ঢাকা, সোমবার 2 July 2018, ১৮ আষাঢ় ১৪২৫, ১৭ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আন্তর্জাতিক নদী আইন ও ভারতের বাঁধ প্রকল্প

আহমেদ উল্লাহ ভূইয়া : জীবনের অপর নাম পানি। এমন কি মানবদেহের মোট ওজনের শতকরা ৭৮ ভাগই জলীয়। তাই প্রাগৈতিহাসিক যুগ হতে মানুষ নদীকে কেন্দ্র করে তাদের বসতি স্থাপন ও সভ্যতার বিকাশ ঘটায়। নদ নদীর কার্যক্রম মানব দেহের রক্তপ্রবাহী নালীর মত। প্রতিবন্ধকতাহীন বিশুদ্ধ রক্ত প্রবাহ যেমনি মানবদেহকে সুস্থ ও সক্ষম রাখে, অনুরূপভাবে নদ নদীর সাবলিল জল প্রবাহ ভূ-ভাগের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য বজায় রাখে। স্বাভাবিক নদী প্রবাহে প্রতিবন্ধকতার অর্থই হলো প্রকৃতির বিরুদ্ধে, জীবন ও সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করা। এর বিরুদ্ধে সভ্য পৃথিবীর মানুষকে কার্যকর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কারণ প্রকৃতির প্রয়োজনেই সৃষ্ট আন্তর্জাতিক নদ নদীর উপর উজান বা ভাটির দেশ যাই বলুন, সকলেই সমান অধিকার যা জাতি সংঘ সনদে সুস্পষ্টভাবে সুলিখিত এবং স্বীকৃত।
আজকের সভ্যতার সুউচ্চ মিনারে দাঁড়িয়ে আমরা যদি আমাদের অতিক্রান্ত সিড়িঁগুলোর দিকে ফিরে তাকাই, তাহলে ঠিকই বুঝতে পারব, আমাদের ঋণ ও সভ্যতার উৎস, নীলনদের সভ্যতা, হোয়াং হো-ইয়াজির সভ্যতা, ইউফ্রেটিস ও তাইগ্রিস নদের সভ্যতা, সিন্ধু নদ কেন্দ্রিক সিন্ধু সভ্যতা, গঙ্গা ও ব্রক্ষপুত্র কেন্দ্রিক সমতট সভ্যতার নিকট। অবদানের কথা সামনে রেখেই হিন্দু সম্প্রদায় গঙ্গা পূজার প্রচলন করে। হয়তো উদ্দেশ্য ছিল মানুষ যেন নদনদীর প্রতি যতœশীল হয়। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, সে হিন্দু জাতিই আজ মহাদেবের পবিত্র জটা (টিকি) হতে উৎসারিত গঙ্গা নদীর বুকে গিট (বাঁধ) দিয়ে তার প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে। আর সেখানেই বাংলাদেশের শ্বাস প্রবাহে প্রাণঘাতি যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়েছে। অপুষ্টিতে জরাজীর্ণ হাড্ডিসার মানুষের মত শুকিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ, যাকে আমরা মরুকরণ বলে থাকি।
পশ্চিমবঙ্গের বশিরহাট জেলার ফারাক্কা নামক স্থানে গঙ্গার ওপর যে বাঁধ নির্মাণ করা হয়, তাই ফারাক্কা বাঁধ নামে খ্যাত। গঙ্গা নদী ২৩০০০ ফুট উঁচুতে হিমালয়ের দক্ষিণ খাতে মানস সরোবর হতে উৎপত্তি। এ  নদীটি চীন, নেপাল ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ইহা ৪ দেশীয় একটি আন্তর্জাতিক নদী। গঙ্গা নদী ভারতের উত্তর প্রদেশের তেহেরি গুরুয়াল জেলার গাঙ্গয়ত্রীর কাছে দেব প্রয়াগের শীমু শানপেনে (ব্রক্ষপুত্র) মিলিত ¯্রােতধারা গঙ্গা নামে অভিহিত যা হরিদ্বারের কাছ থেকে সমতলে প্রবেশ করে বাংলাদেশের রাজশাহীর সীমান্ত দিয়ে পদ্মা নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পদ্মা সীমান্ত থেকে ২৪০ কিঃ মিঃ দক্ষিণ পূর্বে প্রবাহিত হয়ে গোয়ালন্দের উজানে যমুনার সাথে মিলিত হয়েছে। সেখান থেকে ১০৪ কিঃ মিঃ দক্ষিণ পূর্বে প্রবাহিত হয়ে গোয়ালন্দের উজানে যমুনার সাথে মিলিত হয়েছে। সেখান থেকে ১০৪ কিঃ মিঃ পথ অতিক্রম করে চাঁদপুরের নিকট মেঘনায় মিলিত হয়ে মেঘনা নামে ২১৮ কিঃ মিঃ দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। পদ্মা, যমুনা এবং মেঘনা- এ তিন নামে গঙ্গা নদী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত। এর মোট দৈর্ঘ্য ৫৬২ কিঃ মিঃ। গঙ্গা একটি ৪ দেশীয় নদী। ভারতীয় অংশের নাম গঙ্গা। বাংলাদেশের অংশ তিনটি নামে পরিচিত। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত- এর নাম পদ্মা। দৈর্ঘ্য ২৪০ কিঃ মিঃ। গোয়ালন্দ হতে চাঁদপুর হয়ে বঙ্গোপসাগর-নাম মেঘনা। দৈর্ঘ্য ২১৮ কিঃ মিঃ।
গঙ্গা বক্ষে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের উত্তর ও পশ্চিম জনপদ যা পুরো বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ, তা প্রায় মরুকরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এ হীন কার্যাবলীকে আমরা একটি জাতি সত্ত্বার বিরুদ্ধে নীরব ধ্বংসযজ্ঞ বললেও কম বলা হবে। কারণ এর নেতিবাচক কুফল হতে বিশ্বপরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
বাংলাদেশের সীমান্ত হতে মাত্র ১১ মাইল পশ্চিমে ফারাক্কা বাঁধের অবস্থান। ১৯৫১ সালের দিকে ভারত এ বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পটি বর্ণিত উদ্দেশ্য ছিল হুগলী নদীর প্রবাহ বাড়িয়ে কোলকাতা বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধি করা। এতদ্বিষয়ে ভারতীয় পানি বিশেষজ্ঞদের নিরীক্ষা মূলক মতামত চাওয়া হয়। তৎকালীন ভারতীয় পানি বিশেষজ্ঞ কপিল দেব চ্যাটার্জী তাঁর প্রদত্ত রিপোর্টে আনুপূর্বিক তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন পূর্বক বলে, “দামোদর ও রূপ কানোয়ার নদীর পানি স্বল্পতাই কলিকাতা বন্দরের পানি স্বল্পতার প্রধান কারণ। ফারাক্কা প্রকল্পের মাধ্যমে হুগলী নদীর পানি প্রবাহ বৃদ্ধি কল্পনা বিলাম মাত্র। এ প্রকল্পটি যতটা না বৈষয়িক তারচে’ বেশি রাজনৈতিক। ব্যয়ভারের সাথে এর সফলতার দূরত্ব কল্পনাতীত।” -সূত্র: দি পোর্ট ইঞ্জিনিয়ার্স- ১৯৬৩ইং
মজার ব্যাপার হলো তৎকালীন ভারতীয় কেন্দ্রীয় পানি ও সেচ মন্ত্রী এস. কে. পাতিল পানি বিশেষজ্ঞ কপিল দেব চ্যাটার্জির প্রদত্ত রিপোর্টের সাথে একমত পোষণ করেন। তার পরও ভারত সরকার এদেশের মানুসের প্রাণঘাতি এ বাঁধ নির্মাণ করে। জানিনা এটাও আমাদের প্রতি ভারতের নিখাদ বন্ধুত্বের বন্ধন কিনা। তবে আমাদের যে শ্বাসরোধ হয়ে যাচ্ছে তা আর বুঝিয়ে বলার অবকাশ নেই।
গোটা ষাটের দশক ব্যাপী পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে ভারত পুরোদমে বাঁধ নির্মাণ কার্যক্রম চালিয়ে যায়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও ভারত  এ জাতি বিধ্বংসি পরিকল্পনা ত্যাগ করেনি। ভারতের সহযোগিতা ও সমর্থন বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ছিল। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ তখনও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার তেমন মিত্র গড়ে তুলতে পারেনি- যে, বাংলাদেশের আহ্বানে বিদেশী রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়াবে, বাংলাদেশের বুকের ওপর চেপে বসা ফারাক্কা নামক এ অশুভ পাথরকে অপসারণ করবে। ভারতই তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের একমাত্র অভিভাবক। ফারাক্কা ১৯৭৪ সালে নির্মিত, ৭৭৬৩ ফুট ৬ ইঞ্চি লম্বা, ১০৯টি স্পান সম্বলিত ২৭ লক্ষ কিউসেক পানি নির্গমনে সক্ষম একটি বিশাল বাঁধ। ফিডার ক্যানালটির দৈর্ঘ্য ২৩.৮ মাইল, প্রশস্ত ৪৯৫ ফুট আর গভীরতা ২০ ফুট। ১৯৭৪ সালে বাঁধটি সম্পন্ন হয়। বাঁধ নির্মাণের পর হতেই ভারত বাঁধ চালু করার জন্য চেষ্টা করে। যেহেতু এটা বাংলাদেশের জীবন মরণের প্রশ্ন, সে হেতু বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এ ব্যাপারেও ছিল সোচ্চার। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারী হতে বাংলাদেশে বিরোধী দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।  এরপর শুধু পরীক্ষামূলকভাবে মাত্র ৪০ দিনের জন্য চালু করার কথা বলে ভারত যে ফারাক্কা বাঁধ চালু করেছিল আজও তা চালু আছে বহাল তবিয়তে। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ৪০ দিনের মেয়াদে বাঁধটি চালু করার একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে হয়। চুক্তি অনুযায়ী ভারতের শুধুমাত্র ১১ হাজার হতে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার কিউসেক পানি ফিডার খাল দিয়ে প্রবাহিত করার কথা ছিল। এরপরও ভারত কোন প্রকার চুক্তি ব্যতিরেকে পানি প্রত্যাহার অদ্যাবধি অব্যাহত রাখে। বাংলাদেশ বার বার প্রতিবাদ করা সত্ত্বেও ভারত এর প্রতি কর্ণপাত করছে না। এ চুক্তিটি ছিল একটি আত্মঘাতি এবং জাতি বিনাশী চুক্তি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনের পর তৎকালীন সামরিক সরকার ১৯৭৬ সালে ইস্তাম্বুলে ইসলামী সংস্থার সম্মেলনে গঙ্গা নদীর পানি বন্টন সমস্যা উত্থাপন করে। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রীরা বাংলাদেশে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তখন ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেকটা যুদ্ধংদেহী রূপ নেয়। মরহুম মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ফারাক্কা মিছিল হয়। ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসে কলম্বোতে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ সম্মেলনেও বিষয়টি উত্থপিত হয়। কিন্তু ভারতের অনুরোধে মস্কো লবির জোর তৎপরতায় বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। এরপর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ৩১তম অধিবেশনে ১৯৭৬ সালের ২৪ নভেম্বর বিষয়টি সাধারণ পরিষেদে উত্থাপন করে। এখানেও সোভিয়েত লবির বিরূপ মনোভাবের জন্য বাংলাদেশের ন্যায্য দাবী সফলতা লাভ করতে পারেনি। তবে সাধারণ পরিষদের জরুরি এবং ন্যায্য সমাধানের জন্য যথাশীঘ্র সম্ভব ঢাকায় মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হতে একমত হয়। কিন্তু বহুবার বৈঠক হলেও ভারতের একগুঁয়েমির কারণে ফলাফল শূণ্যই থেকে যায়।
১৯৭৭ সালে ভারতের রাজনীতির পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মতভেদ ক্রমশঃ হ্রাস পেতে থাকে। এ বছরের ৫ই নভেম্বর উভয় দেশ ৫ বছরের জন্য একটি পানি বন্টন চুক্তি সম্পাদন করে। এ ৫ বছরের শুকনো মৌসুমে ফরাক্কা লব্ধ গঙ্গা নদীর প্রবাহ ১০ দিন ওয়ারী সিডিউলের মাধ্যমে পানি বন্টনের সিদ্ধান্তে উপনিত হয়। শুকনো মৌসুমে ২১ শে এপ্রিল হতে ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশের পানির হিস্যা কমপক্ষে ৩৪৫০০ কিউসেক নির্ধারিত হয়। এ সময়ে কোন কারণে যদি গঙ্গার প্রবাহ অতিমাত্রায় কমে যায় তবে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত পরিমাণের ৮০ শতাংশ প্রবাহের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব গৃহিত হয়। এ গ্যারান্টি ক্লজের আওতায় চুক্তিবদ্ধ সময়ে বাংলাদেশের হিস্যার কোন হেরফের হওয়ার সম্ভাবনা রহিত হয়। চুক্তিটি প্রতি ৫বছর অন্তর অন্তর নবায়নের কথা।
পরবর্তীতে অর্থাৎ ১৯৮২ সালের পর ভারত চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে দ্বিমত পোষণ করে। ১৯৮২ সালের ৭ই নভেম্বর উভয় দেশ একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করলেও তাতে গ্যারান্টি ক্লজ অনুপস্থিত ছিল। আর এ সুযোগে ভারত এক তরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করতে থাকে যা আজও চলছে। বাংলাদেশের প্রস্তাব ছিল গঙ্গার ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় বাৎসরিক ভিত্তিতে যে বিপুল পরিমাণ পানি পাওয়া যায় তারই কিছু অংশকে নিয়ে নেপাল ও ভারতে জলাধার নির্মাণ করলে সংরক্ষিত পানি শুষ্ক মৌসুমে ছেড়ে দিলে শুষ্ক মৌসুমে বর্তমান প্রবাহ ৫৫ হাজার কিউসেকের পরিবর্তে এ প্রবাহের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লক্ষ ৮০ হাজার কিউসেক। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে ভারত এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করে যাচ্ছে। অথচ এ কাজটি করলে গঙ্গার প্রবাহই শুধু বৃদ্ধি পেতোনা-কোলকাতা বন্দরের নাব্যতা আশানুরূপ হতো, আভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগ বৃদ্ধি পেতো। অনেক জল বিদ্যুৎ কেন্দ্রও স্থাপন করা যেত। আসলে ভারত সমস্যার সমাধনের জন্য দ্বিপক্ষীয় আলোচনাকে প্রাধান্য দেয় না একটি কারণে। আর তাহলো শক্তির দিক থেকে ভারত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। নেপালকে এ সমস্যা সমাধানের জন্য অন্তভূর্ক্তির প্রশ্নে ভারত নারাজ। এক কথায় ভারত ফারাক্কার প্রকৃত সমস্যার সমাধান কামনা করেনা। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪ টি অভিন্ন নদী রয়েছে। যার মধ্যে আমাদের পরম বন্ধু রাষ্ট্র ভারত এ পর্যন্ত প্রায় সব কয়টিতে বাঁধ দিয়েছে। শুধু তাই নয় তারা সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর উজানে কুশিয়ারার উৎসে বরাকের টিপাইমুখে ১৬১ মিটার উচুঁ টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া আসামের কপি খোপায় ২০২ মাইল লম্বা ব্রক্ষপুত্র ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। আসামের করিম গঞ্জে কুশিয়ারা নদীতে একটি গ্রোয়েন নির্মাণ করেছে ভারত যার বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় সিলেটের জকিগঞ্জ শহর মারাত্মক ভাঙ্গনের সহজ শিকারে পরিণত হয়েছে।
এবার বাংলাদেশের পূর্বপার্শ্বের ত্রিপুরার দিকে দৃষ্টি ফেরান যাক। মহুরী, দুধকুমার, ধরলা, গোমতি, খোয়াই নদী ছাড়াও সিলোনিয়া ইছামতি নদী এবং ছড়া নামে বিভিন্ন জলাধার যেমন মধুছড়া, ফুলছড়া, মহামায়া ছড়া, কছুয়া ছড়া, ঘাঘরা ছড়া, গাইতাছড়া, মহেশ্বর ছড়া, মাতাই ছড়া যা থেকে বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেট, কুমিল্লা ও নোয়াখালী জেলাতে জলপ্রবাহ সাধারণভাবে নেমে আসতো- একে একে এর প্রতিটিতেই বাঁধ দেয়া হয়েছে। ফলে ফারাক্কা ও তিস্তা বাঁধের ফলে যেমনি বাংলাদেশের ৪ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত উত্তর ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জনগণ ধুকে ধুকে মুত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে- অনুরূপভাবে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের বৃহত্তর সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রামের জনগণ একই ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের দুই তৃতীয়াংশ হচ্ছে মরুভূমি, আর দক্ষিণাঞ্চল অর্থাৎ বাকী এক তৃতীয়াংশ হচ্ছে সামুদ্রিক লোনা পানির শিকার। জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্বই আজ বিপন্ন হতে চলেছে। প্রমত্তা পদ্মার উপর চাদর বিছিয়ে যখন লোকজন তাস খেলে, মাঠ হিসেবে ফুটবল খেলে, তখনও আমাদের বিশ্বাস করতে হয়- পদ্মা প্রমত্তা।
প্রতিক্রিয়া : বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবাহমান নদীগুলোর উৎস মুখে বাঁধ নির্মাণের ফলে দেশের অসংখ্য নদী তার নব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। নৌ-যোগাযোগ বারো ভাগের ১ ভাগে নেমে এসেছে। বাংলাদেশের মাটির আভ্যন্তরীণ পানির স্তর আশাংকাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে। সেচ ব্যবস্থা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। ক্রমশঃ নদ নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি এবং উজান হতে গড়িয়ে আসা পানি পরিবহন করার ক্ষমতা আমাদের নদীগুলো হারিয়ে ফেলেছে বিধায় ফি বছর বন্যা হয়। ধ্বংস হয় জনজীবন ও সম্পদ। সেচ প্রকল্পগুলো প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। যেমন গঙ্গা কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প, তিস্তা প্রকল্প। শুস্ক মৌসুমে নদী-উপনদীগুলো তার সাধারণ প্রবাহ হারানোর ফলে এগুলো শুকিয়ে যায় এবং সেচ কার্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। উজান হতে নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে সামুদ্রিক লোনা জল আমাদের নদীগুলোতে ঢুকে পড়ে। ফলে ফসলের জমিগুলো লবণাক্ততায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সাগরের নোনজল আমাদে কুষ্টিয়া পর্যন্ত চলে আসছে। বিশ্বখ্যাত সুন্দরবন আজকে হুমকির সম্মুখীন। দেশের মৎস সম্পদ বিলীন হয়ে গেছে। পশু পাখি আর আগের মত দেখা যায় না। হালে দেখা যাচ্ছে জীবন ঘাতি মারাত্মক আর্সেনিক সমস্যা। ফলে ব্যবহার্য ও খাবার পানিতে আর্সেনিকের দূষণ মহামারীর রূপ ধারণ করেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় দুই কোটির অধিক লোক আর্সেনিকের ভয়াল থাবার মধ্যে ক্রমশঃ ধীর পদে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। উজানের নদীগুলোর উপর নির্মিত বাঁধগুলো অনতিবিলম্বে উঠিয়ে না দিলে আগামী ২৫-৩০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ মানুষ্য বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে।
বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ২৪ হাজার কিলোমিটারের নদীপথ মাত্র দুই হাজার কিলোমিটারে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। কয়েক বছরের মধ্যে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হবে। দেশের পূর্বাংশের অবস্থাও তথৈবচ। টিপাইমুখ বাঁধ সে যে নামেই হোক তা হবে এ জনপদেও মানুষের কফিনের শেষ পেরেক। কৃষি, বনায়ন, নদীপথ, প্রাকৃতিক ভারসাম্য, শিল্প, যোগাযোগ, জীব বৈচিত্র্য সব মিলিয়ে প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদদের হিসেব মতে আমাদের বাৎসরিক ক্ষতি কম বেশি একলক্ষ পঁচিশ হাজার কোটি টাকা। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে পৃথিবীর অন্যান্য ভূ-খন্ডের আগামী প্রজন্ম হয়তো জানবে “ভারতের দক্ষিণ-পূর্বে বাংলাদেশ নামের একটি ঘনবসতিপূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল। সে দেশের রাজনীতিবিদদের অদূরদর্শিতার জন্য ফরাক্কা ও টিপাই মুখ বাঁধের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় সে দেশের সকল মানুষ, জাতি হিসেবে তাদের অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলে। দূর্ভাগ্যবশতঃ সে জাতির মাঝে কোন দূর্দর্শী দেশ প্রেমিক দূর্দর্শী মানুষের জন্ম হয়নি। বাঁধ চালু করার অনুমতি নামক হলাহল তারাই পান করেছিল।”
উত্তরণের উপায় : বর্তমানে আমরা আমাদের অবস্থানে দাঁড়িয়ে আত্মঘাতি এবং সর্বনাশা এ সমস্যার ভয়াল চিত্র চাক্ষুস করছি আর কঠিন যন্ত্রণা অনুভব করছি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমরা জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নদী আদালতের ১৫-১২-১৯৭২ ইংরেজি সালের স্টক হোম রিজলিউশানের ২৯৯৫ ধারার ২৭ নং উপধারাকে ব্যবহার করতে পারি। উক্ত রেজিলিউশনটি ১৯৭৩ সালে জাতিসংঘের ২৭ তম সেসনের সাপ্লিমেন্টের ৩০ অনুচ্ছদ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এতে স্পষ্ট করে বলা আছে উজানের কোন দেশ নিজের প্রয়োজনে তার নদী প্রবাহকে এমনভাবে পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করতে পারবে না যাতে করে তার দেশের বাহিরের কোন দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ধরনের কোন সমস্যা সমাধানের জন্য দ্বিপক্ষিয় আলোচনা কার্যকর না হলে সেখানে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নদী আদালতে দাবী উত্থাপন করার বিধান রয়েছে । দুঃখের বিষয় এযাবৎকাল আমাদের সরকারগুলো যারাই যে সময়ে ফরাক্কা সংক্রান্ত যত আলোচনা ভারতের সাথে করেছেন- সোজা সাপটা ভাষায় বলতে হয় তাঁরা ভারত প্রেমের বেদিতে দেশ বাসির জীবন বলি দিয়েছেন। অন্ততঃ বর্তমান ফলাফল তাই মনে হয়। আবার এ ফারাক্কা চুক্তিকে ৩০ বছরের জন্য আমরাই বর্ধিত করেছি!
অথচ আন্তর্জাতিক নদী সমস্যার উপর গৃহিত ১৯১১ সালের মাদ্রিদ ডিক্লারেশন, ১৯৩৩ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মাঝে কলোরাডো নদী চুক্তি, ১৯৫৭ সালের সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্সের মাঝে লেক লেনক্স মামলার রায়, ১৯৬০ সালের পাক ভারতের সিন্ধু নদীর পানি চুক্তি,  ১৯৬১ সালের সলসবারি ডিক্লারেশন, নীলনদ নিয়ে মিশর-সুদান চুক্তি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে কলম্বিয়া নদী চুক্তি এসবের কোনটিতেই কোন রাষ্ট্রকে ইচ্ছেমত নিজ ভূ-খন্ডে আন্তর্জাতিক কোন নদীর পানি ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়নি। সিরিয়ার আপত্তির মুখে আজও তুরস্ক ইউফ্রেতিশ নদীতে বাঁধ নির্মাণ করতে পারেনি। এতদসংক্রান্ত বিশ্বের প্রচলিত আইন-কানুন ও বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে আমাদের অবস্থান সত্যিই দুর্বোধ্য। জাতি হিসেবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে আমাদের এখনই সোচ্চার হওয়া উচিত। তা না হলে আমাদের আগামীর পরিণতি হবে কল্পনার ও অতীত।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, ভারত অরুনাচল-আসাম সীমান্তে টিপাই মুখ বাঁধের চেয়েও বড় সুবর্ণশিরি বাধ নির্মাণ করেছে এবং ইতোমধ্যে এর ৭৫% ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এতে ব্রক্ষপুত্র নদী শুকিয়ে যাবে। প্রবল ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায় এ বাঁধ নির্মাণেল ফলে এখন আমরা শুধু মৃত্যুর প্রহর গুনতে পারি।
ভারতের নির্মিত প্রতিটি বাঁধ ভারতের জন্য তেমন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে না পারা স্বত্বেও ভারত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রতিটি নদীতে বাঁধ দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় ভারত  তাদের ধর্ম শাস্ত্রের বিধান মোতাবেক আমাদেরকে রাক্ষস বা অশূর বিবেচনা করে, অশূর বধের সর্ব আয়োজন সম্পন্ন করছে। এতে তাদের পুণ্যের ভান্ডার ভারী হলেও মানুষ হিসেবে আমাদের বিলুপ্তি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবু আমরা ভারতকে বন্ধু ভাবতে হয়। এ যেন আজরাঈলের সাথে আত্মীয়তা।
আমাদের আশু কর্তব্য হলো আলোচনার টেবিলে যুক্তি যুক্তভাবে ভারতকে আমাদের সমস্যার কথা বুঝিয়ে বলা। ভারত আন্তর্জাতিক নদী আইন মানতে না চাইলে আন্তর্জাতিক আদালতে আমাদের আর্জি পেশ করা। ভারতের তথাকথিত আশ্বাসে বিশ্বাস স্থাপন করলে আমরা ধ্বংস হয়ে যাব। ভারতের পরিচয় অন্ততঃ আমাদের বেলায় ওয়াদা ভঙ্গকারী। জনগণের প্রত্যাশা, সরকার তাই করবে, কারণ গোটা জাতি এ ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ। ভয়ের কারণ নেই। আমরা ষোল কোটি জনসংখ্যা অধ্যূষিত জাতি। আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি-কারো দয়া দাক্ষিণ্যে মেরুদন্ড বাঁকা করে কাপুরুষের মত বেঁচে থাকার জন্য নয়। এটা আমাদের ন্যায্য দাবী এবং তা আন্তর্জাতিক আইনসিদ্ধ। প্রয়োজন শুধু দেশ প্রেমের। আসুন সবাই মিলে জাতির বুকের ওপর পাথরসম চেপে থাকা মরণঘাতি ভারতের এ অন্যায় বাঁধগুলো অপসারণের ব্যবস্থা করি। এ সংক্রান্ত আইনগুলো আমাদের অনুকূলে। প্রয়োজন শুধু আমাদের আন্তরিক প্রচেষ্টার এবং জাতি হিসেবে টিকে থাকার সংকল্পের।
লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আয়কর আইনজীবী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ