ঢাকা, বুধবার 4 July 2018, ২০ আষাঢ় ১৪২৫, ১৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা প্রশ্নে জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক

রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের ঘোষিত উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ সফরে এসেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। গত সোমবার তারা নিজেদের চোখে রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখার জন্য কক্সবাজারের উখিয়ায় গিয়েছিলেন। বিভিন্ন আশ্রয় শিবির পরিদর্শনের পাশাপাশি সেদিন তারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গেও কথা বলেছেন। তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা শুনেছেন। সব মিলিয়ে তারা দুঃখ ভারাক্রান্ত অবস্থায় ঢাকায় ফিরে এসেছেন। ফিরে আসার পর রাজধানীর একটি হোটেলে দু’জনই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছেন, রোহিঙ্গারা যাতে মর্যাদার সঙ্গে তাদের আদি নিবাস মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারে সে জন্য সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান দরকার। মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে তার জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি এবং হত্যা-নির্যাতনের অভিযান চালানোর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের ওপর ঐক্যবদ্ধভাবে চাপ সৃষ্টি করতে হবে বলেও মতপ্রকাশ করেছেন মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার এবং দেশে ফিরে তারা যাতে নিরাপদে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেশটির সরকার এবং সেনাবাহিনীর। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করাসহ তাদের সমস্যা সমাধানের স্বার্থে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত মিয়ানমারের ওপর ঐক্যবদ্ধভাবে চাপ সৃষ্টি করা। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পাদিত দুটি সমঝোতা চুক্তিকে রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের পথে প্রাথমিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে মহাসচিব গুতেরেস বলেছেন, এই সমঝোতার সূত্র ধরেই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকটে জাতিসংঘের, বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা এবং দ্বিধাবিভক্তি নিয়েও কথা উঠেছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, সিরিয়াসহ আন্তর্জাতিক অনেক বিষয়েই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এবং নিরাপত্তা পরিষদ সদস্যদের মধ্যে মতানৈক্য এবং দ্বিধাবিভক্তি রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সাধারণভাবে জাতিসংঘ সকল সমস্যার সমাধানের পথে এগিয়ে চলেছে। রোহিঙ্গা প্রশ্নেও দৃশ্যমান মতানৈক্য ও দ্বিধাবিভক্তি রয়েছে সত্য, তাই বলে একথাও আবার বলা যাবে না যে, সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হচ্ছে না। নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি এ বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। পরিষদের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার সফর করেছে। প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার দায়িত্ব পালনের জন্য মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। সুতরাং একথা বলার সুযোগ নেই যে, জাতিসংঘ এবং নিরাপত্তা পরিষদ রোহিঙ্গা সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য কিছুই করছে না।
সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে এবং তারও আগে কক্সবাজারের প্রেস ব্রিফিংয়ে আরো কিছু বিষয়েও কথা বলেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমও তার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। রোহিঙ্গাদের দুঃখ-কষ্ট দেখে বেদনায় আপ্লুত হয়ে জিম ইয়ং কিম এমনকি একথা পর্যন্ত বলেছেন যে, তার মনে হচ্ছে, তিনি নিজেও একজন রোহিঙ্গা!
এভাবেই বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে জাতিসংঘের মহাসচিব এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করার ব্যাপারে নিজেদের সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। আমরা তাদের এই সদিচ্ছাকে প্রশংসাযোগ্য বলে মনে করি। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার এবং নাগরিকত্বসহ নিরাপদে বসবাস করার অধিকার অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির যে আহবান মহাসচিব গুতেরেস জানিয়েছেন, তাকে অবশ্যই ইতিবাচক বলা দরকার। শুধু তা-ই নয়, মহাসচিব হত্যা ও নিষ্ঠুরতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি ও বিচার করার কথাও বলেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট সর্বান্তকরণেই রোহিঙ্গাদের তথা বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এটা নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের অগ্রগতি। আমরা আশা করতে চাই, এ থেকে বিশেষ করে মিয়ানমারের সরকার ও সেনাবাহিনী তাদের ভুল, অন্যায় ও অপরাধ সম্পর্কে ধারণা করতে সক্ষম হবে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে উঠবে।
শুধু ফিরিয়ে নিলে চলবে না, জাতিসংঘ মহাসচিবের দাবি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার পাশাপাশি নিরাপদে জীবন যাপন এবং রাষ্ট্রীয় সকল কাজে অংশ নেয়ার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারকেও বিষয়টি নিয়ে নতুন পর্যায়ে তৎপর হতে হবে। মহাসচিব গুতেরেসের পরামর্শ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার এবং মিয়ানমারের সরকার ও সেনাবাহিনীর ওপর চাপ তৈরি করার ব্যাপারে বাংলাদেশকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করার মতো সময় আর নেই। সুতরাং উদ্যোগী হতে হবে অনতিবিলম্বে। আমাদের ধারণা, বাংলাদেশের যে কোনো উদ্যোগের প্রতি জাতিসংঘ এবং বিশ্বব্যাংক বলিষ্ঠভাবেই সমর্থন জানাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ