ঢাকা, সোমবার 2 July 2018, ১৮ আষাঢ় ১৪২৫, ১৭ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হারিয়ে যাচ্ছে কুষ্টিয়ার লোকসংস্কৃতি

কুষ্টিয়া সংবাদদাতা : ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর কুষ্টিয়ার লালন শাহের লালনগীতির ব্যাপক চর্চার প্রভাব সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে প্রভাবিত করেছে। এছাড়া লোক-সংস্কৃতি, বাউলগীতি, আঞ্চলিক গীতি, নাট্যচর্চা, ভাসানগান ও মানিকপীরের গান উল্লেখযোগ্য।
কুষ্টিয়ার নদীয়ার প্রাচীন জনপদ হওয়ায় এখানে লোকসংস্কৃতি বা গ্রামীণ সংস্কৃতি বিভিন্নভাবে চর্চার মাধ্যমে ঐতিহ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। বাঙালীর সমাজ জীবনে নানা উৎসব আয়োজনে নানা ধরণের গীত, কবিগান, ভাবগান, পুঁথিপাঠ, মেঠো গান, মানসার গান, ভাসান গান, ছেলে নাচানো গান, মানিকপীরের গান, বোলান গান, অষ্টগান, গাজীর গীত ও কৃষ্ণগান এগুলো উল্লেখযোগ্য। লোক সংস্কৃতির বিকাশের ক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রভাব ও এক শ্রেণীর প্রভাবশালী সমাজপতিদের বিদ্রুপান্তক দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষ অন্তরায়  সৃষ্টি করলেও বহুকাল ধরেই লোকসংস্কৃতি কুষ্টিয়ার সমাজ জীবনে নানাভাবে বিদ্যমান রয়েছে।
বিয়ের গান : লোক সংস্কৃতির ভান্ডার অফুরন্ত। প্রতিনিয়ত এর উপাদান বৃুদ্ধি পেয়ে চলেছে। আধুনিকতার উষ্ণ আবেদনের প্রেক্ষিতে অতীতের অনেক লোকসংস্কৃতি হারিয়ে   গেছে। তবে শোমসপুরের গ্রামগুলোতে অশিক্ষিত মেয়েরা বিয়ের গানের শত শত পংক্তি অনর্গল মুখস্থ বলে যেতে পারে। এ সমস্ত গান তাঁরা নিজেরাই সৃষ্টি করেন। শোমসপুরের ইউনিয়নের গ্রামাঞ্চলের প্রচলিত বিয়ের গান, ক্ষীর খাওয়ানোর গান এখানে তুলে ধরা হলোঃ-
বিয়ের গান ঃ ‘‘দুলাভাই গিয়েছে শহরে, আনবে নাকের নথরে
সেই নথ নাকে দিয়ে নাক ঘুরিয়ে নাচবো রে।’’
ক্ষীর খাওয়ানার গান : ‘‘আলুয়ার চালে কাঞ্চন দুধে ক্ষীরোয়া পাকালাম
সেই না ক্ষীরোয়া খেতে গরমি লেগেছে।
কোথায় আছ বড় ভাবী পাক্কা হিলোয়রে।’’
সারী গান : এই গান হচ্ছে কর্ম সংগীত। অঞ্চলে সারীগানের প্রভাব আজও বিদ্যমান। পাকা ঘরের জলছাদ পেটানো কিংবা কোন ভারী কাজের জোশ সৃষ্টির জন্য সারীগান গাওয়া হয়ে  থাকে।
জারী গান : জারীগান মূলতঃ ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকে সৃষ্টি। শোমসপুর ইউনিয়নে বিভিন্ন অঞ্চলে মহররমের সময় গায়করা দলবদ্ধ হয়ে বাড়ী বাড়ী জারীগান গেয়ে  বেড়ায়। যাদবপুরের বেলাল হোসেন বয়াতী জারী গানের গায়ক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। এছাড়াও অনেক জারী গায়ক দল এ অঞ্চলে রয়েছে। জারীগানের কিছু অংশ তুলে ধরা হলোঃ-
‘‘ঈমান যে না আনিবে মক্কার উপরে
গোনাহগার হয়ে যাবে দোযখ মাঝারে
আরে রোমের ও শহরে ছিল
ইব্রাহীম পায়গম্বর
বহুদিবস বাদশাহী করে এই দুনিয়ার পর।’’
শাস্ত্র গান : একটানা বাদলার দিনে শাস্ত্র গানের কদর দেখা যায়। জমিতে নিড়ানোর সময় অথবা ধান লাগানোর সময় শাস্ত্র গান গাওয়া হয়। গ্রামের গৃহস্থের বাড়ীর বৈঠকখানায় বৃষ্টির দিনে কখনও কখনও শাস্ত্র গানের আসর বসে শাস্ত্র গানের কাহিনী অনেকটা বর্ণনামূলক। শাস্ত্রগানের উপমাঃ-
‘‘ঈমান খাঁটি ভবের খুঁটি শাস্ত্রের পরিচয়
ঈমান দিয়ে দেলকে আগে খাঁটি করা চাই,
নইলে নামাজ হবে নয়
আছে সত্য ঠিক যথার্থ তোমারে জানাই।’’
ভাটিয়ালী গান : কুষ্টিয়ার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে এক সময় ভাটিয়ালী গানের ব্যাপক প্রচলন ছিল। ইদানীং কালে অনেক কমে গেছে। গ্রামের গাড়ীর গাড়োয়ান, নৌকার মাঝি এবং মাঠের রাখালী ভাটিয়ালী গানের গায়ক হিসেবে আজও এই প্রাচীন লোকসংস্কৃতিকে ধারণ করে রেখেছে।
অষ্টগান : চড়কপূজায় অষ্টগান পরিবেশিত হয়ে থাকে। চড়কপূজার ১৫ দিন পূর্বে পাড়ায় পাড়ায় অষ্টগানের দল বেঁধে অষ্টগান পরিবেশিত হয়ে থাকে। কুষ্টিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিভিন্ন গ্রামের লোকেরা অষ্টগান গাওয়ার জন্য বাড়ী বাড়ী যায় এবং তারা কিছু টাকা পয়সা নিয়ে থাকে। বর্তমানে এটি কম দেখা যায়।
পালা বা যাত্রাগান : পালা বা যাত্রাগান সর্বত্র এখনও অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি লোক সংস্কৃতি হিসেবে বিদ্যমান। রূপবান যাত্রা, ভাসান যাত্রা, ইমাম যাত্রা, আসমান সিংহের পালা গান উল্লেখযোগ্য। শীতকালের পুরো সময় এখানকার গ্রামাঞ্চলে, এমনকি বিভিন্ন শহরের কেন্দ্রস্থলেও যাত্রাগানের আসর বসে থাকে। সরকারিভাবে নিবন্ধিত কোন যাত্রা দল নেই। তবে কতিপয় নিবন্ধীকৃত ক্লাব রয়েছে যারা  প্রতিবছরই নিয়মিতভাবে যাত্রাগানের আয়োজন করে থাকে।
পুতুল নাচ : এক সময় খোকসায় সর্বত্র পুতুল নাচ অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। টিকিট কেটে পুতুল নাচ দেখার জন্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ভীড়  জমাতে দেখা গেছে। বর্তমানে পেশাদার পুতুল নাচের কোন দল নেই। তবে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে এখানে পুতুল নাচ প্রদর্শন করতে আসে। পুতুল নাচ শিশু কিশোরদের বেশ আনন্দ দিয়ে থাকে। তবে এখন আর পুতুল নেই জ্যান্ত পুতুলেরা নেচে মানুষকে রিপুর খোরাক জোগায়।
সারী গান : সারী গান এক সময় কুষ্টিয়া অঞ্চলে দারুণ জনপ্রিয় ছিল। ছাদ পেটানো বা নৌকা বাইচ কিংবা ভারী কাজের সময় কুষ্টিয়া জেলা লোকজন সারী গান গেয়ে কাজ করতো। এ জেলায় শরৎকালে নৌকা বাইচের মেলা হতো। এসব মেলায় একশত দেড়শত হাত লম্বা বাইচের নৌকার পাল্লা হতো। সেখানে সারী গান গেয়ে গেয়ে মাঝি,বাইচরা নাচতো। গত ৬০ দশকে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর জগন্নাথপুরের পাঁচু ঘোষ বাইচের নৌকায় সারী গান গেয়ে প্রচুর সুনাম অর্জন করেছিলেন। কুষ্টিয়ার লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্যে নাচ একটি উল্লেখযোগ্য অবদান।
গ্রামে বিয়ের বাড়ীতে বর ও কনের উভয় পক্ষের যুবক-যুবতী এমনকি বুড়ো-বুড়িরা নাচে অংশগ্রহণ করে থাকেন। তবে প্রাচীন কালের তুলনায় আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। হারিয়ে যেতে বসেছে এসব সঙ্গীতের অনুষ্ঠান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ