ঢাকা, মঙ্গলবার 3 July 2018, ১৯ আষাঢ় ১৪২৫, ১৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শহীদ মিনারে শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগের দফায় দফায় হামলা

#  ছেলেদের গুম ও মেয়েদের ধর্ষণের হুমকি দেয়ার অভিযোগ
#  ছাত্রলীগ বলছে, বিশৃঙ্খলা ঠেকাতেই ভূমিকা রাখছে তারা
#  জাবিতে আহ্বায়ককে তুলে নেয়ার অভিযোগ
#  রাবিতে দেশীয় অশ্রশস্ত্র নিয়ে হামলা
স্টাফ রিপোর্টার : সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথার সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর দফায় দফায় হামলা করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। হামলাকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদেরও রেহাই দেয়নি। চড় থাপ্পড় দেয়ার পাশাপাশি রাস্তায় ফেলে বেধড়ক পেটানো হয়েছে। এসময় গায়ে হাত দেওয়াসহ নানা ধরনের হুমকি দেয়ার কথা জানায় আন্দোলনকারী নারী শিক্ষার্থীরা। তবে ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা-কর্মীরা দাবি করেছেন,ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতেই তারা সেখানে গিয়েছিলেন। এ দিকে ছাত্রলীগের প্রবল বাধা উপেক্ষা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করেছে। এ দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপর লাঠি-সোটা ও বাঁশ নিয়ে হামলা করেছে ছাত্রলীগ। কোটা সংস্কার নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অগ্রগতি নেই বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন ও ফারুকের নেতৃত্বে কোটার দাবিতে আন্দোলনরত ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী গতকাল সোমবার বেলা ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। এ সময় তাদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের ১০/১৫ জন নেতাকর্মী। এতে নেতৃত্ব দেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় স্কুল ও ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক জয়নুল আবেদীন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহসিন হল শাখার সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সানী।
হামলার পর কোটা আন্দোলনের নেতা ফারুক নিচে পড়ে যান। তখন তাকে ঘিরে ধরে বেধড়ক মারধর করে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এরপর বঙ্গবন্ধু হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন তার মোটরসাইকেলে করে ফারুককে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
এ সময় কোটা আন্দোলনকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা এগিয়ে আসলে তাদের ওপরও হামলা করে ছাত্রলীগ কর্মীরা। এর মধ্যে ছাত্রলীগের অন্তত আটজন নেতাকর্মী এক ছাত্রীকে ঘিরে ধরে বেধড়ক মারধর করে। এ সময় ওই ছাত্রীকে কাঁদতে দেখা যায়।
ছাত্রলীগের হামলা সত্ত্বেও কোটা আন্দোলনকারীরা বেলা ১১ টা ৫ মিনিটে আবারও শহীদ মিনারে জড়ো হন। তখন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক সাইফ বাবু, মুহসীন হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সানীর নেতৃত্বে তাদের ওপর ফের হামলার ঘটনা ঘটে।
কোটা বাতিলে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারির দাবিতে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ডাকে সারা দেশে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি চলছে। এর সাথে গতকাল সোমবার জাতীয় পতাকা নিয়ে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচির ঘোষণা দেয় শিক্ষার্থীরা।  শিক্ষার্থীরা জানান, যুগ্ম-আহ্বায়ক নূরুল হক নূরসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা এবং অন্য দুই যুগ্ম-আহ্বায়ক রাশেদ খান ও মাহফুজ খানকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে তাদের এই বিক্ষোভ কর্মসূচি।
কর্মসূচিকে ঘিরে গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন ও কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও কলাভবন এলাকায় অবস্থান নেন। কিছু শিক্ষার্থী শাহবাগের আশেপাশে থাকলেও পরে তারা ক্যাম্পাসে চলে আসেন।
ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের কড়া পাহারার মধ্যেই বেলা সাড়ে ১০টার দিকে ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় চলে আসেন। সেখানে তারা মানববন্ধন করার চেষ্টা করলে কয়েক দফায় মারধরের শিকার হন।
কয়েকজন নারী আন্দোলনকারী অভিযোগ করেন, হামলার সময় ফারুক হোসেনকে বাঁচাতে তারা এগিয়ে গেলে ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে তারাও লাঞ্ছিত হন। এছাড়াও তাদের ‘তুই-তোকারি’ করে নানাভাবে কটূক্তি করার অভিযোগও এনেছেন তারা।
আন্দোলনকারী লুৎফুন্নাহার লিনা এবং লুবনা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, প্রকাশ্যে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা আমাদের ভাইদের গায়ে হাত তুলেছে, মারধর করেছে। তারপরও কেউ তাদেরকে ঠেকাতে আসে নাই। ছাত্রলীগ নেতারা আন্দোলনরত মেয়েদের প্রকাশ্যে নানা ধরনের হুমকি দিচ্ছেন এমন অভিযোগ তুলে তাদের একজন বলেছেন, এখন তারা প্রকাশ্যে হুমকি দেয়। এখন তারা বলে ছেলেদের গুম করে দেওয়া হবে। মেয়েদের ধর্ষণ করা হবে। তারা এত বড় সাহস কোথায় পাচ্ছে?
অপর এক আন্দোলনকারী নারী শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে কটূক্তির অভিযোগ এনে বলেন, তারা বলে, আমরা নাকি তাদের ওয়াইফ। এগুলো কী ধরনের কথা?
কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ফারুককে মারধরের সময় আন্দোলনরত মেয়েদের গায়ে হাত দেয়ার অভিযোগ করে এই দুই নারী শিক্ষার্থী বলেন, তারা (ছাত্রলীগ নেতারা) গায়ে হাত দিয়েছে, তারা ধাক্কাধাক্কি করে আমাদের সেখান থেকে চলে যেতে বলেছে, তুই তোকারি করে কথা বলছে। তারা এমন বেয়াদব, একটা মেয়ের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় ন্যূনতম সেই ভদ্রতাও জানে না। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন মেয়ে, বিরোধীদলীয় নেত্রী মেয়ে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেয়ের সঙ্গে এমন আচরণ করা হলো কেন?
হামলাকারীদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা বলেন, হামলাকারীদের তারা চেনেন কিন্তু নাম জানেন না। নির্যাতিতা একজন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমি আসলে নাম বলতে পারবো না। তারা  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের বিভিন্ন হলের নেতা। মোটরসাইকেলে করে এখানে এসেছিল।’
পরিষদের যুগ্ন আহ্বায়ক লুৎফর নাহার নীলা অভিযোগ করেছেন, আন্দোলনকালীদের ওপর ছাত্রলীগ দফায় দফায় হামলা করলেও প্রশাসন-পুলিশ নীরব ভূমিকা পালন করছে।
হাসান আল মামুন বলেন, আমরা শহীদ মিনারে মানববন্ধনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এ সময় ছাত্রলীগ দফায় দফায় আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। হামলায় কয়েকজন ছাত্রীসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে।
হামলায় আহত ফারুককে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তুলে নিয়ে গেছে জানিয়ে মামুন বলেন, তাকে কোথায় নেয়া হয়েছে আমরা জানি না। অবিলম্বে সুচিকিৎসা না দিলে তার শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হওয়ার আশঙ্কা করছি।
হামলার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মহসীন হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদি হাসান সানী গণমাধ্যমকে বলেন, কোটা সংস্কারের আন্দোলনের নামে ফারুক হোসেন দলবল নিয়ে ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। তাকে প্রতিহত করার জন্যই আজ আমরা মাঠে আছি। কোনও মেয়ের গায়ে হাত দেওয়া হয়নি। ফারুককে যখন আমরা মারধর করছিলাম তখন দুই তিনজন মেয়ে তাকে ঠেকাতে আসে। তখনই তার গায়ে হাত লাগতে পারে। ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু করা হয়নি। তাছাড়া মেয়েদেরকে রেপ করা অথবা কাউকে গুম করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়নি। যারা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা করে আন্দোলন করতে এসেছে তারা প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি করেছে। আমরা তা বরদাস্ত করবো না।
বাধা উপেক্ষা করে মানববন্ধন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিভাগটির শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।
গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় ঢাবির অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এ মানববন্ধন হয়। এ সময় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা সেখানে এসে তাঁদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে বাধা উপেক্ষা করেই প্রায় এক ঘণ্টা মানববন্ধন করেন তাঁরা।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন অভিযোগ জানান, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির স্কুলবিষয়ক সম্পাদক জয়নুল আবেদিন, ত্রাণ ও দুর্যোগ সম্পাদক ইয়াদ আলী রিয়াদ, কৃষি সম্পাদক বরকত হাওলাদার, প্রচার সম্পাদক সাইফ বাবু, সূর্য সেন হলের সভাপতি গোলাম সরোয়ার, বঙ্গবন্ধু হলের সম্পাদক আল আমিন রহমান, বিজয় একাত্তর হলের সভাপতি ফকির আহমেদ রাসেল প্রমুখ নেতাকর্মী মানববন্ধনে বাধা দেয়ার চেষ্টা করে।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, কোটা সংস্কারের যৌক্তিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিল নুরুল হক নুর। সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ তাদের ওপর হামলা করেছে। নুরকে এমনকি হাসপাতালে নিয়ে যেতেও বাধা দেয়। হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে হামলাকারী সন্ত্রাসীদের বিচার দাবি করেন তাঁরা।
ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাসনীম মাহবুব বলেন, কতিপয় ছাত্র (ছাত্রলীগ) আমাদের ওপর হামলা করার চেষ্টা করে। তারা আমাদের বিভিন্ন দলের ট্যাগ দেয়। আমাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়। তারা আমাদের বিভিন্ন কটূক্তি, ধমক দেয়। তারা আমাদের ছবি তোলে। তিনি আরো বলেন, মানববন্ধনে উপস্থিতদের মধ্যে যারা হলে থাকে, তাদেরও ছাত্রলীগ দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। আমরা নিরাপদ ক্যাম্পাস চাই। তিনি ক্যাম্পাসে ছাত্র নির্যাতনের প্রতিবাদ জানান।
হামলার বিষয়ে কিছুই জানেন না প্রক্টর: কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানি কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আজকের ( সোমবার) হামলার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমার প্রক্টরিয়াল বডি বা শিক্ষার্থীরা লিখিত বা মৌখিক কোনোভাবেই বিষয়টি আমাকে অবহিত করেননি।
গতকাল প্রক্টর তার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের একথা বলেন। শহীদ মিনারে মেয়েদের লাঞ্ছিত করা এবং ছাত্রলীগের কাছ থেকে ধর্ষণের হুমকি পাওয়ার বিষয়ে আন্দোলনকারীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি যেহেতু হামলার বিষয়ে অবহিত নই এবং কেউ যেহেতু অভিযোগ করেনি তাই এ নিয়ে কিছু বলতে পারছি না। অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেবো।
ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়েছে দাবি করায় এ বিষয়ে প্রক্টরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সাংবাদিকরা জানতে চান ‘ঢাবি ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলার দায়িত্ব ছাত্রলীগের নাকি প্রক্টরিয়াল বডির?’ এর উত্তরে প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানি বলেন, ‘ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার দায়িত্ব প্রক্টরিয়াল বডির। অন্য কাউকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।’
জাবিতে কোটা আন্দোলনের নেতাকে তুলে নিয়ে যায় ছাত্রলীগ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের আহবায়ক শাকিলুজ্জামানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থেকে তুলে নিয়ে যায় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় ঘোষিত কর্মসূচি ‘পতাকা মিছিল’ শুরু করতে চাইলে তাকে তুলি নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আন্দোলনের আরেক কর্মী রাজিব আহমেদকে চড়-থাপ্পড় দিয়েছে ছাত্রলীগ নেতারা।
এদিকে বিপুল পরিমাণ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী লাইব্ররির সামনে অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে। ঘটনাস্থলে প্রক্টরিয়াল ও নিরাপত্তার শাখার কয়েকজনকে দেখা গেলেও শাকিলকে তারা উদ্ধার করেনি।
এ বিষয়ে প্রক্টর সিকদার জুলকারনাইন বলেন, কাউকে তুলে নওয়ার ঘটনা শুনিনি। এমনটা হলে আমরা ব্যবস্থা নেব।
প্রজ্ঞাপন নিয়ে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়নি: কোটা সংস্কার নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অগ্রগতি নেই বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম। গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, কোটা সংস্কার বা বাতিলের বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিবেচনাধীন রয়েছে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে সময় লাগবে। বিষয়টি আসলে আপনারা যতটা সহজ ভাবছেন ততটা সহজ নয়, জটিল আছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে একটি কমিটি গঠন করার কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা। এই কমিটি গঠনের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে শফিউল আলম বলেন, কমিটির পর্যায়ে এর আনুষ্ঠানিক কোনো কার্যক্রম নেই। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এই পর্যায়ে কোনো ঘোষণা আসেনি। এটি উচ্চপর্যায়েই রয়েছে। তবে শুরু হয়ে যাবে বলে আশা করছি।
তিনি বলেন, কোটা সংস্কারকে যতটা সহজভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, অতটা সহজ নয়, জটিলতা আছে। অনেক বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সংস্কার কার্যক্রম শেষের বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেয়া যায় কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আমাদের পক্ষে অনুমান করা কঠিন, এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোটা সংস্কারে গঠিত কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কাজ শুরু করেনি। তবে শুরু হয়ে যাবে বলে আশা করছি।
রাবিতে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ছাত্রলীগের হামলা: রাবি রিপোর্টার জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতাদের উপর হামলার প্রতিবাদে ডাকা মানববন্ধনে লাঠি-সোটা ও বাঁশ নিয়ে হামলা করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ। এ সময় ক্যাম্পাসের কয়েকটি স্থানে অন্তত ১২ জনকে বেধড়ক পেঠানো হয় বলে জানা গেছে। হয়রানির ভয়ে আহতরা নাম প্রকাশে রাজি হননি। গত রাতেই রাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু ফেসবুকে কোটা আন্দোলনের নামে যদি কেউ বিশৃঙ্খলা চেষ্টা করলে কঠোর হস্তে দমনের হুমকি দেন।
পূর্বঘোষিত জাতীয় পতাকা মিছিলে পুলিশের উপস্থিতিতে হামলা করে তারা। গতকাল বিকেল ৪ টার দিকে বিশ^বিদ্যালয় প্রধান ফটকের সামনে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসময় ঘটনাস্থল থেকে একজন কোটা আন্দোলনকর্মীকে গুরুতর আহতবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। আহত শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম তারেক।
সরেজমিনে দেখা যায়, জাতীয় পতাকা হাতে বিশ^বিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর দিক থেকে আসছিলেন কোটা আন্দোলনকারীরা। এদিকে আন্দোলনকারীদের কর্মসূচীর খবর পেয়ে বিশ^বিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনুুর নেতৃত্বে প্রধান ফটকে জমায়েত হয় বিশ^বিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
এসময় তাদের হাতে লাঠি সোঠা, জিআই পাইপ, হাতুড়ি, রড দেখা যায়। আন্দোলনকারীদের দেখে ধাওয়া দেয় ছাত্রলীগ। এসময় একজন পড়ে গেলে তাকে লাঠি, রড, হাতুরি দিয়ে উপর্যুপরি মারধর করতে থাকে ছাত্রলীগ নেতারা। রক্তাক্ত অবস্থায় আহত শিক্ষার্থীকে পুলিশের সহায়তায় রাজশাহী মেডিকেল করেজ হাসপাতাল (রামেক) পাঠানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু সাংবাদিকদের বলেন, আপনারা দেখবেন যে যখন নির্বাচনের সময় হয় তখন যারা সরকারবিরোধী আছে তারা ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করার চেষ্ঠা করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলছেন কোটা সংস্কার হবে তারপরও বিভিন্ন সময় কোটা আন্দোলনকারীরা তাকে কটূক্তি করেছে এজন্য আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সতর্ক অবস্থান করছি।
এদিকে ঘটনার সময়ে উপস্থিত থাকা মতিহার থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মাহবুব আলম ছাত্রলীগ নেতাদের ক্যাম্পাসের ভিতরে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, ছাত্রলীগ ও কোটা আন্দোলনকারীদের মাঝে সংঘর্ষ হয়েছে। একজন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। ওই শিক্ষার্থীকে পুলিশের সহায়তায় রামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
রংপুর অফিস : গতকাল দুপুরে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা বিরোধী বিক্ষোভ ও পতাকা মিছিলে বাধা দিয়েছে ছাত্রলীগ। এর আগে সকাল থেকে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসেল চত্বরে সমবেত হয়ে মিছিল বের করার চেষ্টা করলে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা কোটা বিরোধীদের ঘিরে রাখে।
এ সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও কোটা বিরোধীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলে পুলিশ চতুর্দিকে বেষ্টনী তৈরী করে অবস্থান নেয়ার কারণে আন্দোলনকারীরা শেষ পর্যন্ত  পূর্বনির্ধারিত  বিক্ষোভ ও পতাকা মিছিল বের করতে পারেনি।
পরে আন্দোলনকারীদের নেতা ওয়াদুদ জানান, অব্যাহত হুমকি ধামকির কারণে আমরা কর্মসূচী পালন করতে পারিনি। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আমাদের বিভিন্ন ভাবে হুমকী দিচ্ছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জানিয়েছে, তারা কাউকে হুমকি দেয়নি। রংপুর কারমাইকেল কলেজ, সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ ও সরকারি রংপুর কলেজে কোটা বিরোধী কোন কর্মসূচী পালিত হয়নি।
সিলেট ব্যুরো : সিলেটে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের মিছিল করতে দেয়নি পুলিশ। এ সময় আন্দোলকারীদের ব্যবহৃত মাইকও বন্ধ করে দেয় পুলিশ। তবে পুলিশের বাধার মুখেও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে কিছু সময় অবস্থান করে মানববন্ধনেই কর্মসূচি শেষ করে আন্দোলনকারীরা। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল সকাল ১১টার দিকে সাধারণ শিক্ষার্থী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে চৌহাট্টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সামনে জড়ো হয়ে মানবন্ধন করে আন্দোলনকারীরা। এ সময় সিলেট মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি মডেল থানার একদল পুলিশ সেখানে এসে আন্দোলনকারীদের চলে যেতে বলে এবং তাদের মাইক বন্ধ করে দেয়।
এসময় আন্দোলকারীদের সাথে পুলিশের দস্তাদস্তিও হয়। একপর্যায়ে আন্দোলকারীরা বিক্ষোভ মিছিল করতে চাইলে তাতেও পুলিশ বাধা দেয়। পরে মিছিল না করেই চলে যায় আন্দোলনকারীরা। পরবর্তীতে নতুন কর্মসূচি জানানো হবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
আন্দোলনকারীরা বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন একটি যৌক্তিক আন্দোলন। এ আন্দোলনের কর্মীদের নানা অজুহাতে আটক ও পুলিশি হয়রানি করা হচ্ছে। এমনকি ছাত্রলীগ দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। নিপীড়ন করে এ আন্দোলন দমন করা যাবে না উল্লেখ করে তারা বলেন, কোটা বাতিল নয়, সংস্কারের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তারা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ