ঢাকা, শুক্রবার 6 July 2018, ২২ আষাঢ় ১৪২৫, ২১ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খুলনা-যশোরের নয় পাটকলে পড়ে আছে আড়াইশ’কোটি টাকার পাটজাত পণ্য

খুলনা অফিস : মন্ত্রিসভায় মজুরি কমিশন অনুমোদনের পর খুলনাঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের মধ্যে আশার আলো দেখা দিয়েছে। সরকারি এ সিদ্ধান্তের ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে শ্রমিক উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনও বাড়তে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে, সাপ্তাহিক মজুরি প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বকেয়ার পরিমাণও বেড়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। সেই সাথে উৎপাদিত পণ্য বিক্রির বাজার তৈরিসহ মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপারেও সরকারি তৎপরতার দাবি উঠেছে। তা না হলে মিলগুলো কিছুদিনের মধ্যেই অলাভজনক হওয়ারও আশংকা করছেন অনেকে। এসব নানা কারণে শ্রমিকদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইলেও কর্তৃপক্ষের মধ্যে রয়েছে টেনশন।

বিজেএমসির আঞ্চলিক অফিস এবং মিলগুলোর সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে খুলনা-যশোর অঞ্চলের নয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে শ্রমিকদের সোয়া ১২ কোটি টাকার মজুরি বকেয়া রয়েছে। পক্ষান্তরে প্রায় আড়াইশ’ কোটি টাকার পণ্য মজুদ রয়েছে মিলগুলোতে। ঈদের আগে সব মিলের বকেয়া পরিশোধ করা হলেও বর্তমানে আলিম জুট মিলে তিন সপ্তাহের, কার্পেটিংয়ে তিন সপ্তাহের, ক্রিসেন্টে দু’সপ্তাহের, দৌলতপুর জুট মিলে এক সপ্তাহের, ইষ্টার্ন জুট মিলে তিন সপ্তাহের, জেজেআইতে তিন সপ্তাহের, খালিশপুর জুট মিলে দু’সপ্তাহের, প্লাটিনামে দু’সপ্তাহের এবং স্টার জুট মিলে দু’সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে।

এদিকে, খুলনা-যশোর অঞ্চলের নয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে বর্তমানে প্রায় আড়াইশ’ কোটি টাকার পাটজাত পণ্য অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে আছে বলেও মিলগুলো সূত্র জানিয়েছে। এসব পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নেয়াসহ বহির্বিশ্বের বাজার তৈরিতেও বিজেএমসিকে ভূমিকা নেয়ার দাবি উঠেছে। পক্ষান্তরে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মজুরি কমিশন বাস্তবায়নই এখন শ্রমিকদের মূল দাবি।

গত মঙ্গলবার মন্ত্রিসভায় রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানার শ্রমিকদের মজুরি শতভাগ বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদনের পর  খুলনা শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে গিয়ে দেখা গেছে শ্রমিকদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইছে। এখন রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশের পর যত দ্রুত এটি বাস্তবায়ন হবে ততই শ্রমিকদের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে উৎপাদন বাড়বে বলেও সাধারণ শ্রমিকরা মনে করছেন। কেননা এখন থেকে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি হবে ৪শ’ থেকে ১২শ’ টাকা। নতুন বেতন কাঠামোতে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন বেতন চার হাজার ১৫০ টাকার পরিবর্তে আট হাজার ৩শ’ টাকায় উন্নীত হবে। একইসাথে সর্বোচ্চ মজুরি পাঁচ হাজার ৬শ’ টাকার পরিবর্তে ১১ হাজার ২শ’ টাকায় উন্নীত হবে। নতুন মজুরি ২০১৫ সালের পয়লা জুলাই থেকে এবং ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কার্যকর হবে ২০১৬ সালের পয়লা জুলাই থেকে। শ্রমিকরা মজুরি কম পেয়ে ইজিবাইক চালানোসহ অন্যান্য পেশায় চলে যাওয়ায় অনেক মিলেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম উৎপাদন হচ্ছে বলেও মিলগুলোর সূত্র জানিয়েছে। এখন আর সে আশংকা থাকবে না। মজুরি বকেয়া থাকলেও হয়ত এক সময় একসাথে অনেক টাকা পাওয়া যাবে এ আশায়ই শ্রমিকরা মিলে কাজ করবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরি আহবায়ক সোহরাব হোসেন বলেন, তারা যে ১১ দফা দাবিতে আন্দোলন করছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের শ্রেক্ষিতে তা থেকে সরে দাঁড়ান। এর দীর্ঘদিন পর হলেও মজুরি কমিশন অনুমোদন হওয়া শ্রমিকদের মধ্যে আশার আলো দেখা দিয়েছে। এখন এটি বাস্তবায়নই জরুরি। এজন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়ে যেভাবে মন্ত্রীসভায় মজুরি কমিশন অনুমোদন দিয়েছেন তেমনিভাবে দ্রুত এর গেজেট প্রকাশসহ অন্যান্য কার্যক্রমেও তার হস্তক্ষেপ কামনা করছে শ্রমিকরা।

প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলস্ সিবিএ’র সাবেক সভাপতি মো. খলিলুর রহমান বলেন, মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন হলে শ্রমিকরা উদ্যম নিয়ে কাজ করবে। এতে উৎপাদনও বাড়বে। কিন্তু পাশাপাশি সরকারকেই বিশ্বের বাজার সৃষ্টিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে মিলগুলো আবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে মিলের উৎপাদিত পণ্য পড়ে থাকলে শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া পড়ে যাবে বলেও আশংকা রয়েছে।

অবশ্য মিলের কর্তৃপক্ষ এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখছেন। প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলের প্রকল্প প্রধান মো. মজিবর রহমান মল্লিক বলেন, তার মিলে প্রায় ৬০ কোটি টাকার পণ্য এখনই পড়ে আছে। যা বিক্রির জন্য বিজেএমসিকে উদ্যোগী না হলে অবিক্রিত পণ্যের পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে। পক্ষান্তরে মিলের সাপ্তাহিক মজুরিও প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ায় মিলের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। এজন্য শ্রমিকদের কাজের গতি স্বাভাবিক রাখতে মজুরি কমিশন বাস্তবায়নের সাথে সাথে অন্যান্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রমও দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করা দরকার বলেও তিনি মনে করেন।

বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন বা বিজেএমসি’র আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শেখ রহমত উল্লাহ বলেন, মজুরি কমিশন অনুমোদনের বিষয়টি শ্রমিকদের কাজের গতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক হলেও অর্থের সংস্থানের দিকটিও নিশ্চিত করতে হবে। কেননা এমনিতেই বিক্রির যে সক্ষমতা মিলগুলোর আছে তা দিয়ে সাপ্তাহিক মজুরি দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবার মজুরি দ্বিগুণ বৃদ্ধির ফলে নতুন করে মিলগুলোকে চ্যালেঞ্জ কোমাবেলা করতে হবে যদি অর্থের যোগান নিশ্চিত না করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ