ঢাকা, মঙ্গলবার 3 July 2018, ১৯ আষাঢ় ১৪২৫, ১৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য

সুবাহ তাসনীম : কয়েকদিন আগে এক ছোট্ট মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তুমি কেন পড়াশুনা করো?” উত্তর ছিলো এরকম, “না হলে, মা, বাবা, মিস সবাই বকবে।” আবার কলেজ পড়ুয়া এক ছাত্রীকেও একই প্রশ্ন করাতে সে উত্তর দিলো, “ডাক্তার হবো, তাই।” এভাবে বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদেরকে এ প্রশ্নটি করা হলে তাদের সকলের উত্তরের সারাংশ এই যে, সকলে শুধুমাত্র জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। এটা অবশ্যই ঠিক যে জীবনে প্রতিষ্ঠিত না হলে, এ দুনিয়ায় তার মূল্য নগণ্য হয়। সমাজে তার সম্মান মর্যাদা থাকে না। কিন্তু সত্যি কি শিক্ষিত হওয়ার উদ্দেশ্য কেবলমাত্র দুনিয়াবী সাফল্য? তবে আল্লাহ কেন একে ফরয ঘোষণা করেছেন?
“পড়, তোমার রবের নামে। যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট বাঁধা রক্তপিন্ড থেকে। পড় এবং তোমার রব বড়ই মেহেরবান, যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান দিয়েছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন, যা সে জানতো না।” (সূরা আলাক্ব: ১-৫)
হেরা গুহার অন্ধকার ভেদ করে সর্বপ্রথম যে আলোর বাণী সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স:) এর কাছে এসে পৌঁছেছিলো তা এই পাঁচটি আয়াত। মানবজাতির জন্য পথনির্দেশনা হিসেবে কুরআন নাযিল হয়েছে আর সেটি নাযিল হয়েছে জ্ঞান অর্জনকে ফরয করার মাধ্যমে। ফলে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরয। কিন্তু হাদিসে আছে-“প্রত্যেক কাজের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।” (বুখারী)
এ অনুযায়ী আমরা বুঝতে পারি যে, কেউ একজন মুসলমান হয়েও তার নিয়তের ভুলের জন্য জ্ঞান অর্জন করা সত্ত্বেও এ ফরয কাজটির সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স:) বলেছেন-“যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ইলম হাসিল করে অথবা এ ইলম দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্য কিছু হাসিলের ইচ্ছা করে, সে যেন জাহান্নামে তার বাসস্থান নির্ধারণ করে নেয়।” (তিরমিযী) 
এ হাদিসটি দ্বারা সহজেই অনুমেয় যে, আমাদের শিক্ষা অর্জন করতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। এ উদ্দেশ্যকে প্রাধান্য রেখে, অত:পর আমরা দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করবো যাতে আল্লাহর বিধান সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি। আল্লাহ তায়ালা জ্ঞানী মুসলিমদের পছন্দ করেন। কুরআনের বহু জায়গায় আল্লাহ বিবেকবান, জ্ঞানীদের কথা উল্লেখ করেছেন।
“অবশ্যই এতে বিবেকবান মানুষদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা ত্বাহা: ১২৮)
“নি:সন্দেহে এতে আল্লাহর কুদরতের অনেক নিদর্শন আছে তাদের জন্য যারা জ্ঞানসম্পন্ন সম্প্রদায়ের লোক।” (সুরা নাহল: ৬৭)
“অবশ্যই এর মাঝে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা নাহল: ১১)
আসলে একজন মুসলমান হিসেবে নিজের পথনির্দেশনা জানতে হলে, বুঝতে হলে জ্ঞান অর্জন করতে হবে।তবে এ জ্ঞান শুধুমাত্র পাঠ্যবইয়ের সীমাবদ্ধ জ্ঞান না, এর বিস্তৃতি ব্যাপক। অবশ্যই পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান প্রয়োজন, তবে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এ জ্ঞানের মাধ্যমে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ আমাদের কথা গুরুত্ব সহকারে শোনে ও মানে। এভাবে প্রতিষ্ঠিত অবস্থানে পৌঁছে আল্লাহর বিধান সমূহকে সাধারণদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। আর ব্যক্তিগতভাবে দুনিয়াবী এ শিক্ষার পাশাপাশি সঠিকভাবে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করতে হবে।তার জন্য নিয়মিত কুরআন ও হাদিস অধ্যয়ন করতে হবে। “কুরআন ও হাদিস অধ্যয়ন করতে হবে”- লিখতে ও পড়তে যতটা সহজ মনে হচ্ছে বাস্তবে তা করাটা ঠিক ততটাই কঠিন। কেননা এমন একটি ভালো ও সঠিক কাজ করার সময় শয়তানের পক্ষ থেকে বাঁধা আসবেই তা তো স্বাভাবিক। কুরআনে বলা হয়েছে- “শয়তান তোমাদের দুশমন, তাকে দুশমনই মনে করবে।” (সূরা ফাতির: ৬)
সুতরাং, শয়তানের কথা মাথায় রেখেই এর থেকে রেহাই পেতে দৃঢ় চিত্তে, আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের নিয়ত করেই কুরআন ও হাদিস নিয়ে নিয়মিতভাবে বসতে হবে। আত্মিক উপলব্ধির সাহায্যে কুরআন অধ্যয়ন করতে হবে। অধ্যয়ন বলতে কুরআন পড়ার সাথে সাথে অর্থ ও তার ব্যাখ্যা বা তাফসীর পড়াকে বোঝায়।
এভাবে কুরআন অধ্যয়ন করা হলে তা ব্যক্তির মনে গভীর রেখাপাত সৃষ্টি করবে যা তার আত্মিক উন্নয়নে বিশেষভাবে সাহায্য করবে। তার এ জ্ঞান তাকে অন্যদের চেয়ে পৃথক করবে, আল্লাহর নিকটবর্তীদের অন্তর্ভুক্ত করবে।
এমনই ভাবে, হাদিসও বিস্তারিত পড়তে হবে, তারই সাথে ইসলামের নানা দিক বিষয়ক বই বা সাহিত্য পড়তে হবে। সাহিত্য মনকে নাড়া দিবে, অন্তরকে আন্দোলিত করবে। কুরআন ও হাদিসের বিস্তারিত জ্ঞানের পর সাহিত্যের জ্ঞান ব্যক্তিকে পরিপূর্ণতা দান করতে সাহায্য করবে।
কোন ব্যক্তির দ্বীন ইসলামের এমন পরিপূর্ণ জ্ঞান তাকে ইসলামকে বুঝতে বিশেষভাবে সাহায্য করবে। এ জগতের সৃষ্টিকর্তাকে সে চিনতে পারবে। সে বুঝবে ইসলাম শুধুমাত্র একটি ধর্ম না, বরঞ্চ একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান।সৃষ্টির রহস্য নিয়ে ভাবনা চিন্তা তার মনে খেলা করবে। এসব শিক্ষা ও জ্ঞান নিয়ে সে ব্যক্তি যখন দুনিয়াবী শিক্ষাও অর্জন করতে যাবে, তখন সেখানেও সে পরিপূর্ণতা খুঁজে পাবে। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ইত্যাদি বিজ্ঞান শাখার নানা বিষয়ে কিভাবে আল্লাহর পরিচয় লুকিয়ে আছে তা সে সহজেই বের করতে পারবে। প্রতিটি সৃষ্টির নিপুণতা, এ পৃথিবীর শৃঙ্খলা ও মহা জগতের সুনিয়ন্ত্রণ অবস্থা তার চোখে নতুন করে ধরা পড়বে। এক্ষেত্রে এ বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে যে, কোন ব্যক্তি যখন তার মস্তিষ্ককে দ্বীন ইসলামের বিশুদ্ধতম ইলমের সাথে এমন গভীরভাবে সম্পর্কিত রাখবে, তখন তার সাধারণ পড়াশুনাও অনেক আকর্ষণীয় ও বোধগম্য হয়ে যাবে। যেমন, একজন বিজ্ঞানের ছাত্র বা ছাত্রী কে পদার্থবিজ্ঞানে জাহাজের সাগরের পানিতে ভাসার পদ্ধতি জানতে হয়। সে যখন নিয়মিত কুরআন অধ্যয়ন করবে তখন সে এ বিষয়টি পড়ার সময় সূরা নাহলের ১৪ নং আয়াতের সাথে মিল খুঁজে পাবে, যেখানে জলযানের কথা উল্লেখ আছে।
“তিনি সমুদ্রকে তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন, যেন তার মধ্য থেকে তোমরা তাজা মাছ খেতে পারো এবং তা থেকে তো তোমরা মনিমুক্তার গহণাও আহরণ করো, যা তোমরা পরিধান করো, তোমরা দেখতে পাচ্ছো কিভাবে ওর বুক চিরে জলযানগুলো এগিয়ে চলে, যেন তোমরা এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ (রিযিক) সংগ্রহ করতে পারো, সর্বোপরি তোমরা যেন তাঁর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করো।” (সুরা নাহল: ১৪)
আবার জীববিজ্ঞানে বিভিন্ন শস্যকণার উৎপত্তির বিস্তারিত ব্যাখ্যা পড়তে হয়। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-“যমীনে আবার রয়েছে বিভিন্ন অংশ। কোথাও রয়েছে আংগুরের বাগান, কোথাও আবার শস্যক্ষেত্র, কোথাও আছে খেজুর, তাও কিছু হয়তো এক শির বিশিষ্ট একটার সাথে আরেকটা জড়ানো, আবার কোনটি আছে একাধিক শির বিশিষ্ট অথচ এর সব কয়টিতে একই পানি পান করানো হয়। তা সত্ত্বেও আমি স্বাদে গন্ধে এক ফলকে আরেক ফলের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকি, আসলে এসব কিছুর মধ্যে সে সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে যারা বোধশক্তিসম্পন্ন।” (সূরা রাদ: ৪)
আমাদের ছোটবেলা থেকেই পানিচক্র পড়তে হয়। আর তাও কুরআনে সুন্দরভাবে এসেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-“আমি বৃষ্টি-গর্ভ বায়ু প্রেরণ করি, তারপর আমিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি, অতপর আমিই তোমাদের তা পান করাই। তোমরা নিজেরা তো তার এমন কোন ভান্ডার জমা করে রাখোনি যে সেখান থেকে এসবের সরবরাহ আসছে।” (সূরা হিজর: ২২)
এভাবে আল্লাহর জ্ঞান পরিপূর্ণভাবে অর্জন করলে তা দুনিয়াবী শিক্ষাকেও পরিপূর্ণতা দান করবে। এতে আল্লাহর সন্তুষ্টি সহকারেই দুনিয়াবী জীবনে সফলতা অর্জন করা সম্ভব হবে ইন শা আল্লাহ।
সুতরাং আমাদের জ্ঞান অর্জনের বা শিক্ষিত হবার উ্দ্দেশ্য শুধুমাত্র পাশ করা, ডিগ্রিধারী হওয়া বা চাকরী করা নয় বরং আল্লাহর সম্পূর্ণ সন্তুষ্টি অর্জন করে, সৃষ্টির নিগূঢ় রহস্য উপলব্ধির চেষ্টা করে, পরকালীন জীবনের সর্বোচ্চ সফলতা ও মুক্তি হাসিল করা। এরই সাথে একজন মুসলিম হিসেবে প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে মহান আল্লাহকে সঠিক রূপে চিনতে পারাটাই হবে আমাদের দুনিয়াবী জীবনের সর্বোচ্চ সফলতা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ