ঢাকা, মঙ্গলবার 3 July 2018, ১৯ আষাঢ় ১৪২৫, ১৮ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বগুড়া প্রি-ক্যাডেট স্কুল যেন মদ-জুয়ার আড্ডাখানা

বগুড়া অফিস: বগুড়া প্রিক্যাডেট নার্সারি এন্ড হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক দিনে অফিস কক্ষে বসে শিক্ষকদের নিয়ে জুয়া খেলেন আর সভাপতি ক্যাডারদের নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত তার কক্ষে মাদক সেবন করেন। গত কয়েকদিন যাবৎ পরস্পরের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ জোরালো তুলে ধরছে দুই পক্ষ। প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলম তার অফিস কক্ষে বসে সহকারি শিক্ষক ও বন্ধুদের নিয়ে জুয়া  খেলছেন এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এরপর থেকেই অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
অপর দিকে, ওই স্কুলের সভাপতি স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা নাসিমুল বারি নাসিম স্কুলের একটি কক্ষে ব্যক্তিগত অফিস বানিয়ে স্কুল ছুটির পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে মাদকের আসর বসাতেন নিয়মিত। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে মঙ্গলবার বগুড়া সদর থানা পুলিশ তার কক্ষে অভিযান চালিয়ে ৩ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার করেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে নাসিমের সহকারি লিখন নামের এক যুবককে গ্রেফতার করেছে। সভাপতি নাসিম সেসময় ওই কক্ষেই ছিলেন। পুলিশ তাকেও গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে হাতকড়া পরালেও শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছেন। এমন কি মঙ্গলবার রাতে ওই ঘটনায় বগুড়া সদর থানায়  মাদক আইনে মামলা হলেও অজ্ঞাত কারণে নাসিমকে আসামী  করা হয়নি।
বগুড়ার প্রি-ক্যাডেট স্কুলটির যাত্রা শুরু হয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জায়গা দখলের মাধ্যমে। ১৯৬৫ সালে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ৮হাজার ১০০.৮২ টাকায় ২৬ শতাংশ জমি হুকুম দখল করেন জলেশ্বরীতলা আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামে। ১৯৭৩ সালে বিদ্যালয়টিকে সরকারি ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৬ সালে একটি মহল বিদ্যালয়টিকে বগুড়া আইন কলেজ মাঠে স্থানান্তর করে। পরে ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কমিটির সাথে সমঝোতায় ওই জায়গায় প্রি-ক্যাডেট স্কুল চালু হয়। বর্তমানে ওই স্কুলের সামনের জায়গায় বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন প্রধান শিক্ষক এবং ম্যানেজিং কমিটি। মূলত ওই বাণিজ্যিক ভবনের কোটি কোটি টাকার লোভেই সভাপতি এবং প্রধান শিক্ষকের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব দিন দিন জটিল হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষই প্রশাসনকে লিখিত ভাবে জানিয়েছে। অভিযোগে পরস্পরের বিরুদ্ধে অর্থ কেলেংকারি, জুয়া খেলা, মদের আসর বাসানোর কথা উল্লেখ আছে।
স্কুল ভবনের কক্ষে সভাপতির চেম্বার থাকার কোন নিয়ম না থাকলেও ক্ষমতার জোরে নাসিম ওই স্কুল ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি আলিশান অফিস কক্ষ তৈরি করেছেন। সেই অফিসে উন্নতমানের ডেকোরেশন, এসি এবং পাশে তার সহকারির জন্য আরো একটি চেম্বার তৈরি করেছেন। সেখানে বসে তিনি ব্যবসায়ীক কার্যক্রমের পাশাপাশি রাতে মাদকের আসর বসান। এমন অভিযোগ তুলছেন প্রধান শিক্ষক নিজেই। মাদকের আসর ছাড়াও সেখানে অসামাজিক কার্যকলাপের কথাও বলেছেন শিক্ষকরা। সেই সাথে স্কুলের সামনের অংশের বাণিজ্যিক ভবনে কয়েকটি কোম্পানীর শো-রুম রয়েছে। সেই শো-রুমগুলো থেকে মাসিক যে ভাড়া ওঠে তা সভাপতি নিজেই আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ওই স্কুলের শিক্ষক প্রতিনিধি মহবুবর রহমান জানান, গত ১৫ মাসে নাসিম ওই বাণিজ্যিক ভবনের ভাড়ার টাকার কোন প্রকার হিসাব স্কুলকে দেননি। তিনি সব টাকাই আত্মসাৎ করেছেন। এমন কি ওই ভবন থেকে কত টাকা মাসিক উত্তোলন করা হয় সেই হিসাবও শিক্ষকরা কেউ জানেন না।
অপরদিকে, প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলমে বিরুদ্ধেও অনিয়মের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। তিনি বিভিন্ন সময়ে ১ কোটি ৬লাখ ৮১ হাজার ৩৯৮ টাকা আত্মসাৎ করেছেন যা নিয়ে জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে মামলা হয়েছে। সম্প্রতি ১৯ জুন ম্যানেজিং কমিটির একটি বৈঠকে তাকে সাময়িক বহিস্কারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই মোতাবেক তাকে পত্র প্রেরণ করা হয়। বুধবার দুপুরে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আবারো বিভিন্ন অভিযোগ এনে সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নাসিমুল বারি নাসিম। তিনি প্রধান শিক্ষক জহুরুলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন খাতের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করে বলেন, ওই শিক্ষক ২০১৪ সালের ৪ জুলাই স্কুল ফান্ড থেকে ১০ লাখ টাকা উত্তোলন করেন। সেখান থেকে তিনি পরে ৩ লাখ টাকা ফেরত দেন। বাকি টাকা তিনি আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়াও স্কুলের পুরাতন টেস্টখাতা বিক্রির টাকাও স্কুলে জমা দেননি। তার বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে এফডি আরের ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও করেন সভাপতি। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে মহাপরিচালক মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে পাঠানো একটি নোটিশে তার এমপিও স্থগিত করা হয়েছিলো।
অর্থ-আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক জহুরুল আলম বলেন, ওই সব বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলবেন না। জুয়া খেলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি জুয়া খেলিনি তবে কাস খেলেছি।’
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নাসিমুল বারি নাসিম জানান, মঙ্গলবারে তার কক্ষে পুলিশি অভিযান ছিলো উদ্দেশ্যমূলক। সেখান থেকে যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সেই লিখন তার কেউ নয়। যদিও তিনি লিখনকে গ্রেফতারের সময় বলেছিলেন সে তার গাড়ী চালক এবং ব্যক্তিগত সহকারি।  
বগুড়া সদর থানার ওসি এসএম বদিউজ্জামান বলেন, ফেন্সিডিল সভাপতির কক্ষে তার সহকারি লিখনের টেবিলে পাওয়া যায়। সেজন্য সভাপতিকে গ্রেফতার করা হয়নি। তার টেবিলে পাওয়া গেলে তাকেও গ্রেফতার করা হতো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ