ঢাকা, সোমবার 2 July 2018, ১৮ আষাঢ় ১৪২৫, ১৭ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সব ঋণের সুদ হার সিঙ্গেল ডিজিট হচ্ছে না

স্টাফ রিপোর্টার : বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্সের (বিএবি) ঘোষণা অনুযায়ী, আজ ২ জুলাই(১ জুলাই ব্যাংক হলিডে থাকায়) থেকে ব্যাংক ঋণে সুদ হার সিঙ্গেল ডিজিট বা এক অঙ্কে (৯ শতাংশ) নেমে আসার কথা থাকলেও সব ঋণে সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে নামছে না। বিশেষ করে ভোক্তা ঋণ, এসএমই ঋণ কিংবা ক্রেডিট কার্ডে সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে কোনোভাবেই এক অঙ্কে নামবে না। ব্যাংকগুলো এসব ঋণে আগের মতোই সুদারোপ করবে। তবে শিল্পের মেয়াদি ঋণে অথবা চলতি মূলধন ঋণে সুদহার এক অঙ্কে নামছে। ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে আলাপ করে এমন তথ্য জানা গেছে।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা (এমডি) বলছেন, গতকাল ১ জুলাই থেকে শুধু শিল্প ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামানো সম্ভব হবে। তবে কম সুদে আমানত পেলে পর্যায়ক্রমে অন্য ক্ষেত্রেও সুদহার কমে আসবে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করে বলেন, আগামী কয়েক মাসেও সব ঋণে সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে আনা সম্ভব হবে না। কোনও কোনও ব্যাংক হয়তো শিল্পের মেয়াদি ঋণ, চলতি মূলধন ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে রাখবে।
তিনি বলেন, গত এক বছর ধরে যে সব ব্যাংক ১১ শতাংশেরও বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করেছে, সেই সব ব্যাংক ইচ্ছে করলেও সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ দিতে পারবে না।
এ প্রসঙ্গে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বিএবির ঘোষণা অনুযায়ী সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে আনতে হলে সব ব্যাংকের বোর্ডে সিদ্ধান্ত হতে হবে। কারণ, প্রত্যেকটা ব্যাংকের বোর্ড আলাদা। কাজেই স্ব স্ব ব্যাংকের বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই হবে।
তিনি বলেন, বোর্ডের সিদ্ধান্ত কোন কোন ব্যাংক কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, সেটাও নির্ভর করছে ওই ব্যাংকের ইচ্ছের ওপর। হয়তো কোনও ব্যাংক ঘোষণা দিয়েও বাস্তবায়ন করলো না, সেটা তো আমরা দেখতে পারবো না। তবে বিএবির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আমরা অন্তত একটি খাতে হলেও গ্রাহকদের সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ দিতে পারবো।
এবিবির এক নেতা নাম প্রকাশ না করে বলেন, সব ঋণে সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামাতে গেলে ব্যাংক ব্যবসা ঝুঁকিতে পড়বে। সুদের হার কমাতে গিয়ে ব্যাংকের আয় কমে গেলে সরকারের রাজস্ব খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি বলেন, সরকারের রাজস্ব আদায়ের বড় ভূমিকা রাখে ব্যাংক খাত। এই ব্যাংক খাতের আয় কমলে সরকারও কম রাজস্ব পাবে।
এদিকে সুদহার কমানোর বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে আজ সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও এরই মধ্যে বেসরকারি এক্সিম ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ১ জলাই থেকে তারা সুদ হার সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ দেবে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি পূবালী ব্যাংকের এমডি আবদুল হালিম চৌধুরী বলেন, আগামী ৪ বা ৫ জুলাই পূবালী ব্যাংকের বোর্ডসভা হবে। ঋণে সুদহার নির্ধারণের বিষয়ে বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নেবে, তা-ই হবে।
তিনি বলেন, সব ব্যাংকের বোর্ডেই বিএবির সদস্যরা রয়েছেন। তারা সবাই ব্যাংক ঋণে সুদের হার কমানোর পক্ষে। কোন খাতে কোন ব্যাংক কত কমাবে, সেটাও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বোর্ডে সিদ্ধান্ত হবে। কম সুদে আমানতে পাওয়া গেলে কম সুদে ঋণও বিতরণ করা সম্ভব হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘পাইলট প্রকল্প’ হিসাবে প্রত্যেক ব্যাংক যাতে অন্তত যেকোনও একটি খাতে ঋণে সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনে সে ব্যাপারে বিএবির চাপ থাকলেও ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের বক্তব্য হলো, এতদিন ১১ শতাংশেরও বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে লোকসান দিয়ে কোনও ব্যাংকই ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করবে না। তবে ৬ শতাংশ সুদে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত পেলে সিঙ্গেল ডিজিটে নামতে পারে।
এর আগে সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে ৬ শতাংশ সুদে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পড়ে থাকা ‘অলস’ টাকা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ চায় বেসরকারি ব্যাংকগুলো। এজন্য গত ২৫ জুন ব্যাংক খাতের সিনিয়র ৫ ব্যাংকের এমডি বৈঠক করেন গর্বনর ফজলে কবিরের সঙ্গে। বৈঠকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পড়ে থাকা ‘অলস’ টাকা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত ৫ শতাংশ বা ৬ শতাংশের কম সুদে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয় ওই বৈঠকে।
তবে ৬ শতাংশ সুদে সরকারি ব্যাংকের টাকা বেসরকারি ব্যাংক পাবে না বলে মন্তব্য করেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত। তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কোনোভাবেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ৯ শতাংশের কম সুদে ঋণ দিতে পারবে না। কারণ, সরকারি ব্যাংকও এক একটি আলাদা কোম্পানি। তারা ৬ শতাংশের বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করেছে, যা কোনোভাবেই ৯ শতাংশের কম সুদে ঋণ বিতরণ করতে পারবে না।
সম্প্রতি সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার কথা বলে ৪ ধরনের সুবিধা নিয়েছেন বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরা। নতুন করে আরও ৩ ধরনের সুবিধা পেতে যাচ্ছেন তারা। এরই মধ্যে বাজেটে ব্যাংকের করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমিয়ে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এর আগে বিএবির চাহিদা অনুযায়ী সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা, সিআরআর ১ শতাংশ হ্রাস, ঋণ আমানতের হার (এডিআর) সমন্বয়সীমার সময় বাড়ানো এবং রেপো রেট ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। এরপরও ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামেনি।
অবশ্য সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের চাপে গত ২০ জুন বিএবি ব্যাংকে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়। সে অনুযায়ী গতকাল ১ জুলাই থেকে ঋণে সর্বোচ্চ সুদহার হওয়ার কথা ৯ শতাংশ।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে ব্যবসায়ীদের উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। এতে ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন তারা। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে বা এক অঙ্কে নামিয়ে আনার তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ