ঢাকা, শুক্রবার 6 July 2018, ২২ আষাঢ় ১৪২৫, ২১ শাওয়াল ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জাতীয় নির্বাচনে খুলনা ও গাজীপুরের ‘মডেল’ বাস্তবায়নের আশঙ্কা সুজনের

 

স্টাফ রিপোর্টার : খুলনা মডেলে গাজীপুরেও ‘নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। আগামী জাতীয় নির্বাচনেও একই মডেল বাস্তবায়ন করা হতে পারে বলে সংগঠনটি আশংকা প্রকাশ করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কেমন জনপ্রতিনিধি পেলাম’ শীর্ষক সাংবাদিক সম্মেলনে সুজনের পক্ষ থেকে  গাজীপুরের ভোটের এ চিত্র তুলে ধরা হয়। 

সম্মেলনে নির্বাচনে গাজীপুর সিটিতে বিজয়ী প্রার্থীদের তথ্যের বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার। এসময় সুজনের সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য হামিদা হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

বিভিন্ন গণমাধ্যম ও নিজস্ব স্বেচ্ছাব্রতীদের মতামতের ভিত্তিতে সুজন জানিয়েছে, খুলনার মতো গাজীপুরেও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় প্রধান প্রতিপক্ষকে মাঠছাড়া করা হয়েছে। বিএনপি প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের দিন সাময়িকভাবে কেন্দ্র দখল করে জালভোট প্রদান, ভোটকেন্দ্রে এবং এর আশেপাশে ভীতিকর ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি এবং ভোট প্রদানে বাধা দানের ঘটনা ঘটেছে। খুলনার মতো গাজীপুরের নির্বাচনেও বহু অনিয়ম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হয়রানি ও বাড়াবাড়ির অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, যা সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন ছিল নির্বিকার। 

সুজন জানায়, গাজীপুর সিটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতার  তুলনায় উচ্চ শিক্ষিতদের নির্বাচিত হওয়ার হার কিছুটা বেশি, যা ইতিবাচক। তবে অন্যান্য নির্বাচনের মতো গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নব-নির্বাচিত ৭১ জন জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে ৪৭ জনই ব্যবসায়ী।

সুজনের বিশ্লেষনে বলা হয়েছে, প্রতিদ্বন্ধিতার  তুলনায় মামলা সংশ্লিষ্টদের নির্বাচিত হওয়ার হার বেশি। স্বল্প আয়কারী প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়ার হার প্রতিদ্বন্ধিতার  তুলনায় কম হলেও অপেক্ষাকৃত অধিক আয়কারী প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়ার হার প্রতিদ্বন্ধিতার  তুলনায় বেশি। এছাড়া ঋণগ্রহীতা ও কর প্রদানকারীদের নির্বাচিত হওয়ার হার প্রতিদ্বন্ধিতার তুলনায় বেশি।

সুজন সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গাজীপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের হয়রানি ও গ্রেফতারের অভিযোগ করা হলেও নির্বাচনের মাত্র একদিন আগে গত ২৪ জুন ইসি এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। যা রোগী মারা যাবার পর ডাক্তার হাজির করার মতো অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। ইসি এই প্রজ্ঞাপন জারি করলেও পুলিশ তা অমান্য করে ধরপাকড় অব্যাহত রাখে। গাজীপুরের এসপির বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ তোলা হলেও নির্বাচন কমিশন থেকে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

তিনি বলেন, আমরা আশা করবো আগামী ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল এই তিন সিটি নির্বাচনের আগে ২৪ জুনের মত ইসি আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করবে না। যাতে প্রধান প্রতিপক্ষকে পুলিশ হয়রানি না করতে পারে। তবে, গাজীপুরের মত প্রজ্ঞাপন জারি করলেই হবে না। তা বাস্তবায়নে ইসিকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

সুজন সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী যে ধরণের পদক্ষেপ নেয়ার কথা ছিল ইসি তা নেয়নি। ভবিষ্যতে তিন সিটি নির্বাচনসহ জাতীয় নির্বাচনে তা নেবে কিনা আমরা সন্দিহান। তারপরেও আমরা আশা করবো ইসি আইন অনুযায়ী তার ভূমিকা পালন করবে।

সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, খুলনার মতো গাজীপুর সিটি নির্বাচনেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় প্রধান প্রতিপক্ষকে মাঠ ছাড়া করা হয়েছে। আদালত কর্তৃক নির্বাচন স্থগিত করার দিন (গত ৬ মে) একটি লেগুনা ভাংচুর করার অভিযোগে বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের বাড়ির আশপাশ থেকে দলটির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানসহ ১৩ জনকে আটক করা হয়। ৬ ঘন্টা পর নোমানকে ছেড়ে দেয়া হলেও বাকি ১২ জনসহ ১০৩ জনের বিরুদ্ধে নাম উল্লেখ করে টঙ্গী থানায় ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে পুলিশ মামলা করে। এই মামলায় আসামীদের মধ্যে ৪৮ জন ছিল বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য। অথচ টঙ্গী থানায় ওই লেগুনাটিকে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে।

সম্মেলনে বলা হয়, গাজীপুর সিটি নির্বাচনে পুলিশ বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। নির্বাচনের দিন পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা ভোট কেন্দ্র ও তার আশেপাশের এলাকায় ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে সাধারণ ভোটারদের ভোট দিতে বাধা দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ইসির দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গাজীপুর সিটি নির্বাচনে নব নির্বাচিত ৫২ জন সাধারণ কাউন্সিলের মধ্যে ২৪ জনের বিরুদ্ধে বর্তমানে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। শতাংশের হিসাবে এর পরিমাণ ৪৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। আবার ১৮ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে অতীতে ফৌজদারী মামলা ছিল।

অন্যদিকে, নির্বাচিত ৫২ জন সাধারণ কাউন্সিলরের মধ্যে ৪৩ জনই ব্যবসায়ী। শতাংশের হিসাবে এর পরিমাণ ৮২ দশমিক ৮৯ শতাংশ। সংরক্ষিত ওয়ার্ডের (নারী) কাউন্সিলরসহ ৭১ জন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মধ্যে ৪৭ জনই ব্যবসায়ী। নির্বাচিত মোট কাউন্সিলরদের মধ্যে ৩৯ জনের শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি বা তার নীচে। স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারীর সংখ্যা ১৯ জন।

সুজনের সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার বলেন, গণমাধ্যম ও সুজনের স্বেচ্ছাব্রতীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, খুলনার নির্বাচনের মতো গাজীপুরেও ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে জোরজবরদস্তি করা হয়েছে। কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট প্রদান, ভোটকেন্দ্র ও আশপাশে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি এবং ভোট প্রদানে বাধা দেওয়া হয়েছে। 

সুজন জানায়, গাজীপুরে ভোট দেওয়ার হার ৫৭ দশমিক ২ শতাংশ হলেও ৬১টি কেন্দ্রে ৭৩ থেকে ৯৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। এ ছাড়া ৪০টি কেন্দ্রে ১৪ থেকে ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে। এ ধরনের অস্বাভাবিক ভোটের হার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সুজন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ