ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 July 2018, ২১ আষাঢ় ১৪২৫, ২০ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিবাদে ঢাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল বুধবার অপরাজয় বাংলার পাদদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হককে পুলিশের লাঞ্ছনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
গতকাল বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের আয়োজনে এই মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সংহতি জানান।
বিভাগটির ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সহ-সভাপতি মীর আরশাদুল হকের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য দেন অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন। বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাওন্তী হায়দার এসময় উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, শতবর্ষের পথে এগিয়ে চলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের লড়াই সংগ্রামের স্মরণে যে সকল স্থাপনা  তৈরি হয়েছে সেখানেও শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানাতে গেলে হামলার শিকার হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের অনেককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে তাদের তুলে নেওয়া হয়েছে, এখন তারা কোথায়? বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীর অভিভাবক এসে যাতে আমাদেরকে বলতে না পারে যে তাদের সন্তানকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না; এ ধরনের কথা যাতে আর শুনতে না হয়।
গত মঙ্গলবার বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ঘণ্টাখানেকের জন্য আটক ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ব্লগার বাকী বিল্লাহ। সে সময় লাঞ্চিত হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাজী আনিস ও উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক রুশাদ ফরিদী এসময় বক্তব্য দেন। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক জুয়েল মিয়া, অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, সহযোগী অধ্যাপক মো. আব্দুল মান্নান, সহকারী অধ্যাপক সায়মা আহমেদ, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম, অধ্যাপক তৈয়েবুর রহমান ও ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনাসির কামাল মানববন্ধনে সংহতি জানান।
সহকর্মীদের অনুরোধে অধ্যাপক ড. ফাহমিদুল হক মানববন্ধনে উপস্থিত থাকলেও তিনি বক্তব্য দেননি।
মানববন্ধন শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল অপরাজেয় বাংলা থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাস ঘুরে সেখানেই শেষ হয়।
রাবি রিপোর্টার: কোটা সংস্কার আন্দোলন ঠেকাতে কাঠোর অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগ বলছে নির্বাচনের আগে ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না। দেশব্যাপী এ আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ জন শিক্ষার্থী হামলার স্বীকার হয়েছেন। এর মধ্যে গত সোমবার আন্দোলনে নেমে ছাত্রলীগের হামলায় গুরুতর আহত হন ইসলামের ইতিহাস বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম তারেক। তাকে চাপাতি, হাতুড়ি, বাঁশ দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে আহত করে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।
পহেলা জুলাই রাতে রাবি ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু ফেসবুকে আন্দোলনকারীদের কঠোর হস্তে দমনের হুমকি দেন। ঐদিন কোটা সংস্কারের কেন্দ্রীয় নেতা নুরুর উপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন করতে গেলে দুই দফায় হামলা চালায় রাবি ছাত্রলীগ। প্রথমে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে পরে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করার সময় আবার হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এসময় ১১জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
পরদিন জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিলের কর্মসূচী ছিল। বিকেল ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে জড় হতে থাকে আন্দোলনকারীরা। খবর পেয়ে ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে সেখানে আগে থেকেই লাঠি, জিআই পাইপ, হাতুড়ি, রড ইত্যাদি নিয়ে অবস্থান নেয়। এ সময় ছাত্রলীগের ধাওয়ায় তরিকুল নামে একজন পড়ে গেলে তাকে বেধড়ক পিটিয়ে পা ভেঙে দেয় রাবি ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। ঐদিন ছাত্রলীগের হামলায় ১০ আন্দোলনকারী আহত হয় বলে জানান বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ রাবি শাখার আহ্বায়ক মাসুদ মোন্নাফ।
তিন জুলাই সকালে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের উপর হামলা ও লাঞ্ছনার প্রতিবাদে নগ্নপায়ে অফিস ও শহীদ শিক্ষক জোহার মাজারে এক ঘন্টা নীরবতা পালনের ঘোষণা দেন অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ফরিদ উদ্দিন খান। এ সময় প্রক্টর লুৎফর রহমান ও সভাপতির সাথে কথা বলার পর তাকে আর আন্দোলনে আসতে দেয়া হয়নি। সূত্রে জানা গেছে, আন্দোলনে আসলে ছাত্রলীগ তাকে লাঞ্ছিত করতে পারে এ সম্ভাবনায় শিক্ষক ফরিদকে আসতে দেননি বিভাগের সভাপতি প্রফেসর কেবিএম মাহবুবুর রহমান। আন্দোলনে আসতে না দেয়ার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবন সামনে জোহার মাজারে এক ঘন্টা নীরবতা পালন করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এদিনও সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নেতৃতে রাবি প্রশাসন ভবনের পাশে সশস্ত্র অবস্থান নেয় রাবি ছাত্রলীগ।
হামলার নেতৃত্বে যারা: ২ জুলাই আন্দোলনে বেশকিছু নেতাকে বেপরোয়াভাবে আন্দোলনকারীকে পেটাতে দেখা গেছে। হামলায় মূল ভূমিকা পালন করে ১০-১৫ জন নেতাকর্মী। মূল নেতৃত্বে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক থাকলেও মারধরের সময় তাদের দেখা যায়নি। সরাসরি মারধরে অংশ নেয় কয়েকজন সহ-সভাপতি, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদের আরও কয়েকজন শীর্ষনেতারা।
রবিবার কোটা আন্দোলনকারীদের উপর আক্রমণে চাপাতি হাতে দেখা গেছে ছাত্রলীগকর্মী লতিফুল কবির মানিককে। হাতুড়ি হাতে দেখা গেছে ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক ও সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মামুনকে। বিভিন্ন ছবিতে বাঁশের লাঠি হাতে সবার সমানে ছিল সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদি হাসান মিশু। বিভিন্ন ছবিতে মারধরে তাকে আগ্রাসী ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে।
এরা ছাড়াও আক্রমণে মূল ভূমিকায় আরো ছিলেন, রাবি ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি গোফরান গাজী, মিজানুর রহমান সিনহা, রমিজুল ইসলাম রিমু, সাদ্দাম হোসেন, আহমেদ সজীব, ছানোয়ার হোসেন সারোয়ার, আরিফ বিন জহির, সাংগঠনিক সম্পাদক সাবরুল জামিল সুষ্ময়, হাসান লাবন, ইমতিয়াজ আহমেদ, প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক আসাদুল্লাহ হিল গালিব, কর্মী জন স্মিথ ও রাশেদ খান।
শিক্ষার্থীকে মারধর করলো রাবি ছাত্রলীগ : প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কটূক্তি করার অভিযোগ এনে এক শিক্ষার্থীকে মারধর করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। বুধবার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট ভবনের সামনে এ ঘটনা ঘটে। পরে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর প্রফেসর ড. লুৎফর রহমানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মারধরের স্বীকার শিক্ষার্থীর নাম জসিম উদ্দিন বিজয়। সে বিশ্ববিদ্যালয় আরবী বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী।
প্রত্যক্ষদর্শীসূত্রে জানা যায়, মারধর করার ফলে জসিমের মুখ ও ঠোঁট ফুলে যায়। জানতে চাইলে ভুক্তভোগী জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বিভাগের পরীক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আমি সিনেট ভবনের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন কয়েকজন ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়াসহ নেতা-কর্মী এসে আমাকে মারধর করে।’
মারধরের বিষয়টি অস্বাীকার করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু বলেন, ‘মারধরের কোন ঘটনা ঘটেনি। এক শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কটূক্তি করছিল আমরা তাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরের কাছে হস্তান্তর করেছি।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে আহত শিক্ষার্থীকে এনে প্রক্টর দপ্তরে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছি। সে এখন আমার এখানেই বিশ্রাম করছে।’
খুলনায় কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ, খুলনা অফিস জানায়, খুলনায় কোটা পদ্ধতি সংস্কারের প্রজ্ঞাপনের দাবিতে প্রগতিশীল ছাত্র জোটের মানববন্ধনে লাঠিচার্জ করেছে পুলিশ। এতে ৮/১০ জন ছাত্র আহত হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে মহানগরীর পিকচার প্যালেস মোড় ও হাদিস পার্ক এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আন্দোলনরত ছাত্ররা মানববন্ধনের জন্য জড়ো হতে শুরু করলে পুলিশ বাধা দেয়। এসময় ছাত্ররা পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে মানববন্ধন করতে চাইলে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ব্যানার কেড়ে নেয় ও ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয়। এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রুহুল আমিন জানান, শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনের শুরু থেকেই পুলিশ বাধা দেয়। পিকচার প্যালেস মোড়ে সড়কের একপাশে ছাত্ররা দাঁড়াতে চাইলে পুলিশ সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। পরে হাদিস পার্ক এলাকায় ছাত্ররা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে। এতে ৮ থেকে ১০ জন ছাত্র আহত হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ