ঢাকা, শুক্রবার 6 July 2018, ২২ আষাঢ় ১৪২৫, ২১ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রফতানি আয় প্রসঙ্গে

গত ৩০ জুন সমাপ্ত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকার রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। শুধু তা-ই নয়, একমাত্র তৈরি পোশাক তথা গার্মেন্ট ছাড়া সকল পণ্যের রফতানির ক্ষেত্রেই দেশ পিছিয়ে পড়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোÑ ইপিবি’র সর্বশেষ হালনাগাদ পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে দৈনিক সংগ্রামের এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, আলোচ্য অর্থবছরে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন হাজার ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার। অন্যদিকে আয় হয়েছে তিন হাজার ৬৬৬ কোটি ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চাইতে দুই দশমিক ২২ শতাংশ কম। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় কমেছে আট কোটি ৩১ লাখ ডলার। এই আয় অবশ্য পূর্ববর্তী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় বেশি। ওই অর্থবছরে রফতানি আয় হয়েছিল তিন হাজার ৪৬৫ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। কিন্তু সে আয়  এসেছিল সব ধরনের পণ্যের রফতানি থেকে।

অন্যদিকে সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে কেবল তৈরি পোশাক বা গার্মেন্ট খাত থেকেই এসেছে তিন হাজার ৬১ কোটি ৪৭ ডলার। এটা মোট রফতানি আয় তথা তিন হাজার ৬৬৬ কোটি ডলারের ৮৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ গার্মেন্ট ছাড়া অন্য সকল পণ্যের খাত মিলিয়ে আয় হয়েছে মাত্র ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তা সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার করা হচ্ছে, গত অর্থবছরের তুলনায় পাঁচ দশমিক ৮১ শতাংশ বেশি আয় হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তৈরি পোশাক খাতের কথা বলা হচ্ছে বিশেষভাবে। কারণ, এই খাতে আয় বেড়েছে আট দশমিক ৭৬ শতাংশ। 

অন্যদিকে ইপিবি’র পরিসংখ্যানের আলোকে প্রবৃদ্ধির এ পরিমাণকে কিন্তু মোটেও গুরুত্বপূর্ণ বলার উপায় নেই। কারণ, অন্য সকল পণ্যের খাতে আয় শুধু অনেক কমেই যায়নি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের মতো কোনো কোনো খাতে ধসও নেমেছে। এ দুটি খাতে রফতানি আয় কমেছে ২১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার আয় হয়েছে সত্য কিন্তু প্রবৃৃদ্ধি গত অর্থবছরের তুলনায় ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ কম হয়েছে। কৃষি পণ্য রফতানি ২২ শতাংশ বাড়লেও চায়ের রফতানি ৩৮ শতাংশ এবং শাকসব্জির রফতানি তিন দশমিক ৭৬ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে তিন দশমিক ৪২ শতাংশ কমেছে হিমায়িত খাদ্যের রফতানি। এছাড়া প্লাস্টিক পণ্যের রফতানি আয় লক্ষ্যমাত্রার চাইতে ৩৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ কমে গেছে। গত অর্থবছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কমে এ খাতটিতে আয় হয়েছে মাত্র নয় কোটি ৮৪ লাখ ডলার। 

ইপিবি’র হালনাগাদ পরিসংখ্যানে মাস হিসেবে অর্থবছরের শেষ মাস জুন এসেছে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে। এ মাসেও আয় কমেছে ১৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ৩৬২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে জুন মাসে রফতানি আয় হয়েছে ২৯৩ কোটি ৯৩ লাখ ডলার। পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায়ও এই আয়ের পরিমাণ তিন দশমিক ০৩ শতাংশ কম। 

রফতানি আয়ের এমন অবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সিপিডি’র একজন গবেষণা পরিচালক বলেছেন, বাংলাদেশে বিগত কয়েক মাস ধরে মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় তার সুফল পেয়েছেন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী ও রফতানিকারকরা। একই ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আবার অন্য সকল পণ্যের রফতানিকারকদের আয় কমে গেছে। কারণ, যেসব দেশে গার্মেন্ট ছাড়া অন্যান্য পণ্য রফতানি করা হয়েছে সেসব দেশেও ডলারের তুলনায় মুদ্রার মূল্য কমে গেছে আর তার ফলে দেশগুলো তাদের চাহিদা বা প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে পারেনি। সে জন্যই রফতানি আয়ও অনেক কমে গেছে। 

তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের কেন্দ্রীয় সংগঠন বিজিএমইএসহ রফতানির সঙ্গে জড়িত অন্য আরো কয়েকজনও পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সম্ভাবনা সম্পর্কে বিশ্লেষণও করেছেন তারা। সকলের বক্তব্যেই একটি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। সেটা রফতানি আয়ের জন্য গার্মেন্টের ওপর সর্বাত্মক নির্ভরতা। অথচ আন্তর্জাতিক চাপের কারণে বাংলাদেশকে শতভাগ কমপ্লায়েন্স কারখানার দিকে এগোতে হচ্ছে। সে কারণে গার্মেন্ট রফতানিতেও সন্তোষজনক সুফল অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া ভারত, চীন ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো কমপ্লায়েন্স কারখানার ব্যাপারে বাংলাদেশের চাইতে বেশি এগিয়ে রয়েছে। একই কারণে একদিকে প্রতিযোগী দেশগুলোর রফতানি আয় বাড়ছে, অন্যদিকে ঝুঁকির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। বলা হচ্ছে, শতভাগ কমপ্লায়েন্স না থাকার অভিযোগে বাংলাদেশ এমনকি গার্মেন্ট রফতানিতেও অনেক পিছিয়ে পড়তে পারে। তাছাড়া বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পে ভারতীয়দের ষড়যন্ত্র ও মালিকানা দখল সম্পর্কে প্রায় নিয়মিতভাবেই খবর প্রকাশিত হচ্ছে। সুতরাং গার্মেন্টের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া যেমন জরুরি তেমনি দরকার কেবলই গার্মেন্টের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনাও। 

আমরা মনে করি, সরকারের উচিত প্রধানত গার্মেন্টের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে রফতানির বহুমুখীকরণের জন্য উদ্যোগী হওয়া। কোন কোন পণ্যের রফতানি থেকে দেশের আয় ক্রমাগত বাড়তে পারে সে বিষয়ে অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া দরকার। না হলে রফতানি আয় যেমন আরো কমে যেতে পারে তেমনি দেশ পড়তে পারে বৈদেশিক মুদ্রার কঠিন সংকটে। বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া হবে বলে আমরা আশা করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ