার প্রথম চাদের তিন পুত্র শ্রীনাথ, সীতানাথ ও জামকী নাথ। শ্রীনাথ ও জমকীনাথ ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে “রাজা” উপাধি ও শ্রীনাথের ছেলে প্রথম নাথ “কুমার” উপাধি লাভ করেছিলেন। ১৮৭৭ সালে মহারানী ভিক্টোরিয়াকে যখন “ভারত সম্ম্রাজ্ঞী” উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সেই সময় নানা বিধ জনকল্যান মূলক কাজ ও সংস্কৃত চর্চ্চার পৃষ্ঠপোষকতার জন্য শ্রীনাথকে একটি বিশেষ মান পত্র দেওয়া হয়েছিল। সংস্কৃত সকল পন্ডিতদের একত্রিত করার উদ্দেশ্যে শ্রীনাথ রায় ঢাকায় সারস্বত সমাজ প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। শ্রীনাথ রায় দীর্ঘ দিন অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবেও কাজ করেছিলেন। সৎ ও পরোপকার মূলক কাজ কর্মের জন্য ১৮৯১ সালে তিনি “রাজা” উপাধিতে সম্মানিত হন। এছারা জনহতিকরণ কাজ কর্মের জন্য ১৯১১ সালে দিল্লির দরবারে রাজা শ্রীনাথ রায়কে একটি স্বর্ণ পদকে ভূষিত করা হয়।
১৯১৪ সালে যুদ্ধের জন্য সৈন্য সংগ্রহের কাজে সহায়তা করার জন্য ইংরেজ সরকার তাকে “রিংক্রুটিং” ব্যাজ প্রদান করেন। বিক্রমপুরের রাম বাড়িতে অতি প্রাচীন সু-উচ্চ একটি মঠ ছিল। মঠটি প্রায় ভেঙ্গে পরেছিল। শ্রীনাথ রায় বহু অর্থ ব্যায় করে মঠটি সংস্কার করলেও ১৯২৩ সালে এই বিখ্যাত মঠটি পদ্মার ভাঙ্গনে হারিয়ে যায়। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহায়তা করতে শ্রীনাথ রায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও দেশ প্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেন গুপ্তকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। মহাতœা গান্ধী ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন এর মত জাতীয় নেতাদের পূর্ববঙ্গ অঞ্চলে নদী পথে যাতায়াতের সুবিধার্থে শ্রীনাথ রায় তার কোম্পানীর স্টিমার ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। ১৯০৭ সালে এক অসুখে শ্রীনাথ  রায় তার দৃষ্টি শক্তি হারান। ১৯১৯ সালে স্ত্রীর মৃত্যুতে তিনি নিঃসঙ্গ হয়ে পরেন।
এর পর কলেরা রোগে তার এক পুত্র ও আদরের কন্যা রাইবিনোদনীরও মৃত্যু হয়। ভাগ্যকুলে নিজ গৃহে ১৯২৪ সালে ৮৪ বছর বয়সে কুন্ডু পরিবারের এই মহান পুরুষ শ্রীনাথের দেহাবাস ঘটে। ভাগ্যকুলের রায় পরিবারটি বিক্রমপুরে জনহিতকর কাজ কর্মের পাশা-পাশি বহু জনহিতকর প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। এগুলোর মধ্যে ভাগ্যকুলের হরেন্দ্র লাল উচ্চ বিদ্যালয়, শ্রীনগর বাজারে রাজা শ্রীনাথ চেরিটেবল ডিসপেনসারী এন্ড হসপিটাল, সিরাজদিখান উপজেলার শেখর নগরে রাজা শ্রীনাথ ইনষ্টিটিউট এন্ড হাই স্কুল, মুন্সীগঞ্জ সদরের রাজা শ্রীনাথ ক্লাব উল্লেখ যোগ্য। শ্রীনাথ রায়ের পুত্র কুমার বাহাদুর খ্যাত কুমার প্রমথনাথ রায় তার স্বর্গীয় পিতা শ্রীনাথ রায়ের মহান স্মৃতিকে অক্ষুন্ন রাখার জন্য বর্তমান শ্রীনগর বাজারে জমিদার লালাকৃত্তি নারায়ণ বসুর নির্মিত ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী অনন্তদেব মন্দিরের পূর্ব পাশের্^ ১৯৩৯ সালের ২৯ জুন স্থাপন করেন (RAJA SREENATH CHARITABLE DISPENSARY) রাজা শ্রীনাথ চেরিটেবল ডিসপেনসারী এন্ড হাসপাতাল। এই হাসপাতালেই কলকাতার বিখ্যাত কারমাইকেল হাসপাতালের দু’জন খ্যাতনামা ডাক্তার মন্মথনাথ নন্দী সংক্ষেপে এম এন নন্দী ও মনীন্দ্র কৃষ্ণ চৌধুরী নামে মানব দরদী ডাক্তারকে শ্রীনাথ হাসপাতালে নিয়োগ দেওয়া হয়ে ছিল। গ্রামে তখন বিদ্যুৎ ছিলনা, তাই প্রয়োজন হলে ডাঃ নন্দী মোমবাতীর আলোতে অপারেশন করতেন। সুদীর্ঘ কালব্যাপী ইহা মোটা মোটি সুষ্ঠু ভাবে পরিচালিত হয়ে আসছিল। দীর্ঘ দিন ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে আছে ভবনটি। প্রায় শত বছরের হাসপাতাল ভবনটি অযত্ন-অবহেলার শিকার হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। দেখাগেছে, ঐতিহ্যবাহী শ্রীনাথের ডিসপেনসারী ভবনটির দেয়ালের চারপাশে বট গাছের অসংখ্য শিকড় হাসপাতাল ভবনের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ছেয়ে গেছে। ভবনের চারিদিকে অসংখ্য বট গাছ। শিকর গুলো এতই জড়িয়ে আছে যে, হঠাৎ করে কেউ দেখলে বুঝতে পারবেনা এখানে একটি ভবন রয়েছে। এছারা হাসপাতাল ভবনটির চারিদিকে শ্রীনগর বাজারের ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারনে স্তুপে জমে রয়েছে। ফলে দুগর্ন্ধ ছরিয়ে পরিবেশের মারাত্বক ক্ষতি হচ্ছে। এর পাশেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পল্লী চিকিৎসা কেন্দ্র। সাধারণ রোগীরা দুগন্ধের মধ্যেও নিরুপায় হয়ে সেব নিতে আসেন। অনুসন্ধানে আরও জানা-যায়, খুব বেশী দিনের কথা নয়, মাত্র অল্প কয়েক দিনের মধ্যে কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এ হাসপাতাল ভবনের অতি মূল্যবান কাঠের দরজা জনালাসহ গুরুত্ব পূর্ণ আসবাবপত্র চুরি করে নিয়ে গেছে। এমনকি কিছু প্রভাবশালী ভূমিদস্যু পুরাতন ঐতিহ্যবাহী হাসপাতাল ভবনটির জায়গা গ্রাস করতে উঠে পরে লেগেছে। আজও কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে এ হাসপাতালের জারাজির্ন এ ভবনটি। বিক্রমপুরেরে  ঐতিহাসিক জমিদার শ্রীনাথের ডিসপেনসারীটি দেখতে অনেকেই দুর-দুরান্ত থেকে প্রায়ই ছুটে আসে।
তাই, ভবিষ্যৎ প্রজম্মের ইতিহাস জানার জন্য ঐতীহ্যবাহি রাজা শ্রীনাথ চেরিটেবল ডিসপেনসারী এন্ড হাসপাতাল ভবনটি অতীব জরুরি ভিত্তিতে সংক্ষার ও সংরক্ষণ করা একান্ত প্রয়োজন বলে সুধী মহলের দাবী। এ ব্যপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার জহিদুল ইসলাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, অতিশিঘ্রই আমরা শ্রীনগরের পরিত্যাক্ত ঐতিহ্যবাহী রাজা শ্রীনাথ চেরিটেবল ডিসপেনসারী এন্ড হাসপাতাল ভবনটির সংস্কারের জন্য ব্যবস্থা করবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ