ঢাকা, মঙ্গলবার 3 July 2018, ১৯ আষাঢ় ১৪২৫, ১৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মন্ত্রিসভায় কোটা নিয়ে সিদ্ধান্ত বিবেচনাধীন একটু সময় লাগবে -মন্ত্রিপরিষদ সচিব

স্টাফ রিপোর্টার : সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল, সংরক্ষণ বা সংস্কারের বিষয়টি নিয়ে অনেক বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত আসবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম। বিষয়টি সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে বিবেচনাধীন আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এতে জটিলতা আছে, একটু সময় লাগবে।’ গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সচিব এ কথা বলেন। কোটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনার অগ্রগতি সম্পর্কে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে সচিব আরও বলেন, ‘এটা সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে সক্রিয় বিবেচনাধীন আছে। আমাদের পর্যায়ে এখনো আসেনি। তবে আপনারা যত সহজভাবে এটা বিশ্লেষণ করছেন, তত সহজ নয়। জটিলতা আছে। অনেক বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত আসবে। আমরা সেই আলোকে কার্যক্রম নেব।’
কবে শেষ হবে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘এটা অনুমান করা কঠিন। একটু সময় লাগবে মনে হচ্ছে।’ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে বর্তমানে ৫৫ শতাংশ নিয়োগ হয় অগ্রাধিকার কোটায়। বাকি ৪৫ শতাংশ নিয়োগ হয় মেধা কোটায়। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতেও আছে বিভিন্ন ধরনের কোটা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মেধা তালিকা থেকে বিভিন্ন কোটার শূন্যপদ পূরণের জন্য মন্ত্রিসভা বর্তমান সরকারের পুন পরীক্ষণ পদ্ধতির পাশাপাশি বিগত তিনটি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার নিয়োগ পদ্ধতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছে। বর্তমান নিয়মে সিভিল সার্ভিসের ৪৫ শতাংশ পদ মেধাবী প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত, ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য, ১০ শতাংশ নারী, ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ১০ শতাংশ জেলা (কিছু ক্ষেত্রে) এবং এক শতাংশ দৈহিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের (কিছু ক্ষেত্রে) জন্য সংরক্ষিত।
তিনি বলেন, এদিকে ৩৩তম বিসিএস-এ প্রায় ৭৭ দশমিক ৪০ শতাংশ পদ মেধা কোটা থেকে পূরণ করা হয়েছে। তাছাড়া ৩৫তম ও ৩৬তম বিসিএস থেকে যথাক্রমে ৬৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ ও ৭০ দশমিক ৩৮ শতাংশ পদ পূরণ করা হয়েছে মেধা তালিকা থেকে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘বস্তুত কোটা পদ্ধতি মেধাবীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন সমস্যা তৈরি করেনি।’ সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। আন্দোলনের একপর্যায়ে গত মার্চ মাসে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে। পরে গত ৮ এপ্রিল ঢাকার শাহবাগে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ লাঠিপেটা করলে এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে মারলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ঘটনার পরদিন এই আন্দোলন সারা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন।
কোটা সংস্কার নিয়ে সরকারি কোনো প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় গত শনিবার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা তাঁদের অবস্থান জানাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন। সংবাদ সম্মেলন শুরু হওয়ার আগে ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান। আজও আন্দোলনকারীদের মারধর করা হয়।
সরকারি খাতের শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের নূন্যতম বেতন ৮ হাজার ৩০০ টাকা অনুমোদন: মন্ত্রিসভায় জাতীয় বেতন ও উৎপাদনশীলতা কমিশন-২০১৫ এর সুপারিশ অনুযায়ী সরকারি খাতের শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের জন্য জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ ঘোষণা এবং নূন্যতম বেতন ৮,৩০০ টাকা অনুমোদন দেয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম বলেন, বর্তমান জাতীয় বেতন স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কমিশন কর্মচারিদের বেতন প্রায় শতভাগ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে।
শফিউল আলম বলেন, ১৬ টি গ্রেডে বেতন স্কেল দেয়া হবে এবং সর্বনি¤œ স্কেল হবে ৮,৩০০ টাকা, যা বর্তমানে ৪, ১৫০ টাকা। সর্বোচ্চ বেতন বর্তমান ৫,৬০০ থেকে বাড়িয়ে ১১,২০০ টাকায় উন্নীত করা হবে।
কর্মচারিরা মূল বেতনের শতকরা ৫০ভাগ বাড়ি ভাড়া হিসেবে পাবেন, চিকিৎসা খরচ হিসেবে ১,৫০০টাকা, যাতায়াত ভাতা ২০০ টাকা, পরিচ্ছন্নতা ভাতা হিসেবে ১০০টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা, নববর্ষের ভাতা মূল বেতনের শতকরা ২০ভাগ, উৎসব ভাতা হিসেবে দুই মাসের মূল বেতনের সমান দেয়া হবে। সেই সঙ্গে অর্জিত ছুটির নগদায়ন ও অন্যান্য সুবিধা দেয়া হবে।
তিনি বলেন, ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে শ্রমিকদের এই বেতন কার্যকর হবে এবং ২০১৬ সালের ১ জুলাই এই ভাতাসমূহ কার্যকর হয়। মন্ত্রিসভা ক্ষতিকর জীবাণূ প্রতিরোধে মাছের আমদানী নিয়ন্ত্রনের লক্ষে ফিসারিজ কোয়ারান্টাইন আইন ২০১৮-এর খসরার অনুমোদন দিয়েছে। এই আইন বলে মৎস্য কোয়ারান্টাইন কর্তৃপক্ষ নৌ, সড়ক ও আকাশ পথে বা যে কোন রুটে যে কোনো ধরণের মৎস্য বা মৎস্য প্রজাতির যে কোন কিছু আমদানী মনিটর করবে। মৎস্য বিভাগ কোয়ারানটাইন কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে। তিনি আরো বলেন, এ আইন লঙ্ঘন করলে যে কোনো ব্যক্তি বা কোনো কোম্পানী মালিককে সর্বনিম্ন এক বছর ও সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদ- প্রদান অথবা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় সাজা প্রদান করা যাবে।
পুলিশ, র‌্যাব, কোস্টগার্ড, বিজিবি, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ রেলওয়ে, শিপিং এজেন্সিসমূহ ও সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান এই আইনের অবমাননা প্রতিরোধে ও মৎস্য কর্মকর্তাদের এই আইন প্রয়োগে সহায়তা করবে। এই আইনের আওতায় যে কোনো অপরাধ অ-আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের এখতিয়াধীন। তবে কোনো আদালত কোয়ারান্টাইন কর্মকর্তার লিখিত অভিযোগ ব্যতিরেকে কোনো মামলা গ্রহন করবেন না। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মন্ত্রিসভা আগামী তিন বছরের জন্য দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে।
মন্ত্রিসভায় বাসস আইনের খসড়া অনুমোদন: মন্ত্রিসভা সোমবার বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর খসড়া আইন অনুমোদন করেছে। জাতীয় সংবাদ সংস্থা হিসেবে ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি ১৯৭৯ সালে জারিকৃত অধ্যাদেশের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের পর বাংলাদেশ সচিবালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম বলেন, ১৯৭৯ সালের অধ্যাদেশের কিছু পরিবর্তন এনে খসড়া আইনটি প্রণীত হয়েছে। এসোসিয়েট প্রেস অব পাকিস্তান (এপিপি)-র স্থলে ১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)। সংস্থাটি পরিচালনায় ১৯৭৯ সালে সামরিক শাসনামলে অধ্যাদেশ জারি হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে সংবাদ পরিবেশনের দায়িত্বে নিয়োজিত জাতীয় সংবাদ সংস্থা বাসস পরিচালনার জন্য প্রণীত এই প্রথম আইনটি জাতীয় সংসদে পাসের মাধ্যমে কার্যকর হবে।
খসড়ায় সংস্থাটি পরিচালনার জন্য ৩ বছর মেয়াদী ১৩ সদস্যের একটি বোর্ড গঠনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এতে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সদস্য থাকবেন। সরকার বোর্ডের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেবে এবং এই জাতীয় সংবাদ সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক পদের জন্য সাংবাদিকতায় ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন সাংবাদিক যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। সংস্থাটি একই সঙ্গে কম্পোট্রোলার ও অডিটর জেনারেল (সিএন্ডএজি) এবং চার্টার্ড একাউন্ট ফার্ম দিয়ে নিরীক্ষার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ