ঢাকা, বৃহস্পতিবার 5 July 2018, ২১ আষাঢ় ১৪২৫, ২০ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ফুটবল বিশ্বের নতুন সেনসেশন এমবাপ্পে

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : মেসি, নেইমার, রোনালদোদের ভীড়ে নতুনদের খুঁজে পাওয়া খুবই কষ্টকর। তবে এবারের বিশ্বকাপে বেশ কয়েকজন নবীন ফুটবলার নিজেদের আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে চলেছেন। এদের মধ্যে অন্যতম এমবাপ্পে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কিলিয়ান এমবাপ্পের জীবনে অনেক কিছু ঘটে গেল। লিওনেল মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর মতো তারকা যেটা পারেন নি, মাত্র ১৯ বছর বয়সে সেটা করেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিশ্বকাপের ‘শেষ ১৬’ রাউন্ডের নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনাকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে ফ্রান্সের কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার নায়ক হয়ে গেলেন ১৯ বছর বয়সী এই কিশোর। তার এই উত্থানে খুব বেশি সময় লাগেনি। মাত্র তিন বছর আগে তিনি হাই স্কুলে তার লেখাপড়া শেষ করেছেন। তারপর দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি হয়ে উঠেছেন একজন পেশাদার ফুটবলার। ফ্রান্সের জাতীয় দলের খেলোয়াড়। বিশ্ব ফুটবলের নতুন সেনসেশন। মাঠে বলের পিছু তার ছোটার গতি বিস্মিত করেছে কোটি কোটি ফুটবল অনুরাগীকে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জোড়া গোল করে ফ্রান্সকে জেতানো এমবাপ্পে ছুঁয়েছেন ৬০ বছর আগে গড়া পেলের কীর্তি। ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলের পর প্রথম টিনএজার হিসেবে বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে একাধিক গোল করলেন ফ্রান্সের এই ফরোয়ার্ড। ৬৪তম মিনিটে দারুণ এক গোলে দলকে এগিয়ে নেওয়ার চার মিনিট পর কোনাকুনি শটে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন এমবাপ্পে। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে সুইডেনের বিপক্ষে ব্রাজিলের ৫-২ ব্যবধানে জেতা ম্যাচে জোড়া গোল করেছিলেন পেলে। কিংবদন্তি এই ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের পাশে নিজের নামটা ওঠায় দারুণ খুশি এমবাপ্পে। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমি খুবই খুশি। এই কীর্তিতে পেলের পর দ্বিতীয় টিনএজার হওয়াটা তৃপ্তিদায়ক। পেলের সঙ্গে থাকতে পারাটা দারুণ ব্যাপার।’ আকস্মিকভাবে সাড়া ফেলে দেওয়া এই কিশোর বর্তমানে খেলছেন ফরাসী ক্লাব প্যারিস সঁ জার্মেইনের হয়ে। এর মধ্যে তিনি দুই বার ফরাসী লীগ জিতেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এখন এই প্যারিস সঁ জার্মেইন ক্লাবে স্থায়ীভাবে খেলার ব্যাপারে তার সঙ্গে ১৮ কোটি ইউরোর (প্রায় ১ হাজার ৭৬৪ কোটি বাংলাদেশী টাকা) একটি চুক্তি হতে পারে। রাজধানী প্যারিসের উত্তর-পূর্ব শহরতলিতে বেড়ে ওঠার সময় ফুটবলে দক্ষতা অর্জন করতে শুরু করেন তিনি। সে সময় তিনি খেলতেন এএস বন্ডি ক্লাবে। এমবাপ্পে খেলা শুরু করার পর হু হু করে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এই ক্লাবের। একই সঙ্গে অল্পবয়সী ছেলেরাও ভীড় করতে শুরু করে এই ক্লাবের হয়ে খেলার জন্যে। তাদের স্বপ্ন যে তারাও এমবাপ্পের মতো ফুটবলার হবেন। এএস বন্ডি ক্লাবের গর্বিত প্রেসিডেন্ট আতমানে এরুশ বলেছেন, এই ক্লাবেই এমবাপ্পের জন্ম হয়েছে। তার বাবা এই ক্লাবেরই একজন খেলোয়াড় এবং কোচ ছিলেন। তাই শিশু বয়স থেকেই এমবাপ্পের এই ক্লাবে যাওয়া আসা আছে।  ফুটবল খেলা সে এখানেই শিখেছে। খেলা শুরু হওয়ার আগে দেখতাম, দু’বছর বয়সী একটি বাচ্চা বল নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সে আমাদের সঙ্গে বসে থাকত, টিমের সদস্যরা যখন আলোচনা করত তখন সে চুপ করে মন দিয়ে শুনত। এভাবেই ধীরে ধীরে সে আজকের এমবাপ্পে হয়ে উঠেছে।
ইংল্যান্ডের সাবেক ফরোয়ার্ড গ্যারি লিনেকার যেমন বলেছেন, আগেই বলেছিলাম, কিলিয়ান এমবাপ্পে হবে বিশ্ব ফুটবলের পরবর্তী সুপারস্টার। দানবীয় গতি এবং নিখুঁত ফিনিশিং এমবাপ্পেকে রাশিয়ার আসরে নিশ্চিতভাবেই প্রতিপক্ষের জন্য ভয় পাওয়ার মতো খেলোয়াড় বানিয়ে দিয়েছে। ২০১৫ সালে পেশাদার ফুটবলে অভিষেকের পর থেকে উন্নতির ধারাবাহিকতায় থাকা এই তরুণ রাশিয়ার আসরে এরই মধ্যে ৩ গোল করেছেন। তবে প্রশংসা, তুলনার স্রোতে ভেসে যাচ্ছেন না পিএসজির এই ফরোয়ার্ড। মাথা রাখছেন ঠাণ্ডা। পেলের পর দ্বিতীয় টিনএজার হওয়াটা তার কাছে খুবই তৃপ্তিদায়ক। পেলে ভিন্ন ক্যাটেগরির। তবে তাদের সঙ্গে থাকতে পারাটা ভালো। ‘আমি সব সময় যেটা বলি, সেটা ইতোমধ্যে বলেছি, বিশ্বকাপে আপনি সব উচুঁ পর্যায়ের খেলোয়াড় পাবেন। তাই আপনি কি করতে পারেন এবং আপনার কি সামর্থ্য সেগুলো দেখানোর জন্য এটা একটা সুযোগ। এটা দেখানোর জন্য বিশ্বকাপের চেয়ে ভালো জায়গা আর নেই।’
ফ্রান্সের অধিনায়ক উগো লরিস জানান, রাশিয়ায় এসে ঠিক এই কাজটিই করেছেন এমবাপ্পে। “আমি মনে করি, এমবাপ্পে সারা বিশ্বের সামনে নিজেকে তুলে ধরেছে।” আর্জেন্টিনা ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে চার মিনিটের মধ্যে গোল দুটি করেন এমবাপ্পে। অতোঁয়ান গ্রিজমানের স্পট কিক থেকে পাওয়া গোলের পেছনের কারিগরও তিনি। দানবীয় গতিতে ৭০ মিটার দৌড়ে ডি-বক্সে ঢুকে পেনাল্টিটি আদায় করেছিলেন পিএসজির এই ফরোয়ার্ড। মেসিদের বিপক্ষে দারুণ পারফম্যান্সের পর এমবাপ্পের মাটিতে পা রাখা দেখে খুশি ফরাসী ফরোয়ার্ড ফ্লোরিয়ান থাউভিন। পেনাল্টি আদায় করা ওই দৌড়ের প্রসঙ্গ টেনে মজা করে তিনি বলেন, “আমি বিস্মিত হয়ে ভাবছিলাম সে স্কুটার চালাচ্ছে নাকি।” “ম্যাচের পর আমি তাকে ঠাণ্ডা দেখলাম। যেন কিছুই ঘটেনি এমন একটা ব্যাপার।”
তারপরও ফ্রান্সের এই ‘বিস্ময় বালককে’ কোয়ার্টার-ফাইনালে আরও বেশি কিছু দেখাতে হবে। সেমি-ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ১৯৯৮ সালের চ্যাম্পিয়নদের প্রতিপক্ষ উরুগুয়ে। এমবাপ্পেকে খেলার জন্য অতটা জায়গা উরুগুয়ে দেবে না, যতটা কাজানে আর্জেন্টিনা দিয়েছিল। কোয়ার্টার-ফাইনাল ম্যাচের আগে গ্রিজমান অবশ্য এমবাপ্পেকে কিছু পরামর্শ দিতে পারেন। কেননা, উরুগুয়ের হোসে মারিয়া হিমেনেস ও দিয়েগো গদিন এই দুই নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার আতলেতিকো মাদ্রিদে তার সতীর্থ। থাউভিনেরও মনে হচ্ছে গ্রিজমানের পরামর্শ কাজে লাগবে। “একটা বিষয় নিশ্চিত, অতোঁয়ানের উপদেশ হবে মহামূল্যবান। সে তাদের (উরুগুয়ের) কিছু খেলোয়াড়কে জানে।” “গদিন এবং হিমেনেস আতলেতিকোয় একসঙ্গে খেলে। তারা পরস্পরকে নিখুঁতভাবে জানে এবং তারা খুবই কম ভুল করে। তারা কেবল একটু ধীর গতির হতে পারে। তাই তাদের পেছনে আমাদের খেলার জন্য জায়গা খুঁজে পাওয়া দরকার।” উরুগুয়ে ম্যাচে এমবাপ্পের ওপর বাড়তি প্রত্যাশার চাপ দিতে রাজি নন গ্রিজমান। তবে অস্কার তাবারেসের দলের বিপক্ষে লড়তে প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন এই ফরোয়ার্ড। “কোয়ার্টার-ফাইনালে অবশ্যই এমবাপ্পের কাছে অত বেশি আশা করা ঠিক হবে না। কেননা, উরুগুয়ে তার জন্য প্রস্তুত থাকবে।” ফ্রান্স বিশ্বকাপ জিতেছে একবারই। কিলিয়ান এমবাপ্পের জন্মও সে বছর, ১৯৯৮ সালে। মাত্র চারটি আসর পর ফ্রান্স সেই এমবাপ্পে ঘিরেই বুনছে আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। স্বপ্নটাকে অলীক বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অসুস্থতার কারণে এত দিন পুরো বিশ্বকাপে ‘নীরব’ থাকা পেলেও যে সরব হয়েছেন আর্জেন্টিনা ম্যাচের এমবাপ্পেকে দেখে! সুইডেনে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জিতে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন পেলে। উনিশের এমবাপ্পের মাঝে ‘এবারের পেলে’কে দেখছেন অনেকে। একজন উত্তরসূরি পেয়ে টুইট করেছেন পেলে স্বয়ং, ‘অভিনন্দন কিলিয়ান এমবাপ্পে। এত কম বয়সে বিশ্বকাপে দুই গোল করে অনন্য একটা ক্লাবে নাম লিখিয়েছ। শুভ কামনা রইল তোমার বাকি ম্যাচগুলোর জন্য।’ সঙ্গে অবশ্য অট্টহাসির ইমোজিতে পেলে জানাতে ভোলেননি, ‘শুধু ব্রাজিল ম্যাচ ছাড়া!’ পেলের দেশ নকআউটের দুটি বাধা জিতলে পরে সেমিফাইনালে এমবাপ্পের দেখা হবে নেইমারদের সঙ্গে, যে দ্বৈরথে ফিরে ফিরে আসবে প্যারিস সেন্ট জার্মেইও। দুজনে তো ফরাসী এই ক্লাবের সতীর্থও।
অবশ্য পেলে কিংবা নেইমার এমনকি মেসিও নন, কিলিয়ান এমবাপ্পে বড় হয়েছেন নিজের শোবার ঘরে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর পোস্টার দেখে দেখে। রোনালদোর এবারের বিশ্বকাপ যেদিন শেষ হলো, কাকতালীয়ভাবে সেদিনই মহামঞ্চ এমবাপ্পের দখলে। তার অবিশ্বাস্য গতির পেছনে আর্জেন্টাইনদের হাঁপিয়ে ওঠা মুখগুলোই যেন সে ম্যাচের সবচেয়ে বড় পার্থক্য। অবশ্য আর্জেন্টিনা কেন, অলিম্পিক মানের গতির সঙ্গে স্কিল দিয়ে এমবাপ্পে যেকোনো রক্ষণভাগের জন্যই বিপজ্জনক। আন্তোয়ান গ্রিয়েজমানকে ফেলে ২০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে নামা এমবাপ্পেই এখন ফরাীসদের স্বপ্নসারথি। ফ্রান্সের একমাত্র বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক দিদিয়ের দেশম এবারের কোচ। কাজানে আর্জেন্টিনাকে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট হাতে মিডিয়ার মুখোমুখি হয়ে কৌতুক করেছেন তিনি, ‘ওর (এমবাপ্পে) জন্ম হয়েছে খুব ভালো সময়ে, সে বছরই আমরা বিশ্বকাপ জিতেছিলাম।
যদিও সেবারের বিশ্বকাপের পুরোটা দেখেছে বলে মনে হয় না!’ পরমুহূর্তেই কোচসুলভ অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলেন দেশম, ‘এমবাপ্পের জন্মই হয়েছে ফুটবল খেলার জন্য। ক্লাব আর খেলোয়াড়দের সম্পর্কে খুব ভালো জানে। আমি সব সময়ই বলে আসছি যে ও খুব ভালো খেলোয়াড়। তবে এই মুহূর্তে আমি এর চেয়ে বেশি ওর সম্পর্কে বলতে চাই না।’ তবে এটুকুতেই আত্মতুষ্টিতে ভুগলে উন্নতির রাজপথ থেকে পিছলে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। ফুটবলবিশ্ব তো এমনটা কম দেখেনি। সে কারণেই কিনা দেশম পরোক্ষে শুনিয়ে দিলেন এমবাপ্পেকে, ‘সে (এমবাপ্পে) ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো টাইপের খেলোয়াড় নয়। রোনালদো মাঠজুড়ে খেলে আর বল পায়ে ওর গতি অবিশ্বাস্য। কিলিয়ানের গতি সে তুলনায় কিছুটা কম, তা ছাড়া জায়গাও একটু বেশি লাগে।’ এত কিছু বলার পরও এমবাপ্পেকে ঘিরে অতি উচ্ছ্বাস যদি কমে গিয়ে না থাকে! সে কারণেই কিনা রাশ টানার শেষ চেষ্টা দেশমের, ‘দেখুন, পেলের সঙ্গেও ওর তুলনা হচ্ছে। তার মানে আমরা একজন বিশ্বচ্যাম্পিয়নের সঙ্গে তুলনা করছি একজন মানসম্পন্ন ফুটবলারের।’ তবে দিদিয়ের দেশমও আশায় থাকবেন, ‘ওর বয়স মাত্র ১৯। উন্নতির জন্য সামনে অনেক সময় রয়েছে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ