ঢাকা, সোমবার 2 July 2018, ১৮ আষাঢ় ১৪২৫, ১৭ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্য নিরাপত্তা

আখতার হামিদ খান : জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই জানা দরকার জলবায়ু পরিবর্তন বলতে আমরা বুঝি আর খাদ্য নিরাপত্তাই বা কি?
জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে জলবায়ু সংক্রান্ত বিভিন্ন নির্দেশসমূহের দীর্ঘকালীন অবস্থা সমূহের পরিবর্তন। অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের আবহাওয়া সূচক, যেমন- বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, সূর্যালোকের ঘণ্টা, বায়ুপ্রবাহ, মেঘের অবস্থা ইত্যাদি সূচকসমূহের দীর্ঘকালীন গড় অথবা পরিবর্তনশীলতার মধ্যে সৃষ্ট পরিবর্তন। দৈনন্দিন আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের একটা তফাৎ আছে। দৈনন্দিন আবহাওয়া ঋতুভিত্তিক, মাসভিত্তিক, এমন কি দিনের বিভিন্ন সময়েও পরিবর্তিত হতে পারে এবং এটা স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু কোন একটা নির্দিষ্ট মৌসুমে নির্দিষ্ট স্থানে আবহাওয়া সূচকের মধ্যে ৩০ বছরের বা তার বেশি সময়ের গড়ের তুলনায় হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে, তখন তাকে আমরা জলবায়ু পরিবর্তন হিসেবে অভিহিত করি। সাম্প্রতিক কালে বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপীও জলবায়ু পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বেশি পড়বে বাংলাদেশের উপরে।
এবার আসা যাক খাদ্য নিরাপত্তা প্রসঙ্গে : খাদ্য নিরাপত্তা হচ্ছে, সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের যেন সকল মানুষের সকল সময়ের জন্য প্রাপ্যতা ও তা ক্রয়ের ক্ষমতা নিশ্চিত হয়। খাদ্য নিরাপত্তার জাতীয় ও ব্যক্তিগত দুটো দিক আছে। জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা হচ্ছে আভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য সরবরাহ, যা দেশির উৎপাদন, নতুন শস্য কর্তন ও সংগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সংগৃহীত হতে পারে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তার অর্থ হচ্ছে, সমাজের  সদস্যরা যেন তাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য নিজস্ব উৎপাদন বাজার থেকে ক্রয় এবং অথবা সরকারি বিতরণ ব্যবস্থা কার্যকর ভাবে পেতে পারে।
স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের খাদ্য সামগ্রীর উৎপাদন বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। মাথাপিছু খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে- বেড়েছে মোট উৎপাদনও। খাদ্য শস্যের (ধান ও গম) উৎপাদন স্বাধীনতা পরবর্তীকালীন সময়ের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। ১৯৭২-৭৩ সালে যেখানে খাদ্য শস্যের উৎপাদন ছিল প্রায় ১ কোটি মেট্রিক টন, সেখানে ২০০৮-০৯ সালে খাদ্য শস্যের উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ১২ লাখ মেট্রিক টন। একই সময়ে আলুর উৎপাদন বেড়েছে সাতগুণ (সাড়ে সাত লাখ মেট্রিক টন থেকে বায়ান্ন লক্ষ সত্তর হাজার মেট্রিক টন)। সবজি উৎপাদন বেড়েছে চারগুণ (৬ লক্ষ ৭০ হাজার মেট্রিক টন থেকে ২৬ লক্ষ ৯০ হাজার মেট্রিক টন)। তবে ডাল জাতীয় শস্যের উৎপাদন কমেছে। দুধের উৎপাদন বেড়েছে পাঁচগুণ যা ৪ লক্ষ ৯০ হাজার মেট্রিক টন থেকে ১০ লক্ষ ৮০ হাজার মেট্রিক টন হয়েছে)। ডিমের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চারগুণ (১১৮ কোটি ৫০ লক্ষ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৬৯ কোটি ৬০ লক্ষ)। মাছের উৎপাদন বেড়েছে ৩ গুণেরও বেশি (৮ লক্ষ ২০ হাজার মেট্রিক টন থেকে ২৭ লক্ষ মেট্রিক টন)।
বর্ধিত উৎপাদনের পাশাপাশি খাদ্য সামগ্রীর আমদানী উদারীকরণ করা হয়েছে। ফলে মাথাপিছু খাদ্য সামগ্রীর প্রাপ্তি ও ভোগ দুটোই বেড়েছে। খাদ্যশস্য, সবজি, ফল, মাছ-মাংস, দুধ ও ডিমের মাথাপিছু ভোগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। ১৯৯১-৯২ সালে মাথাপিছু দৈনিক শক্তি গ্রহণের পরিমাণ  যেখানে ছিল ২০৭০ কিলো ক্যালরী, ২০০৫-০৬ সালে তার পরিমাণ ২৫৮০ কিলো-ক্যালরীতে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে মাথাপিছু দৈনিক প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে ৫৩.৬ গ্রাম থেকে ৭২.৪ গ্রাম। স্নেহজাতীয় পদার্থের মাথাপিছু দৈনিক ভোগের পরিমাণ বেড়েছে ৪০.৭ গ্রাম থেকে ৪৭.১ গ্রাম।
খাদ্য উৎপাদন, প্রাপ্যতা এবং ভোগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও বাস্তবতা এই যে, বাংলাদেশের অনেক মানুষ এখনো খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ২০০৮ সালে প্রস্তাবিত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফ এ ও) এবং বিশ্বখাদ্য কর্মসূচির প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, বাংলাদেশের সাড়ে চৌদ্দ কোটি মানুষের প্রায় ৪৫ শতাংশ খাদ্য নিরাপত্তাহীন অর্থাৎ তাদের দৈনিক মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ ২১২২ কিলো ক্যালরী থেকে কম। অন্যদিকে মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৩.৯ শতাংশ) চরম খাদ্যহীনতায় ভুগছে, যাদের মাথাপিছু দৈনিক খাদ্য গ্রহণের হার ১৮০৫ কিলো ক্যালরী থেকে কম। বিভিন্ন গবেষণায দেখা গেছে যে, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা চরমে পৌছে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি পরবর্তী সময়ে। অর্থনৈতিক বিষর্যয়, দ্রব্যমূল্যের উল্লম্ফন, অর্থনৈতিক মন্দা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে প্রকট করে। বিগত দিনে ধনী-দরিদ্র, গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সকলেরই ভোগের পরিমাণ বেড়েছে। কিন্তু, একই সাথেস এটাও লক্ষ্য করা গেছে, ধনী ও দরিদ্রের খাদ্য ভোগের ক্ষেত্রে ব্যাপক ফারাক রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত দারিদ্র্য পরিবীক্ষণ সমীক্ষসমূহ থেকে জানা যায় যে, দরিদ্র সমূহের খাদ্য ভোগের পরিমান অন্যদের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম এবং ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ প্রায় ২০ শতাংশ কম। প্রোটিন এবং স্নেহজাতীয় পদার্থ ভোগের ক্ষেত্রে ফারাক আরও বেশি। এটা সত্যিই ভাবনার বিষয়। বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণের মাধ্যমে আমরা সকল মানুষের বিশেষত দরিদ্র মানুষের খাদ্য ভোগ নিশ্চিত করতে পারি।
বাংলাদেশের কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব : শস্য ক্রয় ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদন নির্ভর করে জলবায়ুর উপর। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে খাদ্য শস্যের উৎপাদনের পরিবর্তনও স্বাভাবিক। জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত বিভিন্ন ভবিষ্যদ্বাণীতে বলা হয়েছে, জলবায়ুর বিভিন্ন সূচকসমূহে বেশ পরিবর্তন হবে। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, সময় এবং দিনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন সাধিত হবে। বাড়বে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, তাপপ্রবাহ, দেশের বিভিন্ন অবস্থানে শস্য উৎপাদনের মৌসুম পাল্টে যাবে। পানির পরিমাণ ও মানের ক্ষেত্রে পরিবর্তন সাধিত হবে, লবণাক্ততা বেড়ে যাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাবে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই সমুদ্রের লবণাক্ত পানি দেশের অভ্যন্তরে শস্য আবাদী এলাকায় ঢুকে যাবে।
২০০৭ সালে প্রকাশিত ‘ইন্টার গর্ভনমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ (আইপিসিসি) এর জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রকাশণাতে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের জলবায়ুতে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘকালীন গড় তাপমাত্রার তুলনায় ১৯৮৫-১৯৯৮ সাল পর্যন্ত (১৪ বছর) সময়কালে মে মাসে গড় তাপমাত্রা বেড়ে প্রায় ১ সে.গ্রে.দ। একই সময়ে নভেম্বর মাসে তাপমাত্রা বেড়েছে ০.৫ সে.গ্রে। ৬০ এর দশক থেকে দশকভিত্তিক গড় বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ভয়াবহ এবং ঘন ঘন বন্যা সংঘটিত হতে দেখা গেছে ১৯৯৮-২০০২ এবং ২০০৮ সালে। বঙ্গোপসাগর থেকে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ১৯৭০ সাল থেকে কমলেও তার প্রকাশ বেড়েছে অনেক। বঙ্গোপসাগর থেকে সৃষ্ট নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ে সংখ্যা বেড়েছে। পানির প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে ঘাটতির পরিমাণ, নগরায়ণ, শিল্পায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পানির অদক্ষ ব্যবহারের কারণে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে তা আরও প্রকট হয়েছে, এর ক্ষতিকর প্রভাব পানির চাহিদা, সরবরাহ ও পানির মানের উপর নৈতিক প্রভাব ফেলছে। শুষ্ক মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে লোনা পানি দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ১০০ কি.মি. বা তার বেশি এলাকার নদীনালা ছড়িয়ে পড়েছে। খরাপ্রবণ এলাকাতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে গেছে এবং প্রতিবেশের উপর এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা থেকে জানা গেছে যে, বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছর গুলোতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। উক্ত গবেষণায় ১৯৭১-২০০০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘকালীন (৩০ বছর) সময়ের তুলনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে (২০০১-২০০৮ সাল পর্যন্ত) তাপমাত্রা, এবং বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় জানা যায় যে, উক্ত বছরগুলোতে খরাপ্রবণ এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় জানা যায় যে, উক্ত বছরগুলোতে খরাপ্রবণ এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে গেছে বন্যাপ্রবণ ও জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ এলাকাসমূহে বৃষ্টিপাতের হ্রাসবৃদ্ধির পরিমাণ বেড়েছে। মৌসুমি বৃষ্টিপাতের শুরু এবং সমাপ্তির বন্যাপ্রবণ ও জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ এলাকাসমূহে বৃষ্টিপাতের হ্রাসবৃদ্ধির পরিমাণ বেড়েছে। মৌসুমি বৃষ্টিপাতের শুরু এবং সমাপ্তির ক্ষেত্রেও স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পরিমাণ দেশের সর্বত্রই বেড়েছে। “জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশে ধান উৎপাদন” শীর্ষক সিপিডির আরেকটি নিবন্ধে জলবায়ু পরিবর্তনের (খরা, লবণাক্ত পানিতে নিমজ্জন) ফলে ২০০০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের বিভিন্ন মৌসুমে (আউশ, আমন, বোরো) ধান উৎপাদনের উপর কী প্রভাব পড়বে তা হিসাব করা হয়। উক্ত নিবন্ধ থেকে জানা যায় যে, “স্বাভাবিক বছরে” উপরোক্ত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বার্ষিক ধানের উৎপাদন প্রায় ১২ লাখ টনের মতো কমে যাবে, যা কি না বর্তমানে বার্ষিক ধান উৎপাদনের ৪ শতাংশের বেশি।
এ সম্পর্কিত অন্যান্য গবেষণা থেকে জানা যায় যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শস্য উৎপাদনের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। শস্যের উৎপাদন হ্রাসের ফলে স্বাভাবিকভাবে আমাদের খাদ্য সামগ্রীর প্রাপ্যতা এবং ভোগের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র এবং উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী।
জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার বিনির্মাণ : জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে হলে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের অভিযোজনের মাত্রা নির্ভর করবে বিভিন্ন অভিযোজন পদক্ষেপসমূহ গ্রহণের ক্ষেত্রে সক্ষমতা, প্রযুক্তির প্রাপ্তি, ভূমি ও পানি সম্পদের প্রাপ্যতা, মাটির বৈশিষ্ট্য, শস্য পেষণের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল, সম্পদের বৈচিত্র্য এবং ভূমির ধরণের উপর। শৈত্যপ্রবাহ সহিষ্ণু বিভিন্ন জাত উদ্ভাবনের জন্য আমাদের প্রয়োজন পড়বে এসকল গুণমান সম্পর্কিত কৌশল, সম্পদের প্রাপ্যতা ও ব্যবহার।
কৃষি ক্ষেত্রে, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব রোধ কল্পে আমাদের একটি সমন্বিত অভিযোজন কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। অভিযোজন প্রক্রিয়ায় দরকার পড়বে খরা সহিষ্ণু, বন্যা সহিষ্ণু, লবণাক্ততা সহিষ্ণু শৈত্যপ্রবাহ সহিষ্ণু জাতের গবেষণা। অগ্রাধিকার দিতে হবে কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং প্রসারের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। তাছাড়া এ সকলখানে জীব প্রযুক্তি, জিআইএস, রিমোট সেন্সিং এর ব্যবস্থা বাড়াত হবে। শস্য উৎপাদন ও পশুপালনের জন্য দীর্ঘ মেয়াদী আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং তা প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন প্রতিবেশ অঞ্চল ও গ্রাম পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য সুনির্দিষ্ট কৌশল, নীতিমালা প্রনয়ণের পাশাপাশি উপযুক্ত কর্মকা- পরিচালনা করতে হবে। সরকারের এ্যাকশন প্ল্যানকে গ্রাম পর্যায়ে সাফল্য অর্জনের জন্য শুরুতেই বাস্তবায়নযোগ্য আদর্শ প্রকল্প হাতে নেয়া যেতে পারে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নিয়মিত পরীক্ষণ, মূল্যায়ণ এবং ফিডব্যাকের ব্যবস্থা করতে হবে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন শস্যের উৎপাদন উপযোগী এলাকা নির্ধারণ করতে হবে। উত্তরবঙ্গের খরাপ্রবণ এলাকায় খরার প্রকোপ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ঐ সকল এলাকার জন্য শুষ্ক মৌসুমে ধান ব্যতীত অন্যান্য ফসলের আবাদকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে অর্থাৎ শীতকালে কম পানি লাগে অথবা বিনা সেচে আবাদ করা যায় যেমন ছোলা, মুসুর, ভুট্টা প্রবৃদ্ধির আবাদ বাড়াতে হবে। একই সাথে বিভিন্ন উদ্যান শস্য যেমন আম, কুল, পেয়ারা, শরীফা, মিষ্টি তেঁতুল প্রভৃতি ফসল খরা বছরব্যাপী আবাদের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বর্ষাকালে সহিষ্ণু জাতের উদ্ভাবন এবং প্রসারের মাধ্যমে উত্তর বঙ্গের ধান চাষের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব, ভারতের বিহার রাজ্যে ইতিমধ্যে খরা সহিষ্ণু ধান জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জন্য ভূ-উপরিভাগের পানি ব্যবহার করা আবাদ করা সম্ভব। বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান লবণাক্ততা সহিষ্ণু ব্রি ধান ৪৭ উদ্ভাবন করেছে। তবে পরিবর্তিত জলবায়ু অবস্থায় বর্ধিত লবণাক্ততার মাত্রা মোকাবিলার ক্ষেত্রে এটি সক্ষম নাও হতে পারে। তাই ভবিষ্যতের জন্য আরও বেশি লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের দরকার পড়বে। দীর্ঘদিন পানিতে নিমজ্জিত থাকলেও টিকে থাকতে পারে এমন জাত উদ্ভাবনেরও দরকার পড়বে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এ সংক্রান্ত গবেষণার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। অচিরেই স্বর্না সার- ২, বি-আর ১১, সার- ১ এবং বি আর ১১ সার- ২ অবমুক্ত হতে পারে। এ সকল গবেষণায় আরও জোর দিতেস হবে।
উপকূলীয় এলাকাতে খাটো জাতের নারকেল গাছের গবেষণার মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়ের অভিঘাত কমানো সম্ভব। বিভিন্ন প্রতিবেশ অভিযোজনের ক্ষেত্রে দেশীয় ধানের তথ্য ভান্ডার গড়ে তোলা দরকার যা জলবায়ু পরিবর্তন সহিষ্ণু ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়নসংস্থার এবং সার্ক দেশসমূহের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়নসংস্থার যৌথ কর্মসূচির প্রয়োজন পড়বে।
বিগত দিনে বাংলাদেশ অনেক চ্যালেঞ্জ সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে সামর্থ্য হয়েছে। আমরা আশা করি আমাদের জলবায়ু পরিবর্তন সহিষ্ণু কৃষি ব্যবস্থা বিনির্মাণ এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সফল হবেন এবং এ লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে জাতীয়, জেলা, উপজেলা, গ্রাম এবং থানা পর্যায়ে। সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল ও তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ