ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 July 2018, ২১ আষাঢ় ১৪২৫, ২০ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রসঙ্গে

সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ শুধু নয়, ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগও হামলা চালাচ্ছে। হামলার সময় নিষ্ঠুরভাবে মারপিট করা হচ্ছে। কিল-চড় ও লাথির পাশাপাশি ব্যবহার করা হচ্ছে লাঠি, লোহার রড এবং ছুরি ও চাকু। এসব হামলায় এরই মধ্যে গুরুতর আহত অনেককে হাসপাতালে ভর্তি হতে এবং চিকিৎসা নিতে হয়েছে। কারো কারো সম্পর্কে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার আশংকাও ব্যক্ত করেছেন চিকিৎসকরা। একযোগে চলছে গ্রেফতারের অভিযানও। অন্দোলনকারী ছাত্রদের সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নিয়ে প্রচণ্ড নির্যাতন করা হয়েছে। কয়েকজনকে আদালতের মাধ্যমে করাগারেও ঢুকিয়েছে পুলিশ। গাড়ি পোড়ানো এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের বাসায় হামলা চালানোর মতো বিভিন্ন অভিযোগে মামলা দায়ের করা হচ্ছে ঢালাওভাবে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতির এতটাই অবনতি ঘটেছে যে, আন্দোলনকারীরা কোথাও কোনো সমাবেশ করতে পারছে না। তাদের এমনকি সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন পর্যন্ত করতে দেয়া হচ্ছে না। দিন কয়েক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনে পূর্বঘোষিত সংবাদ সম্মেলন করতে গিয়ে ছাত্রলীগের হামলায় আহত হয়েছে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী। শাহবাগ এলাকায় আন্দোলনকারী হিসেবে চিহ্নিত করে পথচারী সাধারণ মানুষকেও পিটিয়েছে ছাত্রলীগের গু-া-সন্ত্রাসীরা, যাদের মধ্যে মাদরাসার শিক্ষকও রয়েছেন। ছাত্রলীগের সঙ্গে সেদিন পুলিশ সদস্যরাও যোগ দিয়েছিল। তারা শুধু পিটিয়েই থেমে যায়নি, মিথ্যা অভিযোগে অনেক নিরীহ মানুষকে থানায়ও ঢুকিয়ে ছেড়েছে। থানার ভেতরেও পুলিশ তাদের ওপর যথেচ্ছভাবে নির্যাতন চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে হামলা ও নির্যাতনের পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের বানোয়াট মামলায় গ্রেফতারসহ পরিস্থিতি মারাত্মক হয়ে ওঠায় জনগণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর উদ্দেশ্যে গত মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অভিভাবকরা একটি সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু অনুমতি নেয়া হয়নি ধরনের যুক্তি দেখিয়ে সে সমাবেশও প- করে দিয়েছে পুলিশ। বড় কথা, সেখানেও লাঠির ব্যবহার করেছে পুলিশ। শুধু তা-ই নয়, অভিভাবক হিসেবে আগত বিশিষ্ট অনেক ব্যক্তিও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক। সাংবাদিকদের কাছে এই অধ্যাপক বলেছেন, পুলিশের হাতে আটক হওয়া কয়েকজন অভিভাবককে ছাড়ানোর জন্য অনুরোধ করতে গেলে পুলিশ সদস্যরা তাকে এমনকি চড়-থাপ্পড় পর্যন্ত মেরেছে। নিজের পরিচয় দেয়ার পরও পুলিশ সদস্যরা সামান্য সম্মান দেখায়নি। একইভাবে লাঞ্ছিত ও অসম্মানিত হয়েছেন আরো অনেক অভিভাবকও। অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন, কোটা সংস্কারের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানানোর জন্য তারা আসেননি। তারা এসেছিলেন পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করার দাবিতে, যাতে তাদের সন্তানদের ওপর যেখানে-সেখানে হামলা চালানো না হয়। যাতে তাদের সন্তানরা নিরাপদে বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতে এবং লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারে।
রাজধানীর পাশাপাশি দেশের অন্য সকল স্থানেও পুলিশ ও ছাত্রলীগের সদস্যরা হামলা চালাচ্ছে। আন্দোলনকারী ও সাধারণ মানুষ তো বটেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকসহ সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের সম্মানিত ব্যক্তিরাও এসব হামলার শিকার হচ্ছেন। গত মঙ্গলবার এ ধরনের হামলায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা চত্বরে আয়োজিত এক শান্তিপূর্ণ সমাবেশ প- হয়ে গেছে। দেশব্যাপী চলমান হামলা ও গ্রেফতারের প্রতিবাদে সেখানে মাত্র দশ মিনিটের এক সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ এবং ছাত্রলীগ সে সমাবেশও হতে দেয়নি। নগ্ন পায়ে আগত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদেরও যথেচ্ছভাবে অসম্মানিত করেছে তারা। সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা। প্রক্টরসহ দায়িত্বপ্রাপ্তরাও অধ্যাপকদের লাঞ্ছিত করার কর্মকা-ের ব্যাপারে বিস্ময়কর নীরবতা অবলম্বন করেছেন। জড়িত ও দায়ী কারো বিরুদ্ধেই কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অর্থাৎ প্রায় ঘোষণা দিয়েই ছাত্রলীগ ও পুলিশের অন্যায় কর্মকান্ডের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও প্রক্টরসহ প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা বিশিষ্টজনেরা।
আমরা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী এবং তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসা সকলের ওপর ছাত্রলীগ ও পুলিশের নির্বিচার হামলা, গ্রেফতার, মিথ্যা মামলাসহ সমগ্র বিষয়টিকে গুরুতর মনে করি। প্রসঙ্গক্রমে স্মরণ করা দরকার, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলে আসছে বেশ কিছুদিন ধরে। আন্দোলন বেগবান হয়ে উঠলে গত ১১ এপ্রিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং কোটা ব্যবস্থা বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা বলেছিল, বাতিল নয়, তাদের দাবি কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। এ ব্যাপারে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের ঘোষণাও এসেছিল সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু অন্তরালের নানা ষড়যন্ত্র এবং নেতিবাচক প্রচারণার পরিপ্রেক্ষিতে অতি সম্প্রতি আবারও শুরু হয়েছে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন। আমরা মনে করি না যে, সরকারের সত্যি সদিচ্ছা থাকলে ছাত্রলীগ ও পুলিশের পক্ষে এতটা ভয়ংকরভাবে মারমুখী হয়ে ওঠা সম্ভব হতো। অন্যদিকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে আন্দোলন প্রতিহত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেই এর বিরুদ্ধে দেশের সকল মহলে প্রতিবাদ উঠেছে।
আমরা মনে করি, হামলা এবং গ্রেফতারসহ দমন-নির্যাতন মোটেই গণতন্ত্রসম্মত পন্থা হতে পারে না। সরকারের উচিত ছাত্রলীগ ও পুলিশের হিংসাত্মক কর্মকা-ের অবসান ঘটানো এবং বিভিন্ন হামলার ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা ও বিচার করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা। আমরা একই সঙ্গে কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের জন্যও দাবি জানাই। কারণ, বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থায় সব মিলিয়ে দেশের মাত্র ২ দশমিক ৬৩ শতাংশের জন্য বরাদ্দ রয়েছে সরকারি চাকরির ৫৬ শতাংশ। অন্যদিকে ৯৭ দশমিক ৩৭ শতাংশের জন্য রয়েছে মাত্র ৪৪ শতাংশ। বিশ্বের কোনো দেশেই এ ধরনের চরম বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা নেই। থাকাও উচিত নয়। আমরা তাই কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করি এবং অনতিবিলম্বে তাদের দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ