ঢাকা, শুক্রবার 6 July 2018, ২২ আষাঢ় ১৪২৫, ২১ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাঙালি মুসলিম সাংবাদিকতার অগ্রপথিক মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ

 

রফিক আখন্দ : চলতি বছর বাঙালি মুসলিম সাংবাদিকতার অগ্রপথিক মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর দেড়শত জন্মবার্ষিকী। অবিভক্ত বাংলার  পশ্চিমবঙ্গস্থ চব্বিশ পরগণা জেলার হাকিমপুর গ্রামে এই লিখনী সিপাহসালার জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। জন্ম তারিখ ১২৭৫ বাংলা সনের ২৪ জৈাষ্ঠ মোতাবেক ১৮৬৮ সালের ৭ জুন । অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত বংশে তিনি  জন্মগ্রহণ করেছিলেন । পিতা ছিলেন প্রখ্যাত আলেম ও পীর মওলানা আবদুল বারী খাঁ। মাতা- রাবেয়া খাতুন ছিলেন বিদূষী ধর্মপ্রাণ মহিলা।

আকরম খাঁর বারো- তেরো বছর বয়স, কলেরায় পিতামাতা একই দিনে  ইন্তেকাল করেন। পিতামাতা উভয়কে হারিয়ে নিতান্ত অনাথ অবস্থায় মাতামহ কর্তৃক লালিতপালিত হন। মাতামহের নিকটই তিনি  প্রাথমিক শিক্ষালাভ করেন। পরে বর্ধমানের বিখ্যাত মওলানা লিয়াকতউল্লাহ মাদ্রাসায় কিছুদিন অধ্যয়ন করেন। সেখান থেকে গিয়ে কলকাতার জুবিলী হাই স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু ইংরেজি ধারার সাধারণ শিক্ষা তাঁকে তেমন আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়। ফলে তিনি ঐ স্কুল ত্যাগ করেন। পরে ১৮৯৬ খৃস্টাব্দে কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। এখানে অধ্যয়নকালেই কৃতি ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। কলকাতা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। ১৯০০ খৃস্টাব্দে কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে ফাযিল পরীক্ষা পাশ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই আকরম খাঁ বাংলা, আরবি, উর্দু ও ফারসি ভাষায় কাব্যচর্চা শুরু করেন। অল্প বয়স  থেকেই তাঁর পেশাগত ও রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা ঘটে ‘সাপ্তাহিক আহলে হাদীস’ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে। এরপর মওলানা আবদুল খালেক প্রতিষ্ঠিত ‘ মোহাম্মদী আখবার’ পত্রিকায় পেশাগত সাংবাদিকতা শুরু করেন। পরে তিনি ‘ ত্রৈমাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। তখন তিনি এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি মোহাম্মদীকে  মাসিকে উন্নীত করেন। কিছুদিন এটি সাপ্তাহিকরূপেও প্রকাশিত হয়।

ইসলামী জ্ঞানের প্রতিভু পুরুষ হিসেবে তিনি দেখলেন, বাংলার আলেম-ওলামাদের মাঝে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়াবলিকেন্দ্রিক বিরোধ রয়েছে। এ অনৈক্যের কারণে মুসলমান সমাজের উন্নতি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। অনৈক্যের পরিস্থিতির উন্নয়নে তিনি ও মওলানা ইসলামাবাদী বঙ্গীয় আলেম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার মানসে প্রয়াস চালান। এ লক্ষে ১৯১৩ খৃস্টাব্দে ‘আাঞ্জুমানে ওলামায়ে বাঙ্গালা’ নামক আলেমদের এক সংগঠন গড়ে তোলা হয়। আকরম খাঁ আঞ্জুমানের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। ১৯১৫ খৃস্টাব্দে এ সংগঠনের মুখপাত্র হিসেবে মাসিক ‘আল এসলাম’ পত্রিকা প্রকাশ করা হয়। মওলানা  মোহাম্মদ আকরম খাঁ ও মওলানা মনিরুজ্জামান এসলামাবাদী আল এসলাম পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন। 

আকরম খাঁ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে। ১৯২০ খৃস্টাব্দে তিনি খেলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন। এ বছর ঢাকার আহসান মঞ্জিলে অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গীয় খিলাফত কমিটির এক মহাসম্মেলন। এ সম্মেলনে তাঁকে খিলাফত কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত করা হয। ঐ সম্মেলনের বছরেই উর্দু ‘দৈনিক জমানা’ প্রকাশ করেন। পত্রিকাটির সম্পাদনার দায়িত্ব নেন আকরম খাঁ। ১৯২১ খৃস্টাব্দে নিজ সম্পাদনায় প্রকাশ করেন ‘দৈনিক সেবক’ পত্রিকা। সেবক  খেলাফত আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলনের সমর্থক হিসেবে কাজ করে।  তিনি তাঁর এ কাগজে বিদেশী ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসনের বিপক্ষে জ¦ালাময়ী ভাষায় সম্পাদকীয় প্রকাশ করতে থাকেন। এক সংখ্যায় অসহযোগ আন্দোলনের সপক্ষে ‘অগ্রসর’ শীর্ষক ঝাঁঝালো সম্পাদকীয় লিখেন। এ তুখোড় সম্পাদকীয় প্রকাশের কারণে ইংরেজ সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করে। দৈনিক  সেবকের প্রকাশনাও সরকার নিষিদ্ধ করে দেয়। বছরখানেক জেল খাটার পর ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে তিনি মুক্তিলাভ করেন। কারামুক্তির পর পুনরায় সাংবাদিকতায় মনোনিবেশ করেন। সেবকের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে এর প্রকাশ সম্ভব হচ্ছিল না। বিকল্প হিসেবে সাপ্তাহিক মোহাম্মদীকে দৈনিকে রূপান্তরিত করে প্রকাশ করতে থাকেন। কিন্তু দৈনিকরূপে মোহাম্মদীর প্রকাশনা বেশিদিন চলে নি। এটি প্রকাশের বছরই কলকাতায় চিত্তরঞ্জন দাসের স্বরাজ পার্টির প্রতি আকরম খাঁ তাঁর সমর্থন জ্ঞাপন করেন। পরের বছর ১৯২৩ খৃস্টাব্দে বেঙ্গল প্যাক্টকে সমর্থন করেন। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের জুনে পাবনার সিরাজগঞ্জে প্রাদেশিক কংগ্রেসের এক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। আকরম খাঁ ঐ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। ১৯২৬-২৭ খৃস্টাব্দের সাম্প্রদায়িক হানাহানি এবং তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় রাজনীতির প্রতি তিনি বিতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। এ প্রেক্ষিতে তিনি কংগ্রেস এবং স্বরাজ পার্টি-উভয় দলের সাথেই সম্পর্কের ইতি টানেন।

১৯২৭ খৃস্টাব্দের ৬ নভেম্বর থেকে মোহাম্মদী মাসিক হিসেবে পুনঃপ্রকাশিত হয়। ১৯২৯-১৯৩৫ খৃস্টাব্দ সময়কালে কৃষক-প্রজা রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত হন। নিখিলবঙ্গ প্রজাসমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।  তিনি এ সমিতির প্রথম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৩৫ খৃস্টাব্দে এ প্রজা সমিতিতে অনৈক্যের সৃষ্টি হয়। সৃষ্ট গোলযোগের কারণে তিনি এ সমিতির সাথে সংশ্রব ত্যাগ করেন। এরপর ১৯৩৬ খৃস্টাব্দে মুসলিম লীগে যোগদান করেন। ১৯৪১ খৃস্টাব্দে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৩৬ খৃস্টাব্দের ৩১ অক্টোবর তিনি ‘দৈনিক আজাদ’ প্রকাশ করেন। অখ- বাংলার মুসলমানদের  মুখপাত্র হিসেবে আজাদ যুগান্তর সৃষ্টি করে। এই পত্রিকা ছিল আকরম খাঁর সাংবাদিকতা জীবনের অমর কীর্তি তথা মাইলফলক। পরাধীন ভারতে বাঙালি মুসলমানের কোন দৈনিকের অভাব মিটিয়েছিল এই পত্রিকা। তাদের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক দাবিদাওয়া তুলে ধরতে এ কাগজ জোরালো ভূমিকা পালন করে। মুসলমান সমাজের  আত্মপরিচয় সংকট, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধ, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে বঞ্চনা ও ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় আজাদ সময়ের দাবি পূরণ করে। সেকালে এ ধরণের পত্রিকা প্রকাশ করা ছিল ভীষণ চ্যালেঞ্জিং ও দুঃসাহসিক কাজ। যে সাহস দেখানোর মাধ্যমে মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ বাঙালি মুসলিম সাংবাদিকতার পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। 

দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক সংগ্রামের ফলে সা¤্রাজ্যবাদী বৃটিশ শক্তি উপমহাদেশ ত্যাগ করে। ১৯৪৭ সালের  আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান নামে আলাদা রাষ্ট্র গঠিত হয়। ভারত বিভাগের পর তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৪৮ খৃস্টাব্দে দৈনিক আজাদকেও তিনি ঢাকায় স্থানান্তর করেন। ১৯৫৪ খৃস্টাব্দে গণপরিষদ ভেঙে দিলে রাজনীতি থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৬২ খৃস্টাব্দে দৈনিক আজাদ সম্পাদনার দায়িত্বে পুনরায় প্রত্যাবর্তন করেন। পাকিস্তানী সামরিক শাসক আইয়ুব খান গণমাধ্যম নিবর্তনমূলক প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্স জারি করেন। এ বিধির প্রতিবাদে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সপক্ষে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৬৩ খৃস্টাব্দের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় সাংবাদিকরা বিক্ষোভ মিছিল করে। মওলানা আকরম খাঁ ঐ মিছিলে সম্মুখভাগে তেকে নেতৃত্ব দান করেন।

মওলানা আকরম খাঁ ইসলামী আদর্শ, ঐতিহ্য এবং মুসলিম সংস্কৃতির প্রতি ছিলেন তিনি নিবেদিতপ্রাণ। অধঃপতিত বাঙালি মুসলমান সমাজের মুক্তি এবং উন্নয়নকল্পে তিনি নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন। এ জন্য তিনি কলমকে বানিয়েছিলেন হাতিয়ার। তিনি বাংলা সাহিত্যে ইসলামী জ্ঞান, তথ্য ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের নানা বিষয়কে তুলে আনেন। সমাজবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ কপটাচারিতার বিপরীতে ইসলামের সুদৃঢ় আদর্শকে বলিষ্ঠ হাতে উপস্থাপন করেন।

তাঁর রচিত মোস্তফা চরিত বাংলাসাহিত্য তথা সিরাত সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন। মোসলেমবঙ্গের সামাজিক ইতিহাস তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এ গ্রন্থে পীরবাদ, সূফিবাদ, খৃস্টবাদ এবং আরো  কোন কোন ধর্মীয় মতবাদের ভ্রান্তির বেড়াজালের উন্মোচন করেন। আকবরের বানানো জগাখিচুড়ি মার্কা তথাকথিত ধর্ম দ্বীনে এলাহীরও যুক্তিভিত্তিক সমালোচনা করেন। ঐ পুস্তকটিকে মুসলমানদের সামাজিক অবনতির বিষয়ও তুলে ধরেন। এ গ্রন্থটি ছাড়াও তিনি রচনা করেন ৫ খ-ের তাফসিরুল কোরআন, সমস্যা ও সমাধান, মোস্তফা চরিতের বৈশিষ্ট্য, মুক্তি ও ইসলাম প্রভৃতি গ্রন্থ।

 

বাঙালি মুসলিম জাগরণের অন্যতম অগ্রপথিক মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ আগস্ট ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন তুখোড় বাগ্মী এবং যুক্তিবাদী সমাজচিন্তক। মুসলিম জাগরণবাদী লেখক ও পথিকৃৎ সাংবাদিক হিসেবে তিনি চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন এই প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব। মাদ্রাসায় শিক্ষিত হিসেবে তিনি আরবি-ফারসি ভাষায় ছিলেন বুৎপত্তিসম্পন্ন। তখন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় বাংলা পাঠ্য ছিল না। মাদ্রাসায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়নের সুযোগ না থাকার কষ্টটা তিনি বেশ ভালোভাবে টের পেয়েছিলেন। ঐ মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালে আরো কতিপয় সতীর্থসহ সেখানে বাংলা পাঠ্যভুক্ত করার আন্দোলন শুরু  করেন। তাঁর নেতৃত্বে এ আন্দোলন জোরালো হয়ে উঠে। পরিস্থিতির বাস্তবতা অনুধাবন করে সরকার কলকাতা মাদ্রাসায় নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলা অন্তর্ভুক্ত করে। 

ছাত্রাবস্থায়ই আকরম খাঁ উপলব্ধি করেছিলেন, বাংলা ভাষায় চর্চা না হলে শিক্ষিত বাঙালি মুসলমানের সামাজিক নেতৃত্বেও পশ্চাদপদতা কাটিয়ে উঠতে পারবে না। অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর তুলনায় তার   প্রগতির চাকা রুদ্ধ হয়ে পড়বে। এ ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি একদিকে যেমন ছিলেন ধর্মীয় জ্ঞানে প্রখর, তেমনি আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণে শীর্ষস্থানীয় পথিকৃৎ। 

বাঙালি মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সংকটকালে তিনি আবির্ভুত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন, অন্ধকারপ্রায় দুর্যোগ-সময়ের আলোকোজ্জ্বল এক অনন্য প্রতিভা। বাঙালি মুসলমানের নেতৃত্বের স্বল্পতা-সময়ে তিনি এসেছিলেন তীব্র মনোবল নিয়ে সুদৃঢ় সিপাহসালারের সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। মসী ও লেখনীকে তীক্ষ্ম, শাণানো হাতিয়ার হিসেবে তুলে নিয়েছিলেন। 

উপমহাদেশের মুসলিম সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তিনি যুগান্তর এনেছিলেন। বিশেষতঃ এক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একটি বাংলা দৈনিক প্রকাশ করে। মাত্র ১ টাকা ১৩ পয়সা পুঁজি নিয়ে তিনি একটা সংবাদপত্র প্রকাশের দুঃসাহস নিয়ে কলকাতা শহরে উপস্থিত হয়েছিলেন। ভীষণ চ্যালেঞ্জিং ছিল তাঁর  সে অভিযাত্রা। সে দুঃসাহসটুকু করেছিলেন অধঃপতিত জাতির ত্রাণ-মানসে।

নানা চরাই উৎরাই পেরিয়ে পর্যায়ক্রমে তিনি একাধিক পত্রপত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। সাপ্তাহিক, মাসিক ও দৈনিকÑ বিভিন্ন স্তরের ছিল সেসব পত্রিকা। প্রকাশনায় বার বার বাধাগ্রস্ত হয়েও তিনি মনোবল হারান নি কিংবা হতোদ্যম হন নি। প্রচ- মানসিক শক্তিতে একের এক প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে গেছেন। তিনি ক্রমান্বয়ে প্রকাশ করেছেন, সাপ্তাহিক মোহাম্মদী, মাসিক মোহাম্মদী, দৈনিক জামানা, দৈনিক  সেবক ও সবশেষে দৈনিক আাজাদ। এ আজাদ প্রকাশনা ও দৈনিন্দন সংবাদভাষ্যে এক প্রবল ইতিহাস। আকরম খাঁর মতই এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্করূপ কিংবদন্তি। 

মোহাম্মদী ও আজাদ-এর প্রকাশ-সূচনা কলকাতায়। এক দশক পর্যন্ত এগুলোর প্রকাশনা কলকাতায় অব্যাহত থাকে। পরবর্তীতে দেশবিভাগের কারণে পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় পত্রিকা দু’টি স্থানান্তরিত হয়।

আকরম খাঁ একদিকে ছিলেন ঝানু সাংবাদিক, তেমনি একজন প্রতিভাবাবন সুসাহিত্যিক। সাংবাদিকতা ও সাহিত্য রচনায় তিনি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন।  একইসাথে দেড়শতবর্ষ অতিক্রমী স্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিচিত হয়েছেন।

পরিশেষে বলা যায়, মুসলিম বাংলার সাংবাদিকতার আকাশের দাদাগুরু মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ স্মরণকালের একজন শীর্ষস্থানীয় চিন্তাবিদ ও সংস্কারক ছিলেন। মুসলিম রেনেসাঁর অগ্রপথিক হিসেবে নিরলস ভূমিকা পালন করে গেছেন। তাঁর প্রদর্শিত এ আলোকাভিসারী পথ অনুসরণ করে ডুবন্তপ্রায় স্বজাতির আত্মোদ্ধারের আলোকসরণি লাভে সহায়ক হতে পাারে।

বাঙালি মুসলমানের চিন্তাজগতের অদম্য এ সিপাহসালার ১৯৬৮ সালের ১৮ আগস্ট ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে বংশালের আহতে হাদীস মসজিদ চত্বরে সমাহিত করা হয়। এই মহামনীষীর দেড়শত জন্মবার্ষিকীর এই শুভক্ষণে তাঁর প্রতি রইল সীমাহীন শ্রদ্ধা। তাঁর চিন্তা ও লিখনীর আলোকবর্তিকা দিকভ্রান্ত জাতিকে আলোর ঔজ্জ্বল্য দেখাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ