ঢাকা, বুধবার 4 July 2018, ২০ আষাঢ় ১৪২৫, ১৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পুরো রাস্তাই বেদখল হয়ে ময়লা আবর্জনায় ঠাসা

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীর গুলিস্থান-যাত্রাবাড়িতে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে গড়ে ওঠা মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়াল সড়কের নিয়তিই যেন বারবার খবরের পাতায় শিরোনাম হওয়া।এই প্রকল্পটি শুরুর পর থেকে শেষ অবধি নানা কারণে খবরের শিরোনাম হয়েছে অগণিতবার। উড়াল সড়কটি চালুর পরও খবরের শিরোনাম যতবার হয়েছে, এ দেশের অন্য কোন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে এতো মাতামাতি,আলোচনা,সমালোচনা আর খবরের শিরোনাম হতে হয়নি অন্য কোন প্রকল্পকে। খবরের কবল থেকে মুক্তি মিলছে না হানিফ উড়াল সড়কের। এটির নির্মাণ থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনাসহ দেখভালের দায়িত্ব যাদের, তাদের দায়িত্বহীনতার কারণেই মূলত: বার বার খবরের শিরোনাম হতে হচ্ছে উড়াল সড়কটিকে। যত প্রকার অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনা,তার সব কটিই যেন লেপ্টে আছে মেয়র হানিফ উড়াল সড়কের গায়ে।
এখনকার খবর হচ্ছে,ওই উড়াল সড়কের নিচের সড়ক ও বঙ্গ ভবনের পাশের সড়ক দু’টির অবস্থা বেহাল। সংস্কারের অভাবে এ সড়কগুলো বহুদিন ধরে যানচলাচলের অনুপযোগী হয়ে আছে। বিশেষ করে বঙ্গ ভবনের দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশের সড়ক দুটি দিয়ে যাতায়াত না করলে বোঝা যাবে না যে কতটা বেহল দশা এ দু’টি সড়কের। কাপ্তানবাজারের কাঁচা বাজার ও মুরগি পট্টির ময়লা আবর্জনা উড়াল সড়কের নিচে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। বঙ্গ ভবনের দক্ষিণ পাশে স্থাপন করা হয়েছে সিটি কর্পোরেশনের ময়লা সংরক্ষণের স্থান, সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস)। এছাড়াও কাপ্তান বাজার থেকে রাজধানী সুপার মার্কেট পর্যন্ত এক কিলোমিটার সড়কের পুরাটাই ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়ে আছে। এ এক কিলোমিটার সড়কের মধ্যে সিটি কর্পোরেশনের একটি ময়লার এসটিএসসহ অন্তত তিনটি ময়লার কন্টেইনার বসানো হয়েছে। যে কারণে পঁচা ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধে এ সড়কটি দিয়ে চলাচল করাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে খোদ বঙ্গ ভবন থেকেও। বঙ্গ ভবনের দক্ষিণ পাশে ময়লা আবর্জানর ভাগাড়সহ মুরগি, ছাগল, কবুতর ও কাঁচা বাজার থাকার কারণে এর দুর্গন্ধ দক্ষিণ হাওয়ায় মিশে বঙ্গ ভবনে যাচ্ছে। ময়লার দুর্গন্ধে বঙ্গ ভবনেও টেকা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে সোমবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে ডেকে পাঠিয়েছে বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। সংস্থার অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বঙ্গ ভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে এসেছেন বলে জানা গেছে। অভিযোগ সেখানেও ওঠেছে। বলা হয়েছে, হানিফ উড়াল সড়কের নিচের প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটিসহ বঙ্গ ভবনের পাশের দু’টি সড়কে যাতায়াত করতে গিয়ে বিড়ম্বনা ও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে নগরবাসীকে। এ জন্য প্রচন্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এ সড়ক দিয়ে যাতায়তকারী নগরবাসী ও যানবাহন চালকেরা।
জানতে চাইলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লতুল ইসলাম বলেন, বঙ্গ ভবনের দক্ষিণ পাশে মুরগি পট্টি, কবুতর, ছাগলের হাট ও কাঁচা বাজারের ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধ বাতাসে মিশে বঙ্গ ভবনে যাচ্ছে। এছাড়াও বঙ্গ ভবনের পাশেই সিটি কর্পোরেশনের একটি ময়লা সংরক্ষণের স্থান (এসটিএস) রয়েছে। এ থেকেও দুর্গন্ধ বঙ্গ ভবনে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এ নিয়ে আমরা  সোমবার বঙ্গ ভবনের কর্মকর্তাদের সাথে বসেছিলাম। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ওই এলাকা থেকে এসটিএসটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরিয়ে নিতে হবে। এছাড়াও মুরগি পট্টি, কবুতর ও ছাগলের বাজারে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে অবৈধ দোকান ও ফ্লাইওভারের আশে পাশের দোকানগুলো উচ্ছেদ করা হবে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে মেয়রের পক্ষ থেকে ডিএসসিসি’র সম্পত্তি বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ ও বর্জ্য বিভাগকে যথযথ পদক্ষেপ নেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সোমবার সরেজমিনে দেখা গেছে, হানিফ উড়াল সড়ক যেখান থেকে শুরু হয়েছে সেই চানখারপুল থেকেই সড়কের বেহাল অবস্থা। এখানে উড়াল সড়কের জন্য পৃথক লেন থাকলেও সেটা স্থানীয় যানবাহনই ব্যবহার করছে। চানখারপুল চৌরাস্তা থেকে ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত সড়কের দু’পাড়ে রয়েছে অবৈধ দখলদার। গুলিস্তান এলাকায় উড়াল সড়কের নিচে মুরগির খাচা রাখা হয়। এ জন্য জায়গাটির নামকরণ হয়েছে মুরগিপট্টি। এ মুগগিপট্টির আশে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মরা হাস, মুরগি, কবুতর ও এদের বিষ্ঠা। কোথাও কোথাও গরু ছাগলের নাড়ি-ভুড়ি, রক্ত ও হাস মুরগির লোমসহ নাড়ি-ভুড়ি ছড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এখানে দুর্গন্ধের জন্য হাঁটাচলাও মুশকিল হয়ে পড়েছে।
কাপ্তানবাজারের মুরগি ব্যবসায়ী বেলাল বলেন, উড়াল সড়কের নিচটা এমনিতেই নোংরা পড়ে থাকে। তাই আমরা সাময়িক সময়ের জন্য সেখানে মুরগির খাচা রাখি। এটি পরিষ্কার হয়ে গেলে কেও আর এখানে ময়লা আবর্জনা ও মুরগির খাচা রাখবে না।
যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত দু’পাশের সড়কেরও বেহাল দশা। প্রায় এক বছর আগে ওই সড়কের সংস্কার কাজ শুরু করলেও চলছে ঢিমেতালে। এতে ব্যস্ততম এ সড়কে চলাচলে মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এর দু’পাশে রাস্তার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখা হয়নি। উড়াল সড়কের উত্তরে সড়ক ও জনপদ বিভাগের জায়গা থাকায় সেখানে রাস্তাটি কিছুটা বাড়ানো গেছে। কিন্তু দক্ষিণ পাশে যানবাহন চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখা হয়নি। মাত্র ১৫-২০ ফুট প্রশস্ত সড়কে পরিবহন চলাচল করছে। এর মধ্যে আবার সড়কের একাংশে ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে রাস্তাটি এখন এতটাই সরু হয়েছে যে, সকাল থেকেই যানজট লেগে থাকছে। এ অবস্থায় যেসব গাড়ি উড়াল সড়কের নিচ দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করতে চায়, সেগুলো মারাত্মক বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। তবে বিপুল সংখ্যক গাড়ি এ ঝক্কি এড়াতে উড়াল সড়ক দিয়ে চলাচল করছে। আর ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথেরও বেহাল দশা। এ অংশে ড্রেন ও সড়ক সংস্কার কাজ করা হচ্ছে। সড়কের পিচ ঢালাই, ইট, খোয়া উঠে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে এ সড়কে যান চলাচল করছে। একটু অসতর্ক হলে যানবাহন গর্তে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটছে।
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা ও মুদি দোকানদার মনিরুল ইসলাম বলেন, নির্মাণ কাজের সময় যেভাবে উড়াল সড়ক নির্মাণের কথা বলা হয়েছিল, সেভাবে নির্মাণ করা হলেও অনেক ভালো হতো। সেসব না করে উড়াল সড়কের কুতুবখালী এলাকার পূর্ব দিকের মাথায় টোলঘরের আগ থেকে ইচ্ছেমতো জায়গা নেয়া হয়েছে। এতে দুটি টোলঘরের জন্য উড়াল সড়কের প্রায় চার গুণ জায়গা নিয়ে দু’পাশে যানবাহন চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখা হয়নি। ফলে উড়াল সড়কের নিচ দিয়ে চলতে গিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। সীমাহীন ভোগান্তি নিত্যদিনের সঙ্গী এলাকাবাসীর।
যাত্রাবাড়ী আড়তের ব্যবসায়ী আবদুর রহমান বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম ৮ লেন মহাসড়ক এসে মিলেছে কুতুবখালীতে। উড়াল সড়ক বাদ দিলে দক্ষিণ দিক দিয়ে ঢাকায় প্রবেশের জন্য রাস্তাটির প্রস্থ মাত্র ১৪ ফুট। এই ১৪ ফুট রাস্তাই রাজধানীতে প্রবেশের একমাত্র পথ। এটা কিভাবে হল ? সরকার কেন এদিকে নজর দিল না, তা আমাদের বোধগম্য নয়। একটা উড়াল সড়কের জন্য রাজধানীতে প্রবেশের পথ থাকবে না, এটা কি মানা যায়।
সরেজমিন আরও দেখা গেছে, চানখাঁরপুল থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত মেয়র হানিফ উড়াল সড়কের নিচের সড়কের প্রায় ৬০ ভাগ অবৈধ দখলে চলে গেছে। এছাড়া অবৈধভাবে সড়কে গাড়ি পার্কিং করে রাখা হচ্ছে। রোড ডিভাইডারের সবুজায়ন করার কথা থাকলেও সেখানে দখলদাররা হোটেল, দোকানপাট গড়ে বাণিজ্য করছেন। ডিএসসিসি হেডকোয়ার্টার সংলগ্ন অংশের এ বেহাল দশা হলেও সেদিকে কারও কোনো দৃষ্টি নেই। উড়াল সড়কের চানখাঁরপুল অংশে সড়কে ঘোড়া বেঁধে রাখতেও দেখা গেছে। গুলিস্তান এলাকার হকার দখলমুক্ত করার জন্য ডিএসসিসি বাহবা নিলেও সেসব হকাররা পুনরায় মেয়র হানিফ উড়াল সড়কের নিচের সড়কসহ আশপাশের সড়ক দখল করে নিয়েছে। এসব দেখেও না দেখার ভান করে চলেছে কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উড়াল সড়কের নিচের অংশটি নোংরা পরিবেশের জন্য দায়ী একটি স্বার্থন্বেষী মহল। তারা নিচের সড়কটি নোংরা করে রাখে যাতে গাড়ি উড়াল সড়ক দিয়ে চলে এতে করে তারা বেশি করে টোল আদায় করতে পারে। সরকারি বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হয়েছিল যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদসহ রাজধানীর একটি অংশের যানজট নিরসনের লক্ষ্যে। এরপর থেকে উড়াল সড়ক ব্যবহারকারী যানবাহন খুব স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারছে। কিন্তু বিপত্তি ঘটে এর নিচের সড়টি কয়েক বছর ধরে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ার কারণে।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অঞ্চল-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন বলেন, মেয়র হানিফ উড়াল সড়কের নিচের সড়কের কোথায়ও এখন আর ভাঙ্গাচুরা নেই। শুধু মাত্র জয়কালি মন্দিরের সামনে ভুমি অফিসের পাশের সড়কের সামান্য অংশের কাজ বাকি রয়েছে। আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে সে কাজাও শেষ করা হবে। তিনি বলেন, সড়কটির সংস্কারের কাজ আমরা গত প্রায় তিন মাস আগে শেষ করেছি। যেহেতু এখন বর্ষাকাল সেহেতু হয়তো কোথায় যদি বিটুমিন উঠে যায় তাহলে আমরা তা মেরামত করে দিব। তবে আমার জানা মতে সড়কটির কোথায়ও এখন আর ভাঙ্গা-চোরা নেই বলে তিনি দাবি করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ