ঢাকা, শুক্রবার 6 July 2018, ২২ আষাঢ় ১৪২৫, ২১ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বছরে আর্থিক ক্ষতি ৩৭ হাজার কোটি টাকা

স্টাফ রিপোটার: রাজধানী ঢাকাতে যানজটের কারণে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এ যানজটের কারণে বছরে আর্থিক ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। রয়েছে স্বাস্থ্য ক্ষতি, পরিবেশ দূষণ, প্রাণহানী- পঙ্গুত্ব হওয়ার সংখ্যাও নেহাত কম নয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংক এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় বিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্টিন রামা, পিপিআরসির চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর অ্যান্থনি ভেনাবলসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবছরই রাজধানীতে বসতি বাড়ছে। ১৯৮০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিলো ৩ মিলিয়ন বা ৩ লাখ, বর্তমানে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ মিলিয়ন বা ১ কোটি ৮০ লাখে। এর মধ্যে সাড়ে তিন মিলিয়ন লোক বস্তিতে বসবাস করে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সালে ঢাকায় বসতি দাঁড়াবে ২৫ মিলিয়ন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিগত ১০ বছরে যান-চলাচলের গড় গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে কমে ৭ কিলোমিটারে পর্যন্ত নেমে এসেছে, যেখানে পায়ে হেঁটে চলার গড় গতি হচ্ছে ৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। এছাড়া গ্লোবাল সিটির অংশ হিসেবে ঢাকাকে কিভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির ‘পাওয়ার হাউস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, সেই গবেষণাও করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, কিছু পদক্ষেপ নিলে ঢাকায় অতিরিক্ত ৫০ লাখ লোকের জন্য বসবাসের ব্যবস্থা করা যাবে। একই সঙ্গে ১৮ লাখ মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানও করা সম্ভব হবে।

পাওয়ার হাউসের পয়েন্টগুলো হলো, বন্যার হাত থেকে বাঁচতে ও পানির গতি ঘোরাতে বালু নদীর তীরে একটি বাধ দিতে হবে, ক্রমবর্ধমান সাধারণ ট্রান্সপোর্ট ও পাবলিক ট্রান্সপোর্টের চলাচলের উন্নয়নে সমন্বয় করতে হবে। এর বাইরে ঢাকার আগেই একটি ‘বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট’ গড়ে তুলতে হবে। বিশ্বব্যাংক বলছে, এই তিন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে ব্যয় হবে দেড় হাজার কোটি টাকা। আর এই টাকা ব্যয়ের ফলে ২০৩৫ সালের মধ্য বছরে ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম হবে। অর্থনৈতিক এই কার্যক্রম রাজধানীবাসীর আয় বাড়িয়ে দেবে। এখন যেখানে মাথাপিছু আয় ৮ হাজার ডলার সেটা ২০৩৫ সাল নাগাদ ৯ হাজার ২০০ ডলারে উন্নীত হবে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর অ্যান্থনি ভেনাবল বলেন, গড় হারে প্রতিদিন ঢাকায় মানুষ বাড়ছে। বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩৫ সালে ঢাকার জনসংখ্যা হবে সাড়ে ৩ কোটি। ঢাকা এখন প্রচুর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। সেটা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। 

ঢাকা শহরে যানজটের কারণে আর্থিক ক্ষতির এই হিসাব যাদের আকর্ষণ করছে না, তাদের জন্য আরেকটি তথ্য আছে। এই শহরে এখন ঘণ্টায় গড়ে প্রায় সাত কিলোমিটার গতিতে চলছে যানবাহন। বিশ্বব্যাংক বলছে, এভাবে চলতে থাকলে আর কিছুদিন পর হেঁটেই গাড়ির আগে যেতে পারবে মানুষ। তীব্র যানজটের সময় গাড়ির আগে হেঁটে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নগরবাসীর কাছে অপরিচিত নয়। যানজটের পরিস্থিতি দিন দিন যেভাবে খারাপ হচ্ছে, তাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও যে বাড়বে, তা বলা বাহুল্য।

যানবাহনের পরিমাণ যদি একই হারে বাড়তে থাকে এবং তা নিরসনের কোনো উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে ২০২৫ সালে এই শহরে যানবাহনের গতি হবে ঘণ্টায় চার কিলোমিটার, যা মানুষের হাঁটার গতির চেয়ে কম। মানুষের হাঁটার গড় গতি ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার বলে মনে করা হয়।

বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা ১ কোটি ৮০ লাখ। ২০৩৫ সালে এই জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ৩ কোটি ৫০ লাখ হবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। এমন জনসংখ্যার একটি নগরীর উৎপাদনশীলতা বাড়ানো গেলে তা অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে বলে সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেছেন, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই ঢাকার যানজট সমস্যার সমাধান করতে হবে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ১০-১২ বছর আগে ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সে পরিকল্পনা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। সেটি গত বছর সংশোধন করা হয়েছে। দ্রত জনসংখ্যা বৃদ্ধির শহরে যদি সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা ধীরগতিতে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সমস্যা তীব্রতর হবে এটাই স্বাভাবিক।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) দ্য আরবান স্পেকট্রাম: মেট্রোপলিটন টু মফস্বল নামের গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়। তাতেও বলা হয়, রাজধানীতে যানবাহনের গড় গতি সাত কিলোমিটার। আবদুল্লাহপুর থেকে সায়েদাবাদ পর্যন্ত ২১ কিলোমিটার পথ যেতে সময় লাগে তিন ঘণ্টার বেশি। অথচ বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ব্যবস্থায় এই দূরত্ব ৩৫-৪৫ মিনিটের।

 মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও দ্য চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব লজিস্টিকস এন্ড ট্রান্সপোর্ট ২০১০ সালে গবেষণা করে বলেছিল, রাজধানীতে যানজটের কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতি ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি। গত ছয় বছরে এটা বেড়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমানে মোট জিডিপির ৩৭ শতাংশ জোগান দিচ্ছে ঢাকা। যানজট না থাকলে এটা আরও বাড়তে পারত। যানজটের কারণে একদিকে শ্রমঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে ঢাকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, রাজধানীতে যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ ব্যক্তিগত ছোট গাড়ি (প্রাইভেট কার)। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে বাস ও মিনিবাসের চেয়ে সাত গুণ বেশি ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ শামসুল হক বলেন, দীর্ঘদিন বলার পরও গণপরিবহন-ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করায় এখন পুরো ঢাকা স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকার পরিকল্পনা করছে, কিন্তু কাজ সেভাবে হচ্ছে না, এটি দুঃখজনক। তিনি বলেন, ঢাকা ও দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে হলে গণপরিবহনভিত্তিক দ্রতগতির পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ