ঢাকা, মঙ্গলবার 3 July 2018, ১৯ আষাঢ় ১৪২৫, ১৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে মায়ানমারে পাঠানো হবে

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম গতকাল সোমবার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যান -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: রোহিঙ্গাদের চরম দূর্দশা নিজ চোখে দেখলেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। নিজ কানে শুনলেন তাদের ওপর মায়নমার সেনাদের চালানো দূর্বিষহ নির্যাতনের বর্ণনা। কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গাদের কাছে মিয়ানমার সেনাদের নিষ্ঠুর নিপীড়নের বর্ণনা শুনে গুতেরেস বলেন, রোহিঙ্গারা তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের যেই বর্ণনা দিয়েছে তাতে আমার হৃদয় ভেঙে গেছে। কিম বলেন, রোহিঙ্গাদের করুণ অবস্থা দেখে নিজেকে একজন রোহিঙ্গা বলে মনে হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে মিয়ানমারে পাঠাতে কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বসম্প্রদায়ের সহযোগিতা চান তারা।
গতকাল সোমবার মায়ানমার সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ মিলিশিয়াদের হত্যাযজ্ঞের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে এই অনুভূতির কথা জানান দুই বিশ্ব সংস্থার প্রধানগণ। জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট এদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত উখিয়ার কুতুপালংয়ে বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবির সরেজমিন প্রত্যক্ষ করেন।। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর প্রধান ফিলিপো গ্রান্ডি, আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের প্রেসিডেন্ট পিটার মুরারও কক্সবাজার সফরে গুতেরেস ও কিমের সঙ্গে ছিলেন।
তারা নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। পাঁয়ে হেঁটে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী বাড়িঘর দেখেন এবং তাঁদের খোঁজ-খবর নেন। এছাড়াও জাতিসংঘ মহাসচিব ভিন্ন সাহায্য সংস্থার কার্যক্রম প্ররিদর্শন করেন। রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি দেখতে দুই দিনের সফরে শনিবার ঢাকায় আসেন আন্তোনিও গুতেরেস ও জিম ইয়ং কিম। তারা জানিয়েছেন, এ সঙ্কট এবং রোহিঙ্গাদের দুর্দশা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিজ চোখে দেখে সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, রোহিঙ্গাদের শরীরে এখনো মিয়ানমারের সেনাদের চালানো নির্যাতনের ভয়াবহ চিহ্ন আছে। হত্যা আর ধর্ষণের যে বিবরণ শুনেছি তা অকল্পনীয়। গ্রামে গ্রামে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও- পোড়াওয়ের ভয়াবহ বিবরণ পাওয়া গেছে। গত ১১ মাস ধরে বিভিন্ন মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের চালানো নিপীড়নের কথা শুনছিলাম। আজ (সোমবার) নিজে সরাসরি শুনলাম। রোহিঙ্গারা তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের যেই বর্ননা দিয়েছে তা শুনে আমার হৃদয় ভেঙে গেছে।
গুতেরেস বলেন, রোহিঙ্গারা তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার চায়, তারা নিরাপদে বাড়ি ফিরে যেতে চায়। সব অধিকার দিয়েই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে। এ জন্য বিশ্বসম্প্রদায়কে আরও জোরালো ভূমি রাখাতে হবে। তবে রোহিঙ্গাদের সহসাই ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না বলে মনে হয় না। রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বিশাল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যেই মানবতা দেখিয়েছে তা বিশ্বে নজিরবিহীন ঘটনা। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘ সবসময় বাংলাদেশের পাশে থাকবে।
গুতেরেস বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যে অবস্থা দেখেছি তা এক ট্র্যাজিক ঘটনা। ছোট ছোট রোহিঙ্গা শিশুদের দেখে আমার নাতি নাতনিদের কথা মনে পড়ে গেছে। তাদের অবস্থাও যদি এমন হতো তাহলে কিরকম হতো! রোহিঙ্গারা যাতে দেশে ফিরে যেতে পারেন সেজন্যে কাজ করে যাচ্ছি। মায়ানমার পরিকল্পিতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। এই অবস্থা এভাবে চলতে পারে না। এর একটা সমাধান করতে হবে।
বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেন, রোহিঙ্গাদের কষ্ট আর তাদের অসহায়ত্ব দেখে নিজেকেই একজন রোহিঙ্গা মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের সব ধরনের সহায়তা দেয়ার জন্য বিশ্ব ব্যাংক সব সময় প্রস্তুত। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের পাশে থাকবে।
মায়ানমারের রাখাইনে নতুন করে সেনা অভিযান শুরুর পর গত দশ মাসে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। সেনাবাহিনীর ওই অভিযানকে জাতিসংঘ বর্ণনা করে আসছে জাতিগত নির্মূল অভিযান হিসেবে। আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটকে এশিয়ার এ অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলে আসছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে থাকা শরণার্থীরা যাতে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং সম্মানের সঙ্গে নিজেদের দেশে ফিরে যেতে পারে এবং এই প্রত্যাবাসন যাতে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করে হয়, তা নিশ্চিত করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে মিয়ানমারকে।
গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সন্ত্রাসবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের নামে শুরু হয় নিধনযজ্ঞ। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। পাহাড় বেয়ে ভেসে আসতে শুরু করে বিস্ফোরণ আর গুলির শব্দ। পুড়িয়ে দেওয়া গ্রামগুলো থেকে আগুনের ধোঁয়া এসে মিশতে থাকে মৌসুমী বাতাসে। মানবাধিকার সংগঠনের স্যাটেলাইট ইমেজ, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন আর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, মায়ের কোল থেকে শিশুকে কেড়ে শূন্যে ছুড়তে থাকে সেনারা। কখনও কখনও কেটে ফেলা হয় তাদের গলা। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় মানুষকে। এমন বাস্তবতায় নিধনযজ্ঞের বলি হয়ে রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় অন্তত সাত লাখ রোহিঙ্গা।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রোহিঙ্গারা রাখাইনে থাকলেও মিয়ানমার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করে না। উগ্র বৌদ্ধবাদকে ব্যবহার করে সেখানকার সেনাবাহিনী ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে স্থাপন করেছে সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের চিহ্ন। ছড়িয়েছে বিদ্বেষ। ৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনে পরিচয়হীনতার কাল শুরু হয় রোহিঙ্গাদের। এরপর কখনও মলিন হয়ে যাওয়া কোনও নিবন্ধনপত্র, কখনও নীলচে সবুজ রঙের রসিদ, কখনও ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড, কখনও আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি নামের রংবেরঙের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষকে। ধাপে ধাপে মলিন হয়েছে তাদের পরিচয়। ক্রমশ তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে রাষ্ট্রহীন বেনাগরিকে।
২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে সংঘটিত নিধনযজ্ঞের ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপ জোরালো হওয়ার পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তিতে বাধ্য হয় মিয়ানমার। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কথিত বৈধ কাগজপত্রের অজুহাতসহ নানা কারণে প্রক্রিয়াটি এখনও বিলম্বিত করে যাচ্ছে মিয়ানমার। ওই চুক্তির আওতায় এখনো পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও রাখাইনে ফিরতে পারেনি।
চূড়ান্ত অর্থে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে ভূমিকা রাখতেই জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস শনিবার (৩০ জুন) দিবাগত রাতে ঢাকায় আসেন। একইদিনে মহাসচিবের আগে আসেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট। রোহিঙ্গাদের দেখতে গতকাল (২ জুলাই) সকাল ৯টায় বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেট কক্সবাজারে পৌঁছান। কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম হোটেল সায়মনে যান। সেখানে তাদেরকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। বিকালে বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম ঢাকার উদ্দেশে কক্সবাজার ত্যাগ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ