ঢাকা, সোমবার 2 July 2018, ১৮ আষাঢ় ১৪২৫, ১৭ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গলাকেটে হত্যা কিংবা জীবন্ত অবস্থাতেই রোহিঙ্গা শিশুদের পুড়িয়েছে সেনারা

নিজের সন্তান কোলে রোহিঙ্গা নারী ফাতেমা। তিনি নিজ চোখে রোহিঙ্গা নারী কেটে টুকরো টুকরো করতে ও পোড়াতে দেখেছেন।

১ জুলাই, ডেইলি মিরর/রয়টার্স : রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত নিধনযজ্ঞ আর মানবতাবিরোধী অপরাধের ভয়াবহ ও নতুন নজির মিলেছে। ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ডেইলি মিররের এক সরেজমিন প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, রাখাইনে জবাই কিংবা গুলী করে মৃত্যু নিশ্চিতের পর রোহিঙ্গা শিশুদের লাশগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। মিররের বিশেষ প্রতিনিধি টম প্যারোর সরেজমিন রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে গিয়ে এসব কথা জেনেছেন। ফাতেমা নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গা নারীর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি তুলে এনেছেন সেই নৃশংসতার ভয়াবহ বিবরণ। ২৫ বছর বয়সী ফাতিমা তাকে জানিয়েছেন, শূন্যে ছুঁড়ে দেওয়া অবস্থায় ভারি রাম দা আর ছুরি দিয়ে টুকরো টুকরো করা হয়েছে তার সন্তানকে। এরপর পোড়ানো হয়েছে আগুনে। ফাতিমা জানিয়েছেন, বেশিরভাগ শিশুকে এভাবেই হত্যা করা হয়েছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে জীবন্ত অবস্থাতেই পুড়িয়ে মারা হয়েছে তাদের।    

 রোহিঙ্গা মা ফাতিমার কোলে নিজ সন্তান, অন্য মায়ের সন্তানকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারতে দেখেছেন এই নারী : ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সন্ত্রাসবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের নামে শুরু হয় নিধনযজ্ঞ। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। পাহাড় বেয়ে ভেসে আসতে শুরু করে বিস্ফোরণ আর গুলির শব্দ। পুড়িয়ে দেওয়া গ্রামগুলো থেকে আগুনের ধোঁয়া এসে মিশতে থাকে মৌসুমী বাতাসে। মানবাধিকার সংগঠনের স্যাটেলাইট ইমেজ, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন আর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, মায়ের কোল থেকে শিশুকে কেড়ে শূন্যে ছুড়তে থাকে সেনারা। কখনও কখনও কেটে ফেলা হয় তাদের গলা। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় মানুষকে। এমন বাস্তবতায় নিধনযজ্ঞের বলি হয়ে রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় অন্তত সাত লাখ রোহিঙ্গা। ফাতিমা সেই পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদেরই একজন। তিনি শিশুদের প্রতি মিয়ানমারের সেনাদের ভয়াবহ নৃশংস আচরণের বিবরণ হাজির করেছেন। ডেইলি মিররকে জানিয়েছেন, হত্যাকা- সম্পন্ন করেই সেনারা আসলে থামেনি, মরদেহগুলো পুড়িয়েও দিয়েছে তারা  

সরেজমিন কক্সবাজার পরিদর্শন শেষে ডেইলি মিররের বিশেষ প্রতিনিধি টম প্যারোর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, প্রথমে গুলি করে মারা হয় ফাতেমার স্বামীকে। তবে এতেই ক্ষান্ত দেয়নি মিয়ানমারের সেনারা। তার মৃত শরীর থেকে এরপর গলা কেটে বিচ্ছিন্ন করা হয়। প্যারোর লিখেছেন, গল্পের ভয়াবহতার এটা কেবল সূচনা। ফাতিমা এরপর কান্নারত কণ্ঠে প্যারোরকে জানিয়েছেন সেখানকার শিশু হত্যার বীভৎস বাস্তবতার কথা। বলেছেন, ‘আমি দেখেছি, সেনারা এক শিশুকে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে ছুরি আর রামদা দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করেছিল। ওই শিশুর চার টুকরা মরদেহ দেখেছি আমি। টুকরোগুলো তারা আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিল’। ফাতিমা প্যারোরকে বলেন, 'আমি বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। একটা কথাও বলতে পারিনি। যা দেখছিলাম, কোনভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এটাই একমাত্র ঘটনা নয়, অনেক শিশুকেই একই কায়দায় হত্যা করেছে মিয়ানমারের সেনারা। কাউকে কাউকে জীবন্ত অবস্থাতেই পুড়িয়ে মারা হয়েছে।’

রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ সংক্রান্ত রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক বিশেষ অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, গত বছরের আগস্ট থেকে ওই জনগোষ্ঠীর ৭ লাখ মানুষকে বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দুইটি পতাদিক বাহিনী। রাখাইনে ওই দুই বাহিনীর নেতৃত্বেই সংঘটিত হয়েছে যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধ। রয়টার্স তাদের বিশ্লেষণে দেখিয়েছে, ওই দুই বাহিনী যা করেছে, তার সার্বিক নির্দেশনা এসেছে সেখানকার শীর্ষ জেনারেল মিন অং হ্ল্যাং-এর কাছে থেকে। তাকেই নিধনযজ্ঞের নেপথ্য কারিগর আখ্যা দিয়েছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও মানবাধিকার কমিশন শুরু থেকেই সোচ্চার মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের বিরুদ্ধে। চীন-রাশিয়ার বিরোধিতা সত্ত্বেও নিরাপত্তা পরিষদও সহিংসতার অবসান ঘটানো এবং রোহিঙ্গা নিপীড়ন বন্ধের তাগিদ দেয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, মার্কিন মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইট ওয়াচসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রও সোচ্চার মিয়ানমারের বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সে দেশের সেনাবাহিনীর ওপর আংশিক নিষেধাজ্ঞাও আরোপ হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত অভিযোগকে বহুদিন আমলেই নেয়নি মিয়ানমার। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আর বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা স্যাটেলাইট ইমেজ আর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে হত্যা-ধর্ষণ-ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত তুলে আনলেও মিয়ানমার ওই অভিযোগকে ‘অতিকথন’ কিংবা ‘গুজব’ আখ্যায়িত করে উড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, রাখাইনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ রাখে তারা। এক পর্যায়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও পরবর্তীতে জাতিসংঘের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন করলেও বাংলাদেশের দাবি অনুযায়ী এখন পর্যন্ত কোনও রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেয়নি মিয়ানমার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ