ঢাকা, সোমবার 2 July 2018, ১৮ আষাঢ় ১৪২৫, ১৭ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হলি আর্টিজানে হামলায় নিহতদের স্মরণ

গতকাল রোববার হলি আর্টিজানে হামলায় নিহতদের প্রতি বিভিন্ন সংগঠন ও পেশার লোকজন শ্রদ্ধা নিবেদন করে -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : দুই বছর আগে ঢাকার কূটনৈতিক পাড়া গুলশানের হলি আর্টিজান  বেকারিতে নজিরবিহীন জঙ্গি হামলায় নিহতদের স্মরণ করেছে নগরবাসী। গতকাল রোববার সকাল ১০টায় গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়িটির ফটক খুলে দেওয়ার পর শোকার্ত নাগরিকদের পাশাপাশি নিহত বিদেশীদের স্মরণ করতে আসেন কূটনীতিকরা। জঙ্গি হামলার পর কয়েক মাস সেই বাড়িটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ থাকার পর বাড়িটিতে বসবাস করছেন মালিক।
ওই ভবনের সামনে তৈরি অস্থায়ী বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে বেলা ২টা পর্যন্ত দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন ফুলের তোড়া দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। জাপান ও ইতালি রাষ্ট্রদূতের পর বিদেশী মিশনগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের পর নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ফুল দিয়ে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে কূটনীতিক পাড়া গুলিশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়ে ১৭ বিদেশীসহ ২০ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। তাদের ঠেকাতে গিয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তাও নিহত হন। রাতভর উৎকণ্ঠার পর ২ জুলাই সকালে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে সঙ্কটের অভিযান ঘটে। হামলায় অংশ নেওয়া নব্য জেএমবির পাঁচ জঙ্গি ওই অভিযানে নিহত হয়। জঙ্গি হামলায় নিহতদের মধ্যে নয়জন ছিলেন ইতালির, সাতজন জাপানি। নিহত জাপানিরা বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করছিলেন। সেদিন ইতালীয় বায়িং হাউজ স্টুডিও টেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ৫২ বছর বয়সী নাদিয়া বেনেদিত্তোর সঙ্গে নিহত হয়েছিলেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আসা আরো ৬ জন ইতালীয় ব্যবসায়ী।
গতকাল রোববার সকালে স্টুডিও টেক্স লিমিটেডের ৩৫ জন কর্মকর্তা হলি আর্টিজান বেকারিতে আসেন শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। তাদের পক্ষে প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার ওয়াহিদ আলম বলেন, “নাদিয়া বাংলাদেশের একজন সম্পদ ছিলেন। তিনি ইতালীয় ব্যবসায়ীদের এ দেশে বিনিয়োগ করতে আসতে নানা পরামর্শ ও সহযোগিতা দিতেন। এদেশের অর্থনীতির জন্য ছিল তার অনেক অবদান।”
নিহতদের প্রতি দলের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানোর পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, “হলি আর্টিজানের হামলার পর থেকেই আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চেষ্টায় আমরা জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক দুর্বল করতে পেরেছি। তবে তাদের এখনো নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।”
গত দুই বছরে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের পর বাংলাদেশে এখন কতটুকু নিরাপদ এমন প্রশ্নে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী কাদের বলেন, “হলি আর্টিজানের পর তেমন কোনো বড় কোনো হামলা ঘটেনি। কিন্তু ইউএসের মতো দেশেও জঙ্গি হামলা হয়। সেই তুলনায় আমরা ভালো আছি।” জঙ্গিবাদের সমস্যা মোকাবেলায় ‘সব সময় সতর্ক’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম বলে তিনি দাবি করেন।
বিএনপির পক্ষে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান দলের ভাইস চেয়ারম্যান রুহুল আলম চৌধুরীরে নেতৃত্বে একটি দল। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “নৃসংশ জঘন্য হত্যাকান্ড যেটা হয়েছিল, যেটা শুধু বাংলাদেশই নয় পুরো বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল। সেই ঘটনার দুই বছরপূর্তি আমরা করছি। এখন পর্যন্ত এ ঘটনার তদন্ত শেষ হয়নি, বিচারকার্য শুরু করতে পারেনি।”
পরে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ নিহতদের স্মরণে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “হলি আর্টিজানের হামলার দিনে আমরা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের দমন করেছি। গত দুই বছরের জঙ্গিবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে আমরা সারা বিশ্বকে সিগনাল দিতে সক্ষম হয়েছি যে, বাংলাদেশ জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয় নয়। বাংলাদেশের মানুষ জঙ্গিবাদ বরদাস্ত করবে না। “এখনো আত্মতুষ্টির কোনো কারণ নেই। কারণ জঙ্গিবাদ একটি দীর্ঘ পক্রিয়া। সম্পর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।”
জঙ্গি হামলায় নিহতদের স্মরণে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। তবে সেখানে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।
হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন ডিশ ক্লিনার জাকির হোসেন শাওন, পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকা থেকে শাওনের ছোট ভাই আব্দুল্লাহকে নিয়ে এসেছিলেন তার মা মাকসুদা বেগম। তার বুকে ছেলের একটি ছবি।
মাকসুদা বেগম বলেন, “আমার ছেলে কোনো অপরাধ করেনি। তাকে মেরে ফেলা হয়েছে।”
মোস্ট ওয়ান্টেড দুই জঙ্গি ভারতে!
রাজধানী ঢাকার গুলশানের কূটনীতিক পাড়ায় হলি আর্টিজান বেকারীতে দুর্ধর্ষ জঙ্গি হামলার ঘটনায় জড়িত দু’জঙ্গি পালিয়ে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে প্রথম জন মামুনুর রশিদ রিপন ও দ্বিতীয় জন শরীফুল ইসলাম খালিদ। তারা দু’জনই নব্য জেএমবির সদস্য। এই দুই নব্য জেএমবি জঙ্গিকে পলাতক দেখিয়েই পেশ করা হচ্ছে হলি আর্টিজান হামলার চার্জশিট।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘৃণিত সেই দিনটির পর কেটে গেছে দুই বছর। হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর একাধিক জঙ্গি ঘাঁটি ডেরা গুঁড়িয়ে দেয়ার কাজে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা সব মহলে প্রশংসিতও হয়েছে। জঙ্গি দমন অভিযানে খতম হয়েছে গুলশনের ঘাতকরা। ধরা পড়েছে অনেকেই। কিন্তু অধরা এখনো দুই জঙ্গি। হামলা পরবর্তী তদন্তে উঠে এসেছে তারা পালিয়ে ভারতে লুকিয়েছে। আর এ খবর জানাচ্ছে সে দেশীয় গনমাধ্যম  কলকাতা ২৪।
পুলিশ ও র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, গুলশানের হলি আর্টিজান হামলার পর বিভিন্ন অভিযানে ৭০ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে আছে জঙ্গি পরিবারের ৭ শিশু। র‌্যাব ও পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে আরও ১০ জন। ২০১৬ সালের ১ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৭১ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। 
গতকাল রোববার কলকাতা ২৪ এর এক প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের গণমাধ্যমটি বলছে, গুলশান হামলায় জড়িত সন্দেহভাজন প্রথম জন মামুনুর রশিদ রিপন ও দ্বিতীয় জন শরীফুল ইসলাম খালিদ। এই দুই নব্য জেএমবি জঙ্গিকে পলাতক দেখিয়েই কয়েকদিনের মধ্য পেশ করা হবে গুলশান হামলার চার্জশিট।
জঙ্গি দমন বাহিনী কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) সেই হামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করেছে৷ চার্জশিটে থাকছে হামলার দিন অর্থাৎ ২০১৬ সালের ১ জুলাই সন্ধের পর থেকে নাশকতা পরবর্তী সময়ে তদন্তের বিবরণ এবং নিহত ও ধৃত জঙ্গিদের সম্পর্কে তথ্য প্রমাণাদি৷
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুলশান হামলার পরিকল্পনা ও জঙ্গি সরবরাহকারী হিসেবে অন্যতম নাম মামুনুর রশিদ রিপনের। জামাত উল মুজাহিদিন বাংলাদেশ ( জেএমবি) সংগঠনের শীর্ষ নেতা ছিল রিপন। পরে জেএমবি ভেঙে নব্য জেএমবি তৈরি হলে রিপন সেই সংগঠনে নাম লেখায়৷ কানাডা থেকে আসা বাংলাদেশি জঙ্গি নেতা তামিম চৌধুরী ওরফে ‘বাংলার বাঘ’ ঘনিষ্ঠ রিপনের বাড়ি বগুড়ায়৷ সে মূলত বাংলাদেশের উত্তারঞ্চলে সংগঠনের দায়িত্ব নিয়েছিল৷ গুলশান হামলার পর থেকেই নিখোঁজ এই জঙ্গি৷
বাংলাদেশের গোয়েন্দা কর্তাদের ধারণা, সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢুকে পড়েছে রিপন৷ পশ্চিমবঙ্গ বা আসামের কোথাও তার গোপন আস্তানা রয়েছে৷
গুলশান হামলার আরও এক মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি হল রিপন৷ সেও হামলার পর থেকে নিখোঁজ৷ গোয়েন্দাদের ধারণা রিপন ও খালিদ একসঙ্গেই লুকিয়ে রয়েছে ভারতে। হোলি আর্টিজান ক্যাফেতে হামলার পরিকল্পনায় পুরোপুরি জড়িত খালিদ। সে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পড়ত ইংরেজি নিয়ে।
ঈদের আগে রমজানের মাসে হামলা করা হয়েছিল ঢাকার হোলি আর্টিসান ক্যাফেতে। ভয়াবহ সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঈদের দিন ফের হামলা চালানো হয় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার বিখ্যাত ঈদের জামাতের সময়।
নব্য জেমবির আত্মগোপনকারীর নেতৃত্ব ফের গুলশান হামলার মতো পরিকল্পনা করেছে সেটা জানতে পারেন গোয়েন্দারা। পরে জঙ্গি দমন অভিযানে খতম হয়েছে তামিম চৌধুরী সহ আরও শীর্ষ জঙ্গি নেতা।
এদিকে নব্য জেএমবির একাধিক নেতৃত্ব খতম বা ধরা পড়ার পরেও তাদের পুরনো শাখা অর্থাৎ জেএমবির প্রধান সালাউদ্দিন সালেহীন এখনো অধরা। গোয়েন্দাদের ধারণা, সালাউদ্দিন পশ্চিমবঙ্গে লুকিয়ে। তার নেতৃত্বে নতুন করে জেএমবি তাদের নাশকতা ছড়াতে তৈরি হচ্ছে। একাধিক নাশকতার মামলায় সালাউদ্দিনের যোগসূত্র মিলেছে। সিটিটিসির দাবি, পুরনো জেএমবিকে শক্তিশালী করতে হাল ধরেছে সালাউদ্দিন সালেহীন।
গুলশান হামলার দুই অধরা জঙ্গি রিপন ও খালিদ সালাউদ্দিনের সঙ্গে ফের ভিড়তে পারে বলেও প্রশ্ন উঠেছে৷ কারণ নাশকতা ছড়াতে জেএমবির পলাতক প্রধান ‘আমির’ সালাউদ্দিন সালেহীনের মতো নেতৃত্ব তাদের প্রয়োজন। সেই সূত্রে ছেড়ে আসা পুরোনো সংগঠন জেএমবিতে গিয়েই ঢুকতে পারে রিপন। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে যেতে পারে খালিদও।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ