ঢাকা, মঙ্গলবার 3 July 2018, ১৯ আষাঢ় ১৪২৫, ১৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সবার অংশগ্রহণে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যাশা সকলের

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : কেন্দ্র দখল, বিরোধী এজেন্টদের বের করে দেয়া, প্রতিপক্ষের সমর্থকদের হুমকি-নির্যাতনসহ বহুল সমালোচিত গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশীদের তুলোধুনো করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সরকারি দল বলছে, বিদেশীরা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করতে পারেন না। তবে বিশ্লেষকরা ক্ষমতাসীনদের এই বক্তব্যকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করছেন। তারা বলছেন, বাংলাদেশের চলমান অস্থিতিশীল পরিবেশ নিয়ে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ দাতা সংস্থাগুলোর বক্তব্য নতুন কিছু নয়। এছাড়া ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের আগে প্রতিবেশী দেশ ভারতের ভূমিকা ছিল প্রকাশ্য। দেশটি ক্ষমতাসীন আ’লীগের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছিল। জাতীয় পার্টির সে সময়কার ডিগবাজির রাজনীতি এবং দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের নানা নাটকীয়তার পেছনে ভারতকেই দায়ী করা হয়। এর আগে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় এই দেশ ও সংস্থাগুলোই দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিয়েছিল। এমনকি অনেক দেশ বিবৃতি পর্যন্ত দিয়েছে। তখন আওয়ামী লীগ এসব নিয়ে কিছুই বলেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যখনই নিজেদের বিরুদ্ধে যায় তখন সেটি যেই হোক না কেন আওয়ামী লীগের কাছে তারা শত্রু হয়ে যায়। এবারো তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। দেশের অরাজক পরিস্থিতি, দখল, বিরোধী নেতাকর্মীদের গুম, মানবাধিকার পরিস্থিতিসহ একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা যারাই বলছে তারাই সরকারের সমালোচনার মুখে পড়ছে।
সূত্র মতে, দেশের প্রায় সব ক’টি দল, সুশীল সমাজ এবং বিদেশীরা বাংলাদেশে সবার অংশগ্রহণে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চান। তবে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেভাবে সরকারি দলের অনমনীয় বক্তব্য চলছে তাতে করে জনমনে শংকা তৈরি হচ্ছে এই জন্য যে, আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের উত্তরণ ঘটবে, নাকি আবারো একটি একদলীয় ভোটারবিহীন নির্বাচনের প্রহসন ঘটবে এমন আশঙ্কার কারণে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, একটি অংশগ্রহণমূলক অর্থপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান জাতির আকাক্সক্ষা ও দেশের স্বার্থেই জরুরি। তাদের মতে, এর মাধ্যমে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করে বাংলাদেশ দ্রুত উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে, দেশ থেকে দারিদ্র্য মোচন হবে, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা চাঙ্গা হবে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা রয়েছে। বহু বিতর্কিত ও কলংকিত দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২০১৯ সালের ৫ জানুয়ারি। তার আগেই নির্বাচন হতে হবে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাতে দেশে এবং দেশের বাইরে আগামী নির্বাচন নিয়ে ঔৎসুক্য ও আগ্রহ প্রবল। ওই নির্বাচনের কারণে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা অনেক কমেছে। দেশ পিছিয়ে গেছে মানবাধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসনসহ প্রায় সকল ক্ষেত্রেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর হাতে সাধারণ মানুষের নিগৃহীত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগের কারণ রয়েছে। শুধু সরকারি বাহিনী নয়, ক্ষমতাসীন মহলের হাতেও মানুষ লাঞ্ছিত হচ্ছে। হত্যা, গুম, বিনা বিচারে আটক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ অব্যাহত আছে। বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক দুর্নীতিপ্রবণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কুখ্যাতি রয়েছে। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত নেই বলে এখানে জবাবদিহিতার প্রচ- অভাব। আর জবাবদিহিতার অভাবেই দেশে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের বিস্তার ঘটেছে। খর্ব হচ্ছে জনগণের অধিকার।
সূত্র মতে, বাংলাদেশের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বেশী উদ্বেগ-উৎকন্ঠা জানাচ্ছে জাতিসংঘ। তারা বারবার বলছে আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ দেখতে চায় তারা। সেই সাথে বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে সফরে আসা বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরাও একই ধরনের কথা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে অবহিত করে গেছেন। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের বিষয়ে ইতবাচক মতামত প্রকাশ করা হচ্ছে।
গেল বছর সচিবালয়ে নিজ দফতরে ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী এবং ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি রবার্ট বি. ওয়াটকিনসের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আগামী নির্বাচনে জাতিসংঘ বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ দেখতে চায়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী বেশ কয়েকটি ইস্যুতে আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে আগামী নির্বাচন বিষয়ে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচন হতে হবে স্বচ্ছ, অবাধ ও নিরপেক্ষ। আমরা চাই শান্তিপূর্ণভাবে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। সব দলের অংশগ্রহণ আমরা দেখতে চাই।
২০১৬ সালের নভেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ক কমিটির প্রতিনিধিদলের প্রধান জিন ল্যামবার্ট ঢাকায় ইইউ দূতাবাসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন, তারা বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন সামনে রেখে শক্তিশালী ও সক্ষম একটি নির্বাচন কমিশন গঠনে জোর দিচ্ছে। তিনি আরো বলেছিলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গঠিত ওই নতুন নির্বাচন কমিশনটি এমন হতে হবে, যাতে অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে ভোটারদের আস্থা থাকবে। আগামী নির্বাচনকে অংশগ্রণমূলক করতে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির কথাও বলেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। জিন ল্যামবারট বলেন, বাংলাদেশের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন এমন একটি পরিবেশে হতে হবে, যাতে করে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়ার সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে। এরপর ঢাকা সফরকালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদের দলের প্রধান আর্নে লিট্জ বিজিএমইএর সাথে বৈঠকের পর সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত। আমি মনে করি এখানে সবাইকে তার মত প্রকাশ করতে দেয়া উচিত।
২০১৬ সালের ৯ জুন ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে পার্লামেন্টের সদস্যরা বলেছেন, বাংলাদেশে বিগত বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের বিষাক্ত প্রভাব কেউ অস্বীকার করতে পারে না। এটা প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। একইসাথে সহিংসতাকে উসকে দিয়েছেÑ যা আমরা এখনো প্রত্যক্ষ করছি। যত দ্রুত সম্ভব তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনই বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের একমাত্র উপায়। বাংলাদেশ পরিস্থিতির ওপর ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অধিবেশনে এসব মন্তব্য করা হয়েছে। এতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ক্রিশ্চিয়ান ড্যান প্রেদা বলেন, আমি বাংলাদেশে সহিংসতার ধারাবাহিকতায় খুবই উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, বিগত জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে বাংলাদেশে নাজুক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন রাজনৈতিক পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এই অংশীদারের সাথে আলোচনা করে দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশের উন্নয়নের জন্য আহ্বান জানানো উচিত।
আরেক সদস্য জোসেফ ওয়াইডেনহোলজার বলেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিপজ্জনক গৃহযুদ্ধের আশঙ্কাও নাকচ করে দেয়া যায় না। রাজনৈতিক দুই শিবির একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এর ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে এবং সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকেই এই পরিস্থিতির সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করছে। আমজাদ বশির বলেন, সাম্প্রতিক সহিংসতা বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমরা অবশ্যই একটি সার্বভৌম দেশের নিজস্ব ব্যাপারে নাক গলাতে পারি না। কিন্তু সহিংসতাকে নিন্দা জানানো ও রাজনৈতিক সংলাপের জন্য উৎসাহিত করার দায়িত্ব আমাদের রয়েছে। বাংলাদেশকে সঠিক পথে ফেরার বাস্তবসম্মত উপায় হলো, দেশটির নেতৃত্বস্থানীয় দলগুলোকে সত্যিকারের নেতৃত্ব দেখাতে হবে, যাতে করে দেশটিকে বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বের করে আনা যায়। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক কমিশনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও ডাচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বার্ট কোয়েন্ডার্স বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক, মানবাধিকার ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে।  কোয়েন্ডার্স বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা পরিপূর্ণভাবে পুনর্বহাল করতে হবে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের গণহারে গ্রেফতার ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
গতবছরের ৫ মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনে নতুন দায়িত্ব পাওয়া সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী (ভারপ্রাপ্ত) উইলিয়াম ই টড ওয়াশিংটনের তরফে ‘শুভেচ্ছা সফরে’ ঢাকায় এসেছিলেন। সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার দু’দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বাংলাদেশ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসছে কি-না জানতে চাইলে জবাবে মার্কিন দূত স্পষ্ট করেই বলেন, ক্ষমতা পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্র নীতি পরিবর্তন করতে পারে এমন কথা চিন্তাই করা যায় না। আমরা চাই চলমান উদ্বেগ-উৎকন্ঠার অবসান হোক। একই বছরের ৪ মার্চ যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ দফতরের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিষয়ক মন্ত্রী অলোক শর্মাও ঢাকা সফর করেন। এ সময় তিনি অন্যান্যের মধ্যে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গেও বৈঠক করেন। বৈঠকের পর অলোক শর্মার সাথে আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন দেখতে আগ্রহী যুক্তরাজ্য। দেশটি চায় বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকার হোক। নির্বাচনেও এর প্রতিফলন দেখতে চায় তারা।
বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে শুধু বক্তব্য দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তারা এর জন্য বিবৃতিও দিয়েছে। গেল বছরের ৯ ডিসেম্বও এক বিবৃতিতে জানায়, বাংলাদেশে অবাধ সুষ্ঠু ও সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায় ইইউ। বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মানদ- অসুসরণ করে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন দিতে হবে। গত কয়েক বছর ধরে সংস্থাটি বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা নিয়ে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি ইউরোপীয় পার্লামেন্টারি প্রতিনিধি দলের নেতা জঁ ল্যামবার্ট ঢাকায় বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বেশ জটিল মনে হচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপার্সনের সাজা হলেও রাজনৈতিক দল হিসেবে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে তাদের আগ্রহী হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ল্যামবার্ট বলেন, দলীয় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ার কারণে বিএনপি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এমনকি দলটির জন্য নির্বাচনে প্রচার চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরও রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিকে আগামী নির্বাচনে আগ্রহী হওয়াটা জরুরি। তিনি আরও বলেন, আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক এবং সুষ্ঠু পরিবেশে অনুষ্ঠানে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তারা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলেছেন।
সূত্রমতে, এ মুহূর্তে ভারতের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বাংলাদেশের একাদশ নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা না বললেও গত অক্টোবরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসে ‘সবার অংশগ্রহণে স্বচ্ছ নির্বাচনের’ তাগিদ দিয়ে গেছেন। এছাড়া তারা অনানুষ্ঠানিকভাবেও একই কথা বলছেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনারও একই কথা বলেছেন। এমনকি নির্বাচনে তার দেশ সহযোগিতা করবে বলেও তিনি একাধিকবার বলেছেন।
সূত্র বলছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো যেনতেন একটি নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকতে চায় আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন দলটির বেশিরভাগ নেতাই সেটা চাচ্ছেন। তারা আশা করছেন, তাদের নির্বাচনী তরী পার করে দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষমতাসীনদের এমন মনোভাবের চিত্র স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত খুলনা ও গাজীপুর সিটি নির্বাচনে ভোট ডাকাতিই তার প্রমাণ।
ক্ষমতাসীনদের এমন জবর দখলের বিরুদ্ধে আবারো সরব হয়ে উঠেছে বিদেশীরা। অতীতে কখনো চীনকে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়নি। কিন্তু এবার চীনও এ বিষয়ে বেশ সোচ্চার। তারা বলছে, বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার হস্তান্তর দেখতে চায় দেশটি।
বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায় যুক্তরাজ্য। গত শুক্রবার ঢাকায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে যুক্তরাজ্যের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিষয়ক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মার্ক ফিল্ড এ কথা বলেন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মার্ক ফিল্ড বলেন, বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায় যুক্তরাজ্য। যেখানে সব দল ভূমিকা রাখবে। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের এখানকার নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। তিনি মনে করেন, নির্বাচনের পর যে সরকার গঠিত হবে, তাতে জনমতের প্রতিফলন ঘটবে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার ডিপ্লোমেটিক করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন  বাংলাদেশ (ডিকাব) আয়োজিত অনুষ্ঠানে মার্শা বার্নিকাট খুলনা ও গাজীপুর নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। বার্নিকাট বলেছেন, খুলনা ও অতি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ছিনতাই এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও পোলিং এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের খবরে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। এ ছাড়া বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও পোলিং এজেন্টদের গ্রেফতার ও পুলিশি হয়রানির বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। মার্শা বার্নিকাট বলেন, বাংলাদেশ সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যে নির্বাচনে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে। আমরা দেখতে চাই, সরকার তার অঙ্গীকার পূরণ করবে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে বার্নিকাট বলেন, ওই স্থিতিশীলতা কেবল অবাধ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে করা করা সম্ভব।
এদিকে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভোট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের দেয়া বক্তব্যের কড়া সমালোচনায় মুখর আ’লীগ। তারা বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশী কর্মকর্তার বক্তব্য কেবল অযৌক্তিকই নয়, শিষ্টাচার বহির্ভূতও। এই প্রসঙ্গে গত নবেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনকে কারচুপি করে হারানোর অভিযোগ নিয়েও কথা বলেন আওয়ামী লীগ নেতারা। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, নিজেদের নির্বাচন নিয়ে যে দেশে বিতর্ক উঠেছিল সে দেশের কর্মকর্তার মুখে অন্য দেশের নির্বাচন নিয়ে কথা বলা শোভা পায় না। সভাপতিম-লীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বলেন, একজন রাষ্ট্রদূত হয়ে তার (বার্নিকাট) এ ধরনের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এভাবে কথা বলা সমীচীন হয়নি। তিনি বলেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য অনভিপ্রেত। একটা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে আরেকটা দেশের রাষ্ট্রদূতের কথা বলা সমীচীন নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যারাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলছে তাদের ছাড় দিচ্ছে না তারা। একই অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও। গত ৯ বছর ধরে আমেরিকাকে শুধু গালাগালি দিয়েই যাচ্ছে দলটি। ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে দীর্ঘকাল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে সেই নির্বাচনটিও কারো কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। যেমনীভাবে ২০১৪ সালের টা পায়নি। সরকার যদি মনে করে আবারো যেনতেন নির্বাচন করবে তাহলে তারা ভুল করবে। এই নির্বাচন দেশের ভবিষ্যৎ অনেক কিছুই নির্ধারণ করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ