ঢাকা, মঙ্গলবার 3 July 2018, ১৯ আষাঢ় ১৪২৫, ১৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চৌহালীতে যমুনা নদীর তীরবর্তী ২ কিলোমিটার এলাকা ভাঙ্গনের কবলে

আব্দুস ছামাদ খান, বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ): যমুনা নদীর পাড় ভাঙ্গনের হাত থেকে সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলা সদরের এলাকা সহ আশপাশ রক্ষায় ১০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭ কিলোমিটার জুড়ে তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণে মানুষের হাহাকার কাটিয়ে এখন স্বস্তি বিরাজ করছে। তবে আরেক দিকে নদীতে পানি বাড়ার সাথে-সাথে বাঁধ পেরিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ পাশে কয়েক গ্রাম জুড়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ নদী ভাঙ্গন। গত দু সপ্তাহের ব্যবধানে ২টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ বিলীন হয়েছে দেড় শতাধীক ঘরবাড়ি। এছাড়া বিলীনের অপেক্ষায়  শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ আরো হাজারো ঘরবাড়ি, সহস্রাধিক একর আবাদী জমি সহ অন্যান্য স্থাপনা। তাই যমুনার তীরবর্তি  মানুষ হতাশায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। এছাড়া অতি ভাঙ্গনের কারণে সদ্য নির্মিত বাধটিও ক্ষতির আশংকা করছে পাউবো সহ স্থানীয়রা।
এ অবস্থায় ভয়াবহ ভাঙ্গনের রশি টেনে ধরতে পাউবো ১৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহন করেছে। । গত ৫ বছরে যমুনার পুর্বপাড় বোয়ালকান্দি থেকে দক্ষিণে পাথরাইল পর্যন্ত উপজেলা সদরের খাসকাউলিয়া হয়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার জুড়ে পুরো চৌহালী উপজেলা পরিষদের অফিস আদালতের দালানকোঠা, হাসপাতাল, হাট-বাজার, ৮ সহস্রাধিক ঘরবাড়ি সহ এ উপজেলার প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা নদীতে বিলীন হওয়ায় প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এ ভাঙ্গন চৌহালীর ঘোরজান ইউনিয়নের পুর্ব অংশ গ্রাস করে টাঙ্গাইল সদর ও নাগরপুর উপজেলার কয়েকটি গ্রাম একের পর এক নিশ্চিন্থ করে দেয়। প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। এর মধ্যে প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ নদীর পুর্ব পাড়ে ঘোরজান, উমরপুর, বাঘুটিয়া,খাষপুখুরিয়া  ইউনিয়নের জেগে ওঠা চর গুলোতে আশ্রয় নিয়েছে।
জমি-জমা হারিয়ে এদের কষ্টের শেষ নেই। আর ৪০ ভাগের মধ্যে তীরবর্তী এলাকা সহ আশপাশে ২০ ভাগ। এছাড়া সদর খাসকাউলিয়া সহ আশপাশের এলাকায় ভাঙ্গন কবলিত ছিল প্রায় আরো ১০/১২ হাজার মানুষ। এসব মানুষের দাবী ছিল বাকি এলাকা টুকু রক্ষায় একটি স্থায়ী বাধ। সরকারের উচ্চ মহলের নির্দেশে চৌহালী উপজেলা সদরের বাকি এলাকা, টাঙ্গাইলের কয়েক কিলোমিটার সহ ৭ কিলোমিটার এলাকা রক্ষায় এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক ১০৯ কোটি টাকার বরাদ্ধ গ্রহন করে।
এই টাকা দিয়ে ভাঙ্গনের রশি টেনে ধরতে গত ২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর নদীর পুর্ব পাড়ের টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সরাতৈল থেকে দক্ষিণে নাগরপুর উপজেলার কুকুরিয়া, শাহজানীর খগেনের ঘাট, সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার ঘোরজানের চেকির মোড়, আজিমুদ্দি মোড়, খাসকাউলিয়া, জোতপাড়া পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার তীর সংরক্ষন বাধের নির্মান কাজ শুরু হয়। যা গত ২০ ফেব্রুয়ারী কাজ শেষ হয়। বাধের ৫ কিলোমিটার পাথরের বোল্ড দিয়ে স্থায়ী এবং বালি ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ২ কিলোমিটার অস্থায়ী বাধ নির্মান করা হয়। । বর্তমানে এর  পার  রক্ষা কাজ এগিয়ে চলছে।
এদিকে বাধটি নির্মানে এলাকা হয়েছে ভাঙ্গন মুক্ত। তাই স্বস্থ্যির নিশ্বাস ফেলে যমূনা পাড়ের পাশেই বসতি গড়েছে অনেকে। এ ব্যাপারে চৌহালী উপজেলার খাসকাউলিয়া গ্রামে বাধের পাশে বসবাসকারী দরিদ্র দিন মজুর সাইফুল ইসলাম বাবুল ও আব্দুল হালিম জানান, দরিদ্রদের থাকার জায়গা না থাকা যে কি কষ্ট তা আমরাই জানি। নদীতে সব বিলীন হওয়ায় কয়েক দফা বাড়ি অন্যত্র সরিয়েছি। কোথাও আশ্রয়ের জায়গা নেই। নতুন বাধ হওয়াতে এর পাড়ের পাশেই ঘর তুলেছি। এখন আর ভয় নেই আমাদের। এদিকে এই গ্রামের দিন মজুরের স্ত্রী ফিরোজা বানু, মৃত আব্দুর রশিদের স্ত্রী আলেয়া বেগম, খুদ্র দোকানী আব্দুল বারেক জানান, আমাদের একটিই দাবী ছিল চৌহালীতে একটি শক্ত পোক্ত বাধ। আমরা তাই পেয়েছি।
বানের পানি আসার সাথে-সাথে আমরা আতংকে দিন কাটাতাম। এখন বাধ হয়েছে। সেই ভয় দুর হয়েছে। এদিকে বাধ নির্মানে আশার আলো দেখা দিলেও যমুনায় পানি বৃদ্ধিতে বাধের উত্তর পাশ থেকে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কুকুরিয়া, বারোবাড়িয়া, চালাপাকলা, সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার মিস্ত্রীগাঁতী, স্থল চর, বোয়ালকান্দি পর্যন্ত সাড়ে ৪ কিলোমিটার ও খাষপুখুরিয়া দক্ষিন পাড়া গ্রামে ২ কিলোমিটার জুড়ে বেড়েছে ভাঙ্গন আতংক। গত দু সপ্তাহের ব্যবধানে এসব এলাকার দেড় শতাধিক ঘরবাড়ি, কয়েকশ একর আবাদী জমি বিলীন হয়েছে।
এছাড়া সরাতৈল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ধোপাকান্দি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় বিলীনে ৬/৭শ ছাত্র-ছাত্রীর শিক্ষা জীবন নানা ভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এখনো বিলীন হবার পথে হাজারো একর জমি, হাজার-হাজার ঘরবাড়ি সহ অন্যান্য স্থাপনা। তাই কুকুরিয়া গ্রামের যমুনা তীরের মানুষ গুলো এখন আতংকে দিন কাটাচ্ছে। এ ব্যাপারে মাহমুদনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাজেদুর রহমান তালুকদার, প্রবীন সমাজ সেবক কৃষক গাজী আব্দুল জলিল, আব্দুল হাকিম মন্ডল, শফিকুল আলম, নার্গিস বেগম জানান, আমরা সবাই ভাঙ্গনে বিপর্যস্ত মানুষ।
কোন রকমে ঠাঁই নিয়েছি পাড়ে। এখন তাও থাকছেনা। এ অবস্থায় আমাদের ঘর-বাড়ি, জমিজমা সহ নতুন নির্মিত বাধটিও হুমকীর মুখে পড়েছে। যদি উত্তর পাশে দ্রত ব্যবস্থা না নেয়া হয় তাহলে আর কিছুই থাকবেনা ও খাষপুখুরিয়া গ্রামের আঃ ছাত্তার,বাতাসী,হবি,নয়ানতারা,কাদের মেম্বারসহ অনেকেই  ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান,  এলাকা রক্ষায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিরোধ কাজ হবার কথা। কিন্তু কবে নাগাৎ কাজ ধরবে তা কেউ জানেনা আমরা প্রধানমন্ত্রী ও পানি সম্পদ মন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানাই আমাদের বাঁচান। নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধ করুন।
গতকাল সি পি টিভি উপজেলার খাষপুকুরিয়া ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় গিয়ে সরেজমিন প্রতিবেদন  এর সংবাদ পেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভার)  মোঃ আনিসুর রহমান ভাঙ্গন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আঃ মজিদ সরকার ও ভাঙ্গন কবলিত মানুষের সাথে কথা বলেন । এসময় তিনি উপস্থিত ক্ষতিস্থদের মাঝে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
অপর দিকে  ভাঙ্গন তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহজাহান সিরাজ জানান, আমরা নৈতিকতায় যথাযথ তদাকরি করে বাঁধের নির্মাণ কাজ শেষ করেছি। আশা করছি মানুষ আর ভাঙ্গনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বেনা।
এজন্য সবাই সন্তুষ্ট। তবে বাঁধের উত্তর এলাকায় পানি বৃদ্ধিতে ভাঙ্গন শুরু হওয়ায় সেখানে প্রতিরোধে ১৮ কোটি টাকার প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। দ্রুত টেন্ডার হলে এলাকা যেমন রক্ষা পাবে তেমনি নতুন বাঁধটিও ঝুঁকির মধ্যে থাকবেনা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ