ঢাকা, বুধবার 4 July 2018, ২০ আষাঢ় ১৪২৫, ১৯ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চম্পাওয়াত : যেখানে ইতিহাস কথা কয়

হামিদ খান : উত্তর ভারতীয় রাজ্য উত্তর প্রদেশের টেরাই অঞ্চলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নবগঠিত রাজ্য উত্তরাঞ্চলের সীমানা নির্ধারণ করেছে। টেরাই অঞ্চলটি নয়নাভিরাম পার্বত্য সৌন্দর্য কুমায়ুন ও গারোয়াল অঞ্চলকে মহিমান্বিত করেছে। অপূর্ব পর্যটন ও ধর্মীয় স্থান হিসেবে এ অঞ্চলটি ভারতীয় উপমহাদেশে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। শুষ্ক, ধূলিময়, বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কর্মব্যস্ত বেরেইলি শহর পার হলেই দৃষ্টিনন্দন ফুলেল স্থলভাগ সবার নজর কাড়ে। দিগন্ত পানে তাকালে চোখে পড়বে বৃক্ষের সারি পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে দিগন্ত ছুঁয়েছে।
মহাসড়ক পার হয়ে আমরা শান্ত নিরিবিলি পরিবেশের সজীবতা, বাতাস ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা আর ভারী হয়ে উঠছে। আমরা বৃক্ষশোভিত বানবাসা পেরুলাম। এখানে রয়েছে সেগুন, বার্চ, শাল আর পাইন গাছের অপূর্ব সমাহার। বনভূমির সুগন্ধ অনুভবের জন্য সেগুন গাছের ঘন পত্রশোভিত প্রান্তরে থামলাম। ছবির মত অপরূপ নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে দেখতে উঁচু ভূমির উপর দিয়ে প্রবাহিত নদী পাড়ে পৌঁছলাম। নদীর পাড়ে রয়েছে নুড়ি পাথর। নিচু পাহাড়ের উপর দিয়ে ভেসে যাওয়া মেঘ সত্যিই অপূর্ব।
বানবাসা, তানাকপুর, চম্পাওয়াত- এগুলো করবেট গ্রাম হিসেবে বিখ্যাত। প্রবাদপ্রতিম জিম করবেট তাঁর বন্দুক নিয়ে একদা এসব গ্রাম চষে বেড়াতেন। কুমায়ুন গ্রামে নরখাদক বাঘ শিকার করে তিনি গ্রামবাসীদের বাঘের ভয় থেকে মুক্ত করেছেন। চম্পাওয়াত সম্ভবত নরখাদকদের সবচেয়ে বড় আস্তানা ছিল। জিম করবেটকে আজও এ এলাকার মানুষ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। শহরে রাস্তার ধারে স্থাপিত একটি সাইন পোস্ট দর্শনার্থীদের জানিয়ে দেয়, সেখানে জিম করবেটের হাতে পঞ্চত্বপ্রাপ্ত একটি ভয়ঙ্কর নরখাদক ইতিহাস হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে চম্পাওয়াতের তাৎপর্য রয়েছে। এ শহরটি কুমায়ুন রাজাদের আমলে রাজধানী ছিল। এছাড়া চাঁদ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সোম চাঁদের আমলেও এটি রাজধানী ছিল। চাঁদ রাজার সময়কাল সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে ধরা যায়, এ সময়টা ছিল নবম ও একাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। এ অঞ্চলে অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। শোনা যায়, নিষ্ঠুর ও লোভী হয়ে ওঠায় ক্ষিপ্ত প্রজারা পর্বতশিখর থেকে রাজাকে ফেলে দিয়েছিল। নতুন রাজা খোঁজা শুরু হয়। অবশেষে কনৌজ এর রাজপুত্র চন্দ্রবাসীকে মনোনীত করা হয়। তিনি চম্পাওয়াতের সাবেক রাজার মেয়েকে বিয়ে করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। যদিও স্থানীয় অনেকে এ ঘটনাকে সত্য বলে বিশ্বাস করেন না। তারা বলেন, চম্পাওয়াতের রাজা তীর্থযাত্রায় গিয়ে কনৌজ-এর রাজকুমারকে পছন্দ করেন এবং তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেন। এ বিষয়ে যৌতুক হিসেবে রাজ্যের একটি বড় অংশ তাকে উপহার দেন।
এখানে রয়েছে কিংবদন্তির স্বাক্ষর অনেক প্রাচীন স্থাপনা। রয়েল ফোর্ট- এমনই এক স্থাপনা। এর বিশাল প্রবেশদ্বার ও দীর্ঘ দেয়াল চম্পাওয়াতের ঐশ্বর্যময় সময়ের সাক্ষী। এছাড়া নাগনাথ মন্দির খুবই দর্শনীয় একটি মন্দির। রয়েল ফোর্টের পাশেই আছে শিব মন্দির। এ মন্দিরের প্রাঙ্গণটি ভক্তরা ত্রিশূল দিয়ে ভরে রেখেছে।
শহরের কেন্দ্রে অর্থাৎ বাস স্টপেজ থেকে একটু দূরে রয়েছে বলেশ্বর মন্দির। মহাদেব শিবের বিধ্বংসী রূপ হচ্ছে বলেশ্বর। মন্দিরটি নবম ও দশক শতাব্দীতে নির্মিত। কেল্লার কাছাকাছি মন্দিরটি নির্মিত হওয়ায় ধারণা করা যায়, চাঁদ রাজারা এ মন্দিরে উপাসনা করতেন। অপূর্ব শিল্পশৈলীসমৃদ্ধ এ মন্দিরটি ঐতিহাসিকদের কাছে খুবই প্রিয়।
এক সময় মন্দিরটিতে অনেক দেব-দেবীর উপাসনা হত। আজ এটি কেবল কালের সাক্ষী হয়ে আছে। শোনা যায়, এ সম্পদের লোভে এ রাজ্যের অনেক মানুষকেও খুন করে পার্শ্ববর্তী রোহিলখ-ের সেনাপতি। এই আক্রমণের স্বাক্ষর রয়েছে মন্দিরের গায়ে। কৌশলগত কারণে চাঁদ রাজারা রাজধানী চম্পাওয়াত থেকে আলমোড়াতে স্থানান্তরিত করেন। রাজধানী স্থানান্তর ও চাঁদ রাজবংশের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার কারণে মন্দিরগুলো অবহেলিত হয়ে পড়ে। লোকালয় থেমে গেলে প্রকৃতির নির্মম শক্তি অবক্ষয় টেনে আনে। তবুও এখানকার মন্দিরগুলো টিকে আছে, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতার কারণে নাকি ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে তা বলা কঠিন। ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন এসব স্থাপনা রক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে একদিন এগুলো কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ