ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 July 2018, ২১ আষাঢ় ১৪২৫, ২০ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ম্যারাডোনা, পেলে এরপর কে?

মোহাম্মদ সুমন বাকী : বিশ্বকাপ ফুটবলে তারকাদের নিয়ে তর্ক-বিতর্ক নতুন কিছু নয়। তা দেখা যায় গোল টেবিলের আলোচনা থেকে মাঠের দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে একেবারে রাজপথ পর্যন্ত। যা হৈ চৈ ফেলে দেয় সারা বিশ্বে। আলোচনা, পর্যালোচনায় সবাইকে মাতাল করে ছাড়ে। প্রিয় সুপার তারকাকে কেউ ছোট আকারে ভাবতে চান না। যার যার প্রিয় তারকা খেলোয়াড়কে সে সে অনেক বড় মাপের মনে করেন। গড়ে সাফল্যটা অনেক বেশি থাকায় ফাঁকে ফাঁকে ব্যর্থ হলেও চোখের পাতায় ধরা পড়ে না সেটা। বিপরীত ধারায় প্রিয় তারকার প্রতি এমন অফুরন্ত ভালোবাসার কারণে তর্ক-বিতর্ক নামক শব্দটি ঘুরে ফিরে অবস্থান পায় গোল টেবিলের আলোচনায়। তা সকলকে রোমাঞ্চকর জোয়ারে ভাসায়। সারা বিশ্বে এমন দৃশ্য দেখা যায়। প্লেয়ার এর পাশাপাশি ফুটবল স্থায়ী আসন গেড়েছে জনপ্রিয়তার মায়া বন্ধনে। যা থেকে এক ধাপ নীচে নামাতে পারেনি অন্য খেলা। অপ্রিয় হলেও সেটাই সত্য কথা। ফুটবল মাঠে গড়ায় উত্তেজনার গতিতে। তখন মনকে রাখে ফুরফুরে মেজাজে। গোল দেখার প্রত্যাশায় সবার দৃষ্টিপাত হয় সবুজ ঘাসের ময়দানে। এভাবে গ্যালারীর আসনে ক্রীড়া ভক্ত দর্শকের সমাহার ঘটে। একজন ফুটবলার তারকার মর্যাদা আসন পেয়ে যান সেই স্বপ্নের গোল বাস্তবায়ন করে। মাঠে এই চিত্র বার বার ফুটে উঠেছে। সেটা বজায় আছে যুগ যুগ ধরে। রোমাঞ্চকর মনোভাব দেখা যায় এমন উত্তেজনায় ভরা প্রশ্নের মাঝে! যা ঘিরে থাকে কোটি কোটি ক্রীড়া প্রেমীর তুলতুলে হৃদয় স্পর্শ করে। ধরা দেয় গাঢ় ভালোবাসার জোয়ারে। অবশ্যই সেটা বিশ্বকাপের রং মহলে। তা শতাব্দীর পর শতাব্দী হতে। সেরা প্লেয়ার, সর্বোচ্চ গোলদাতাসহ বিভিন্ন পজিশনের সুপার পারফর্মার পাওয়া যায় যেখানে। এই ধারায় বিশ্ব ফুটবলের মহানায়ক এবং আর্জেন্টাইন ভালোবাসা দিয়াগো আরমান্ডো ম্যারাডোনার মুখটি ভেসে উঠে সেখানে। যিনি তর্ক-বিতর্কের টেবিলের আলোচনায় কোনঠাসা করে ফেলেন ব্রাজিল ফুটবল ভুবনের ব্ল্যাক ডায়মন্ড পেলেকে। যা ব্যক্তিগত নৈপূণ্যের দাপটে। সেটা ইতিহাস থেকে ইতিহাস হয়েছে শুধুমাত্র পরিবর্তনের ছোঁয়া দিয়ে। কে সেরা? ম্যারাডোনা না পেলে? এমন তর্ক-বিতর্কের মহা ঝড় উঠে সারা পৃথিবীতে। যা মানুষের মুখে মুখে শোভা পায়। গোল বলের আকর্ষণীয় জগতে মাস্ট গ্রেট প্লেয়ার দিয়াগো ম্যারাডোনা। সে তালিকায় কালো মানিক পেলে কম নয়। যাদেরকে নিয়ে টেবিলের আলোচনায় তর্ক-বিতর্কে জড়াতে অন্য সব খেলোয়াড়ের যত ভয়। তাইতো ফিফার গোপন ভোটের আয়োজন। জিতবে কে? পেলে না ম্যারাডোনা? প্রথম জনের ফুটবল অবসর নেয়াটা খুবই সুন্দর। ফিফার সু-নজর থাকার কারণে এ দৃশ্যপট। দ্বিতীয় জনের শেষ লগ্নের ক্যারিয়ারটা নানা ঘটনায় জড়ানো। সেটা এক কথায় দুঃখজনক তার ব্যক্তিগত ও ক্রীড়া জীবনকে ঘিরে। এই পরিস্থিতিতে পেলে জয় পাবেন নিশ্চিত। না, তা আর হয়ে উঠেনি। কারণ ময়দানের পারফরম্যান্সকে প্রাধান্য দেন ভোটাররা। এর ফলে ম্যারাডোনা জয়ী হন বিশাল ব্যবধানে। পেলের সঙ্গে তার প্রাপ্ত ভোটের পার্থক্য ছিলো ৫০ পার্সেন্ট বেশি। যা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয় রোমাঞ্চকর পরিবেশে। ২০০০ সালের ঘটনা এটা। তখন শতাব্দীর সেরা প্লেয়ার এর রাজকীয় মুকুট পরেন ম্যারাডোনা। যার উদ্ভাসিত, কার্টুন, শৈল্পিক এবং দলের প্রয়োজনে কৌশলগত পারফর্ম পুরো বিশ্বকে নাচিয়েছে। তিনি ছিলেন অসাধারণ ফুটবলার। সেই তালিকায় পেলে চমৎকার। তখন মাত্র কয়েক সদস্যের ফিফা জুরি বোর্ড কর্তৃক পুরস্কার পায় সে। তিনি মঞ্চে উঠেন ভোটে জয়ী ম্যারাডোনাকে সঙ্গী বানিয়ে। ইতালীর পাওলো রসি, ব্রাজিলের জিকো, জার্মানির রুমানিগে, ফ্রান্সের প্লাতিনি, ইংল্যান্ডের লিনেকার, আর্জেন্টিনার বুরুচাগা, রুমানিয়ার হ্যাজীসহ অনেক সুপার তারকা শতাব্দীর সেরা হবার তালিকায় প্রার্থী হন সেখানে। তা জানা আছে সবার। এমন অবস্থায় ঊনবিংশ শতাব্দীতে ম্যারাডোনা হলেন বিশ্ব ফুটবল ভুবনে বড় উপহার। যা বজায় রয়েছে এখন পর্যন্ত। সে কথা সকলের বোধগম্য। ক্যারিয়ার সূচনা, বয়স বিবেচনায় দু’জনার মধ্যে পেলে সিনিয়র। সেটাও আবার কয়েক ধাপ এগিয়ে। তা জানেন ক্রীড়া প্রেমীরা।
গত শতাব্দীর চল্লিশ দশকে ব্রাজিলের পেলে ফুটবল ভুবনে পা রাখেন। যা ছিলো প্রাথমিক লেবেলের ছোঁয়ায়। সেটা নিজেকে গড়ে তোলার উত্তম সময়। যিনি ধাপে ধাপে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম মডেল হয়ে উঠেন। তার পারফরম্যান্স ছিলো ইর্ষনীয়। তা পৃথিবী জুড়ে এক তরফা প্রশংসায় ঘেরা। তখন জার্মানির বেকেন বাওয়ার মাঝে মধ্যে আলোচনার লাইম লাইটে চলে আসতেন। ব্যস, এইটুকু পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। ফুটে উঠে পেলের রাজত্ব। ১৯৫৮, ৬২ ও ৭০ বিশ্বকাপ জয়ী ব্রাজিল টিমের প্লেয়ার ছিলেন তিনি। এমন চমকপ্রদ সাফল্য বজায় থাকে তার বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে। যা ছিলো বিশ্বব্যাপী আলোচিত। পেলে গোল করেছেন অনেক। সেটা জাতীয় এবং ক্লাব দলের হয়ে। কেউ কি জানতো, একই শতাব্দীর ষাট দশকে আরেকজন ওনার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিবে? হ্যাঁ তা ঘটেছে ফুটবল ময়দানের যুদ্ধে। অনেকের কাছে অপ্রিয় হলেও যা সত্য কথা। সে জন্য ঠিকই উপস্থিত হন দুর্দান্ত নৈপূণ্য, সাফল্য এবং দল নায়কের ভূমিকায়। যিনি উপরোল্লিখিত বাক্যের ব্যাখ্যায় প্রথম ও শেষ বিষয়ে অনেকদূর এগিয়ে ছিলেন। তাই ভোট প্রাপ্তির ব্যবধানে পরিলক্ষিত হয় বিশাল পার্থক্য। তিনি আর কেউ নয়, সকলের খুবই পরিচিত মুখ। যার নাম দিয়াগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা। তখনই আধুনিক ফুটবল হয়ে উঠে সোনায় সোহাগা। ৭০, ৮০ ও ৯০ দশকে আর্জেন্টিনা এবং বিভিন্ন ক্লাব দলের পক্ষে ভুরি ভুরি সাফল্য তার সোনালী ক্যারিয়ারকে মজবুত করে। সবার চোখের পাতায় সেটা ধাপে ধাপে গাঢ় হয়ে ফুটে উঠে। তা তর্ক-বিতর্কের জন্ম দিয়ে। বিষয়-সেরা কে, ম্যারাডোনা না পেলে? অবশেষে প্রথম জনের জয় হয় ভোটের মাধ্যমে। ফুটবল গ্রেট আর্জেন্টাইন ম্যান! যিনি সুপার হিরো। এর প্রমাণ মাঠে পাওয়া গেছে বার বার। সত্যি ম্যারাডোনা চমৎকার। যা দেখা গেছে পারফরম্যান্সের গুণে। বল নিয়ন্ত্রণ, ডজ, রিসিভ, পাস, ক্রস, ফ্রি কিক এর বৃত্তে অতুলনীয় সে। ৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার করা গোলটি এখনো সেরা। পাঁচ-ছয় জন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে এই কীর্তি অর্জন করেন। একই ম্যাচে ইশ্বরের কৃপায় উড়ন্ত অবস্থায় ম্যারাডোনার হ্যান্ড গোলটি আলোচিত। সেটা ঘটে কোয়ার্টার ফাইনালে। শুধু প্লেয়ার হিসেবে নয়, তিনি সফল অধিনায়ক। ১৯৭৯ সালে তার নেতৃত্বে যুব বিশ্বকাপ জিতে আর্জেন্টিনা। সে সময় থেকে অসাধারণ তারকা বনে যান ফুটবল রাজ্যে। ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ জয় করে আকাশী-সাদা শিবির। থেমে থাকেনি সাফল্য। তা বিভিন্ন ক্লাব দলের হয়ে। স্ব-দেশে বোকা জনিয়র্স এবং ইতালীর নেপোলীর জার্সি পরে সাফল্যের জোয়ারে ভেসে যান তিনি। ম্যারাডোনার হাত ধরে ১৯৯০ বিশ্বকাপে রানার্স আপ হয় আর্জেন্টিনা। এর পাশাপাশি কনফেডারেশন কাপের প্রথম শিরোপা জিতে। স্বর্ণের বল, রূপার বুট (৮৬) ও রূপার বল (৯০) সব পুরস্কার ধরা দেয় তার কাছে। যা শক্তি যোগায় ঊনবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব সেরা হতে। বিংশ শতাব্দীতে মেসি, ওর্তেগা, রোনাল্ডো, কাকা, এ্যাগুয়ারা, হিগুইন, রোনালদিনহো, নেইমার, জিদান, মুলার, ইনেয়াস্তা, ক্রিস্টিয়ান রোনাল্ডো, মুসা, সালাহ, লুকা এর মতো আকর্ষণীয় তারকার সবুজ-ঘাসের মাঠে পদচারণা ঘটে। যাদের নৈপূণ্য মন ভরে দিয়েছে সবার। সেই বিচারে এক বাক্যে তারা চমৎকার। কিন্তু ম্যারাডোনা পেলের ন্যায় আসন পোক্ত করতে পারেননি এখন পর্যন্ত! সেটা কেন? তাই স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন জাগে! ম্যারাডোনা, পেলে এরপর কে? যা সময়ই বলে দিবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ