ঢাকা, শুক্রবার 6 July 2018, ২২ আষাঢ় ১৪২৫, ২১ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ছড়া

মুহম্মদ মতিউর রহমান : মুসলিম বাংলার সাংবাদিকতার জনক হিসাবে খ্যাত মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ (জন্ম ইংরেজি ১৮৬৮, বাংলা ১২৭৫ সনের ২৪ জ্যৈষ্ঠ, মৃত্যু ইংরেজি ১৮ আগস্ট ১৯৬৮) ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক বিরল ব্যক্তিত্ব। একাধারে রাজনীতি, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান চির স্মরণীয় হয়ে আছে। এরূপ ক্ষণ-জন্মা ব্যক্তির আবির্ভাব যে কোন দেশ ও জাতির জন্যই অত্যন্ত গৌরবের। তিনি নিরলস কর্ম-প্রচেষ্টার দ্বারা দেশ ও জাতির বিশেষত বাঙালি মুসলমান সমাজের সীমাহীন খেদমত করে গেছেন, সেজন্য তিনি চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ইংরেজ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন, বাঙালি মুসলিম জাগরণ, সামাজিক সংস্কার, ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন, ভাষা, সাহিত্য, সাংবাদিকতা, সংস্কৃতি ইত্যাদি বহু ক্ষেত্রে তাঁর মূল্যবান অবদানের জন্য তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন। তদানীন্তন অবিভক্ত বাংলার চব্বিশ পরগণা জেলার বশিরহাট মহকুমায় মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর জন্ম। তাঁর পিতার নাম মাওলানা হাজী আবদুল বারী খাঁ গাজী। আব্দুল বারী খাঁ নিজে ছিলেন একজন আলেম ও জিহাদী-চেতনাসম্পন্ন মানুষ। প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর আকরম খাঁর পিতা- আব্দুল বারী খাঁ মাত্র ১০/১২ বছর বয়সে তৎকালীন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম অগ্রপথিক সৈয়দ আহমদ শহীদ ব্রেলভীর নেতৃত্বে পরিচালিত শিখ ও ইংরেজ-বিরোধী জিহাদে অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্যে সীমান্ত প্রদেশে গমন করেন। ফলে তিনি ‘গাজী’ খেতাব লাভ করেন। এহেন একজন গাজীর পুত্র হিসাবে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁও ছিলেন জিহাদী মনোভাবাপন্ন এক লড়াকু ব্যক্তিত্ব। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ‘কুর’ বা ব্রাহ্মণ। পরবর্তীতে তারা ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্যে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম কবুল করেন। কথিত আছে, মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ও কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একই বংশদ্ভূত। উভয়েরই পূর্বপুরুষ ছিলেন কুলীন ব্রাহ্মণ। শৈশবে পিতৃ-মাতৃহীন হওয়ার কারণে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ভাগ্য-বিড়ম্বিত হন। অতি কষ্ট এবং দুঃখ- দারিদ্র্যের মধ্যে তাঁর শৈশব-জীবন অতিবাহিত হয়। কিন্তু তাঁর মনোবল ছিল দৃঢ় এবং তার মধ্যে ছিল প্রবল উচ্চাকাক্সক্ষা। এ কারণে তিনি নানা দুঃখ-কষ্ট ও দারিদ্র্যের মধ্যেও বিদ্যাশিক্ষা চালিয়ে যান এবং কঠোর নিষ্ঠা ও সাধনায় কৃতিত্বের সাথে মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রী হাসিল করেন। ১৯০১ সনে তিনি কলকাতা মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে এফ.এম. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ঐ সময় মাদ্রাসার সিলেবাস অনুযায়ী আরবি-ফারসি-উর্দু ভাষা শেখার সুযোগ থাকলেও বাংলা ভাষা শেখার কোন সুযোগ ছিল না। তাই ছাত্র-জীবনে তিনি ইংরাজি-বাংলা শেখার সুযোগ না পেলেও পরবর্তীতে নিজ চেষ্টায় বাংলা, সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষা রপ্ত করেন। আরবি-ফারসি, উর্দু ভাষায়ও তিনি বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। ছাত্র-জীবনেই তিনি ফারসিতে কবিতা লেখায় অভ্যস্থ ছিলেন। ঐ সময় কলকাতা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ছিলেন জনৈক ইংরেজ, তাঁর নাম স্টিন। স্টিন সাহেবের উপস্থিতিতে মাদ্রাসার এক অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ আকরম খাঁ স্বরচিত ফারসি কবিতা আবৃত্তি করে সকলের প্রশংসা অর্জন করেন। ইং রেজ শাসনামলে মোহাম্মদ আকরম খাঁর জন্ম। তখন মুসলমানদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। একদিকে, ইংরেজ রাজশক্তি, অন্যদিকে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের অত্যাচার-নিপীড়ন, শোষণ-বঞ্চনায় বাঙালি মুসলিম সমাজের দুরবস্থা চরম পর্যায়ে উপনীত হয়। এ অবস্থা দেখে আকরম খাঁর হৃদয় রুধিরাক্ত হয়। তিনি এ অবস্থার পরিবর্তন সাধনে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেন। মুখ্যত বাঙালি মুসলমানদের দুরবস্থা দূরীকরণার্থে এবং তাদের উন্নতির জন্য কাজ করার জন্য তিনি সচেষ্ট হন। তাঁর জীবনের সকল কর্ম-প্রচেষ্টার মধ্যে আমরা এর প্রতিফলন লক্ষ্য করি। প্রথমত, শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমান তখন ছিল অত্যন্ত পশ্চাৎপদ। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, জমিদারি-জোতদারি সবই ছিল তখন হিন্দুদের হাতে। তৃতীয়ত, সামাজিক ক্ষেত্রেও মুসলমানরা ছিল চরমভাবে উপেক্ষিত-অবহেলিত। চতুর্থত, অশিক্ষার কারণে মুসলমানরা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। নানারূপ কুসংস্কার ও অন্ধ-বিশ্বাসের দ্বারা তাদের মন-মানসিকতা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আকরম খাঁ উপায় অনুসন্ধান করতে লাগলেন। এজন্য তিনি প্রথমেই লেখালেখি ও সাংবাদিকতার মাধ্যমকে বেছে নিলেন। ১৯০৫ সনে কুষ্টিয়া নিবাসী জনৈক বিদ্যোৎসাহী আব্দুলাহ নাসের কলকাতা থেকে ‘মোহাম্মদী’ নামে একখানি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। কিন্তু অল্প দিনেই পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। আকরম খাঁ উক্ত পত্রিকাটি পুনঃপ্রকাশের উদ্দেশ্যে কলকাতার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হাজী আলতাফের শরণাপন্ন হন। ঐ সময় হাজী আলতাফ একজন বড় চামড়া ব্যবসায়ী হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন। কলকাতায় তাঁর একটি প্রেসও ছিল। প্রেসটির নাম ছিল ‘আলতাফী প্রেস’। হাজী আলতাফ ছিলেন একজন সমাজ-দরদী, উদারপন্থী ব্যক্তি। আকরম খাঁকে তিনি সহযোগিতা করতে রাজি হন। তাঁর সহযোগিতায় ‘আলতাফী প্রেস’ থেকে ১৯১০ সনে আকরম খাঁ প্রথমে ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ সময় থেকেই আকরম খাঁর কর্ম-জীবনের শুরু। ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’ পত্রিকা প্রকাশের সময় ‘বলকান যুদ্ধ’ চলছিল। এ সময় মুসলমানগণ ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রবলভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মুসলমানদের এ আবেগ ও ক্ষোভের বিষয় ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায় বিশেষভাবে তুলে ধরার কারণে পত্রিকাটি যথেষ্ঠ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কিন্তু ইং রেজ সরকার এ পত্রিকাটি সহ্য করতে পারেনি। তাই সরকারের আদেশে তা অচিরেই বন্ধ হয়ে যায়। ১৯১৩ সনে তদানীন্তন অবিভক্ত বাংলায় ‘আঞ্জুমায়ে ওলামায়ে বাংলা’ নামে আলেমদের একটি প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে মাওলানা আব্দুলাহিল বাকী ও মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ। পরবর্তী বছর ১৯১৪ সনে এ প্রতিষ্ঠানের মুখপত্র হিসাবে মাসিক ‘আল ইসলাম’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী এ পত্রিকার সম্পাদক এবং আকরম খাঁ ছিলেন এর যুগ্ম-সম্পাদক ও প্রকাশক। ১৯০৫ সনে বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ববঙ্গ ও আসাম নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হয়। এ নতুন প্রদেশের রাজধানী স্থাপিত হয় ঢাকায়। নতুন প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ছিল মুসলিম। ফলে এ এলাকার অধঃপতিত মুসলমানদের ব্যাপক উন্নতির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। এজন্য ভারতীয় হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গের প্রবল বিরোধিতা করে। তাদের বিরোধিতার ফলে ১৯১১ সনে ইংরেজ সরকার ‘বঙ্গভঙ্গ রদ’ করে। এতে ভারতীয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ নবাব আব্দুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী, নবাব সলিমউলাহ, সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী প্রমুখসহ মুসলিম সমাজ অতিশয় ক্ষুব্ধ হন। ১৯০৬ সনে ঢাকার শাহবাগে নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের রাজনৈতিক অধিবেশনে ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগে’র জন্ম হয়। আকরম খাঁ এতে যোগদান করেন। ১৯১৪ সনে তিনি প্রাদেশিক কংগ্রেস অধিবেশন এবং ১৯১৬ সনে লক্ষেèৗয়ে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে যোগদান করেন। এ সময় তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের ‘সরাজ আন্দোলনে’র সাথেও যুক্ত হন। ১৯১৯-২১ সন পর্যন্ত ‘আলী ভ্রাতৃতদ্বয়’ নামে মশহুর মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও মাওলানা শওকত আলীর সঙ্গে তিনি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করেন। ‘আলী ভ্রাতৃদ্বয়ে’র খিলাফত আন্দোলনের সাথে তিনি গভীরভাবে সংশিষ্ট হয়ে পড়েন এবং প্রাদেশিক খিলাফত আন্দোলন কমিটির সম্পাদক রূপে দায়িত্ব পালন করেন। এভাবে প্রায় একই সময় তিনি একাধারে মুসলিম লীগ, কংগ্রেস, খেলাফত আন্দোলন, সরাজ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মুখ্যত ‘খিলাফত আন্দোলন’কে জোরদার করার উদ্দেশ্যে আকরম খাঁ ১৯২০ সনের ২১ মে উর্দু ‘দৈনিক জামানা’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। দীর্ঘ চার বছরকাল তিনি এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। উর্দু দৈনিকের পাশাপাশি ১৯২১ সনে তিনি ‘সেবক’ নামে একটি বাংলা দৈনিকও প্রকাশ করেন। এ সময় একই সাথে ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’, ‘দৈনিক সেবক’ ও ‘দৈনিক জামানা’র (উর্দু) সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করেন। ‘দৈনিক সেবক’ পত্রিকায় ব্রিটিশ-বিরোধী মতামত প্রকাশের অভিযোগে আকরম খাঁ রাজরোষে পতিত হন। ফলে এক বছরের জন্য তিনি কারাবরণ ভোগ করেন। এ সময় দৈনিক সেবক পত্রিকার প্রকাশনাও কিছু দিনের জন্য বন্ধ হয়। কারাগারে থাকা অবস্থায় আকরম খাঁ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে হাত দেন। ঐ সময় তিনি পবিত্র কোরআনের বাংলা তাফসির রচনার কাজ শুরু করেন এবং আমপারার বঙ্গানুবাদ সমাপ্ত করেন। ১৯২২ সনে আকরম খাঁ কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ‘দৈনিক সেবক’ পত্রিকা পুনঃপ্রকাশ করেন। তবে বিভিন্ন কারণে তা বেশি দিন টিকে থাকতে পারেনি। অতঃপর উর্দু ‘দৈনিক জামানা’ পত্রিকাও বন্ধ হয়ে গেলে তিনি শুধু ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’ পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকেন। ১৯২৭ সনে আকরম খাঁ একটি প্রথম শ্রেণীর সাহিত্য পত্রিকা হিসাবে ‘মাসিক মোহাম্মদী’ প্রকাশ করেন। এটি ঐ সময় বাঙালি মুসলমান কবি-সাহিত্যিক-লেখকদের জন্য একটি প্রতিনিধিত্ব স্থানীয় পত্রিকা হিসাবে গণ্য হয়। এতে নবীণ-প্রবীণ বহু বাঙালি মুসলমান কবি-সাহিত্যিক অবাধে সাহিত্য-চর্চার সুযোগ পান। অতঃপর ১৯৩৬ সনের ৩১ অক্টোবর মাওলানা আকরম খাঁর পরিচালনায় এবং প্রখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীনের সম্পাদনায় ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। উক্ত পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসাবে বিশিষ্ট সাহিত্যিক-সাংবাদিক মুজীবুর রহমান খাঁ, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, আকবর উদ্দীন, মোহাম্মদ মোদাব্বের, হাবিবুলাহ বাহার, জহুর হোসেন চৌধুরী প্রমুখ তরুণ ও প্রতিভাবান ব্যক্তিগণ নিযুক্ত হন। এছাড়া, এসব পত্রিকায় কাজ করার সুযোগ পেয়ে অসংখ্য মুসলিম প্রতিভাবান তরুণ সাংবাদিকতায় হাতে-খড়ি লাভ করেন এবং পরবর্তীতে তাঁরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন। বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রবীণ সাংবাদিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাঁদের পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য আকরম খাঁর নিকট বহুলাংশে দায়ী। তাঁদের অগ্রপথিক হিসাবে আকরম খাঁর কৃতিত্ব ঐতিহাসিক তাৎপর্যম-িত। তাই তাঁকে যথার্থই মুসলিম বাংলার ‘সাংবাদিকতার জনক’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। সাংবাদিকতার পেশাকে সমুন্নত রাখা এবং সাংবাদিকদের মর্যাদা রক্ষার জন্য তিনি সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। এমনকি, এজন্য তিনি আন্দোলন-সংগ্রামও পরিচালনা করেছেন। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খাঁর সাংবাদিক নির্যাতনের বিরোধিতা করে তিনি সংবাদ-কর্মীদের নিয়ে এক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলেন। ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকা বাঙালি মুসলমানদের স্বার্থরক্ষা ও নবজাগরণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ পত্রিকার মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক আন্দোলন, সামাজিক জাগরণ, সাহিত্য-সংস্কৃতি চিন্তার প্রতিফলন ঘটে। বৃটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ‘দৈনিক আজাদ’ অফিস থেকে একই সাথে ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’ ও ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। একই সাথে আকরম খাঁ দৈনিক আজাদ অফিসে ‘মোহাম্মদী বুক এজেন্সী’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা গড়ে তোলেন। এ প্রকাশনা সংস্থা থেকে তৎকালীন খ্যাতনামা বিভিন্ন মুসলিম লেখকের অসংখ্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এভাবে ‘দৈনিক আজাদ’, ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদী’, ‘মাসিক মোহাম্মদী’ ও ‘মোহাম্মদী বুক এজেন্সী’ তৎকালীন বহু নবীন-প্রবীণ মুসলিম লেখকের সাহিত্য চর্চায় উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা প্রদান করে। একাধারে দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকা প্রকাশ এবং প্রকাশনা সংস্থার মাধ্যমে আকরম খাঁ অধঃপতিত মুসলিম সমাজকে একদিকে যেমন রাজনীতি-সচেতন করে তোলেন, অন্যদিকে তেমনি সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা, বিকাশ ও উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখেন। ঐ সময় দৈনিক আজাদ পত্রিকার অফিসেই ১৯৪৩ সনে ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’ গঠিত হয়। সেখানে রেনেসাঁ সোসাইটির সকল সভা ও কর্মকা- সম্পন্ন হতো। এ সংস্থার প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক প্রখ্যাত সাহিত্যিক-সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন এবং এর আহ্বায়ক ছিলেন দৈনিক আজাদের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক মুজীবুর রহমান খাঁ। সোসাইটির কর্মকা-ের সাথে জড়িত ছিলেন হাবিবুলাহ বাহার, আবুল মনসুর আহমদ, মোহাম্মদ মোদাব্বের, জহুর হোসেন চৌধুরী, কবি ফররুখ আহমদ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। ১৯২১ সনে সামাজিক আন্দোলন হিসাবে এবং নিগৃহীত কৃষক, প্রজা সাধারণের ভাগ্যোন্নয়নের উদ্দেশ্যে ‘নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি’ গঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে স্যার আব্দুর রহীম ও মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ। ১৯৩৬ সনে ‘নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি’ ‘কৃষক প্রজা পার্টি’তে রূপান্তরিত হয়। ১৯৩৭ সনে আকরম খাঁ প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক পরিষদে মুসলিম লীগের মনোনয়ন পেয়ে সদস্য নির্বাচিত হন। মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ একজন অতিশয় সমাজ ও রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি ছিলেন। সংগ্রামী রাজনৈতিক নেতা হিসাবে তিনি সবসময় জনগণের দাবী-দাওয়ার কথা জোরালোভাবে তুলে ধরতেন। দেশের স্বাধীনতার সপক্ষেও তিনি সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। তিনি একজন ওজস্বী ও জ্বালাময়ী বক্তা ছিলেন। ফলে, জনগণের মধ্যে তাঁর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা ছিল। 

অসহযোগ আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন ও বেঙ্গল প্যাক্ট ইত্যাদি বিষয়ে কংগ্রেসের চিন্তাধারার সাথে আকরম খাঁর মতের অমিল হওয়ায় তিনি মুসলিম লীগে যোগদান করেন। এ সময় আর একটি বিতর্ক হিন্দু-মুসলিম বিরোধকে ব্যাপকভাবে উস্কানী দেয়। সেটা হলো, ভারতীয় হিন্দু-নেতৃবর্গ প্রায় সকলেই হিন্দুদের নিকট ‘ঋৃষি’ নামে খ্যাত চরম মুসলিম-বিদ্বেষী ব্রাক্ষ্মণ লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘বন্দে মাতরম’ গানটিকে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত এবং ‘শ্রীপদ্ম’কে ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসাবে গণ্য করার দাবী জানায়। এতে মুসলিম সমাজ দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হয়। কেননা, ‘বন্দে মাতরম’ হিন্দু- দেবীর বন্দনামূলক গান এবং ‘শ্রীপদ্ম’ হিন্দু-দেবীর আসন হিসাবে পরিচিত। মুসলমানের দৃষ্টিতে এ দুটোই সুস্পষ্টভাবে শিরক হিসাবে গণ্য। ফলে, সমগ্র মুসলিম সমাজ এতে ক্ষুব্ধ হয়। মাওলানা আকরম খাঁ মুসলমানদের এ আবেগ ও আকীদার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন এবং তিনি এ দু’টির বিরোধিতায় মুসলমানদের নেতৃত্ব প্রদান করেন। অন্যদিকে, হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই গায়ের জোরেই সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমানদের উপর তারা তাদের দাবী চাপিয়ে দিতে দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে থাকে। কংগ্রেস নেতা গান্ধী ও কবি রবীন্দ্রনাথসহ সকল হিন্দু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি তাদের দাবীর ব্যাপারে অনঢ় ছিলেন। এদিকে, ‘বন্দে মাতরম’ ও ‘শ্রীপদ্ম’-কে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজে চরম বিক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শ্রীপদ্ম’ অংকিত মনোগ্রামকে পাঠ্য-পুস্তক ও কাগজ-পত্রে ব্যবহৃত হতে দেখে মুসলিম ছাত্ররা দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হয় ও প্রতিবাদ করতে থাকে। এ সময় আকরম খাঁর পত্রিকা মাসিক ও সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’তে ‘শ্রীপদ্ম’ মনোগ্রাম ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদসূচক নিবন্ধ লেখা হয়। ‘শ্রী’ হিন্দুদের বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী ‘সরস্বতী’ এবং ‘পদ্ম’-কে তার আসন হিসাবে মনে করা হয়। এ পৌত্তলিক ভাবধারার মনোগ্রাম কখনো কোন মুসলমান গ্রহণ করতে পারে না, এটা তাদের ঈমান ও আকীদার খেলাপ। মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ তাঁর বিভিন্ন লেখায় এ সম্পর্কে অকাট্য যুক্তিসহ তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন এবং মুসলমান সমাজ দৃঢ়ভাবে তাঁর পক্ষ সমর্থন করে। কবি রবীন্দ্রনাথসহ অনেকেই ‘বন্দে মাতরম’ অর্থে দেশ মাতৃকা ও ‘শ্রীপদ্ম’ অর্থে বাংলাদেশের একটি বিশেষ ফুল বলে ব্যাখ্যা দিলেও মুসলমান সমাজ তা গ্রহণ করেনি। এ আন্দোলনের ফলে দীর্ঘকাল থেকে মুসলমানদের নামের আগে হিন্দুরা ইচ্ছাকৃতভাবে যে ‘শ্রী’ শব্দ ব্যবহার করতো, মুসলমানরা সে সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে এবং ঐ সময় থেকে তারা নামের আগে ‘শ্রী’র পরিবর্তে ব্যাপকভাবে ‘জনাব’, ‘মৌলভী’ ইত্যাদি ব্যবহার শুরু করে। এটা ছিল মুসলমানদের এক ধরনের সাংস্কৃতিক সচেতনতা। এ সচেতনতা থেকেই মুসলমানদের মধ্যে স্বাজাত্যবোধ দৃঢ়বদ্ধ হয় তারা ঐক্যবদ্ধ হয়। এক্ষেত্রে আকরম খাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। 

১৯৩৬ সনে মুসলিম লীগে যোগদান করার পর মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর রাজনৈতিক জীবনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। ঐ সময় থেকে তিনি সর্বতোভাবে মুসলিম লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ফলে ১৯৩৭ সনে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ঐ সময় তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কেন্দ্রিয় কমিটিরও সদস্য নিযুক্ত হন। তিনি ১৯৩৫ সনের ভারত শাসন সংস্কার আইন অনুযায়ী ১৯৩৭ সনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ‘বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদে’র সদস্য পদে নির্বাচিত হন। এভাবে, মুসলিম লীগের নেতা হিসাবে দীর্ঘকাল তিনি বাঙালি মুসলমান সমাজের খেদমত করেন। 

১৯৫৪ সনে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু তারপরও তাঁর ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকা ও ‘মাসিক মোহাম্মদী’র মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ইসলামী দাবী-দাওয়ার সপক্ষে কাজ চালিয়ে যান। মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে অন্যতম পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার মাধ্যমে এবং আজাদের সম্পাদক ও সাংবাদিকদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে তিনি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯১৯ সনে তৃতীয় বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে বাঙালি মুসলমানরা বাংলা ভাষার প্রশ্নে তাঁদের মতামত ব্যক্ত করেন। উক্ত সম্মেলনের সভাপতির ভাষণে তিনি বলেন ঃ “দুনিয়ায় অনেক রকমের অদ্ভুত প্রশ্ন আছে। বাঙালি মুসলমানদের মাতৃভাষা কী ? উর্দু না বাংলা ? এ প্রশ্নটা সর্বাপেক্ষা অদ্ভুত।Ñ বঙ্গ মোছলেম ইতিহাসের সূচনা হইতে আজ পর্যন্ত বাংলা ভাষায়ই তাহাদের লেখ্য ও কথ্য মাতৃভাষারূপে ব্যবহৃত হইয়া আসিতেছে এবং ভবিষ্যতেও হইবে।” (মুহম্মদ মতিউর রহমান ঃ বাংলা ভাষা ও ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন, প্রথম প্রকাশ, জুলাই ১৯৯২, পৃষ্ঠা ৩৫)। ১৯৩৭ সনে মাওলানা আকরম খাঁ বাংলা ভাষার প্রশ্নে আবার তাঁর সুস্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেন। ঐ সময় দৈনিক আজাদেও সম্পাদকীয় কলামে তিনি লেখেন ঃ “সাহিত্যের মধ্যেও বাংলা সমস্ত প্রাদেশিক ভাষার মধ্যে শ্রেষ্ঠ। বাংলা ভাষায় বিবিধ ভাব প্রকাশোপযোগী শব্দের সংখ্যাও বেশি। অতএব বাংলা সবদিক দিয়াই ভারতের রাষ্ট্রভাষা হইবার দাবী করিতে পারে। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস হিন্দীকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করিবার প্রস্তাব গ্রহণ করিয়াছে বটে, কিন্তু এ বিষয়ে বাংলা ভাষার চেয়ে হিন্দীর যোগ্যতা কোন দিক দিয়াই বেশি নহে।” (পূর্বাক্ত, পৃষ্ঠা-৩৫)। ১৯৪৮ সনের ২৩ ফেব্রুয়ারি ‘পাকিস্তান গণ-পরিষদে’র প্রথম অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু এবং ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকেও গণ-পরিষদের অন্যতম ভাষা হিসাবে ব্যবহার করার দাবী জানান। কিন্তু পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খাঁ এর বিরোধিতা করেন। তাঁর সমর্থনে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বলেন ঃ “পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসীই চায় যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” আকরম খাঁ এর তীব্র প্রতিবাদ করে ‘দৈনিক আজাদে’ সম্পাদকীয় লেখেন ঃ “খাজা সাহেব কবে রাষ্ট্রভাষার ব্যাপারে পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের গণভোট গ্রহণ করিলেন, তাহা আমরা জানি না। ... আমরা বিশ্বাস করি গণভোট গ্রহণ করিলে বাংলা ভাষার পক্ষে শতকরা ৯৯ ভোটের বড় কম হইবে না। এ অবস্থায় এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তিনি এইরূপ একটি দায়িত্বহীন উক্তি করিয়া শুধু পূর্ব পাকিস্তানের মৌলিক স্বার্থকেই ক্ষতি করেন নাই, এ দেশবাসীর পক্ষে আপন প্রতিনিধিত্বের অধিকারের মর্যাদাকেও ক্ষুণœ করিয়াছেন।” (দৈনিক আজাদ, ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮)। আকরম খাঁ তৎকালীন ‘পাকিস্তান গণ-পরিষদ’ ও ‘তালীমাতে ইসলামিয়া বোর্ডে’র সদস্য ছিলেন। জেনারেল আইয়ুব খাঁর সামরিক শাসনামলে সরকার তাঁকে ইসলামী উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নিযুক্ত করেন। ঐ সময় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ক্ষুণœ করার অভিযোগে মাওলানা আকরম খাঁ তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং প্রায় আশি বছর বয়সে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এভাবে, সারা জীবন তিনি দেশ, জাতি, জনগণ ও ইসলামের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রেখে ১৯৬৮ সনে তিনি ঢাকায় ইন্তিকাল করেন। তিনি ছিলেন এক সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব। দেশ-জাতি ও জনগণের কল্যাণে তিনি সর্বদা কাজ করেছেন। ইসলামের প্রতি তাঁর কমিটমেন্ট ছিল প্রশ্নাতীত। তিনি যুক্তি ও বিবেকের অনুশাসন মেনে চলার পক্ষপাতী ছিলেন। সাহিত্য ক্ষেত্রে আকরম খাঁর অবদান বিশেষভাবে উলেখযোগ্য। তাঁর রচিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে বিশেষ উলেখযোগ্য হলো ঃ ‘কোরান শরীফ’ (অনুবাদ ১৯০৫), ‘যীশু কি নিষ্পাপ’ (১৯১৫), ‘এসলাম দর্শন’ (১৯১৭), ‘আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাঙ্গালার রিপোর্ট ’(১৯১৩, ১৯১৮), ‘কোরআন শরীফ ‘আমপারা’ (১৯২৪), ‘মোস্তফা চরিত’ (১৯২৫), ‘উম্মুল কেতাব’ (১৯২৯), ‘সমস্যা ও সমাধান’ (১৯৩১), ‘মিশ্র ও স্বতন্ত্র নির্বাচন’, ‘মোস্তফা চরিত্রের বৈশিষ্ট্য’ (১৯৩২), ‘পাকিস্তাননামা বা নয়া রাহে নাজাত’ (১৯৪৩), ‘তাফসীরুল কোরান’ (১৯৫৯), ‘বাইবেল নির্দেশ ও প্রচলিত খ্রিস্টান ধর্ম’ (১৯৬২), ‘মোসলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস’ (১৯৬৫) ইত্যাদি। ‘মোস্তফা চরিত’ রাসূলুলাহর (স) জীবনী গ্রন্থ। বাংলা ভাষায় রচিত সীরাত গ্রন্থসমূহের মধ্যে এটি একটি ব্যতিক্রমী গ্রন্থ এবং নানা কারণে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছে। এর ভাষা, সংগৃহীত তত্ত্ব-তথ্য ও বিবরণ অত্যন্ত হৃদয়-গ্রাহী। তবে দু’একটি ক্ষেত্রে বিতর্কমূলক বিষয় স্থান লাভ করায় অনেকে এ গ্রন্থটির কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর রচিত ‘তাফসিরুল কোরআন’ সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। বাংলা ভাষায় রচিত কোরআনের তাফসীর গ্রন্থসমূহের মধ্যে এটি নিঃসন্দেহে এক অনন্য গ্রন্থ। এর ভাষা উন্নত ও সাহিত্য-গুণসম্পন্ন, আরবি ভাষায় অসাধারণ দক্ষতা থাকার কারণে তাঁর অনুবাদও হয়েছে অত্যন্ত স্বচ্ছ, সুন্দর, সাবলীল ও মূলানুগ। কিন্তু ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষেত্রে দু’একটি স্থানে তাঁর চিন্তার সাথে অধিকাংশ আলেম একমত হতে পারেন নি। ফলে গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে অনেকেই এর তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর মননশীল রচনায় মৌলিকতার পরিচয় সুষ্পষ্ট। কিন্তু তাঁর মতের সাথে সকলে একমত হতে পারেন নি। ফলে কিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এ দু’একটি মতদ্বৈধতার বিষয় বাদ দিলে এ তাফসীর গ্রন্থটির গুরুত্ব অপরিসীম। মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর রচিত ‘মোসলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস’ গ্রন্থটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ইতিহাস, বাঙালি মুসলমানের সামাজিক অবস্থার পর্যালোচনা, তাদের অধঃপতন ও উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নির্দেশনামূলক গভীর ও জ্ঞানগর্ভ আলোচনা এতে স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশে মুসলমানদের সামাজিক ইতিহাস জানার জন্য এ গ্রন্থটি অপরিহার্য বলে বিবেচিত হতে পারে। তাঁর রচিত অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যেও ঐতিহাসিক বিষয়, সমসাময়িক বিভিন্ন সমস্যা বিশেষত মুসলিম সমাজের দুরবস্থার কারণ অনুসন্ধান করে তা দূরীকরণের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তাঁর ইসলাম-বিষয়ক রচনাবলী গভীর জ্ঞান ও পা-িত্বের পরিচায়ক। মুসলমানদেরকে তাদের ধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করে তাদেরকে নব-জাগরণে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াসে তিনি লেখনি পরিচালনা করেন। তাঁর লেখায় এর পরিচয় সুস্পষ্ট। মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ একাধারে বাংলা, আরবি, ফারসি, উর্দু ও সংস্কৃত ভাষায় সুপ-িত ছিলেন। এছাড়া ইংরেজি ভাষায়ও তাঁর মোটামুটি দখল ছিল। মাদ্রাসায় বাংলা ভাষা শেখার সুযোগ না পেলেও, নিজের চেষ্টায় তিনি বাংলা ভাষার চর্চা করে এক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। এটা তাঁর অসাধারণ প্রতিভারই পরিচয় বহন করে। তিনি বাংলা ভাষা আয়ত্ত্ব করেছিলেন শুধু তাই নয়, বাংলা গদ্যের তিনি ছিলেন এক অনন্যসাধারণ শিল্পী। তাঁর ভাষা সাবলীল, প্রাঞ্জল ও অলংকারবহুল, তবে কিছুটা সংস্কৃতানুগ। তিনি একজন আলেম এবং আরবি, ফারসি, উর্দু ভাষায় সুপ-িত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বাংলা ভাষা অনেকটা সংস্কৃতানুগ ও ক্লাসিক-ধর্মী। ফলে তা যেমন ওজ্যস্বিতা সম্পন্ন, তেমনি অলংকার বহুল ও কাব্য-গুণ ম-িত। মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ একাধারে ছিলেন রাজনীতিবিদ, ধর্মীয় নেতা, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সমাজসংস্কারক। এসব ক্ষেত্রে তাঁর বিশিষ্ট অবদান রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল পথিকৃতের। তবে তাঁর সকল কর্ম- প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিম সমাজের নবজাগরণ ও উন্নয়ন। তিনি ছিলেন একজন যুক্তিবাদী। যুক্তির সাথে গভীর পা-িত্য ও প্রজ্ঞা তাঁকে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। তিনি একজন আলেম হলেও অনেকের মতো গোঁড়া বা পশ্চাৎমুখী ছিলেন না। প্রাগ্রসর চিন্তা ও আধুনিক মন-মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন তিনি। তাই তৎকালীন রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সকলের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে অভ্যস্ত ছিলেন। সমকালীন সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সাথে তিনি গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। প্রথমে তিনি কংগ্রেসের সাথে যুক্ত হলেও পরবর্তীতে এটা উপলব্ধি করেন যে, কংগ্রেসের সাথে যুক্ত থেকে কখনো মুসলিম সমাজের উন্নতি সাধন সম্ভব নয়। তাঁর মধ্যে এ উপলব্ধি আসার সাথে সাথে তিনি কংগ্রেস পরিত্যাগ করে ১৯০৬ সনে গঠিত ভারতীয় উপমহাদেশের একমাত্র মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ‘মুসলিম লীগে’ যোগদান করেন। মুসলিম লীগে যোগদান করার পরই তাঁকে অবিভক্ত বাংলার ‘মুসলিম লীগের’ সভাপতি নিযুক্ত করা হয় এবং তাঁর নেতৃত্বে অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লীগ অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৩৭ সনে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে বাংলায় মুসলিম লীগ বিশেষ সাফল্য অর্জন করে। 

মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁকে মুসলিম বাংলার ‘সাংবাদিকতার জনক’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি বাংলা গদ্য- সাহিত্যেরও একজন কালজয়ী অমর প্রতিভা। ধর্মীয় চিন্তার পুনর্গঠন, সমাজিক উন্নয়ন ও মুসলিম বাংলার নব-জাগরণের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। সমাজ সংস্কার, রাজনৈতিক জাগরণ, স্বাধীনতা আন্দোলন, মুসলমানদের স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি আদায়, ধর্মীয় চেতনার পুনর্গঠন, সাংবাদিকতা জগতের পুরোধা ব্যক্তি এবং বাংলা গদ্য সাহিত্যের এক অনবদ্য কালজয়ী লেখক হিসাবে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ জাতীয় ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হিসাবে চির স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ