ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 July 2018, ২১ আষাঢ় ১৪২৫, ২০ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

টানা বর্ষণে বৃহত্তর চট্টগ্রামে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী

চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রাম মহানগরীসহ বৃহওর চট্টগ্রামে সোমবার থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিপাত অব্যাহত আছে। বৃষ্টিপাতে বৃহওর চট্টগ্রামে হাজার হাজার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি, নষ্ট হয়েছে ক্ষেত খামার। চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির সময় পানিবদ্ধতার খবর পাওয়া গেছে।
আবহাওয়া অফিস বলছে, মওসুমী বায়ুর অক্ষ রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, বিহার, হিমালয়ের-পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মওসুমী বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে তা মাঝারী থেকে প্রবল অবস্থায় বিরাজমান রয়েছে। রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রাজশাহী বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ী দম্কা হাওয়া ও বিজলী চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেইসাথে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।
ফটিকছড়ি সংবাদদাতা মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জানান, অবিরাম বৃষ্টি ও পাহাড়ী  ঢলে ফটিকছড়িতে বিভিন্ন খাল নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত কিছুদিন পূর্বে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে না উঠতেই এমন পরিস্থিতে শংকিত হয়ে পড়েছে এলাকাবাসী। হালদা, ধুুরুং, সর্তা, গজারিয়া, ফটিকছড়ি খাল, লেলাং খাল, মন্দাকিনী খালসহ বিভিন্ন খাল নদীর পানি বিপদ সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জানা যায়, উপজেলার দক্ষিণে আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন, ধর্মপুর ইউনিয়নের (কিছু অংশ), জাফতনগর ইউনিয়নের (কিছু অংশ), সমিতিরহাট ইউনিয়ন, রোসাংগিরী ইউনিয়ন, নানুপুর- ইউনিয়নের (কিছু অংশ), সোয়াবিল ও লেলাং ইউনিয়ন বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। গোপালঘাটা এলাকার মোহাম্মদ আজগর আলী বলেন, কর্ণফুলী চা বাগান সড়ক, গহিরা হেয়াকো সড়কের শাহনগর এলাকায়, তালুকদার বাড়ি, করিম মিস্ত্রীর বাড়িসহ লেলাং ইউনিয়নের বিভিন্নস্থান পানিতে তলিয় যায়। আব্দুল্লাহপুরের শাহাবুদ্দিন রকি বলেন, গত দুইদিনের ভারী বর্ষণে আব্দুল্লাহপুরের বিভিন্ন সড়ক ও এলাকা পানিতে ডুবে রয়েছে। নাজিরহাট-কাজিরহাট সড়কের নাজিরহাট কলেজ সংলগ্ন অংশ হালদায় সম্পুর্ণরুপে বিলীন হওয়ার পথে।
রাউজান থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে রাউজানে আবারও অতিবর্ষনে বন্যা দেখা দিয়েছে। ভারী বর্ষণ, দুই পার্বত্য অঞ্চল রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি ঢলের কারণে আবার ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে এ উপজেলায়। বন্যার পানিতে বিশেষ করে পৌরসভার  প্রায় প্রত্যেক ওয়ার্ড ও হলদিয়া, চিকদাই ও ডাবুয়া ইউনিয়নের পুরো এলাকা তলিয়ে গেছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে কমপক্ষে অর্ধলক্ষ মানুষ। বন্যার পানিতে পড়ে গত  মঙ্গলবার দুপুরে পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডে সাজিদুল আলম নামের আড়াই বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাহাড়ী ঢলের তীব্র চাপ ও স্রোতের কারণে সর্ত্তা, ডাবুয়া, বেরুলিয়া, খাসখালী, কলমপতি খালের বাঁধ ভেঙ্গে, হালদা নদীর পানি বেড়ে এবং সাম্প্রতিক বন্যায় ওইসব খালের ভেঙ্গে যাওয়া বাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে রাউজানের তিন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় এই মারাত্মক বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। লন্ডভন্ড হয়ে পড়েছে রাস্তাঘাট। বন্যার পানিতে চট্টগ্রাম- রাঙামাটি সড়কের রাউজান অংশের প্রায় ৭ কিলোমিটার এলাকা ডুবে গিয়ে ভোর থেকে দিনভর যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে পাবর্ত্য অঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
বন্যা পরিস্থিতি দেখতে গত মঙ্গলবার সকাল ৯টায় রাউজানে আসেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। তিনি তার দলীয় নেতাদের নিয়ে চাঁদের গাড়িতে করে উপজেলা সদরের জলিল নগর, থানা, ফকিরহাট, মুন্সিরঘাটা, বেরুলিয়া এলাকা ছাড়াও চিকদাইর, কুশ্বেরীসহ বিভিন্ন প্লাবিত এলাকা ঘুরে দেখেন। উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি সভা করেন তিনি। সেখানে তিনি দুর্গত মানুষের পাশে থাকার জন্য উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশ দেন।
হাটহাজারী থেকে সংবাদদাতা জানান, গত সোমবার সন্ধ্যা থেকে অবিরাম বর্ষণের ফলে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলের তোড়ে হাটহাজারীতে বন্যার আশংকা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম নাজিরহাট–খাগড়াছড়ি মহাসড়কের বড়দিঘীরপাড় ও মুন্সির মসজিদের সংলগ্ন এলাকা, এনায়েতপুর কালিবাড়ি থেকে চেয়ারম্যান ঘাটা পর্যন্ত সড়কের উপর দিয়ে পাহাড়ি ঢলের পানি গড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বড়দীঘির পাড় ও মুন্সির মসজিদ সংলগ্ন মহাসড়ক এলাকা থেকে ঢলের পানি নেমে গেলেও এনায়েতপুর এলাকায় ঢলের পানি নেমেছে প্রায় সাড়ে তিনটার দিকে। এনায়েতপুর এলাকায় বসতঘরে ঢলের পানিতে ক্ষতিগ্রস্থ মালামাল রক্ষা করতে গিয়ে জানে আলম নামে এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
সীতাকু- সংবাদদাতা জানান, ভারী বৃষ্টিতে সীতাকু- পৌরসভার ১৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে পৌর এলাকার ৩০হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় অনেক পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নেয়।ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে দুই শতাধিক কাঁচা–বাড়িঘর ও ফসলি জমি। অবিরাম বৃষ্টিতে পৌর সদরের উপজেলা পরিষদ, দক্ষিণ আমিরাবাদ, দক্ষিণ মহাদেবপুর, চৌধুরী পাড়া, দাশ পাড়া, পশ্চিম মহাদেবপুর, ইদিলপুর, শিবপুর, নলুয়া পাড়া, মৌলভী পাড়া, বড়ুয়া পাড়া, ফকির হাট এলাকা, মধ্যম মহাদেবপুর, সোবহানবাগ শেখনগর, পেশকার পাড়া, নামার বাজার এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়ি পানিতে ডুবে যায়। প্রায় শতাধিক পুকুর ডুবে মাছ বেরিয়ে গেছে।
চন্দনাইশ সংবাদদাতা মোজাহেরুল কাদের জানান, গত তিনদিনের টানা বর্ষণে চন্দনাইশ উপজেলার নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়ে পড়েছে। উপজেলার প্রায় শতাধিক বাড়িঘর ও দোকানপাট পানির নীচে তলিয়ে গেছে। শংখনদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বেড়ে যাওয়ায় চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর ইউনিয়নের পাটানীপুল এলাকায় চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে এ মহাসড়কে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসসহ মালবাহী ট্রাক চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে অব্যাহত বর্ষণে অনেক মওসুমী ফসলের ক্ষেত ডুবে গেছে। এছাড়া এ সব এলাকার অনেক ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় শতাধিক পরিবারের লোকজন পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। চতুর্দিকে পানি বেড়ে যাওয়ায় চন্দনাইশ পৌর এলাকার খান হাটের অধিকাংশ দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়েছে। অনেক দোকান পানির নীচে তলিয়ে রয়েছে। ফলে পুরো এলাকার ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে। ধোপাছড়ি ইউনিয়নের পূর্ব ধোপাছড়ি গোলার পাহাড় এলাকায় পাহাড় ধ্বসে আবদুস সাত্তার ফকির (৬০) নামের এক লোক মাটিচাপা পড়ে আহত হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ