ঢাকা, সোমবার 2 July 2018, ১৮ আষাঢ় ১৪২৫, ১৭ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রংপুরে পীরগঞ্জ উপজেলায় চাল সংগ্রহ অভিযানে শুভংকরের ফাঁকি

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলা সদরের থানাপাড়ায় ‘খাজা চালকল’ এর মাঠ। এই চাল কলটিও ১৬ মে. টন চাল বরাদ্দ পেয়েছে। কিন্তু মাঠে ঘাস। চাতাল বন্ধ

* চালকল কাগজে আছে মাঠে নেই

* ৪ কোটি টাকা লুটের বাণিজ্য

রংপুর অফিস : রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় সরকারিভাবে চাল সংগ্রহে চালবাজি করে শুভংকরের ফাঁকি শুরু হয়েছে। এখানে অনেক চালকল কাগজে আছে মাঠে নেই। এর মাধ্যমে এই উপজেলায় প্রয় ৪ কোটি টাকা লুটের বাণিজ্য শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

প্রাপ্ত অভিযোগে জানা গেছে, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও উপজেলা ভারপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা কোন চালকলে (হাস্কিং মেশিন) উৎপাদিত চাল খাদ্যগুদামে নিচ্ছে না। উপজেলা খাদ্য অধিদপ্তর এর  কর্মকর্তাবৃন্দ অটো রাইস মিলের মালিকদের সাথে আঁতাত করে চাল ক্রয় করায় চালকল মালিকরা তাদের চালের বরাদ্দপত্র বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে কয়েক শত চাতালের হাজার হাজার কর্মঠ শ্রমিক বেকার হয়ে পরেছে। অপরদিকে উপজেলার কোন কোন চালকল কাগজে আছে, মাঠে চালু নেই।  দুর্নীতির মাধ্যমে এমন চাল কলের মালিকও  বরাদ্দ পেয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।  তারা সেই চাল সরবরাহের বরাদ্দপত্র অটো চালকল মালিকদের কাছে কমিশনের বিনিময়ে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো সংগ্রহ- মওসুমে সরকারি ভাবে পীরগঞ্জ উপজেলায় প্রতি টন চাল ৩৮ হাজার টাকা দরে ৪ হাজার ৩৬৯ মেট্রিক টন সিদ্ধচাল এবং প্রতি টন চাল ৩৭ হাজার টাকা দরে সাড়ে ৩৯  মেট্রিক টন আতপচাল সংগ্রহ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে চালকল মালিকদের সাথে খাদ্য অধিদপ্তর চুক্তি করেছে । এই বরাদ্দের মাধ্যমে  উপজেলার পীরগঞ্জ খাদ্য গুদামে ৩ হাজার ৫’শ ৬৯ মেট্রিক টন এবং ভেন্ডাবাড়ী খাদ্যগুদামে ৮’শ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ করার কথা। এ লক্ষে উপজেলার ২০২ জন চালকল মালিক জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের সাথে চুক্তি করেছে। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি টন চালের মুল্য ২৮ হাজার থেকে ২৯ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি টনে ৯ হাজার টাকা করে লাভের আশায় চালকল মালিকরা এবারে খাদ্য বিভাগের সাথে চুক্তিবদ্ধ হলেও সরাসরি তারা তাদের চালকলে উৎপাদিত চাল সরকারী খাদ্য গুদামে দিতে পারছেন না। ফলে চালকল মালিকরা বাধ্য হয়ে অটো রাইস মিলে চালের বরাদ্দ পত্র বিক্রি করছেন। এবারে সংগ্রহকৃত ৪ হাজার ৩৬৯ মেট্রিক টন চালের প্রতি টনে ৯ হাজার টাকা করে ৩ কোটি ৯৩ লাখের বেশী টাকা বাড়তি মুনাফা হবে।  এই বাড়তি মুনাফার প্রায় দেড়  কোটি টাকা হাস্কিং মেশিন চালকল মালিকর এবং অটো রাইস মিল ব্যবসায়ীরা অবশিষ্ট প্রায় আড়াই  কোটি টাকা ভাগ বাটোয়ারা করে নেবেন বলে সি-িকেট তৈরী হয়েছে।  

 এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চালকল মালিকরা  জানান, পীরগঞ্জ উপজেলায় হাস্কিং মিলের বরাদ্দ হলেও অটো মিলের চাল নেয়া হচ্ছে। এবারে চালের সংগ্রহ মুল্য বেশী হলেও আমরা লাভের মুখ দেখছি না। কারণ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও উপজেলা ভারপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা শুধু অটো রাইস মিলের চাল ক্রয় করবেন বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। এমন শর্ত জুড়ে দেয়ায় অনেকে বেকায়দায় পড়ে প্রতি টন চালের বরাদ্দপত্র ২ থেকে ৩ হাজার টাকায় অটো রাইস মিলের কাছে বিক্রি করেছে। ফলে মোটা অংকের মুনাফা লুটে নিচ্ছে অটো রাইস মিল ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের রাফিন এগ্রো ফুডস্ লিমিটেড নামের অটো রাঈস মিলের মালিক চালের বরাদ্দপত্র ক্রয় করছেন। চাল সংগ্রহের উদ্বোধনী দিনেই রাফিন এগ্রো ফুডস্ লিমিটেড উপজেলা খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহ দিয়েছে। ঐ চালকল এবং হাকিম ফুডস লিমিটেড সাড়ে ৬’শ মেট্রিক টন করে চালের বরাদ্দ পেয়েছে বলে জানা গেছে। চালকলগুলোর (হাস্কিং মেশিন) চাতালে চাল উৎপাদন কার্যক্রম না থাকায় চাতালগুলোর হাজার হাজার নিয়মিত শ্রমিক বেকার বসে আছে। খাদ্য গুদামে বছরে দুই মওসুমে একইভাবে চাল সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। অপরদিকে অনেক চালকল কাগজে আছে, বাস্তবে নেই, সেগুলোও চাল সরবরাহের বরাদ্দ পেয়েছে বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ পাওয়া গেছে। চালকলগুলো সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বেশকিছু চাতালে কাজ না থাকায় তাদের মাঠে ঘাঁস গজিয়েছে। এসব এখন গোচারণ ভূমীতে পরিনত হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেকার শ্রমিকরা আক্ষেপ করে জানান, ”হামরা হালের গরু হইলেও হামাক জবো করি খাওয়া যাইতো। এলা কাম-কাজ না থাকায় বেকার হয়া পড়ি আছি। গরুর চায়াও হামরা অধম হছি।”

 ভুক্তভোগি ব্যবসায়ীদের সুত্রে জানা গেছে, এবারে গুদামে চাল সংগ্রহ করার সময় উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তার পক্ষ থেকে দরকষাকষির মাধ্যমে ২০ টাকা হারে উৎকোচ নির্ধারন হয়েছে বলে জানা গেছে। এবারের বরাদ্দে মোট ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ বস্তা চালে ২০ টাকা হারে প্রায় সোয়া ২৯ লাখ টাকা উৎকোচ নেয়া হচ্ছে। ফলে চালের গুনগত মানও দেখা হচ্ছে না। এ ব্যাপারে উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা অনিমেষ কুমার উৎকোচ নেয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, অটো রাইস মিলের চালের মান ভাল ও ওজন ঠিক থাকে। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সাইয়েদুল ইসলাম বলেন, হাস্কিং মিলে (চালকল) উৎপাদিত চাল ভাল হলে নেব। তবে অটো রাইস মিলের চালই নিচ্ছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ